ইউজার লগইন

ভালো একটা শিরোনাম খুঁজে পেতেই হবে

মন মাঝি খবরদার
আমার তরী যেন ভেড়ে না
আমার নৌকা যেন ডুবে না।

মজিদ ভাইয়ের দোকানের বেঞ্চে বসে শাফায়াত ভাই গানটা গাওয়া শুরু করলেন। শাফায়াত ভাই চমৎকার গান গাইতে পারে। কিন্তু কদাচিৎ শাফায়াত ভাইয়ের দেখা পাওয়া যায়।
যেসব রাতে দেখা হয়ে যায় সেসব রাত কেটে যায় ভেবে ভেবে। ভাগ্যক্রমে সেদিন রাতেও দেখা হয়ে গিয়েছিল।

গানটা শুনেই পাহাড়ের দেশের রাতে একটা নির্জন জলাভূমির কথা মনে পড়ল। যেখানে চাঁদের আলোয় রাত খেলা করে। একবার প্রকৃতির সেই গোপন স্বপ্নরাজ্য দেখে আমরা পৃথিবীর সব বিষাক্ত দুশ্চিন্তা ভুলে গিয়েছিলাম। তক্ষকগুলো ডেকে যাচ্ছিলো আর পাহাড়ের ভালবাসার পরশে আমাদের দেহমনের সব প্রার্থনা গেয়ে শোনাচ্ছিল লুসি দিদি- সাড়ে তিন হাত নৌকার খাঁচা, মন মন মাঝিরে, ঘন ঘন জোড়া; সেই নৌকাখান বাইতে আমরন, হাড় হইলো গুড়া রে...

এ রকম যখন মনের অবস্থা তখন একটা সিগারেট জ্বালিয়ে আবছা আলোয় শাফায়াত ভাইয়ের পাশে বসে পড়াই একমাত্র কাজ। এই ভাইটার পাশে বসলে আমার ভিত্তরেও একটা শুভ্র ভাব চলে আশে। মনে হয় অনেক দিন পর সূর্যের আলো দেখছি। বেঁচে থাকার সাহস ফিরে পাওয়া যায়।

এর আগে যেদিন শাফায়াত ভাইয়ের সাথে দেখা হয়ে গিয়েছিলো সেদিন ব্যাংকের এটিএম সার্ভিস বন্ধ ছিলো। সবার টাকা থাকলেও কারও পকেটেই ছিলো না। তবুও আড্ডার
জোগাড় হয়ে গিয়েছিলো। সেটা বেশ একটা অভিজ্ঞতা ছিল। রাত হলে ফেরার আগে শেষ ৯
টাকা দিয়ে একটা সিগারেট কিনেছিলাম। আর তিন দোকানে বাকিতে কয়েক পদ খেয়ে হলে ফিরতে ভোঁর হয়ে গিয়েছিলো।

মনে পড়ে, তার আগের রাতে মৌসুমের প্রথম বৃষ্টিটা। সেটা কিঞ্চিত অপ্রত্যাশিত ছিলো। একেবারে বলা কওয়া ছাড়া এসে হাজির। সাথে করে নিয়ে এসেছিল একগাদা অফুরন্ত বাতাস। এর মধ্যে লাফ দিয়ে একটা ৩ নাম্বারে চড়েছিলাম। সিগন্যাল ছাড়ার ঠিক আগে কলমিলতার মত একটা মেয়ে বাসে উঠলো। মেয়েটা এই বৃষ্টির মধ্যে কোথায় যাচ্ছিলো কেন যাচ্ছিলো- শাহবাগ পৌঁছানো পর্যন্ত এসব নিয়ে ভেবেছিলাম।

কেননা মানুষ অনেক সময় কোনও কারণ ছাড়াও বাইরে বের হতে পারে। অজথা রাস্তায় হাঁটা
হাঁটিও করতে পারে যতক্ষণ খুশি। আমি মাঝে মাঝে এরকম করি। চৈত্রের পোকার শব্দ আর আলসেমি যখন বিকেলটা কিনে নিতে চায় কিংবা গভীর রাতের পথঘাটের দৃশ্য যখন হলদে- তখন অনেকক্ষণ ধরে আমি হাটি। বসন্তে গাছপালা নতুন পাতায় ভরে যায়। আমের গুটিগুলো প্রতিরাতে একটু করে বড় হতে দেখে মনটা কালো বিষণ্ণতা থেকে খানিক মুক্তি পায়।

দেয়াল ভর্তি এই শহরের অনেক কিছু আমাকে বিষণ্ণ করলেও মাঝে মাঝে প্রকৃতির স্পন্দন দেখে ভালো লাগে আর অবাক হই। কংক্রিটের রুক্ষতার সাথে যুদ্ধ করে বাঁচতে থাকা একটা কলাগাছ বা পলাশ গাছের দেখা পেয়ে গেলেও মন খুশি হয়। মনে হয় আমিও গাছটার মত বৈরি পরিবেশে বেঁচে আছি। আমাদের কারো চারণভূমি নয় এই বিষাক্ত জঙ্গল।

অনেক মানুষ এই বিষয়গুলো বোঝেই না। যেমন স্বপ্নময়ী নামের মেয়েটা। তার নাম স্বপ্নময়ী
কারণ সে ভালো দেখে একটা প্রবাসি ছেলে বিয়ে করতে চায়, তারপর ইউরোপের সীমাহীন হাইওয়েতে শেভির সামনের সিটে বসে বলতে চায়- আরও স্পীড চাই প্রিয়তম, আমার শরীরের সবগুলো কনা বাতাসে ভাসিয়ে দাও। কিন্তু সে আমার সাথে একটুও হাঁটতে রাজি হয় না। হাঁটার প্রস্তাব করতেই রোদের আঁচে পুড়ে যাবার ভয় করে ওদের। কিন্তু রোদ্দুর তো সারা জীবন আমার চাই। তাই স্বপ্নময়ীদের আমি বুঝতে পারি না। আমার মনে হয় ওরা সবুজ চেনে না, মাঠের ঘাস বোঝে না। ওরা বোকা, কিন্ত হয়ত ওরাই ভাগ্যবান।

আমি জানি আমিও কম বোকা নই। সে জন্যই বোধ হয় কঠিন পথ বেছে নিতে ইচ্ছা করে। কল্পনায় পথ খোঁজার চেষ্টা করি। চৈত্রের কাফনে মনটা মুড়িয়ে দুপুরের রোদে পুড়ি প্রায়ই। শিশিরের শিহরণে ভিজি মাঝে মাঝে।

আবছা আলোয় বটগাছের পাতার ফাঁক দিয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে থেকে কখন যেন শাফায়াত ভাইয়ের গলার সাথে আমার গলা মিশে যায়। মন মাঝি জানান দেয়- হারানোর মত কিছু তো নেই। বব ডিলানও বলে- হোয়েন য়্যু হ্যাভ নাথিং, য়্যু হ্যাভ নাথিং টু লুজ। আমার তবু হারিয়ে ফেলতে ইচ্ছা করে না এইসব ধুলোবালি; রাতের আলোয় বট গাছের পাতার তল আর জ্বলে পুড়ে বেঁচে থাকার এই সময়।

অনেক দিন হল শাফায়াত ভাইয়ের দেখা নেই। এর ভিতরে ঘটে গেছে অনেকগুলো ঘটনা আর কয়েকটি দুর্ঘটনা। আজকে কাজ করতে হয় নি। বিকেল জুড়ে সারা শরীর মন মাঝির গানটা আঁকড়ে ধরে বাঁচতে চেয়েছে। কালকের দিনটায় খুব পরিশ্রম হবে। কি করে পারবো আমি? আমার চোখ দেখে বোঝা যাচ্ছে যে বুকের ভিতরটা ফাঁকা হয়ে আছে।

পোস্টটি ৯ জন ব্লগার পছন্দ করেছেন

বিষণ্ণ বাউন্ডুলে's picture


অনেক দিনের পর আসলেন।

চমত্‍কার বিষাদমাখা কথকতা..

আরাফাত শান্ত's picture


চমৎকার!

মেসবাহ য়াযাদ's picture


অনেক দিন পর... চমত্‍কার কথকতা..

তানবীরা's picture


কারণ সে ভালো দেখে একটা প্রবাসি ছেলে বিয়ে করতে চায়, তারপর ইউরোপের সীমাহীন হাইওয়েতে শেভির সামনের সিটে বসে বলতে চায়- আরও স্পীড চাই প্রিয়তম, আমার শরীরের সবগুলো কনা বাতাসে ভাসিয়ে দাও। কিন্তু সে আমার সাথে একটুও হাঁটতে রাজি হয় না। হাঁটার প্রস্তাব করতেই রোদের আঁচে পুড়ে যাবার ভয় করে ওদের। কিন্তু রোদ্দুর তো সারা জীবন আমার চাই।

চমত্‍কার কথকতা

নিয়োনেট's picture


লেখাটা তৈরি হয়ে ছিলো অনেকদিন ধরে। কিন্তু ছাড়বো কি ছাড়বোনা টা নিয়ে দোটানায় কাটিয়েছি দিনগুলো। অবশেষে পরিস্থিতি বাধ্য করেছিলো।

কিন্তু এগুলোকেই কি কথকতা বলে? আমি জানতাম না।

আর ভালোলাগা জানাবার জন্য সকলকে ধন্যবাদ। Smile

মন্তব্য করুন

(আপনার প্রদান কৃত তথ্য কখনোই প্রকাশ করা হবেনা অথবা অন্য কোন মাধ্যমে শেয়ার করা হবেনা।)
ইমোটিকন
:):D:bigsmile:;):p:O:|:(:~:((8):steve:J):glasses::party::love:
  • Web page addresses and e-mail addresses turn into links automatically.
  • Allowed HTML tags: <a> <em> <strong> <cite> <code> <ul> <ol> <li> <dl> <dt> <dd> <img> <b> <u> <i> <br /> <p> <blockquote>
  • Lines and paragraphs break automatically.
  • Textual smileys will be replaced with graphical ones.

পোস্ট সাজাতে বাড়তি সুবিধাদি - ফর্মেটিং অপশন।

CAPTCHA
This question is for testing whether you are a human visitor and to prevent automated spam submissions.

বন্ধুর কথা

নিয়োনেট's picture

নিজের সম্পর্কে

অতীতের ভিত্তিতে নিজেকে ডিফাইন করা অর্থহীন। আর আগামীও অদেখা। বর্তমানে আমি কী সেটা যদি এখন বলি, সেই তথ্য খানিক সময় পরে ইনভ্যালিড হয়ে যাবে, যেহেতু মানুষ প্রতি সেকেন্ডে বদলায়। ফলে, নিজের সম্পর্কে স্পষ্ট করে কিছু বলাটা কঠিন কাজ।