সত্যিই সে ভালবাসে
আমি একটা ছেলেকে চিনি। ছোটবেলায় তাকে আমাদের বাসার চারপাশে একটু বেশিই দেখা যেত। কারণ সে আমার মেজো আপাকে ভীষণ ভালবাসত। আমার এই আপা খুবই সুন্দর ছিল বলে তাকে অনেক ছেলেরাই ভালবাসত। আর আমার বড় আপার কাজ ছিল সে ছেলেদের কাছ থেকে ছোট বোনকে বাঁচানো। তবে সে ছেলেটা ছিল আলাদা। আমার বোন সপ্তম শ্রেণীতে পড়ার সময় তার কাছ থেকে প্রথম চিঠি পায়। আর সে ছিল তখন অষ্টম শ্রেণীর ছাত্র। ( আজকাল এই বয়সে প্রেম করা স্বাভাবিক হলেও ১৭ বছর আগে স্বাভাবিক ছিল না) ওদের আসল বাড়ি ছিল অন্য বিভাগে। কোন একটা কারণে সে তার বাবা মা'র সাথে থাকত না । খালার বাসায় থাকত।
সে ছেলে আমাদের জানালা দিয়ে চিঠি দিয়ে যেত। সে চিঠিতে থাকত সব নিজের কথা। সে কি করতে পছন্দ করে, কি খেতে পছন্দ করে, কি রং পছন্দ, প্রিয় গান কোনটা, কোন গানের কোন লাইন সে বেশি শোনে, প্রিয় ক্রিকেট দল কোনটা, প্রিয় খেলোয়ার কে, এইসব। আমি জানালার পাশে বসে পুতুল খেলতাম বলে চিঠিগুলো আমিই বেশী পেতাম। বড় আপা বাসায় আসলে দিতাম। বড় আপা পড়ে আমাদের শোনাতেন। আর লাল কলমে দাগ দিতেন ভুল বানানগুলোতে।
তখন সে দশম শ্রণিতে পড়ে। অনেক বড় একটা চিঠি লিখে। সেটা একটু রোমান্টিক ছিল। যেমন গানের অনুষ্ঠানে আপার গান শোনে ওর মনে কি কি দোলা দিয়েছে এই টাইপ। সেখানেও অনেক বানান ভুল ছিল। কয়েকদিন পর, বাসার পিছন দিয়ে যাওয়ার সময় আপা তাকে ডাক দিল। সে খুবই ভয় পেয়েছিল তবুও আসল। আপা বলল, " চিঠি লিখ ভাল কথা বানান এত ভুল কেন? সামনে এস এস সি পরীক্ষা , বাংলায় তো ফেল করবে। রাত দুইটায় পড়াশোনা না করে চিঠি লিখ কেন? পরে যেন চিঠিতে বানান ভুল না হয়।" বড় আপার এই কথায় আমরা তো দূর থেকে হাসতে হাসতে গড়াগড়ি খাচ্ছি, আর ঐ ছেলে ভয়ে অস্থির।
কোনদিন সে চিঠির উত্তর পায় নি। তবুও সে লিখত। এত ভালবাসতো সে আমার বোনটাকে। আমি ভাল করে জানি কারণ তার সাথে আমার সম্পর্কটা খুব ভাল ছিল। সে যখন তার বাড়িতে ফিরে গেল, সে যেন চলে গেল আমাদের জীবন থেকে।ভেবেছিলাম আর কোনদিন দেখা হবে না, কথাও হবে না।কারণ মোবাইল ফোন তখনও সবার ঘরে পৌছায় নি। যখন আমি নবম শ্রেণীতে তখন নিজেরই ফোন ছিল। তার ফোন পাই একদিন। তারপর থেকে যোগাযোগ হত। সবসময় না হলেও মাসে কয়েকবারই যোগাযোগ হত। সে ফেইসবুকে আপার ছবি দেখে আমাকে বলত, তোমার আপা তো আরও সুন্দরী হয়ে গেছে, ওর ছেলেটাও সুন্দর হয়েছে। আমি এসব শুনে ভাবতাম, এতটা ভালবাসা কি সম্ভব? আপা তার সাথে কখনও কথা বলে নি। সে জোড়ও করে নি। শুধু ভালবেসেছে। আপা ওকে মনে মনে ও ভালবাসে নি। কলেজে পড়াকালীন তার সাথে যোগাযোগ বন্ধ করে দিই। আমার ভালবাসার মানুষের তা সাথে কথা বলা পছন্দ ছিল না বলে।
জাপানে আসার কিছুদিন আগে ওর সাথে যোগাযোগ করি। তখন আমি ভাল ছিলাম না। ভালবাসতে গিয়ে নিজের সব হারিয়ে ফেলেছি। কিছুই না পেয়ে নিঃস্ব। সে কিন্তু আগের মতই আছে। পড়াশোনায় ভাল কিছু করতে পারে নি। এখনও পড়ছেই। বাবা মারা গিয়েছিল অনেক আগেই, বোন বিয়ে দিয়ে মাকে নিয়ে সংসার। আর মা ব্যস্ত তাকে বিয়ে দেয়ার জন্য। আমার বোনের কথা তার আত্বীয় স্বজন পাড়া প্রতিবেশী সবাই জানে। এমনকি তাদের পরিচিত সবাই। তার চুরি করে তোলা ছবিগুলোও না কি মোটামুটি সবাই দেখেছে। এখন আমার বোন স্বামী সন্তান নিয়ে সুখে আছে তাও জানে। আমার বোনের নামের কোন মেয়ে পেলেই তার জন্য বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে যায়। আমার বোনের সুখ দেখে তার যে কি খুশি। সত্যিকারের ভালবাসা আমি একে বলব না তো কোনটাকে বলব। ১৩-১৪ বছর যাবত একতরফা ভাবে ভালবেসে যাওয়া। হয়ত এখনও সে ভালবাসে। জানি না, অনেকদিন যোগাযোগ নেই। তবে তাকে দেখে আমি অনেক কিছু শিখেছি। খুব হিংসে হয় তাকে দেখলে , তবে দুঃখ হয় আমার বোনের জন্য, সে বুঝতেও পারল না কখনও জানতেও পারবে না সে কি পেয়েছিল , আর না বুঝে কি হারিয়ে ফেলল।





ছেলেটা তাকে পায় নি বলেই এতদিন ভালবাসতে পেরেছে, পেলে ব্রেকাপ হয়ে যেতো
মীর হয়ত ঠিকই বলেছেন। আমিও তাই করেছি অনেকবার। আপাকে চিঠি দেয়া অন্যেরাও পাত্তা না পেয়ে অন্য কাউকে ভালবেসেছে। ব্রেকআপও করেছে। এ ছেলেটা যেহেতু করে নি তাই ......
মন্তব্য করুন