ইউজার লগইন

সুশিক্ষিত লোক মাত্রই স্বশিক্ষিত কিন্তু স্বশিক্ষিত লোক মাত্রই সুশিক্ষিত নয় - এতদিনে মানে বোঝলাম।

আমার একটা ছোট ভাই আছে। তার সবচেয়ে অপছন্দ একটা কাজ হল, পড়াশোনা। কিন্তু পড়াশোনা তো করতেই হবে। তার এসএসসি টেস্ট পরীক্ষার আগে একদিন আম্মা বাসায় আসে ভীষণ রেগে। কারনটা হল, ভাইয়ের ক্লাসের ফার্স্ট বয় নাকি পাঠ্যবইয়ের গন্ডি পেরিয়ে সৃজনশীল গাইড বই পড়ছে। যেখানে একই প্রশ্ন বিভিন্নভাবে এবং প্রশ্নের উত্তরও সৃজনশীল ভাবে লেখা রয়েছে। যেহেতু সৃজনশীল পদ্ধতিটা নতুন, তাই তাকেও সেই গাইড বই পড়তে হবে। আম্মা আমাদের কোনদিন গাইড বই পড়তে বলে নি। নিজের হাতে নোট তৈরি করে পড়তাম। আজ হঠাৎ গাইড বই কেন? এত্ত বড় একটা বই কিনেও এনেছেন। ভয়ে ভয়ে বললাম, গাইড বইয়ের চেয়ে পাঠ্যবই পড়াই তো ভাল। আপনিই তো বলতেন। আজকে কেন?
আম্মা বলে, ফার্স্ট বয়ের মা নাকি বলেছেন, প্রশ্ন এই গাইড বই থেকেই আসবে। টিচাররাও উত্তর ঠিক না ভুল গাইড বইয়ের সাথে মিলিয়েই নম্বর দিবে। স্কুলেও তা করছে। ভাইকে জিজ্ঞেস করে জানলাম ঘটনা সত্যি। কি চিন্তার বিষয়। তবে ভাইয়ের কথায় মনে হল কি হাস্যকর ব্যাপার। উত্তর প্রশ্ন যেটা যেমনই হোক , যেদিক থেকেই আসুক, পাঠ্যবইয়ের লেখার বাইরে থেকে তো আর আসবে না।

হোস্টেলে ফেরার দুইদিন পর আম্মার ফোন, তোর ভাই শুধু বইয়ের অধ্যায়গুলো পড়ে, কিন্তু প্রশ্নের উত্তর পড়ে না। বলে এখান থেকে সরাসরি প্রশ্ন আসবে না। আবার গাইড বইও পড়ে না। সেখানে কত রকম প্রশ্ন আছে। আম্মাকে বিখ্যাত গাইড বইয়ের চিন্তা বাদ দিতে বললাম। এক সপ্তাহ পর শুক্রবারে বাসায় গিয়ে দেখি আম্মার চিৎকার চেঁচামেচিতে ঘর রীতিমত কাঁপছে। আম্মার একহাতে ঝাড়ু আর আমার ভাই কিছু অরিগেমি নিয়ে বসে আছে। চোখে পানি। বুঝলাম একচোট মাইর খেয়েছে। সাহস করে আম্মাকে জিজ্ঞেস করলাম ঘটনা কি। আম্মা বলল, ভাই নাকি গাইডের পাতা কেটে অরিগেমি বানিয়ে কিছু আশেপাশে বাচ্চাদের দিয়েছে, আর কিছু আম্মা ড্রয়ারে পেয়েছে। ভাই আমাকে দেখে সাহস করে বলল, হাত লাইফবয় সাবান দিয়ে ধুয়েছি। বুঝলাম তখন জাফর ইকবালের অন্ধ অনুসারি আমার এই ভাইয়ের কপালে আজ আরও দুঃখ আছে। সেদিনের সেই জবাব তার এসএসসির রেজাল্ট দিয়েছে। বিজ্ঞান শাখা থেকে এ প্লাস পেয়েছিল।
তবে এতে নতুন ঝামেলাও হয়েছিল, গোষ্ঠির সবাই ধরে নিয়েছে এবার বুঝি সে ডাক্তার বা ইঞ্জিনিয়ার হয়েই গেল। কিন্তু বেঁকে বসল ভাই। বিজ্ঞান আর ভাল লাগছে না। মানবিক শাখায় ভর্তি হয়ে গেল। গোষ্ঠির সবার চক্ষু শুধু চড়াক গাছে না , আকাশে বাতাসে । একি সর্বনাশা কথা। ছেলেরা মানবিক শাখায়? তা ও বিজ্ঞান শাখা থেকে? উন্নতির দিকে না গিয়ে অবনতি? ভাই আমার নির্লিপ্ত। নিজের ইচ্ছায় সে চলবে। যাক, ভাই আমার আপোষ শিখে নি। ততদিনে দূরে চলে এসেছি। একা ভাইয়ের পাশে দূর থেকেই ঢালের মত ছিলাম । সব দায়িত্ব নিয়ে নিই। সামনে এইচএসসি পরীক্ষা, বললাম, পড়িস ভাল করে। সে এবার বলে, পড়ে কি হবে এত? সার্টিফিকেট পাব, আর কি?
বিরক্ত লাগল। তর্ক করতে ইচ্ছা হল না। বললাম, জ্ঞান অর্জনের জন্য পড়তে বলছিও না। কিছু জানার হলে গুগোল আছে। সার্টিফিকেট তো আর গুগোল দিবে না। সার্টিফিকেটের জন্যই পড়তে হবে। এরপর আর উত্তর থাকে না।
সেদিন কাজের পর সকালে তিনজন পিএইচডি ডিগ্রী অর্জনের উদ্দেশ্যে আসা বাঙ্গালী ভাইদের পেয়ে বললাম, বাংলাদেশে আপনাদেরকে উচ্চশিক্ষিত বলে, আপনারা পড়াশোনা কেন করেন বলবেন প্লীজ?
সেই গৎবাধা কমন উত্তর : জানার জন্য, জ্ঞানের জন্য। বললাম, সেটা সবাই জানে। কিসের জন্য এই জানা , কি জানা, সেটা তো বলেন। একজন উত্তেজিত জনতার মত বলতে শুরু করল, যে যত বেশি পড়বে তার আত্মবিশ্বাস নাকি তত বাড়বে। যত বড় ডিগ্রি তত বেশি আত্মবিশ্বাস। কিন্তু সেই আত্মবিশ্বাস কি কাজে লাগবে তা বলতে পারল না।
আরেকজন তো আমার সার্টিফিকেট নিয়ে টানাটানি শুরু করল। আমি বিজ্ঞানের ছাত্রী নই শুনে বলল, বিজ্ঞান কাকে বলে জানো? আমি বললাম, কোন কিছুর উপর বিশেষ জ্ঞানকেই তো বিজ্ঞান বলে। সেই উত্তেজিত ভাই তখন ছোট বেলায় মুখস্ত করা বিজ্ঞানের সংজ্ঞাটা হুবুহু আমাকে বলে শোনাল। চমৎকার মুখস্ত বিদ্যা, সত্যি প্রশংসাযোগ্য। তিনি আরও বললেন, একাডেমিক বিদ্যাই হচ্ছে সব। সাহিত্য জ্ঞানের উৎস নয়। আমার মেজাজ খারাপ হয়ে গেলেও হাসি মুখে শুনেছি। কারন, সে আবার পিঠের পিছনে কথা বলা মানুষ। মানে গীবত করতে ভালবাসে। আগামী ২ দিনে সবার কানে পৌঁছে যাবে আমি কম শিক্ষিত। তাকে ঘুরিয়ে একটা জবাব দিতে ইচ্ছা করছে। যেন সে ভেতরে জ্বলে মরে। উপরে কিছু বলতে না পারে। কিন্তু এখনও পাচ্ছি না কি বলব। হাতে সাতদিন সময় আছে। ভাবছি। আমার ভাইটাকেও বলেছি ভাবতে। আপনাদেরও সাহায্য চাই। প্লীজ.....
এই ভাই প্রতি মাসে সরকার থেকে কত সুযোগ সুবিধা আর টাকা পাচ্ছে শুধু পড়াশোনা করার জন্য। বাংলাদেশের হয়ে পড়ছে এমন একটা ভাব। কিন্তু সে.....
আর আমরাও তাদের উচ্চশিক্ষিত বলছি। জানি সবাই এক না। কিন্তু একে জবাব দিতে চাই। সাহায্য করুন প্লীজ........

পোস্টটি ৩ জন ব্লগার পছন্দ করেছেন

Fakharuddin's picture


লেখাটা পড়ে ভালোই লাগলো তবে যাই বলেন না কেনো আমাদের দেশে এখন পর্যন্ত এখনো সবাই শুধু সার্টিফিকেটকেই গুরুত্ব দেয় এবং মানুষের এই দৃষ্টীভঙ্গি সহজে পরিবর্তন হবে বলেও মনে হচ্ছে না।

মন্তব্য করুন

(আপনার প্রদান কৃত তথ্য কখনোই প্রকাশ করা হবেনা অথবা অন্য কোন মাধ্যমে শেয়ার করা হবেনা।)
ইমোটিকন
:):D:bigsmile:;):p:O:|:(:~:((8):steve:J):glasses::party::love:
  • Web page addresses and e-mail addresses turn into links automatically.
  • Allowed HTML tags: <a> <em> <strong> <cite> <code> <ul> <ol> <li> <dl> <dt> <dd> <img> <b> <u> <i> <br /> <p> <blockquote>
  • Lines and paragraphs break automatically.
  • Textual smileys will be replaced with graphical ones.

পোস্ট সাজাতে বাড়তি সুবিধাদি - ফর্মেটিং অপশন।

CAPTCHA
This question is for testing whether you are a human visitor and to prevent automated spam submissions.

বন্ধুর কথা

শারমিন's picture

নিজের সম্পর্কে

খুবই বদমেজাজী। স্বপ্ন দেখতে পছন্দ করি। অন্য মানুষের চেয়ে নিজের সাথে নিজে কথা বলতেই বেশি ভাল লাগে। আর ভাল লাগে গান শুনতে শুনতে ডায়রি লিখে কাঁদতে।