ইউজার লগইন

অপ্রত্যাশিত বৃষ্টি ।

( সবাইকে ঈদের উপহার হিসেবে গল্পটা দিলাম ) Smile Crazy

rainy_day_lovers.jpg

মেয়েটির সাথে ছেলেটির পরিচয় ওদের স্কুলের একটি পুরষ্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে । ছেলেটির নাম ছিল রাজ ।

তখন ওরা দুজনই পড়ত ক্লাস এইটে । প্রেম কি জিনিস ঠিক মত বুঝতেও পারত না । ওদের পরিচয় স্কুলের পুরষ্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে ।
মেয়েটি যখন পুরষ্কার নিতে এসেছিল ছেলেটি আগ্রহ হয়ে মেয়েটিকে তার নাম জিজ্ঞেস করে বসে ।
তোমার নাম কি ?
মেয়েটি উত্তর দেয় , আমার নাম নাজরিন সংক্ষেপে নাজ বলে ডাকতে পারো ।
দুজনের নামের ছিল অনেক মিল । এভাবেই ওদের পরিচয় হয়ে যায় ।
। প্রথম দেখাতেই রাজের মেয়েটিকে ভাল লেগে যায় নাজের সুন্দর কথা বলার ধরণের জন্য । রাজ শুধুই সুযোগ খুঁজত নাজের সাথে আবার কবে দেখা হবে । নাজ দেখতে খুব সুন্দরি ছিল সেটা সত্য নয় কিন্তু চেহারা ছিল মায়াময় ।
একদিন রাজ ওর বন্ধু রবিনের সাথে রবিনের এক কাজিনের বাসায় ঘুরতে যায় , গিয়েই দেখা হয়ে যায় নাজের সাথে । রাজের বন্ধু রবিন নাজকে তার কাজিন হিসেবে পরিচয় করিয়ে দেয় । কিন্তু ওর বন্ধু জানতো না যে ওরা একজন আরেকজনকে অনেক আগ থেকেই চিনতো । স্কুলে টিফিন পিরিয়ডে প্রায়ই ওদের দেখা হত , কথা বলত অনেক সময় ওরা একজন আরেকজনের সাথে । রাজ একদিন মেয়েটিকে বন্ধুত্বের অফার করে বসে, আমরা কি একজন আরেকজনের বন্ধু হতে পারিনা ?
জবাবে মেয়েটি বলে , কেন নয় ?
এভাবেই ওদের বন্ধুত্ব শুরু । প্রতিদিন ওরা মোবাইলে কথা বলত। ছেলেটির নিজস্ব কোন মোবাইল ছিলনা কিন্তু মেয়েটির ছিল । ছেলেটি সবসময় লুকিয়ে লুকিয়ে ওর মায়ের না হয় বাবার মোবাইল ফোন দিয়ে মেয়েটিকে ফোন দিত । ওরা একসময় ভাবতে থাকে ওরা আর বন্ধু নয় আরও অনেক কিছু । নাজ একসময় ছেলেটিকে ওর মনের কথা বলে বসে , শুনে রাজের মনে হয়েছিল পৃথিবীর সমস্ত ধন-সম্পদের মালিক সে নিজে । চলতে থাকে ওদের সম্পর্ক । প্রতিদিন একে অন্যের সাথে ক্লাস টিফিনের সময় দেখা করা , স্কুল ছুটির পর একসাথে বাসায় ফেরা , ফোনে নিয়মিত কথা বলা । রাজ ওর মাকে বলে বসে ওকে একটি মোবাইল কিনে দেবার জন্য । ওর মা ওকে না করে দেন । বলেন ফাইনাল পরীক্ষাতে যদি অনেক ভাল ফলাফল করতে পারে তবে তিনি তাকে একটি মোবাইল কিনে দেবেন ।
কিন্তু এরপরও থেমে থাকেনেই ওদের কথা , নিয়মিত চলতেই থাকতো । হয় রাজ কখনও ওর মায়ের বা কখনও বাবার মোবাইল ফোন দিয়ে নাজকে ফোন দিত ।
ধীরে ধীরে ওদের পরীক্ষা চলে আসে স্কুলও বন্ধ হয়ে যায় । ফোনে ছাড়া আর কোনভাবেই যোগাযোগ ছিলনা । এরই ভিতরে রাজের পরিবার থেকে ওকে বন্ধু বান্ধব সবার সাথে ফোনে কথা বলতে নিষেধ করে দেয়া হয় । এমনকি বাসা থেকেও বেশি একটা বের হতে দেয়া হতনা ওকে ।
নিরুপায় রাজের আর কিছুই করার ছিলনা । পরীক্ষার পরও রাজ পড়াশোনা নিয়ে বিজি ছিল । কারন সে ছিল বৃত্তি পরীক্ষার্থী । এভাবেই কেটে যায় সব মিলিয়ে প্রায় দুইমাস সময় । রাজের বৃত্তি পরীক্ষা শেষ হয় । দুই পরীক্ষার ফলাফল প্রায় একই সময়ে বের হয় রাজ বার্ষিক পরীক্ষাতে ওদের স্কুলে চতুর্থ হয়েছিল আর বৃত্তি পরীক্ষাতে সারা ঢাকাতে সেরা দশজনের ভিতরে ওর নাম ছিল । যথাসময়য়েই রাজ খাঁচার মুক্তপাখি হয়ে নাজকে ফোন দেয় । কিন্তু সেদিন ফোনে নাজ আর ওকে ওইভাবে আগের মত করে কথা বলল না । রাজের মনে হচ্ছিল কোথায়ও কোন কিছু হচ্ছে কিন্তু সে ধরতে পারছেনা । সেদিন সে আর বেশি কথা বলে নেই ।
কয়েকদিন পরে স্কুলে গিয়ে রাজ নাজের সাথে দেখা করার চেষ্টা করল । নাজ দেখা করল ঠিকই কিন্তু ওর কথা আগের মত মন খোলা ছিলনা । এভাবে নাজ রাজের কাছ থেকে ধীরে ধীরে দূরে সরে যেতে থাকলো । স্কুলের কোচিং ক্লাসে রাজ কোনভাবেই মনযোগ বসাতে পারছিলনা । শেষ পর্যন্ত রাজ জানতে পারল নাজের এক বান্ধবীর মাধ্যমে এই দুই মাস সময় যখন রাজের সাথে নাজের যোগাযোগ বন্ধ ছিল , নাজ ওকে ভুল বুঝে বসে । এরপর ধীরে ধীরে ওদের স্কুলের আরেক সিনিওর ছেলের সাথে নতুন করে সম্পর্ক গড়ে তুলে । শুনে রাজের মনে হয়েছিল তার হৃদপিণ্ড কেউ যেন ছুরী দিয়ে কেটে ফেলেছে । নিজেকে সে আর মানিয়ে নিতে পারছিলনা । কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি হয়ে রাজ শেষ পর্যন্ত পড়াশোনার প্রতি মনোযোগী হওয়ার চেষ্টা করতে থাকে । এরই ভিতরে রাজের বাবা বদলী হয়ে যান টাউন থেকে অনেক দূরে । বাধ্য হয়ে রাজ কেও সেখানের স্কুলে বদলী হতে হল ।
রাজের সময় সেখানে বেশ ভালই কাটছিল । সে একসময় নাজের বান্ধবীর মাধ্যমে জানতে পারল । ইতিমধ্যেই ওই ছেলেটির সঙ্গে নাজের সম্পর্ক ভেঙ্গে গিয়েছে কারণ নাজ নিজেও জানতো না আসলে ছেলেটি খুব একটা ভাল ছিলনা । শুনে রাজ তেমন কোন মন্তব্য করেনি ।
এভাবেই কেটে গেল প্রায় বছর দুয়েক ।
নাজকে রাজ প্রায় ভুলেই গিয়েছে ।
রাজের এসএসসি পরীক্ষা সামনে । রাজ নিজেকে পরীক্ষার জন্য প্রস্তুত করতে শুরু করল । এরই ভিতরে রাজের স্কুল থেকে নির্দেশ এল ও আগে যেই স্কুলে ছিল সেখান থেকেই ওকে ফর্ম পূরণ এর সবকিছু আনতে হবে ।
রাজ একদিন সময় করে ওর আগেই স্কুলে রওনা দিল । অনেকদিন পর যেহেতু এসেছে ওর পুরানা সব বন্ধুদের সাথে অনেক মজা করল সারাদিন । এসএসসির ফর্ম পূরণের কাজও শেষ হয়ে গেল । বিকেল বেলা সূর্য প্রায় হেলে পড়েছে পশ্চিমে । সেই সাথে আকাশ আবার মেঘলা হতে শুরু করেছে । এটা দেখেই রাজ মনে মানে ভাবল , ছাতা নিয়ে এসে তাহলে ভালই করেছিলাম , নাহলে এখন বৃষ্টি শুরু হলে চরম বিপদে পরতাম ।
রাজ স্কুলের ক্যান্টিনে প্রবেশ করল ।
করবেই সাড়া দিন পরিশ্রমে খিদেও যা পেয়েছিল বলার মত নয় । স্কুলের জনসংখ্যাও তখন কমে আসছিল । খাওয়া শেষে রাজ খানিকটা অন্য মনস্ক হয়ে বসে আছে । ততক্ষণে ঝুমঝুমিয়ে বৃষ্টি শুরু হয়েছে । রাজের কাছে বৃষ্টিটা অপ্রত্যাশিত মনে হতে লাগলো ।
হঠাৎ পরিচিত কণ্ঠস্বরে চমকে উঠল রাজ । পিছনে তাকিয়ে দেখল তার বহুদিনের সেই হারানো প্রেয়সি নাজ দাড়িয়ে আছে ।
কেমন আছো রাজ ?
ভাল আছি আমি । তুমি যে এখানে তোমাকে আগেতো স্কুলে দেখলাম না ?
রাজ আমি তোমার আসার কথা রবিনের কাছ থেকে শুনেছিলাম ।
ও তাই বুঝি । তাহলে এখানে কি মনে করে আমার সাথে দেখা করতে এসেছো ।
রাজ তোমাকে আমার কিছু বলার ছিল । রাজ আমি তোমাকেই ভালবাসি ।
নাজের এইকথা এখন রাজের কাছে খুবই হাস্যকর মনে হল ।
উত্তরে রাজ বলল,
তুমি আমাকে কিরকম ভালবাস , সেটা অনেক আগেই আমি বুঝতে পেরেছিলাম ।
রাজ তুমি আমাকে ক্ষমা করে দাও, আমি অন্যায় করেছি তোমার উপর ।
ভুল বা অন্যায় মানুষ করতেই পারে নাজ । ঠিক তেমনি তুমি করেছো । আমি তোমাকে ক্ষমা করেছি ঠিকই কিন্তু তোমাকে আমার পক্ষে ভালবাসা আর সম্ভব নয় ।
রাজ বিশ্বাস কর এই দুই বছর প্রতি ক্ষেত্রেই আমি তোমার কথা ভেবেছি ।
নাজের এই কথা গুলো রাজকে স্পর্শ করলেও সে কোনকিছু না ভেবেই ওকে উত্তর দিল ,
নাজ তুমি প্লিজ এখন চলে যাও আমাকে একটু একা থাকতে দাও ।
কিন্তু তুমি আমাকে একবার বুঝার চেষ্টা কর । ।
অবরুদ্ধ আবেগে কাঁপা গলায় বলল নাজ । আর কথা বলা সম্ভব হলনা নাজের পক্ষে চোখ দিয়ে তার অঝোর ধারা মত পানি ঝরতে লাগল ।
তুমি তোমার মতই থাকো , বলে উঠে চলে গেল রাজ নাজ কে আর কথা বলার সুযোগ না দিয়ে ।
ক্যানটিনের দোতলার বারান্দায় দাড়িয়ে রাজ স্পষ্ট দেখেতে পেল নাজ এই তীব্র বৃষ্টির ভিতর দিয়ে ছাতা ছাড়াই মাঠের মধ্যে দিয়ে হেঁটে যাচ্ছে । সে কাঁদছে এটা পরিস্কার কিন্তু বৃষ্টির পানি আর চোখের পানি একা হয়ে যাওয়াতে সেটা ঠিকমত বুঝা যাচ্ছেনা । নাজের কাছে হয়ত ছাতা আছে ঠিকই কিন্তু এটা মেলা এখন খুবই অর্থহীন মনে হল তার কাছে ।
নাজকে এভাবে দেখে রাজের মনে পরে গেল সেই পুরনো দিনগুলির কথা । নাজের সেই ভালবাসার কথা । হঠাৎ রাজের বুকের ভিতর সেই পুরনো ভালবাসার স্রোত বয়ে যেতে থাকে ।
এক মুহূর্ত দ্বিধা করে সে দৌড়ে গিয়ে তার ছাতা মেলে ধরলো নাজের মাথায় ।
চমকে উঠে নাজ তাকিয়ে দেখে তার উপর ছাতা মেলে ধরে রেখেছে রাজ ।
বৃষ্টি সত্ত্বেও রাজ স্পষ্ট দেখেতে পেল নাজের কালো চোখে অশ্রুর পানি চিকচিক করছে ।
হঠাৎ হেসে ফেলল নাজ । বলল ,
আমার কেন জানি মনে হচ্ছিল তুমি আসবে ।
কোন ইততস্ত না করে সোজাসুজি ক্ষমা চাইল রাজ । ভুল বুঝে হোক না বুঝে হোক , আমি তোমার প্রতি অন্যায় করেছি আমাকে মাফ করে দাও ।
নাজের চেহারা থেকে খসে পড়েছে ম্লানিমার ছায়া , আশ্চর্য একটা হাসি ফুটে উঠল নাজের ঠোঁটে ধীরে ধীরে । রাজ নিজের হাতে ওর চোখের পানি মুছে দিল । যদিও বৃষ্টির ভিতরে তার কোন প্রয়োজন ছিলনা । নাজের মনে হল শুধু চোখের অস্রু নয় সেই সাথে ওর সব দুঃখও মুছে দিয়েছে সে ।
এক হাতে ছাতা মেলে ধরে আরেক হাতে নাজকে শক্ত করে ধরে হেঁটে যেতে থাকে ওরা দুজন ।
নাজ খুব নিচু স্বরে রাজকে ডাকল ,
রাজ
বলো
তুমি কি আমাকে সারাটি জীবন এভাবে ধরে রাখতে পারবে ?
রাখব । সবসময় রাখব । উত্তর দিতে গিয়ে রাজের গলা আবেগে
কেপে উঠল ।
আমাকে প্রতিজ্ঞা কর ।
হ্যাঁ প্রতিজ্ঞা করলাম । তুমি জান আমি প্রতিজ্ঞা না করলেও সেটা করতে পারব ।
মাথা ঝুলিয়ে সমর্থন দিল নাজ । বা হাত দিয়ে নাজ তার চোখের পানি আবার মুছে নিল ।
কিন্তু রাজ জানে তার এই চোখের পানি আর দুখের নয় । এই অশ্রুর পানি আনন্দের ভালবাসার পানি । একজনের জন্য আরেকজনের ভালবাসার ।

পোস্টটি ১০ জন ব্লগার পছন্দ করেছেন

অতিথি's picture


খুব ভালো লাগল।

মিনহাজ আহমেদ's picture


ধন্যবাদ । আসলে গল্প লিখলে আমি প্রতি ক্ষেত্রেই আপনাদের ভাল বা মন্দ এসব বিষয়ে মন্তব্য আশা করি । তাহলে নিজের ভুল শুধরে নিতে পারব । Smile

মন্তব্য করুন

(আপনার প্রদান কৃত তথ্য কখনোই প্রকাশ করা হবেনা অথবা অন্য কোন মাধ্যমে শেয়ার করা হবেনা।)
ইমোটিকন
:):D:bigsmile:;):p:O:|:(:~:((8):steve:J):glasses::party::love:
  • Web page addresses and e-mail addresses turn into links automatically.
  • Allowed HTML tags: <a> <em> <strong> <cite> <code> <ul> <ol> <li> <dl> <dt> <dd> <img> <b> <u> <i> <br /> <p> <blockquote>
  • Lines and paragraphs break automatically.
  • Textual smileys will be replaced with graphical ones.

পোস্ট সাজাতে বাড়তি সুবিধাদি - ফর্মেটিং অপশন।

CAPTCHA
This question is for testing whether you are a human visitor and to prevent automated spam submissions.

বন্ধুর কথা

মিনহাজ আহমেদ's picture

নিজের সম্পর্কে

নিজের সম্পর্কে তেমন কিছুই বলার নেই । আমি আগে আমার ব্লগে অনেকদিন ধরে লিখতাম এখনও লিখছি । অন্য ব্লগে আমার যাত্রা এই প্রথম । আমি একজন সাধারণ মানুষ । খুব সাধারণ ভাবে চলাফেরা করি ।