আমাদের ভারত ভ্রমন-২
রাতে ঘুমাতে যাবার আগে ধুম আড্ডা আর মাস্তি। তিন রুমের সবাই আমাদের রুমে। যতই বলি, ভোরে ট্রেন, এবার সবাই ঘুমাতে যাও- কে শোনে কার কথা ! আরে বাপু, এক রুমেই যদি রাত কাটাবি, তাহলে তিনটে রুম ভাড়া নেবার কী দরকার ছিলো ? আমাদের সফরসঙ্গী ২/১ জন আবার অতিরিক্ত পরিমানে ভাল্লুক সেবনের কারনে উলোট পালোট কথা বলা শুরু করলো। যা হজম করতে পারেনা, তা কেনো যে মানুষ খায় ! তবে অতিরিক্ত ভাল্লুক সেবনের কারনে আমাদের মিনারেল ওয়াটার কেনার টাকা বেঁচে গেছে। মধ্যরাতে এক বন্ধুর শখ হলো- তাস খেলবে। এর মধ্যে আরো দুজন রাজী হলো। বাধ্য হয়ে আমাকেও বসতে হলো ওদের সাথে। অল্প কার্ডের খেলা। মানে তিন তাসের খেলা। যথারীতি খেলা শেষে আমার ৭০০ বিদেশি টাকা লস...। মনের দুঃখে ঘুমাতে গেলাম। ঘড়িতে ভোর তিনটা। হাতে সময় আছে দুই ঘন্টার সামান্য বেশি। সাড়ে পাঁচটা নাগাদ স্টেশনে যেতে হবে। ৬ টায় আমাদের ট্রেন। শতাব্দী এক্সপ্রেস। গন্তব্য দিল্লী টু আজমীর।


সকালে সবাই মোটামুটি সাড়ে ৫ টার মধ্যে ব্যাগ নিয়ে হোটেল ছাড়লাম। হোটেল আশিয়ানা থেকে পাহাড়গঞ্জ রেল স্টেশন মিনিট দশেকের পথ। সবাই হাঁটা ধরলাম। স্টেশনে গিয়ে অবাক আমি। ভারতের কোনো রেল স্টেশনে এই প্রথম যাওয়া আমার। বিশাল স্টেশন। ১২ টা প্ল্যাটফর্ম। আমাদের ট্রেন ছাড়বে ৪ নম্বর থেকে। খুঁজে পেতে কোনো সমস্যা হয়নি। ৫০ গজ পর পরই একটা করে ডিসপ্লে বোর্ড। তাতে বাংলা, হিন্দী আর ইংরেজিতে লেখা ভাসছে। মাইকেও একইভাবে কন্ঠ ভেসে আসছে। কোন ট্রেন কোন প্ল্যাটফর্ম থেকে কখন ছাড়বে- অনবরত ঘোষনা করা হচ্ছে। কোনো ঝামেলা ছাড়াই শতাব্দীতে আমাদের নির্দ্দিষ্ট কোচে উঠলাম। যার যার সিট খুঁজতে কারো সাহায্য নিতে হয়নি। কী পরিস্কার আর ঝকঝকে ট্রেন। সবাই বসার মিনিট দশেক পরে ট্রেন ঠিক ছয়টায় স্টার্ট দিলো। সাড়ে ছটা নাগাদ বিস্কুট, পানি আর চা দিয়ে গেলো। চা-বিস্কুট খাওয়ার পরে একটা সিগারেট না হলে কি আর চলে ? উপায় কি ? ট্রেন এসি। সিগারেট খাওয়ার কোনো উপায় নাই। এগিয়ে এলো বন্ধু অঞ্জন। ও বহুবার ভারতের ট্রেনে ভ্রমন করেছে। বললো, টয়লেটে যা। সেখানে খেয়ে তারপর মিনিট দশেক পরে বেরিয়ে আয়। কোনো গন্ধ থাকবেনা। কেউ টের পাবেনা। সত্যিই তাই। টয়লেটগুলো এত পরিস্কার, কোনো গন্ধ নেই। ভেতরে ফ্যান চলছে। ফ্যানের হাওয়ায় আমাদের সিগারেটের ধোয়া বেরিয়ে যাচ্ছে...। আহা কী আনন্দ. আকাশে বাতাসে...। ট্রেনে সিগারেট খাও, যতবার ইচ্ছে...


শতাব্দী আজমীর এসে থামলো দুপুর ১২ টা ১০ মিনিটে। আমরা স্টেশনের বাইরে বেরিয়ে ২ টা অটো নিলাম। কোলকাতার বন্ধু ছোটনের এক পরিচিত লোকের বাসায়। তার ওখানে যেয়ে সবাই গোসল টোসল করে নতুন জামা-কাপড় পরে পবিত্র হয়ে নিলাম। সেই ভদ্রলোককে নিয়ে হাঁটা ধরলাম মাজারের দিকে। তার বাসা থেকে এগলি ওগলি করে মিনিট দশেক বাদে মাজারে পৌঁছলাম। মাজারের গেটের কাছে গিয়ে এক্কেবারে আক্কেল গুড়ুম। হাজার হাজার মানুষ। সবাই ভেতরে যাবে। জিয়ারত/মানত করতে এসেছে। সেন্ডেলগুলো গেটের বাইরে এক লোকের জিম্মায় রেখে তার কাছ থেকে টোকেন নিলাম। ৮ জোড়া সেন্ডেলের জন্য ২০ রুপি। ভিড় ঠেলে ভেতরে গেলাম। গেট পেরুতেই হাতের ডান দিকে বিশাল এক পাতিল। যাতে ১২০ কেজি চালের ভাত/শিরনী রান্না করা যায়। ঊঁকি দিয়ে দেখলাম, পাতিলের প্রায় ২০/২৫ ভাগ ভরে আছে টাকায়... সবাই টাকা দিচ্ছে। ৫,১০,৫০,১০০,১০০০ টাকার নোট। কয়েক লাখ টাকা হবে। ছোটনের কাছে জানলাম, প্রতিদিন যে লাখ লাখ টাকা পাতিলে জমা পড়ে- দিনশেষে তা ভাগ হয়ে যায়। মাজারের খাদেমরা সেটাকা ভাগ করে নেয়। ভাগ পায়- প্রশাসন, মাস্তান, পুলিশসহ হরেক কিসিমের মানুষ। খাদেমরা মাজার বন্ধ হবার পরে এক ধরণের লম্বা লাঠিওয়ালা নেট দিয়ে এই টাকা পাতিল থেকে তোলে। তারপর ভাগ করে নেয়। প্রতিদিনের হিসাব প্রতিদিন। বিকাল তিনটার পরে মাজার প্রাঙ্গন বন্ধ হবার পরে চলে এদের টাকা-পয়সা ভাগাভাগির খেলা। শুনে তাজ্জব বনে গেলাম। বাম পাশে আরেকটি পাতিল। যাতে ১০০ কেজির মত রান্না করা যায় বলে জানালো ওখানকার লোকজন। আরেকটু সামনে ডানদিকে বাদশাহ আকবরের আমলে করা মসজিদ। বায়ে অনেকগুলো কবর। ওদের ভাষ্যমতে পীর আউলিয়াদের কবর। কবরের আশে পাশে হাজার হাজার মানুষ। কেউ ফুল দিচ্ছে। কেউ গিলাফ (এক ধরনের কাপড়) দিচ্ছে। মজার ব্যাপার হচ্ছে- এই সব ফুল আর গিলাফগুলো একটু পর পরই মাজার থেকে বাইরে বেরিয়ে আসছে। এবং দোকানে আবার বিক্রী হচ্ছে। দর্শনার্থীরা সেটা আবার কিনছে... মাজারে দিচ্ছে... আবার বাইরে আসছে... আবার বিক্রী হচ্ছে। এই সব দেখে সেখানে থাকতে আর ইচ্ছে করলো না। বাইরের গেটের কাছে এসে অপেক্ষা করছি অন্যদের জন্য। তিনটা নাগাদ সবাই বেরিয়ে এলো। আবার সেই ভদ্রলোকের বাড়িতে এলাম। তিনি আমাদের দুপুরের খাবার খাওয়ালেন। ভাত, পরোটা, আলুর দম,ডাল আর খাশির গোশত দিয়ে। বিনিময়ে তাকে দিতে হলো ৭ জনের জন্য ১০০০ রুপি। খারাপ না। তার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে বেরিয়ে এলাম রাস্তায়। একটা ৮ সিটের এসি মাইক্রো ভাড়া করলাম। ৩০০০ রুপিতে। আমাদের গন্ত্যব্য ২৫৬ কিলোমিটার দুরের জয়পুর শহর।



আমাদের মাইক্রো ছাড়লো ৪ টায়। ড্রাইভার জানালো ঘন্টা চারেক লাগবে। হাইওয়ে ধরে যাবে। আমাদেরও তেমন তাড়া নেই। আজমীর শহর পার হবার পর হাইওয়ে। দারুন রাস্তা। দুপাশে বেশ ফাঁকা। কিছু কিছু মার্বেল পাথরের কারখানা চোখে পড়লো। আর যেটা দেখে পুলকিত হলাম- সেটা হচ্ছে ময়ূর। একটু পর পরই রাস্তার দুই থারে ময়ূরের দেখা পেলাম। আকাশে টিপটিপ বৃষ্টি। এসময় নাকি অনেক ময়ূর দেখা যায়। আমরাও এক একটা ময়ূর দেখছি- আর জোরে চিৎকার দিয়ে উঠছি। ভাগ্যিস এসি গাড়ি। জানালা সব বন্ধ। নইলে আমাদের চিৎকারে একটা ময়ূরও আর রাস্তার পাশে থাকতো না। যাই হোক, পথে এক জায়গায় নেমে ফটোসেশন আর মাটির ভাড়ে চা খাওয়া হলো। তারপর আবার গাড়ি স্টার্ট। ফাঁকা রাস্তা। দুর্দান্ত গতিতে চালাচ্ছে ড্রাইভার। ৭ টা ৫০ এ আমাদের নামিয়ে দিলো পুরোনো বাস স্ট্যান্ডের কোহিনুর হোটেলে। হোটেলে উঠে মুখ-হাত ধুয়ে ছুটলাম আবার। এবার যে যার মত। কথা হলো, সবাই সাড়ে নয়টার মধ্যে হোটেলে ফিরে আসবে। সবাই একটা করে হোটেলের কার্ড সাথে রাখলাম। আমরা তিনজন অটো নিয়ে পিংক সিটি মার্কেটে। সেখানে নেমে যাই দেখি তাই কিনতে মন চাইছে। জয়পুরের থ্রি পিসগুলো যা সুন্দর। ২ টা থ্রিপিস, নাগরা আর কিছু টুকটাক শো-পিস কিনলাম। এরমধ্যে নয়টা বেজে গেছে। অটো নিয়ে হোটেলে এলাম আমরা তিন জন। পর পরই সবাই এলো। রাতের খাবারের সন্ধ্যানে বেরুলাম। খেয়ে হোটেলে ফিরতে ফিরতে এগারোটা। কাল সকালে উঠার তাড়া নেই। তারপরও সবাইকে বললাম নয়টার মধ্যে হোটেল থেকে বেরুতে। কাল অনেক জায়গায় যেতে হবে। হাওয়া মহর, যন্তর-মন্তর, জল মহল... আরো কত কি !
চলবে....





সাথে আছি ভাই।

পড়লাম।
থ্যাংকু পড়ার জন্য এবং সাথে থাকার জন্য
আজমীরের আজমীরি কানড নিয়ে আমারো কিছু ঐতিহাসিক মেমোরী আছে।
পুসকর যান নাই বস? দুই ধরমের জায়গার ডিফারেনসটা দেখতেন
মাজার কালচার দেখে মেজাজ খারাপ হয়ে গেছে আমার...
ধর্মের বেসাতি আমার একদম ভালো লাগেনা...
পুসকর যাইনি ক্যাপ্টেন
এই নিয়ে একটু বিস্তারিত বলবে ? জানুয়ারি- ফেব্রুয়ারিতে আবার যাবার প্ল্যান আছে
পুস্কর আজমীর থেকে বোধহয় দশ কিমি এর মধ্যে পরে। সেখানের রাজার বাড়িটাকেই হোটেল বানিয়েছে। পুরো এরিয়া ভেজিটেরিয়ান। আজমীর যেমন নোংরা, পুস্কর তেমনই পরিস্কার। খাবার এতো টেষ্টি। হাতের কাজের চমৎকার সব জিনিস পাওয়া যায় সেখানে।
আমরা রাজার বাড়িতে ছিলাম। পাশের লেকে সন্ধ্যেবেলা মন্দিরের ছাড়া পড়েছে। পাহাড়ের উপর মন্দির আর সারা মন্দির জুড়ে প্রদীপ জ্বালানো। তার ছায়া সব লেকে। এগুলো আসলে লিখে বর্ননা করা যায় না। অনুভব করার ব্যাপার। দূর থেকে মন্দিরের কাসার টুং টাং আওয়াজ, পানিতে ছায়ার কাপন আর পুরনো সেই রাজ বাড়ির বাগান। অভূতপূর্ব কিছু সময় কাটিয়েছিলাম। এখনো ভুলতে পারি না
পরে রাজস্থান গেলে, রাতের ডেজার্ট ট্রিপ নিবেন। ভুলবেন না কখনো
আমরা আজমীর নিয়ে বাসায় তর্ক করছি, আমার বাবা আবার আজমীর ভক্ত, ভাইয়াও হয়তো কিছুটা। ভাইয়া উৎসাহিত হয়ে জিজ্ঞেস করছে, হাড়িতে কতো দিছি। তর্কতো আব্বুর সাথে আগে হয়েছে, ভাইয়া শুনে নাই সেটা। আব্বু বলে, কারে বলস? এগুলো এমন চিজ হাড়িতে দিবে না পারলে হাড়ি থেকে উঠাইয়া নিয়ে আসবে
(
পড়লাম আর আপনাদের সাথে ঘুরলাম
বিনা খরচে ? তাইতো বলি, আমাদের টাকা বেশি খরচ হলো কেনো ?
টাকার হিসাবটাও মিলছিলোনা...
আজ সন্ধ্যাতে কাকে জানি বলছিলাম আপনাদের ভ্রমনের কথা রাতে দেখলাম আপনার পোষ্ট। আহ কী শান্তি।
পোষ্ট ভালো পাইলাম!
থ্যাংকু ছোট ভাই
এত্ত সুন্দর কইরা বিস্তারিত কেমনে লেখেন?!
মাজার সংস্কৃতিটাকে চরম মাত্রায় অপছন্দ করি।
ভারত যাইতাম চাই
সিগারেট খাইতে, তাও টয়লেটে ?
চলুক...
কী
পড়লাম।
জানলাম
মাইনষে যে কত ঘুরে! আজব কারবার।
ঘুরার জন্য দরকার:
১. ইচ্ছা
২. সুযোগ
৩. টাকা
তোমাদের প্রথম দুইটাই নাই, আফসুস
শালা সরকারী চাকুরির নিকুচি করি। কোথাও যাবার জো নাই । তাই আপনার লগে আমিও যেন জয় পুর থেকে ঘুরে এলাম। দুধের স্বাদ ঘোলে...। ভ্রমণ কাহানী ঝাক্কাস্। চল্তে থাকুক।
সারাজীবন শুনছি এবং দেখছি, সরকারি চাকুরেরদের ছুটির সুবিধা বেশি। সপ্তাহে ২ দিনতো আছেই। তারপরও কৈলেন,
আজব ব্যাপার !
সরকারী চাকুরেদের দেশের বাইরে যেতে হলে বিভাগীয় অনুমোদন নিয়ে সরকারী ভাবে পাসপোর্ট করতে হয়, জিও বের করতে হয়, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রনালয়ের অনুমোদন নিতে হয় এমন অনেক ঝামেলা। তারপরও শুধু ভ্রমণের জন্য অনুমোদন দিবে না। চিকিৎসা অথবা ধর্মীয় কাজেই সাধারণত অনুমতি দেয়া হয়। অবশ্য ভ্রমণটা 'সরকারী কাজে' বা 'জনস্বার্থে' হলে আলাদা কথা।
ঘুরাঘুরি দেখতে ভাল্লাগে!
ক্যান, ঘুরতে ভাল্লাগে না ?
মন্তব্য করুন