আমাদের প্রজন্ম চত্বর
১৯৭১ সাল। ২/৩ বছরের কোলের শিশু। একাত্তরের কথা মনে নেই আমার। ৯০ এর সৈরাচার বিরোধী আন্দোলনের কথা মনে আছে। সেসময় আমি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র। এরশাদ বিরোধী সেই উত্তাল দিনগুলোতে সরাসরি অংশ নেয়া একজন আমি।
আবার এক আন্দোলন। ২০১৩ সাল। ভাষার মাস। আবারো এক গণজোয়ার। এবারের দাবী- যুদ্ধাপরাধীদের সর্বোচ্চ শাস্তি। যুদ্ধাপরাধী, মানবতার শত্রু, খুনি, রাজাকার কাদের মোল্লার বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে রায় হলো। সেই রায়- কাদের মোল্লার যাবজ্জীবন কারাদন্ড! মানিনা সে রায়। কেনো মানবো ? প্রত্যক্ষভাবে মানুষ খুন করা কাদের মোল্লা জেলে যাবে, ভি চিহৃ দেখাবে- আর পত্রিকার পাতায় সে ছবি আমাদের দেখতে হবে ?
৫ ফেব্রুয়ারি ২০১৩। দুপুর নাগাদ সবাই সোচ্চার হয়ে উঠে। অনলাইনে, ব্লগে, ফেইসবুকে ডাক দেয়া হয়। বিকালে সমবেত হয় শাহবাগ যাদুঘরের সামনে। সংখ্যায় খুব বেশি নয়, শ দুয়েক অনলাইন ব্যবহারকারী। তাতে কী ! সবাই দাঁড়িয়ে পড়ে ব্যানার নিয়ে। মানব বন্ধন করে রায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করাই ছিলো মূল উদ্দেশ্য। তারপর ঘন্টাখানেকের মধ্যে কী থেকে জানি কী হয়ে গেলো। হাজারে হাজারে লোক এসে জড়ো হতে শুরু করলো। সবারই এক দাবী- এ রায় মানিনা। বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা নামে। বাড়তে থাকে গণ জমায়েত। এরপর সবাই মিলে অবস্থান নেয়া হয় শাহবাগে। রাতের মধ্যে কয়েক হাজার মানুষ এসে যোগ দেয়। এ যেনো হ্যামিলনের বাঁশিওয়ালার গল্পের মত। বাঁশিতে ফু দিতে যা দেরি, কিন্তু মানুষ আসতে দেরি নেই।
৬ ফেব্রুয়ারি থেকে শাহবাগের চিত্রপট পাল্টে যায়। ছাত্র, যুবক, চাকরীজীবি, সাংবাদিক, কবি, লেখক মোটকথা আপামর জণগন এসে সংহতি জানায়। বসে পড়ে শাহবাগের রাস্তায়। দাবী একটাই। সকল যুদ্ধাপরাধীর সর্বোচ্চ শাস্তি। এর সাথে যোগ হয় আরেকটি দাবী- সকল ধর্মভিত্তিক রাজনীতি নিষিদ্ধ করণ।
শাহবাগের নাম পাল্টে যায়। নতুন নাম হয়- প্রজন্ম চত্বর। কেউ কেউ বলে এটি বাংলাদেশের দ্বিতীয় মুক্তিযুদ্ধ। আশ্চর্যের বিষয় হচ্ছে- এখানে কেউ নেতা নেই। কোনো রাজনীতি নেই। সবারই কন্ঠে এক দাবী। রাজাকার আর যুদ্ধাপরাধীদের ফাসি। বাংলাদেশের প্রায় সব কটি মিডিয়া থেকে ফলাও করে প্রচার হতে থাকে এই গণজোয়ারের সংবাদ। যারা তখনো শাহবাগ যায়নি, তারাও বেরিয়ে পড়ে। গন্তব্য একটাই- শাহবাগ। রাত- দিন টানা চলতে থাকে তারুণ্যের এই আন্দোলন। ইতিমধ্যে এই আন্দোলনের সাথে সংহতি প্রকাশ করে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী সারা দেশের মানুষ। প্রায় সব জেলায় তৈরি হয়ে যায় এক একটি প্রজন্ম চত্বর। সেখানে রাত- দিন চব্বিশ ঘন্টা জনগণ থাকে। স্লোগানে স্লোগানে ভেসে যায় সবাই।
৮ ফেব্রুয়ারি শুক্রবারে ডাক দেয়া হয়- মহাসমাবেশের। সে মহাসমাবেশে হাজির হয়- লাখ লাখ মানুষ। স্লোগানে সেøাগানে আকাশ বাতাস কেঁপে উঠে। সংহতি প্রকাশ করে প্রজন্ম চত্বরে এসে জড়ো হয় সবাই। তথাকথিত রাজনীতিবিদরাও আসার চেষ্টা করে। জনতা তাদের মেনে নেয় না। শুক্রবারের মহাসমাবেশ থেকে শপথ নেয়া হয়। একজন যুদ্ধাপরাধীর বিচারও শেষ না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চালিয়ে যাবার ঘোষনা দেয়া হয়।
এর মধ্যে ঘটতে থাকে অনেক ঘটনা। এই প্রজন্ম চত্বর নিয়ে কোনো কোনো রাজনৈতিক দল তথাকথিত রাজনীতি করার চেষ্টা চালায়। জনতার রোষানলে পড়ে তারা পিছু হটে। নাম না জানিয়ে অনেক মানুষ ব্যক্তিগতভাবে খাবার, পানি সরবরাহ করতে থাকে। এমনকি অনেক প্রতিষ্ঠানও এগিয়ে আসে। হাজার হাজার আন্দোলনকারীদের জন্য মানুষের এই সহমর্মিতা আমাদের আশাবাদী করে। রাত- দিন চব্বিশ ঘন্টার এই আন্দোলনে মানুষের ঢল বাড়তেই থাকে।
কিছু কিছু মিডিয়া ভুল তথ্য দিয়ে দেশের মানুষকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা চালায়। তার মধ্যে- আমার দেশ, নয়া দিগন্ত, দিগন্ত টেলিভিশন, সংগ্রাম অন্যতম। এরা আস্তাকুঁড়ে নিক্ষিপ্ত হয়। প্রজন্ম চত্বর থেকে এই সব মিডিয়া নামধারী কুলাঙ্গারদের বয়কট করা হয়।
আন্দোলনের ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তিত হয়ে পড়ে তথাকথিত বুদ্ধিজীবিরা। তারা বিভিন্ন চ্যানেলের টক শোতে এই নিয়ে প্রচুর কথা বলে। কোনো লাভ হয় না। আন্দোলন তার নিজের গতিতেই চলতে থাকে। এর মধ্যে ট্রাইব্যুনালের আইন সংশোধন করা হয়। একযোগে মহান সংসদের সব সাংসদ আন্দোলনের সাথে একাত্বতা ঘোষনা করেন। বাদ যায়না বাংলাদেশের জাতীয় ক্রিকেট দলও। এ যেনো প্রজন্ম চত্বরে জড় হওয়া আন্দোলনকারীদের বিজয়ের সূচনা।
এর মধ্যে জামায়াত-শিবির ঢাকার বিভিন্ন স্থানে চোরা-গুপ্তা হামলা চালায়। সে হামলায় নিহত হয় অগ্রনী ব্যাংকের এক লিফটম্যান। দুস্কৃতিকারীদের হামলায় আহত হয়- স্লোগান কন্যা লাকী আক্তার। তার মাথার পেছনে আঘাত করা হয়। কিন্তু তাতে কোনও লাভ হয়না। আন্দোলনকারীদের মনে ভয়তো ঢুকেই না, বরং আন্দোলন আরো তেজি রুপ নেয়। জনতার ঢল বাড়তেই থাকে। লক্ষনীয় বিষয় হচ্ছে, শিশু আর নারীদের অংশগ্রহণ।
১৫ ফেব্রুয়ারি ২০১৩। আন্দোলনে ১১ তম দিনে আবার ঘোষনা আসে প্রজন্ম চত্বর থেকে। সার্বিক দিক বিবেচনা করে আন্দোলনের সময়ের পরিবর্তন করা হয়। সবার অংশ গ্রহণের সুবিধার্থে বিকাল ৩ টা থেকে রাত ১০ টা পর্যন্ত আন্দোলনের সময় নির্ধারণ করা হয়। সন্ধ্যার মধ্যে এই ঘোষনা দেয়া হয়। এর রেশ কাটতে না কাটতে রাত সাড়ে নয়টার পরে মিরপুরের পল্লবীতে নিজ বাসার কাছে নৃশংসভাবে খুন হন- একজন সক্রিয় আন্দোলনকারী, ব্লগার, স্থপতি আহমেদ রাজিব শোভন। জামায়াত-শিবির চক্র এই হত্যাকান্ড ঘটিয়েছে বলে দাবী করা হয় শোভনের পরিবার থেকে। রাত দশটার মধ্যেই এই খবর ছড়িয়ে পড়ে শাহবাগের প্রজন্ম চত্বরে। ফুসে উঠে প্রজন্ম চত্বরের লাখো জনতা। আবারো আন্দোলনের সময় পরিবর্তন করা হয়। রাত- দিন চব্বিশ ঘন্টা আন্দোলন চলবে বলে ঘোষনা দেয়া হয়।
এদিকে বিভিন্ন সূত্র থেকে জানা গেছে, এ আন্দোলন ঠেকানোর জন্য- আন্দোলনকে বানচাল করার জন্য জামায়াত- শিবির চক্রের সুইসাইড স্কোয়াড গঠন করা হয়েছে। তারা সারা দেশে চোরা-গুপ্তা হামলার পাশাপাশি যে কোনো মূল্যে এই আন্দোলন নস্যাৎ করার লক্ষ্যে মাঠে নেমেছে। এটা তাদের অস্তিত্তের প্রশ্ন। প্রয়োজনে নিজেরা আত্মাহুতি দেবে। যত লাশ ফেলা দরকার, তাই করার জন্যও প্রস্তত তারা।
মনে রাখা দরকার, ১৯৭১ সালে যখন এই স্বাধীনতা বিরোধী চক্র হেরে যাবার পথে- ঠিক তখনি ১৪ ডিসেম্বর অর্থাৎ স্বাধীনতার মাত্র দুই দিন আগে দেশের সূর্য সন্তানদের নির্বিচারে ধরে নিয়ে হত্যা করেছে। আবারো এরা বুঝতে পেরেছে- এদের দিন শেষ। জনতা জেগেছে। আর তাই এরা মরণ কামড় দেবার চেষ্টা করছে। ইতিমধ্যে আরো অন্তত ১৭ জন ব্লগারের তালিকা করেছে। যাদের জীবন আজ হুমকির মুখে। ব্লগারদের প্রতি এই জামায়াত- শিবির চক্রের প্রতিশোধ নেবার কারন- তথাকথিত রাজনীতি বা আইন দিয়ে যখন এই সব ফ্যাসিস্টদের দমন করা যাচ্ছিলো না, ঠিক তখনি ব্লগাররা তাদের শাস্তির দাবীতে আন্দোলনে ডাক দিয়েছে। এবং সেই ডাকে লাখো জনতা আজ শাহবাগের প্রজন্ম চত্বরে। এবার স্বাধীনতা বিরোধী চক্রের শাস্তি হবেই- এটা নিশ্চিত বুঝে গেছে হায়েনাদের দল।
এদের প্রতিহত করতে হবে। আইন করে, সামাজিক ভাবে বয়কট করে, এদের প্রতিষ্ঠানসমূহকে বর্জন করে- অর্থাৎ যে যার অবস্থান থেকে প্রতিরোধ করতে হবে। এর কোনো বিকল্প নেই। এই বাংলার মাটিতে এই সব নরপশু, খুনি, রাজাকার, যুদ্ধাপরাধীদের নির্মূল করতেই হবে। শহীদ জননী জাহানারা ইমাম যে কাজটি শুরু করে গেছেন ১৯৯২ সালে, তাঁর সেই অসমাপ্ত কাজটিই করতে হবে আমাদের। আর তা শেষ না হওয়া পর্যন্ত এই আন্দোলন চলছে- চলবেই। সকল যুদ্ধাপরাধীর সর্বোচ্চ শাস্তি চাই আমরা। জয় হোক জনতার। আন্দোলন দীর্ঘজীবি হোক।





এ আগুন থামার নয়
জামায়াত-শিবির মানে জিরো টলারেন্স।
জামায়াত- শিবির মানে "নো"।
জামায়াত-শিবির মানে জিরো টলারেন্স।
জামায়াত- শিবির মানে "নো"।
আন্দোলনে জনতার জয় হোক। শোক শক্তিতে পরিণত হোক।
জামায়াত-শিবির মানে জিরো টলারেন্স।
জামায়াত- শিবির মানে "নো"।
লড়াই চলবেই!
এ লড়াই আমাদের অস্তিত্তের লড়াই
জয় বাংলা !
আন্দোলনে জনতার জয় হোক। শোক শক্তিতে পরিণত হোক
জনতার জয় হবে, হতেই হবে
জয় বাংলা !
শোক হোক শক্তি।
১৯৭১ এর পর আমরা যা পারি নি, ২০১৩র পর যেন তা পারি। জামায়াত-শিবির মানে জিরো টলারেন্স। জামায়াত- শিবির মানে "নো"। এটি হলে মনে করবো ২০১৩'র প্রজন্ম একটি সাহসী প্রজন্ম। সালাম আমার ভাইদের।
জামায়াত-শিবির মানে জিরো টলারেন্স।
জামায়াত- শিবির মানে "নো"।
জয় বাংলা। জয় বাংলা।
আন্দোলনে জনতার জয় হোক। শোক শক্তিতে পরিণত হোক
মন্তব্য করুন