ইউজার লগইন

একটা দিন শুধু একটা দিন

২০২৪ সালের, ৫ই আগস্ট আমার কাছে অলীক মনে হয়। বিশ্বাসই করতে পারি নাই এমন কিছু ঘটবে সেই দিনে। প্রচুর মানুষ জীবনের শেষ ঘোষণা দিচ্ছে তাতে দমবন্ধ লাগতেছিল। এর আগের দিন একশোর উপর মানুষ মারা গেছে, আজ হয় চারশো মানুষ মারা যাবে, শেখ হাসিনা এত সহজে ক্ষমতা ছাড়বে না। তখনও ছাত্রলীগ ছেলেমেয়ে খুঁজতেছে যারা আন্দোলনে যায় তারা কই থাকে। এরকম একটা ছেলের সাথে আমার তর্কও হলো সকালে, বললাম- সরকার গেলে গা তোমার সিআইডি গিরি বের করবো, ভালো হও মিয়া। সে খুব কনফিডেন্সে বললো, আওয়ামীলীগ ভাই এত সহজে ছাড়বো না। সকালে খবর দেখাচ্ছিল চ্যানেলে কোথাও লোক নাই, রাস্তা থমথমে। আবার খবর আসছিল ঢাকার দিকে প্রচুর মানুষ আসতেছে তাদের থামানো যাচ্ছে না। তারপর বারোটায় ঘোষণা আসলো, জাতির উদ্দেশ্যে ভাষণ দিবে সেনাবাহিনী। আমি ভাবলাম সেনাবাহিনী আর কি বলবে, বলবে আপনারা বাসায় ফিরে যান আমরা দেখতেছি। শেখ হাসিনাই থাকবে আপাতত। তারপর কই থেকে রেদোয়ান জানালো, শেখ হাসিনা ক্ষমতা ছাড়বে। তখনই মাথা ঠান্ডা হলো, অন্তত এই প্রতিদিন এত মানুষের মৃত্যুটা থামবে। ওটাই আমার কাছে তখন সবচেয়ে বড় ব্যাপার। এত মৃত্যু সংবাদ আর এলিজি পড়ে মন খারাপে আমি এক ট্রমায় থাকতাম। তখনও নেট কম কম, গেলাম কবি হাসান রোবায়েতের বাসায় আমরা, এই আর্মি চীফ খালি পিছায় আর আমাদের মেজাজ খারাপ হয়। কবি দম্পতি এরমধ্যেই চলে গেছে গণভবনের দিকে। তারা খুব আনন্দ ও উদ্বেলিত এক সঙ্গে। আমি আর রেদোয়ান তখনও বাসায় সেনাবাহিনীর চীফের বক্তব্য শুনবো। পরে শুনলাম, শুনে মিক্সড রিএকশন হলো। আরেকটা সেনা শাসন তাহলে আসতেছে। তারপর বের হলাম, সারাদিন কিছু খাই নাই, কবি মিস্টি নিয়ে আসলো তা এক পিস খেলাম। মানুষ তখন গণভবন থেকে ফিরছে আর যাচ্ছে, পুরো মোহাম্মদপুর বিশাল মানবজট। স্লোগান হচ্ছে, পলাইছেরে পলাইছে। হাঁটতে হাঁটতে গনভবনে গেট অব্ধি গেলাম দেখলাম মানুষ,যে যা পারতেছে আনতেছে, পাঁচ জন মিলে একটা বড় আলমারি, ছয়জন মিলে একটা ফ্রিজ, কেউ কাঠের কেবিন অসুরের মত টানতেছে। আর শাড়ি, মশারী, হাস, মাছ, শোপিস, পুরষ্কার, ক্রেস্ট, এসবও নিয়ে লোকজন প্যারেড করতে করতে ফিরছে। এক লোক অনেক গুলো খাম আনছে, ভাবছে খামের মধ্যে থাকবে টাকা, খালি অফিশিয়ার নানান লেটার ও কাগজ, তার কি হতাশা! আমরা আর গণভবনে ঢুকি নাই এত মানুষ দেখে। কলেজ গেট থেকেই ফিরে গেলাম, মানুষ মানুষে হাঁটা যায় না। সেখান থেকে ভাবলাম ৩২ যাব, হাঁটতেছি ২৭ এ কিছু খাবো ভাবলাম, সব বন্ধ নইলে এত ভীড় বসার জায়গা নাই। ইংরেজি মাধ্যমের ছেলে মেয়েরাও রাস্তায় লেখালেখি করতেছে। পরে শুনি,৩২ অলরেডি জ্বালায় দিছে। হেটেই ফেরার সময় হলো অদ্ভুত কান্ড৷ ক্ষুদার্ত সারাদিন কিছু খাইনি, আমরা সাত মসজিদ দিয়ে ফিরতেছি। এমন সময় পুলিশ শুরু করলো গুলি, রাস্তা ফাকা। তখনও জানি না যাত্রাবাড়ীতে এভাবেই কত মানুষ মারা গেছে। মোটামুটি থানার সামনে জান হাতে নিয়ে গুলি টিয়ারগ্যাসের মাঝে বাসায় ফিরছি। রেদোয়ান অবশ্য চিল, বলতেছিল ভয় পায়েন না আমাদের কিছু হবে না। কিন্তু এখন বুঝি গুলি একটা লেগে গেলে মৃত্যু তেমন দূরেও ছিল না। পরে তো জানলাম, প্রচুর মানুষ ৫ই আগষ্টের দিন মারা গিয়েছিল। একটা হোটেলে মুরগী দিয়া ভাত নিয়ে রেদোয়ানের বাসায় নিয়ে খেলাম, মনে হলো অমৃত। বারেকে নয়নতারায় সেই হাসি ঠাট্টা ও অবিশ্বাসের আড্ডা হলো, কে কিভাবে খবর পেয়েছে, কার কি ফিলিং সেসব নিয়ে আলাপ হচ্ছিল, নয়ীম সেদিনও পুলিশের হাতে চড় খাওয়া নিয়ে ঠাট্টা করছিল। কি অসীম সাহসে সে আর তার ভাই ধানমন্ডিতে অবস্থান করছিলো সকালে সেখান থেকে ধরে থানায় নিয়ে গিয়েছিল পুলিশ। রাতে বিভিন্ন জায়গায় সাম্প্রদায়িক হামলার খবর আসতেছিল তা নিয়ে উৎকন্ঠায় ছিলাম, বিএনপির লোকজন কই কই থেকে জানি এলাকায় ফিরতেছিল, যাদের অনেকদিন দেখি নাই। অনেক আওয়ামী লীগের লোকজনের মৃতুসংবাদ ও ঘরবাড়ি জ্বালানোর খবর আসছিল। পাঁচই আগস্ট আমার একটা মিক্সড রিএকশনের দিন। শেখ হাসিনার পালানোয় যেমন আনন্দ, তেমন চারিদিকে এত মৃত্যু এত শোকের মধ্যে নিজেকে খুবই তুচ্ছ লাগছিল। ওতো আনন্দ আমার আসে নাই সে রাতেও চোখ দিয়ে পানি পড়ছিল অনবরত, গান শুনছিলাম টানা একটাই, 'আমায় গেঁথে দাওনা মাগো একটা পলাশ ফুলের মালা। আমি জনম জনম রাখবো ধরে ভাই হারানোর জ্বালা।'

মন্তব্য করুন

(আপনার প্রদান কৃত তথ্য কখনোই প্রকাশ করা হবেনা অথবা অন্য কোন মাধ্যমে শেয়ার করা হবেনা।)
ইমোটিকন
:):D:bigsmile:;):p:O:|:(:~:((8):steve:J):glasses::party::love:
  • Web page addresses and e-mail addresses turn into links automatically.
  • Allowed HTML tags: <a> <em> <strong> <cite> <code> <ul> <ol> <li> <dl> <dt> <dd> <img> <b> <u> <i> <br /> <p> <blockquote>
  • Lines and paragraphs break automatically.
  • Textual smileys will be replaced with graphical ones.

পোস্ট সাজাতে বাড়তি সুবিধাদি - ফর্মেটিং অপশন।

CAPTCHA
This question is for testing whether you are a human visitor and to prevent automated spam submissions.

বন্ধুর কথা

আরাফাত শান্ত's picture

নিজের সম্পর্কে

দুই কলমের বিদ্যা লইয়া শরীরে আমার গরম নাই!