ইউজার লগইন

আজিরা দিনপঞ্জী... ৭

তেমন কোন কারণ নেই, তারপরেও আমি প্রায় প্রতিদিনই রাত এগারটা কি বারোটার দিকে অফিস থেকে বেরুই... অফিসে কেউ থাকেনা আরো অনেক আগে থেকেই। বিশাল ফুটবল মাঠ মার্কা অফিস স্পেসে আমি ফুল ভ্যলুমে গান শুনি, নিজেও চেঁচিয়ে সুরে-বেসুরে গান গাই, কখনো সখনো মন চাইলে এক দুই পাক নেচেও নেই। বারোটার শেষ বাসের জন্য যখন দাঁড়িয়ে থাকি, নিশীথ সূর্যের এই দেশে তার খানিক আগ থেকে মাত্তর রাতটা শুরু হয়... সন্ধ্যের নীলাভ ছায়া আকাশের অন্ধকারে কোথায় যেন মিশে থাকে তখনো। চাইলেই পারি, কিন্তু আমার কেন জানিনা কখনো বাসের টাইমটেবল দেখে বেরুতে মন চায়না। অপ্রয়োজনে এইটুকু সময় নষ্ট করার বিলাসিতা আমি বেশ আরামেই উপভোগ করি। আর বেশিরভাগ দিনই তাই কমের পক্ষে মিনিট দশেক বাস স্টপে দাঁড়িয়ে থাকা লাগে। বাসে যখন উঠি, আর কেউই প্রায় থাকেনা তখন... বাস ড্রাইভাররা কেউ ক্লান্ত মাথা নাড়িয়ে নড করে, কেউ হাই বলে... আবার কেউবা হাই তোলে। পুরো বাসটা আমার একলা'র মনে হয়... নিজেকে রাজকুমারী মার্কা লাগে... যেন বিশাল লিমুজিনে চেপে বেরিয়েছি নৈশ ভ্রমণে। আমি বাসের এক সিট থেকে আরেক সিটে যাই... ড্রাইভাররা হয়তো আড়চোখে তাকায়... পাত্তা দিইনা... কোনকোনদিন হয়তো এক কোণায় ইদানী যেই বইটা পড়ছি, ''হার্ড বয়েলড ওয়ান্ডারল্যান্ড'' সেইটা নিয়ে বসি... এই বইটাকে খুব অনুবাদ করতে ইচ্ছে হয়... কিন্তু এর জন্যে আমাকে বাকি সমস্ত কাজ কাম ফেলে বসে পড়তে হবে এর পেছনে। হয়তো সামনে কখনো করে ফেলবো বা অন্তত করতে শুরু করবো।

লিসাক্যার ব্রু থেকে শুরু... বাসটা এর পরে সে সে ভেস্ট, লিল্যিয়্যাকার, ভেক্কেরোভ্যায়েন.... উল্ল্যেভ্যাল স্টাডিওন... নিডাল্যান, স্তুরু ... এইসব আজগুবী নামের স্টপে থেমে থেমে আধঘন্টা'র মধ্যে পৌঁছে যায় গ্রেফসেন এ। গ্রেফসেন এ নামলেই পেছন থেকে হাজারটা স্মৃতি হামলে পড়ে... আর আমি জানিনা কেন হ্যারল্ডশাইমের এই ইয়ূথ হোস্টেলের আশেপাশে এলেই আমার ২০০৭ এ ফেরত যাওয়া হয় বারেবার। আর কেবল মৌসুমের কথা মনে পড়ে... আমরা দুইজন কতোবার রাস্তা হারিয়েছি এইখানে... অথচ এখন জায়গাটা নিজের নখের মতোই চেনা। সেই বৃদ্ধ ট্যুরিস্টের কথাও মনে পড়ে যে আমাকে বাচ্চা ভেবে মাথায় হাত বুলিয়ে বলেছিলো, ''কিড্ডো, আই অ্যাম এ ট্যুরিস্ট হেয়ার, স্যরি আই ক্যান্ট হেল্প''... কিংবা হোস্টেলের সেই ম্যানেজার মহিলা যে বাংলাদেশ শুনেই কেবল মোহাম্মদ ইউনুসের কথা বলতো... আরো মনে পড়ে আমার প্রেমে পড়বার দিনগুলো... শংকা, লজ্জা, আনন্দ, দ্বিধা এ সবের মিশেলে সে এক অদ্ভুত অনুভূতি। সেসমস্ত কতো পুরানো ঘটনা, তিনটে বছর নেহায়েত ফেলনা সময় নয় বটে। স্টপ থেকে হাঁটতে হাঁটতে কথনো সখনো বুনো শেয়াল কিংবা বিড়ালগেছের কিছু প্রাণী রাস্তার উপর দিয়ে দৌড়ে চলে যায়... আলো-আঁধারিতে রাস্তার পাশের বুনো ফুলের ঝোপের ঝাঁঝালো গন্ধে পৃথিবীটাকে তেমন করে অর্থহীন মনে হয়না আর। ভালোবাসা ভালো, তবে নিজের জন্যেও ছিঁটেফোঁটা রেখে দেওয়া জরুরী... নাইলে পরে বেঁচে থাকাটা ভীষন ক্লান্তি বয়ে আনে।

পোস্টটি ৩ জন ব্লগার পছন্দ করেছেন

বকলম's picture


আজিরা টাইমের অভাবে আনিকার আজিরা দিনপঞ্জী পড়ি পড়ি করেও কেন জানি পড়া হয়ে উঠেনি এতদিন, আজ পড়লাম। কি যে ভীষণ ভাল লাগলো বলে বোঝাবার নয়।

সকাল থেকে কোন এক কারনে টেন্সড ছিলাম, সেই টেনশনে সকাল থেকে কিছু খাওয়া হয়নি, বসের এক মেইলে সেই টেনশন কাটার পর বাইরে থেকে যাতার (মসলা দেয়া রুটি) আর অরেঞ্জ জুস খেয়ে অফিসে নিজের চেয়ারে বসেই এই পোষ্টটা পড়লাম। এ যেন সের এর উপর সোয়াসের, চা'য়ের উপর ক্রীমি মালাই!

গুড উইশেস আনিকা। ভাল থাকবেন।

আনিকা's picture


Smile বাহ!

তানবীরা's picture


অফিস শুরু করেন কটায়?

আনিকা's picture


ঠিক নাই কোনো... Smile

জ্যোতি's picture


ভালোবাসা ভালো, তবে নিজের জন্যেও ছিঁটেফোঁটা রেখে দেওয়া জরুরী... নাইলে পরে বেঁচে থাকাটা ভীষন ক্লান্তি বয়ে আনে।

একদম খাঁটি কথা। নিজেকে ভালো না বাসলে সব কিছুই অর্থহীন লাগে।ভালো থাকবেন।

মন্তব্য করুন

(আপনার প্রদান কৃত তথ্য কখনোই প্রকাশ করা হবেনা অথবা অন্য কোন মাধ্যমে শেয়ার করা হবেনা।)
ইমোটিকন
:):D:bigsmile:;):p:O:|:(:~:((8):steve:J):glasses::party::love:
  • Web page addresses and e-mail addresses turn into links automatically.
  • Allowed HTML tags: <a> <em> <strong> <cite> <code> <ul> <ol> <li> <dl> <dt> <dd> <img> <b> <u> <i> <br /> <p> <blockquote>
  • Lines and paragraphs break automatically.
  • Textual smileys will be replaced with graphical ones.

পোস্ট সাজাতে বাড়তি সুবিধাদি - ফর্মেটিং অপশন।

CAPTCHA
This question is for testing whether you are a human visitor and to prevent automated spam submissions.

বন্ধুর কথা

আনিকা's picture

নিজের সম্পর্কে

কি লিখবো জানিনা...