ইউজার লগইন

ঘুরে ফিরে নিশীথ সূর্যের দেশে....৩

২০০৭ এর সফরে আমি, মৌসুম আর আমাদের তৎকালীন টিম লিডার একসাথে ঘুরে বেড়াতাম বেশিরভাগ সময়ে। একদিন গিয়েছিলাম সাগর সৈকতে, প্রথম বীচটাতে ঢুকে অবশ্য লিডার আমাদেরকে আর সেইখানে ঢুকতে দেননি, সেইটা নাকি ন্যুডিস্ট'দের জায়গা ( আহা! দেখা হইলো না Wink )। যাই হোক বীচে গিয়ে আমার আর মৌসুমের মোটামুটি স্বপ্নভংগ... কই আমাদের কক্সমামু'র বিশাল বালির সৈকত, আর কই এই পাথুরে খ্যাড়খ্যাড়ে বীচ! তবে যেইখানকারই হোক না কেন সাগরের একটা ভীষণরকম আকর্ষণ আছে, কেমন একটা নোনা জলের গন্ধ পাওয়া যায় বাতাসে, পাথরের উপরে বসে কিছুক্ষণ দৃশ্য দেখাদেখি, কিছুক্ষণ নিজেদের মধ্যে পানি আর পাথর ছোঁড়াছুঁড়ি করে চলে আসলাম। ফেরত আসার সময়ে রাস্তা হারিয়ে দুইটা ঘন্টা এদিক সেদিক হাঁটাহাঁটি করসিলাম এইটা বেশ ভালো মতো মনে আছে, পানির তেষ্টায় কলিজা শুকিয়ে গেসলো।
shagor
shagor2

ততোদিনে আমরা হ্যারাল্ডশাইমের'র ইয়ূথ হোস্টেলে এসে উঠেছি রয়্যাল প‌্যালেসের পাশের হোটেল ছেড়ে। এই নতুন জায়গাটা বরং আমাদের বেশি পছন্দ হইসিলো, একটা ইউনিভার্সিটি এরিয়ার ভেতরে বিশাল জায়গা জুড়ে মাঠ, আর তার পাশেই একটা ছোট টিলার উপরে সেই হোস্টেল। এইখানে আসবার পরে কলিগদের মধ্যে ইন্টারঅ্যাকশন বাড়তে লাগলো। আমরা সবাই মিলে রান্নাবান্না করি, ফুটবল-টেবিল টেনিস-ক্রিকেট খেলি, সিনেমা দেখি আর প্রায়ই লনে রাখা টেবিল-চেয়ারে পা উঠিয়ে বসে দুনিয়ার যতো আজাইরা গল্প হয়। মাঝে মাঝে মজা দেখার জন্য পাহাড় থেকে গড়াইয়া নিচে পড়ি, এইরকম করতে গিয়া একদিন আমার সবেধন নীলমণি চশমাটা ভাংতে নিসিলাম আর কি। সবাই মিলে একদিন সিনেমাও দেখতে গেসিলাম কলেসিয়াম থিয়েটারে, যেইটা সম্ভবত ইউরোপের সবচেয়ে বড়ো সিনেমা হল... খুব সম্ভবত পাইরেটস অফ দ্য ক্যারিবিয়ান দেখছিলাম।
hostel
1
games

হাবিজাবি ঘোরাফেরা বাদে সত্যিকারের বেড়াইতে একটা জায়গায়ই গেসিলাম খালি (অফিস ট্যুর হিসেবে সব মিলাইয়া ঘোরাঘুরি নেহায়েত মন্দ হয় নাই অবশ্য)। অফিস থেকে সামার স্পেশাল একটা সাইক্লিং ট্যুর হয় ফি বছর, তো আমাদেরকে নিয়ে গেসলো কোব্বেরহগেন নামের একটা জায়গায়। আমি আর মৌসুম সাইকেল (সিক্কেল ওদের ভাষায়) চালাইতে জানিনা, তাই রসদপত্রের যেই গাড়ি আমরা তার সাথে গেলাম। আমাদের সাথে ম্যাডস নামের এক সামার স্টুডেন্ট, বেচারা কিছুদিন আগে ফুটবল খেলতে গিয়ে ঝোপের পাশে ফেলে রাখা বারবিকিউ'এর জ্বলন্ত কয়লার আগুনে পা পুড়ে ফেলেছে, তাই সাইক্লিং করার প্রশ্নই আসেনা, এইটা নিয়ে তার দুঃখের বহর দেইখা আমি আর মৌসুম একটু টাসকি, বিশ কিলোমিটার সাইকেলে না গিয়ে আরামে গাড়িতে যাইতেসে, এইটা নিয়ে এতো মন খারাপ করার কি আছে আমার বাংগাল মস্তিষ্কে সেইটা কোনভাবেই ঢুকতেসিলোনা। যাই হোক কোব্বেরহগেন এ গিয়া মোটামুটি মুগ্ধ, কেমন স্বপ্নের মতো জায়গা। কাঠের পুরানা লগ কেবিন, দেয়াল বেয়ে উঠে যাওয়া জংলী ফুল, পাথরের পাশে ফুটে থাকা ডেইজি, লনে সারি বাঁধা কাঠের বেঞ্চি, ঢালু হয়ে নেমে যাওয়া পাহাড়ী রাস্তার দুইপাশে পাইনের ঝোপ, পথে পড়ে থাকা পাইনের ফল, ঘন সবুজ ফার্ণ ঝোপ কিছুক্ষণ আগে হয়ে যাওয়া বৃষ্টিতে ঝকঝক করছে যেন।

log house1
log house 2
house 3
house 4
hudai

আশেপাশে হাঁটতে হাঁটতে মৌসুমের গগনবিদারী চিৎকার শুনে ওর কাছে দৌড়ে গিয়ে যা দেখলাম তাতে হৃদস্পন্দন বন্ধ হয়ে যাবার জোগাড়। চারদিকে পাইনের বন দিয়ে ঘেরা একটা কাকচক্ষু জলের লেক। নীল আকাশ আর সবুজ বনের ছায়ায় সে অদ্ভুত এক ছবির মতো ব্যাপার। পরদিন ভোরবেলা এক কলিগের সাথে সেই লেকের চারপাশে হেঁটেও আসছিলাম, যেই হাঁটাটা আমার জীবনের সবচে স্মরণীয় ঘটনা একটা অন্য কারণে। স্মৃতি ছাড়া আসলে জীবনে সম্বল বলে আর কিছু থাকে কি... ? আর কেমন করে কোন জাদুকাঠির ছোঁয়ায় কিছু কিছু স্মৃতি খুব সামান্য হয়েও অসামান্যের চেয়েও বড়ো হয়ে দেখা দেয়। মাত্র হপ্তাখানেক আগে নিজের মনের ভেতর আরেকজন মানুষের জন্য বাঁধছাড়া আবেগ অনুভব করছিলাম। সেই মানুষটাও আছে দলে... কিন্তু আমার আবেগ আবার নিজের কাছে। সারারাতের পার্টিতে বেশিরভাগ লোকই আকণ্ঠ পান করে বেলা করে ঘুমুবার জন্য বিছানায় গিয়েছে ভোরের দিকে... আমি এই ব্যাপারে মোটামুটি নাবালিকা... পানের ধার ধারিনা... নিজের মনের অস্থিরতা চেপে রেখে কিছুক্ষণ ঘুমিয়েছিলুম রাতে। ভোরে অস্থিরতা কাটাতে একলাই নিরুদ্দেশের পানে হাঁটা দিলাম... ঘন্টাখানেক হেঁটে লেকের পাড়ের ছোট্ট কাঠের জেটিতে বসে, পানিতে পা ডুবিয়ে ঝকঝকে স্বচ্ছ পানিতে নেমে আসা সূর্যের ছায়া দেখলাম অনেকক্ষণ ধরে। তারপর আবার কেবিনের সামনের চত্বরে ফিরে এলাম... সেই মানুষটাও ততোক্ষণে উঠে গিয়েছে... জানিনা কি ভেবে সে আমাকেই জিজ্ঞাসা করলো আমি হাঁটতে যাবো কিনা তার সাথে... লেকের ধারে নাকি লাল-সবুজ ট্রেইল আছে, গাছের গায়ে মার্ক করা... সবচে ছোটটা ধরে হাঁটতে পৌনে এক ঘণ্টা লাগবে... আমি বুঝি আর মানা করি। এরপরে সেই পঁয়তাল্লিশ মিনিটের হাঁটা... তার সাথে হাঁটতে গিয়ে আমাকে অবশ্য প্রায় দৌঁড়ুতে হচ্ছিলো... অদ্ভুত দর্শন সব গাছে, যাদের নাম জানা দূরের কথা চোখেও দেখিনি কখনো, গাছের ফাঁকে ফাঁকে বিচিত্র ফার্ণের ঝোপ, এখানে সেখানে মাটিতে যেখানেই রোদের ছিঁটেফোঁটা এসে পৌঁছুয়, সেইখানে ঘাসের দল, আর তার ভেতর থেকে মাথা বের করে রাখা সাদা-নীল ঘাসের ফুল কিংবা হলদে ডেইজি... আমি মনে মনে ভাবছিলাম সময় থেমে যাক... মানুষটার পেছন পেছন দৌড়ে লেকটাকে ঘুরে এসে মনে হচ্ছিলো... ভালোবাসার চেয়েও বেশি কিছু একটা অনুভব করছি। এর পরেও আরো অনেকবার তার সাথে অনেক জায়গায় যাওয়া হয়েছে... কিন্তু কোন দেশ, কোন জায়গা আর সেই সময়টার মতো হবেনা... একটা নতুন দেশে, নতুন জায়গায়, বেকুব আমি, মনের ভেতরে অস্থিরতা আর নতুন প্রেমে পড়ার চাপা কষ্ট, তার মধ্যে সেই সময়টাতে যাকে সবচেয়ে বেশি করে চাইছি তারই সাখে, তারই ডাকে এইটুকু হেঁটে আসা... আমি জানিনা সে কেন আমাকে ডেকে নিয়ে গেসলো... সাথে অন্যেরাও ছিলো... হয়তো ভেবেছিলো অন্যেরা পাত্তা দেবেনা... কারণ যাই হোক, সেই সময়টার ভেতরে আমার একটা অস্তিত্ব আটকে গিয়েছে। প্রথম প্রথম কষ্ট হতো, ভাবতাম ... আহা! আর আসবেনা এমন দিন... এখন মনে হয় এইরকম অনুভূতি এত কম বলেই না এতো দামী।

lake1
lake2

পোস্টটি ৫ জন ব্লগার পছন্দ করেছেন

নুশেরা's picture


আহা!
আনিকার লেখার ভক্ত হয়ে যাচ্ছি।

এইরকম অনুভূতি এত কম বলেই না এতো দামী।

প্রবল সত্যি!

আনিকা's picture


বাহ! বাহ! আমারো আবার লেখা, তারও ভক্ত... তাও নুশেরা'পু... আমি তো মাটি থাইকা দুই ইঞ্চি উপ্রে দিয়া হাঁটুম... Big smile

ভাঙ্গা পেন্সিল's picture


ওদের সী-বীচ দেখে তো করুণা হচ্ছে! Cool

আনিকা's picture


তা আর বলতে... Tongue

শাপলা's picture


ছবিতে ছবিতে জীবনের গল্প
একমুঠো স্মৃতি আর প্রেমে পড়া অল্প
দামী অনুভূতি আর সে পাশে ঠিক
এই ভাবে হয়ে যাও নষ্টালজিক।

এমন গল্প বলো কে না ভালোবাসে?
একদিন শেষ করো গল্পটা
বলো, কেন সে নেই আজও পাশে?

আনিকা's picture


গল্পটা আটকাইয়া আছে... কোনদিন যদি কোনরকমের সমাপ্তি হয়, মিলনাত্মক, বিয়োগাত্মক যেইটাই হোক... তখন শেষ করবোনে... এখন আস্তে আস্তে গল্পটাই চলুক...

মীর's picture


পোস্ট পড়ে, ছবি দেখে বরাবরের মতোই মুগ্ধ হলাম।

অতিথি's picture


Bah!

মেসবাহ য়াযাদ's picture


আপনেগো লগে মনে মনে ঘুইরা আইলাম। কী সোন্দর আর প্রানবন্ত বর্ণনা...। ছবিগুলান ফাটাফাটি। ভালো থাকেন...

১০

মুকুল's picture


প্রথম বীচটাতে ঢুকতে না দেয়ায় লিডাররে দিক্কার! Tongue

১১

শওকত মাসুম's picture


এর নাম বীচ? আমি তো গোয়ার বীচ দেইখাও হতাশ হইছিলাম

১২

আনিকা's picture


হি হি হি... সেইটাই...

১৩

তানবীরা's picture


তবে যেইখানকারই হোক না কেন সাগরের একটা ভীষণরকম আকর্ষণ আছে

সত্যি কথা। অপূর্ব সব ছবিগুলো

মন্তব্য করুন

(আপনার প্রদান কৃত তথ্য কখনোই প্রকাশ করা হবেনা অথবা অন্য কোন মাধ্যমে শেয়ার করা হবেনা।)
ইমোটিকন
:):D:bigsmile:;):p:O:|:(:~:((8):steve:J):glasses::party::love:
  • Web page addresses and e-mail addresses turn into links automatically.
  • Allowed HTML tags: <a> <em> <strong> <cite> <code> <ul> <ol> <li> <dl> <dt> <dd> <img> <b> <u> <i> <br /> <p> <blockquote>
  • Lines and paragraphs break automatically.
  • Textual smileys will be replaced with graphical ones.

পোস্ট সাজাতে বাড়তি সুবিধাদি - ফর্মেটিং অপশন।

CAPTCHA
This question is for testing whether you are a human visitor and to prevent automated spam submissions.

বন্ধুর কথা

আনিকা's picture

নিজের সম্পর্কে

কি লিখবো জানিনা...