অনিকেত... ২
ফ্রিজ খুলে চিন্তা করছিলাম তাড়াতাড়ি করে কি বানানো যায়। গত সপ্তাহে বাজার করেছি, কয়েক পদের সবজি আর ডিম ছাড়া তেমন কিছু নেইও ফ্রিজে। ডিম পরোটা আর কুঁচনো সালাদ বানাবো ঠিক করলাম, খুব বেশি সময় লাগবেনা তাতে। জলদি করে দুটো ডিম ভেংগে নিয়ে পেঁয়াজ আর মরিচ কুঁচি মিশিয়ে নিলাম, রেডিমেড পরোটা ছিলো ফ্রিজে। বের করে আনার সময় ভাবছিলাম জীবনকে কতো সহজ করে ফেলার চেষ্টায় থাকি আমরা। অথচ জীবনটা ভীষণ হতচ্ছাড়া! ঠিকই জটিলতায় ঘুরপাক খেতে থাকে আপন মনে। ডিম পরোটা ভেজে তুলবার ফাঁকে ফাঁকে শসা, আর টমেটো কুঁচিয়ে নিয়ে সাথে কাঁচামরিচ আর ধনেপাতা দিয়ে সালাদ বানিয়ে ফেললাম চটপট। টেবিলে সব তৈরী করে রেখে মাহফুজকে ডাক দিলাম। মাহফুজ এর মধ্যে বাইরের কাপড় পাল্টে নিয়েছে। জানিনা কেন, আজ হঠাৎ মাহফুজকে দেখে মনে হচ্ছিলো অনেকদিন আমি ওকে তেমন করে খেয়াল করিনি, বড্ড ক্লান্ত দেখাচ্ছিলো আজ ওকে।
টেবিলের দিকে তাকিয়ে মাহফুজ যেন একটু চাংগা হয়ে উঠলো, চেয়ারটা টেনে নিয়ে বসে পড়লো; আমার দিকে তাকিয়ে বললো, ''তুমিও বসো না শানু।'' পাশাপাশি বসে চুপচাপ খেতে খেতে আমার মনে আবারো প্রশ্নটা ফেরত এলো, কি বলবে ও? ও কি আমার সাথে থাকতে থাকতে ক্লান্ত? এই নিরামিষ দাম্পত্য কি ওর আর ভালো লাগছে না? নাকি অন্য কিছু? নেহায়েত সাংসারিক আলোচনা?
কবে যেন বলছিলো আশুলিয়ার দিকে একটা জমি কিনতে চায়। ঢাকার আশেপাশের জমির দাম তো হাতের নাগালের বাইরে আজকাল। সেইসব নিয়ে ও কিছুক্ষণ বিরক্তি জানিয়ে বলেছিলো যেখানেই হোক, একটুকরো জমি ওর চাই। সারাজীবন মামাদের বাড়িতে থেকে আমার নিজের ভেতরে কেন জানিনা ওইসব স্বপ্ন কখনো দানা বাঁধেনি। এমনও না মামার বাড়িতে খুব অনাদর হয়েছে। মামা-মামী নেহায়েত ভালো মানুষ ছিলেন। বাবা মারা যাবার পর মাকে তারা নিজেদের ইচ্ছায়ই বাড়িতে জায়গা দিয়েছিলেন, আমাকে পড়াশুনোও করিয়েছেন তারাই। মা-ই বরং কখনো সেখানে পুরোপুরি মানিয়ে নিতে পারেননি। বাবার সরকারী কোয়ার্টার্সের সামনের টুকরো জমিটাতে নিজের স্বপ্নের বীজ বোনায় অভ্যস্ত হয়ে গিয়েছিলেন তিনি। মামা-মামীর বাসাবোর ঘিঞ্জি গলির ভাড়া বাড়িটার বারান্দা থেকে কোনরকমে সামনের বাড়ির বারান্দাটুকুই চোখে পড়েতো। ওইটুকু জমি ছিনিয়ে নেয়ার অপরাধে মা তার সৃষ্টিকর্তাকে কখনো ক্ষমা করে উঠতে পারেননি। সারাজীবন সেই ক্ষোভ জমিয়ে রেখেছেন। শেষের দিকে আমাকে প্রায় বলতেন, ''তোর চাকরি হলে তুই আমাকে একটা ছোট্ট জমি কিনে দিবি?''
কলেজের চাকরিটা পাওয়ার পরে মা বড্ডো খুশি হয়ে গিয়েছিলেন, ছেলেমানুষের মতো বারবার মনে করিয়ে দিতেন সেই জমির কথা। চাকরিটা পাবার কিছুদিন পরেই মাহফুজের এক চাচা আমার জন্য বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে বাড়িতে এলেন। আমার কলেজেই পড়াতো তার ছোট মেয়ে, সেই সুবাদেই আমাকে চিনতেন। মামা-মামী নিতান্তই খুশি হয়ে রাজী হয়ে গেসিলেন, আমার জন্য ওর চেয়ে ভালো পাত্র তারাই বা কোখা থেকে যোগাড় করতেন? মাও খুশিই ছিলেন, এতোদিন পরে তার নিস্তরংগ জীবনে সেই খুশির ঢেউ আটকে রাখার ক্ষমতা বুঝি তার ছিলোনা, আমার বিয়ের মাসখানেকের মাথায় ঘুমের মধ্যে চুপচাপ মারা গেলেন তিনি। তার মৃত মুখে কোথায় জানি একটা পরিতৃপ্তির ছায়া ছিলো? মায়ের সেই মুখ দেখে আমার ভীষণ দুঃখ হয়েছিলো কিনা আমি জানিনা, আমার শুধু জানতে ইচ্ছে করছিলো কিসের স্বপ্ন দেখছিলেন তিনি? ফেলে আসা সেই একটুকরো বাগানের নাকি অন্য কিছু? আর সেই সাথে বুকের ভেতরে কেমন একটা নেই হয়ে যাওয়া অনুভূতি তৈরী হয়েছিলো আমার। সেই শূণ্যতার বোধটাকে আর কোন কিছুর সাথে মেলানো যায়না, আমি তেমন কাঁদিনি- তবে বুকের ভেতরে কেমন একটা শূণ্যস্থান নিয়ে ঘুরে বেড়াই সবসময়ে।
ভাবনার খেয়া কোথায় গিয়ে ঠেকেছিলো জানিনা, মাহফুজের কথায় সম্বিৎ ফিরে পেলাম, ''কি ভাবছো শানু?''। আমি একটু চমকে উঠে বললাম, ''না তেমন কিছু ভাবছি না, তুমি কি যেন বলতে চাইছিলে?'' ''আমার অফিস থেকে সামনের সোমবারে আমাকে চট্টগ্রাম যেতে হবে কয়েকদিনের জন্য, তুমি তো অনেকদিন কোথাও যাওনা। কলেজ থেকে ছুটি নিয়ে এইবার যাবে নাকি আমার সাথে?'' এই কথায় আমার হাসবার কোন কারণ নেই, কিন্তু আমি হঠাৎ হেসে উঠলাম, বললাম ''ওহ! এই কথা বলার জন্য এতো ভণিতা?'' ও বললো, '' না, শুধু এইটুকু না, আরো কিছু কথা আছে। পরে বলবো, তবে পারলে এইবার আমার সাথে চট্টগ্রামে চলো, অনেক কিছু বলার আছে তোমাকে।'' মাহফুজের স্বরে কোথায় যেন একটা বিষন্নতার আভাস ছিলো, অথচ আমি কিছুতেই বুঝে উঠতে পারছিলাম না কেন আর কিইবা হতে পারে কারণ। বললাম, ''আচ্ছা দেখি, কলেজে কথা বলে। কিন্তু যেই কথা আমাকে বলতে চাও তার জন্য চট্টগ্রামে কেন যেতে হবে? এখন এইখানে বলতে সমস্যা কোথায়। কথা বলে ফেলার পরে বেড়াতে যাওয়া যাবেনা?'' মাহফুজ একটু হেসে বললো, '' বলে ফেলার পরে অনেককিছু পাল্টে যেতে পারে, বেড়ানোটুকু হয়ে যাক, এরপরেই না হয় শুনো।''





ফেরার পরে কি হতে পারে তার কিছুটা অনুমান করে নিয়েছি কিন্তু সম্ভবত পাঠকের মনের কথা আর লেখকের চিত্রকল্প দু-রকম হতে পারে। দুই পড়ার জন্য পুরনো লেখা খুঁজে এক পড়ে এলাম, মনে হচ্ছে পাঠকই জিতবে
দেখা যাক।
আমাকে একটু বলে দেন কি হবে পরে, আমি নিজেই এখনো জানিনা...
লেখাটা চমৎকার আগাচ্ছে।
দুই পড়লাম - তারপরে পড়লাম এক । ভাল লিখছেন, তবে তিনমাসের মত সবাইকে ভুগিয়েছেন । এত দেরী ! পরের পর্ব তাড়তাড়ি !
গল্পটার পেছনে ব্যাপক ছুটে শেষমেষ এইটুক ধরতে পেরেছি... ভীষণ পাজি, কিছুতেই সামনে আসেনা... লিখবো কি করে?
ধুর আগের কাহিনী ভুলে গিয়েছিলাম।রিভাইস দেয়া লাগলো।
গল্প ভালো হয়ছে।
চলুক
আনিকা, সব শুভ শুভ হোক। বাবা - মা মরা শানুকে আর কষ্ট দিও না
পিলিজ কইলাম
ওর গণ্ডারের চামড়া, কষ্ট বেশি লাগেনা...
পরেরটা কবে আসবে?
জানিনা...
এ পর্বে কী পড়লাম?
গল্প নাকি
স্মৃতিকথা?
ট্যাগ থাকলে ভালো হতো মনে হয়।
ট্যাগ করে দিচ্ছি...
গল্প সাবলীল। ভালো লাগলো।
তবে লীনার মতে আমারও মত। দেখা যাক।
এই পর্ব পড়ে খুজেঁ প্রথমটা পড়লাম... ভুলেই গেছিলাম... দারুন জমজমাট হয়েছে, আগামী পর্ব দিতে এত্তো দেরি কইরেন না প্লীজ লাগে...
মন্তব্য করুন