ইউজার লগইন

গল্প: মতির শরীরটা খারাপ

"বুয়া! তোমার আক্কেলটা কেমন? বাড়ি ভর্তি কাজ জমে গেছে আর আসছো দুপুর ১২ টার সময়"। বেগম সাহেব হাত নেড়ে বলে। তারপর শুনিয়ে বলতে থাকে, "বেশী বাড়া বাড়ি করলে আসার দরকার নাই। ভাত ছিটাইলে কাকের অভাব হয় না"

দরজায় ঢোকার সময় মাথা নিচু করে থাকে মতির মা। কাল থেকে মতির শরীর খারাপ। জ্বর জ্বর ভাব। সারারাত আম্মা আম্মা করে কেঁদেছে। বলেছে, "তুমি কামে যাইওনা। আইজ থাকো"।

সে খুব সময় মেনে চলে, কিন্তু দেরী না করে উপায় ছিল না।

বাসায় অনেক কাজ। বেগম সাহেবের বান্ধা কাজের মেয়ে বকুল বরিশাল গেছে। মতির মায়ের ঘাড়ে পুরো বাড়ি - একগাদা মসলা পিষতে হবে, ঘর মোছা। বাড়ির লোকজনের টালটাল জামা কাপড় জমানো। রান্নাবান্না। জিনিয়া কলেজে পড়ে। সেও মায়ের মতই চিৎকার করছে। দোতলা থেকে শব্দ আসে, "বুয়া, ও বুয়া, রেসপন্স করছ না ক্যান"? তারপর অনুযোগের স্বরে বলবে, "আম্মা, আম্মা, বুয়াকে একটু আসতে বলতো"। বেগম সাহেব আদুরে কন্যাকে রাগাতে চায় না। কারন জিনিয়া রেগে গেলে ভাত খাওয়া বন্ধ করে দেবে। নরম গলায় বুয়াকে অনুরোধ করে, "বুয়া একটু দেখে আসতো মেয়েটা কি চায়। ওর আবার সামনে পরীক্ষা”

জিনিয়ার ব্রিটিশ এর কী একটা টেস্ট। বিছানায় শুয়ে কার সঙ্গে ফোনে কথা বলছে। সামনে বইপত্র খোলা। তার পা ম্যাজ ম্যাজ করছে। কাজের মেয়েটা নাই বলে বুয়াকে দিয়ে টিপাতে হবে।

মতির মার বয়স ৩৫ হলেও দেখায় ৪০/৪৫ এর মতো। এই শরীরটিপে দেয়ার কথা বললে মতির বাপের কথা মনে আসে। তখনো সুলতান আর মতি পেটে আসে নাই। রিক্সা গ্যারেজে দিয়ে এসে মতির বাপ বলতো,”বউ তোর হাতে যাদু আছে। মাথাটা টিপা দে, রগে ধর, কপাল বানা”

তার স্বামী বিয়ে করে আরেক বউ নিয়ে উত্তর খানে আছে। ১২ বছরের সুলতান আর ৬ বছরের মতি নিয়া সে পড়ে আছে ভাষানটেকে। সাধারণত বড় ছেলের নামে পরিচিতি হয় মেয়েদের। কিন্তু তাকে মতির মাই ডাকে সবাই।

সবাই বলছে কাল ঈদ। ঠিক এমন সময় মতির শরীর খারাপ খুব উদ্বিগ্ন করে মতির মাকে। জ্বরে জলপট্টি দেয়ায় কমেছিল। প্যারাসিটামল দিয়েছে। কিন্তু আবার বাড়ার ভয়। সে ১ রুমের যে বাসায় থাকে, তার লাগালাগি ঘরের কুলসুমের মাকে বলে দিয়েছে, মতির জ্বরটা একটু দেখতে।

বিকাল হতেই বড় ছেলে সুলতান আসে। দারোয়ান খবর দেয়। সুলতান অস্থির ভাবে বলে, "আম্মা, মতির জ্বর বাড়ছে। খালি কানতাছে। তুমি আগে যাইবার পারবা?"
-আচ্ছা
বেগম সাহেব প্রচন্ড ক্ষেপে গেছে, এই ছোট লোকগুলো শুধু নিজের বুঝ বোঝে। জিনিয়ার বাবার বন্ধু ব্যবসায়ীরা আসবে ঈদের দিন সন্ধায়।২৫ টা মাথার জন্য রান্না করতে হবে। খাসী জবাই হয়েছে, তার মাংস কাটাকুটি করে রান্না করে রাখতে হবে। গরুর মাংস। রোস্ট। পোলাও, বিরিয়ানী দুটোই হবে। ওদের খানাপিনা আপ্যায়ন ঠিক মত না হলে প্রেস্টিজ যাবে।

মতির মা খুব অসহায় ভাবে বলে, "আম্মা জান, আমার ছোড পোলার শইলে জ্বর। অহন যাওন দরকার"।

শুনে রক্ত চড়ে বেগম সাহেব মুখ শক্ত করে সে জবাব দেয়,"তোমাদের বিশ্বাস করা কঠিন। ১০০ টা মিথ্যা অজুহাত।" তারপর বলতে থাকে, "জাকাতের কাপড় তো পেয়ে গেছ, নতুন একটা শাড়ী দিলাম। বেতন ও বাড়ায়ে দিলাম। এখন তো যাবাই। ছোটা মানুষরে এই জন্য রাখতে নাই"।
মতির মা এসব কথা শোনার অবস্থা নাই। সে বলে,
"আম্মা আমার যাওন লাগবো"।
"তুমি আসবা কখন?"
"জানিনা, আমার পোলার শইলটা আগে দেখি আগে"।
বেগম সাহেব এবার তাকে হুমকি দেয়, "শোন মতির মা লাস্ট কথা বলি, তুমি জলদি ফিরত আসবা। রাতে থাকবা, ঈদের দিন আবার ছুটি চাইতে পারবা না। মেহমানদের সামনে মুখ ছোট হলে তোমার বেতন বন্ধ"।
"আম্মা আমি যাই"। বলে মতির মা বাড়ির দিকে পা বাড়ায়। বাড়ি ফিরে দেখে সত্যিই অনেক জ্বর। জ্বলপট্টি দেয়। বার্লি খেতে দেয়।

রেডিওতে চাঁদ দেখার খবর এসেছে। মতির শরীরের জ্বরটা নেমে গেছে। মতির মা কনফেকশনারীর দোকান থেকে সেমাই কিনে আনতে পাঠায়। সে কালকে আর কাজে যাবে না। দুই বাচ্চা নিয়ে একসঙ্গে ঈদ করবে। চাকরী গেলে যাক। আল্লাহর দুনিয়ায় দুটো ভাতের ব্যবস্থা হবেই।

মন্তব্য করুন

(আপনার প্রদান কৃত তথ্য কখনোই প্রকাশ করা হবেনা অথবা অন্য কোন মাধ্যমে শেয়ার করা হবেনা।)
ইমোটিকন
:):D:bigsmile:;):p:O:|:(:~:((8):steve:J):glasses::party::love:
  • Web page addresses and e-mail addresses turn into links automatically.
  • Allowed HTML tags: <a> <em> <strong> <cite> <code> <ul> <ol> <li> <dl> <dt> <dd> <img> <b> <u> <i> <br /> <p> <blockquote>
  • Lines and paragraphs break automatically.
  • Textual smileys will be replaced with graphical ones.

পোস্ট সাজাতে বাড়তি সুবিধাদি - ফর্মেটিং অপশন।

CAPTCHA
This question is for testing whether you are a human visitor and to prevent automated spam submissions.

বন্ধুর কথা

স্বদেশ হাসনাইন's picture

নিজের সম্পর্কে

আমি হাসনাইন । ছোট একটা ফার্মে কাজ করছি । সৌখিন লেখক । ক্রিকেট খেলতে পছন্দ করি । পকেটে পয়সা থাকলে এদিক ঘুরে খরচ করে ফেলি । সুনীলের লেখার ভক্ত, শামসুর রাহমানের কবিতা পড়ি। বিদেশী লেখকের মধ্যে ড্যানিয়েল স্টীলের লেখা ভাল লাগে । সবচেয়ে ঘৃণা করি স্বাধীনতার বিরোধী শক্তিকে । একাত্তর আমার সবচেয়ে বড় অহংকার।