ইউজার লগইন

ছোটগল্প: সোনার গাঁ

a

দু পাশে সারি সারি ইটের ভাটা । আরব্য উপন্যাসের গরুড় পাখীর মতো চিমনির গলা বেয়ে কুন্ডলী পাকিয়ে ধুয়া উড়ছে। প্রতিদিনকার মতো কাচের বাক্সে বন্দী হয়ে সামনে এগিয়ে যাই এই পথে । ভোরের সুর্যটা ক্রমেই পানি পানি বিস্বাদ লাগে।

আমাকে বিছানা ছাড়তে হয় আজানের সময়। গোসল সেরে, কোন মতে দাঁতে পেষ্টের প্রবাহ চালিয়ে নেমে পড়তে হয় পথে। ক্লোরিনের গন্ধ পানিতে। চুল পড়ছে। ক'দিন বাদে চুল আঁচড়ানোর ঝামেলাও আর থাকবে না। অবশেষে মাইক্রোবাস ধরতে দাঁড়িয়ে থাকি বাটার সিগনালে।

আমিনবাজার পার হলে পথের ভীড় কমে যায়। ধানক্ষেতে পানি টলমল করে। কানি বক দাঁড়িয়ে থাকে ক্ষেতে। ট্রাকেরা কুঁজো হয়ে পথের ধারে মাল নামায়। মালপত্র কি সেটা বোঝার উপায় নেই। ত্রিপলে ঢাকা।

শ্রেনী বৈষম্যের প্রতিফলন সব জায়গায়। সিনেমা হল ছাড়া সবর্ত্র উঁচু লোকজন সামনের সীট দখল করে। আমাদের মতো লোক সবসময়ই পিছনে। অবশ্য মাইক্রোবাসে একদম সামনে বসলে একটু জাত যাবে। বসতে হবে দ্বিতীয় সারিতে। যারা গাড়িটা বানিয়েছে, কেন যে ড্রাইভারকে সামনে বসতে দেয়!

পথে ব্রিজ কালভার্ট গুলোর তলায় ক্ষীণ পানি বয়ে যায়। টকটকে লাল। সম্ভবত: ব্রোমাইড বা ফেরাসের কেমিক্যাল। সুতা আর টেক্সটাইলের ফিনিশিং দিতে এসব লাগে। আমারও গন্তব্য তেমনই এক সুতার কারখানায়। সকাল ৮টায় পৌছতে হবে। গ্রামের সুশীতল ছায়ার পথ দেখে বিশ্বাস হবে না এত বেশী দুষন হয়েছে এখানে, আর সেই দুষিত কারখারখানার পয়সায় দালান উঠেছে সেই গ্রামেই

জলজ্যান্ত রিসেপশনসহ স্পিনিং মিলের অফিস আছে গাজীপুরের অখ্যাত সেই গ্রামে। প্রতিদিন ফুল বদলানো হয়, নিয়মিত পথে পীচ ঢালা হয়, দুধেল গরুর মতো বড় ফিল্টার পানির জার অপেক্ষা করে - অফিসারেরা তা থেকে পানি ঢেলে খায়।বড় পর্দার টিভিতে সিএনএন চলে । রিসেপশনে বসে থাকে গাঢ় লিপস্টিকের একটা স্মার্ট মেয়ে। শুধু রিসেপশনই নয়, অনতিদুরে বিদেশী ভিসিটরদের জন্য দোতলা অতিথিশালা আছে। সঙ্গে পুকুর ও ফলের বাগান। বিদেশী অতিথিরা এয়ারপোর্ট থেকে এখানে এসে থাকতে পারে। বড় হোটেল থেকে পাঁচক ভাড়া করে স্বদেশী খাদ্য পাকানো হয়।

আমি এখানে নিতান্ত ছোট অফিসার। শ্রমিকদের মাসিক বেতন দেয়ার জন্য আমাকে নিযুক্ত করা হয়েছে। অতিথি বাড়িতে ঢোকা হয় একান্ত জরুরী প্রয়োজনে। তবে শ্রমিকদের ঝগড়া বিবাদ মিটানোর জন্য কারখানায় যাই। সেই অতিথিশালার পাশে হেঁটে গেলে চনমনে পনিরের গন্ধ ভেসে আসে। কখনো গন্ধটা ভাল লাগে, কখনো বমি আসে। বিশেষত: চীনা বা কোরিয়ান অতিথিদের জন্য খাবার নাকে সয় না। কোরিয়ানদের খাবার হয়তো সস্তা, কাছেই বাড়ুইতলী থেকে প্রায় বিনা পয়সায় কুকুর পেয়ে যাওয়ার কথা।

সাইটে হিউম্যান রিসোর্সের কাজ করলেও কম্পিউটারের কাজটাজ করে দিতে পারি আমি। আইটিতে লোকজন যারা, সব ঢাকাতেই কাজ করে। ঢাকার অফিস থেকে ফোনেই যোগাযোগ করে। আমি যেন ভারপ্রাপ্ত আইটির লোক।

মার্চ এপ্রিল থেকে বিদেশীদের ভীড় বাড়ে। আজকে ইউরোপিয়ান একটা ভিজিটর টীম এসেছে। একটা বয়ষ্ক লোককে দেখেছি আমাদের আগেই সাদা শর্টস পড়ে হাঁটা হাঁটি করছে । আমাদের বাস পৌছেছে ৭.৪৫। দারোয়ান ঢুকতেই সালাম দেয়। ও সাইটে রাতে থাকে, রিসেপশনের ফোনও ধরে। মাইক্রোবাসের সামনের সীট থেকে রিসেপশনিস্ট আমার আগে নামে। সে গোছগাছ হয়ে ঠিক ৮ টায় বসে। আমি আমার কিউবিকলে ঢোকার সময়ই সেই স্পেনিশ লোকটার মুখো মুখি হই। হাই বলি। মিষ্টি করে হাসে সে। আমি টুকটাক যা স্পেনিশ শিখে ফেলেছি, তাতে ভাষাটা বেশ মিষ্টি লাগে। লোকটাও ভদ্র।


ছুটির ধুম চলছে। এসময় বড় অফিসারেরা কেউ কাজ করেনা। ভ্যাকেশন নেয়ার হিড়িক পড়েছে। আমাকে দায়িত্ব দেয়া হয়েছে শনিবারদিন স্পেনিশ ডেলিগেটদের একটু ব্যস্ত রাখতে। গাড়ি দেয়া হয়েছে, চাইলে ময়নামতি ঘুরিয়ে আনতে পারি। দুজনের টীম। সালভারেজ হলো সেই বয়স্ক লোকটা, তার সঙ্গে থাকবে তার এসিস্টেন্ট টিনা। স্পেনে "নিমা" ব্র্যান্ডের টীশার্ট খুব জনপ্রিয়। তারা ইপিজেড এ জয়েন ভেঞ্চারে একটা তৈরী পোষাকের কারখানার জন্য আগ্রহী। প্রথম পর্যায়ে সুতা কিনতে চায়, আর সেই সুতায় কাপড় বোনানোর জন্য ঢাকার কাছে একটা কোম্পানীর লুম ভাড়া করেছে।

রুইকাতলা মাছের কোটি কোটি ডলারের গল্পে আমি আদার বেপারী। মার্কেটিং এর মিটিং এ প্রজেক্টর সেটাপ করে দিতে আমাকে ডাকে। আর মাঝে মাঝে প্রেজেনটেশনটা এডিট করে দেই। টিনাকে অন্ধকারে দেখেছি। ঠিক বুঝতে পারিনি।

শনিবার দিন সকালে সাইট অফিসে পৌছে টিনার সঙ্গে দেখা। মেয়েটার বয়স বেশী না। ২২/২৩ হবে। হয়তো বেশী। বিদেশীদের বয়স বোঝা মুশকিল। সেই বলে,
-হাই।
-হাই, আমি সজীব, আপনাদের ঘুরতে নিয়ে যাব। টিনা এরই মধ্যে দেশী জামা যোগাড় করেছে। আড়ং এর সবুজ কামিজ। বাংলাদেশ লেখা। নকশী কাঁথার স্টিচের মতো প্রিন্ট। মেয়েটা লম্বায় কম করে হলেও পাঁচ পাঁচ। জামাটা লম্বায় হয়তো ঠিক কিন্তু চওড়ায় ভরাট শরীরটা চেপে ধরেছে। দুপুরে গরমে ঘেমে কষ্ট হওয়ার কথা। স্প্যানিশদের চুল সামান্য কোঁকড়ানো হয়। আমার এক ভাগ্নি ক্লাস নাইনে পড়ে। তার সুন্দর লম্বা চুলগুলোকে পার্লারে গিয়ে এমন কোঁকড়ানো করে এনেছে। টিনার চোখগুলো কোবাল্ট নীল।কথা বলতে গিয়ে প্রায়ই আমার চোখ তার নীল চোখে চোখ স্থির হয়ে যায়।

দেশে এভাবে চোখ চোখ পড়লে কবিতা লেখা শুরু হয়। পথে চলতে বা কারো বাড়িতে গিয়ে কোন মেয়ের সঙ্গে কথা বললে চোখ নামিয়ে নেয়াই ভদ্রতা। আর ছোট বেলায় বাবা মায়েরাও চোখে তাকিয়ে কথা বললে ক্ষেপে বলতো "কত্ত বড় স্পর্ধা, চোখ নামায়ে কথা বল!" । বিদেশীরা উল্টো। চোখের দিকে স্থির হয়ে তাকিয়ে না থাকলে অভদ্রতা মনে করে।

সাইটে শিফটের শ্রমিকরা সব ভেতরে। কিছু উড়ন্ত পাখী ছাড়া চারদিকে আর কেউ নেই। সকালের হালকা আলোয় টিনার সঙ্গে গল্প করতে ভালই লাগছিল। চোখে চোখে তাকিয়ে মেয়েটা যতই নিরামিষ থাকুক, আমার হৃদস্পন্দন ঠিকই বাড়িয়ে দেয়। মেয়েটার হাতে সানগ্লাস। সানগ্লাসে এমন চোখজোড়া ঢেকে দেয়ার মানে হয় না। আমি তাকিয়ে দেখে ফেলেছি সেই নীল চোখটার গড়ন নির্মল সুন্দর। নীল বৃত্তাকার জমিনে ছোট কালো বিন্দু ঘিরে সাদা সুর্যের রশ্মির মতো আঁকা। শুধু চোখ না পুরো চেহারাতেই একটা টান আছে।

তা সজীব সাহেব, আপনার ছুটির দিনটা নষ্ট করে ফেললাম যে! - টীম ম্যানেজার সালভারেজ এসে দাঁড়িয়েছে। আমি প্রফেশনাল ভাবে হেসে বলি, না না, আমি বরং আপনাদের সঙ্গেই এনজয়ই করবো। টিনা ইতিমধ্যে সহজ হয়ে গেছে, সে বললো, উই উইল এনজয় টু। অফিসের পুলের একটা লেক্সাস দেয়া হয়েছে। বেশ ভালই হবে। মাইক্রোবাসের পিছনে ঝাঁকি খাওয়া লোকটা সাদা ঝকঝকে গাড়ির সামনে বসে থাকবে।

আমার ইংরেজিটা যে ভাল তা না। কাজ চলে। গলার বোতাম হারিয়ে যাওয়া শার্টের মতো, বাতাস এলে হাতে চেপে ধরে থাকি। খাজুরে গল্প করার জন্য বললাম, আপনারা স্পেনের কোন শহরে থাকেন? সেখানে ছুটি কি করে কাটান? আমি ঠিক করেছি সোনার গাঁ যাব। ড্রাইভার অতিথি শালা থেকে দুপুরের খাওয়ার জন্য কয়েকটা স্যান্ডউইচ আর কিছু নাম না জানা স্পেনিশ স্ন্যাকস তুলে নিয়েছে। নিজেকে বেশ রাজা রাজা মনে হচ্ছে। কারণ যেদিকে নিতে চাই সেদিকে যেতে বাধ্য ড্রাইভার।

সোনারগাঁয়ে যাওয়ার কারণ ওখানে অনেক বার গিয়েছি। পরিচিত লোকজন আছে। বস মোবাইলে ফোন করে জেনে নিয়েছে এরই মধ্যে। উনি বেজায় অলস প্রকৃতির লোক। অফিসে আছে শুধু গলার জোর, আর মুখ কালো করে ঝাড়ি দেয়ার ক্ষমতা। এত সকালে উঠে ফোন করার কথা না। মনে হয় উপর তালার কেউ তাকে ঘুম থেকে জাগিয়েছে। যাওয়ার পথে সাভার স্মৃতি সৌধে থামবো।


স্মৃতি সৌধে মানুষ এসেছে। শনিবার দিন ছুটির দিন লোকে বেড়াতে আসবেই। তবে বিদেশীদের কিছু দেখাতে বেশ লজ্জা লাগে। দেশের সবচেয়ে গৌরবজনক স্থানে ঢোকার মুখের গেটে ল্যাংড়া ভিক্ষুকেরা গড়া গড়ি খায়, দেয়ালে পানের দাগ, সিগারেটের প্যাকেট, কোকের মুখ, ফলের খোসা, উড়ন্ত পলিব্যাগ আর অজস্র ধুলা-ময়লা । শুধু ভাবছিলাম সেই দেয়ালটাকে ইউরিনাল করে জলবিয়োগ যাতে না দেখতে হয়। শেষটি দেখতে হয়নি।

টিনা আমার পাশেই হাঁটছিল। সালভারেজ তার বড় ক্যামেরাতে ছবি তুলতে ব্যস্ত। টিনা বললো, "I have read about your History. Its really amazing"। স্বাধীনতার পরের অনেক কষ্টকর জিনিস আছে, সেগুলো তাকে বলবো না। রাজা রানীর রূপকথার মতো স্বাধীনতার কাহিনী তাকে বললাম। বললাম ৫২র কথা। সে বললো, "I want to learn Bangla language"। তারপর বললো, "and I want to give a surprise to my boyfriend"। বয় ফ্রেন্ড শুনে মুহুর্তে একটা ধাক্কা খেলাম। কেন? আমি কেন ধরেই নিয়েছি টিনার আর কেউ নেই? সে আর আমি তো সুনীলের পাইকারী প্রেমের গল্পের মতো অভিসারে বের হইনি! বাস্তবে ফিরে এসে তাবে বললাম, Sure! তুমি তাকে বলতে পার। "আমি তোমাকে ভালবাসি" অথবা "আমি তোমাকে পছন্দ করি"। প্রথমটা গভীর প্রেম। দ্বিতীয়টা খুব ভাল বন্ধু।

টিনা পাতলা গোলাপী ঠোঁটে হেসে উঠলো। তার চামড়াটা জার্মানদের মতো টকটকে ফর্সা। হাসিটা আমাতেও সঞ্চালিত হয়। সে আমার কাছে শেখা তৃতীয় বাংলা বাক্যটা আমাকে ফেরত দেয় - "আপনাকে ধন্যবাদ"।

প্রায় সাড়ে তিনঘন্টা জাম ঠেলে সোনার গাঁতে এসেছি। গাড়ির তেলে এসিতে অফিসের পয়সার শ্রাদ্ধ। বারবার ব্রেক কষাতে ওদের পেটে ব্যথা হয়ে যাওয়ার কথা। শহর থেকে গ্রামের রাস্তায় চলে এলে, সবাই নিস্তার পাই। বেশ কিছুটা অংশ খোলা পথ। সেই সাভারের আগে আগে যেমন। সালভারেজ প্রশ্ন করেছে, "Why women walking in Black gown in such a hot weather, Is it must?" আমি দেশটাকে মৌলবাদী না বলে বোঝালাম, গ্রামে মহিলারা শাই। ইয়ংরা সব সাধারণ পোষাক পরে। কিন্তু অনেক পরিবারে কালো বোরকা পড়ার নিয়ম। কোন আইন নেই।

একটা বড় বিলের মতো। ছেলে মেয়েরা গোসল করছে। সালভারেজ সেখানে গাড়ি থামিয়ে ছবি তুলে নিল। ক্যান ক্যান কোক নিয়ে এসেছিলাম। সালভারেজ তার চুমুক দেয়া বিয়ারের কৌটাটা ফেলতে মানা করলো, বললো, "Country and Can never match"। টিনা বললো, "Shajeeb - Is this real village, Do they have electricity here?"। আমি বললাম - "No idea, may be not yet"। সে তখন বললো, "I wish to enjoy a Moonlit night in a Dark village"।

টিনার কথা কবিদের মতো। আমি ঢাকা থেকে আড়াই ঘন্টা দুরে গ্রামে যাইনা কারেন্ট নেই বলে। আর এই মেয়ের সখ সেখানে চান্নিপসর দেখবে। হাহা।

sonargaon


সোনার গাঁয়ের বাড়িগুলো টিনার দারুণ পছন্দ হয়। সালভারেজের খুটিনাটি ইতিহাস জানার আগ্রহ। সারি সারি ভাঙা লাল দালান। খুব যত্ন করে রাখা নেই। ও জানতে চায়- "Who lived in this house? monks?" সব বাড়িই তো এক লাগে। কে কোনটাকে বাস করেছে আমি জানবো কী করে?

কিছু দালানে শাড়ি শুকাতে দিয়ে উদ্বাস্তু শুয়ে আছে, চুনার অক্ষরে নানান স্লোগান লেখা। সামনের লোহার বাউন্ডারী খুলে নিয়ে গেছে অর্ধেকটা কেউ। পানাম সিটিতে একটা বাড়ির ভেতর ঢুকি আমরা। সালভারেজ মনে হয় ছবি তোলার উপাদান পাওয়াতে খুশী। তার মাথাটা নষ্টই বলা দরকার। সে ট্রাইপড, ফিল্টার সহ বিশাল এক ব্যাগ খুলে দাঁড়িয়েছে। অন্যদিকে টিনার হাতে কোন ক্যামেরা নেই।

আমার সঙ্গে একটা পুরনো ৩ মেগাপিক্সেলের ক্যামেরা ছিল। বললাম, টিনা, Do you want to take some picture here। টিনা অন্যমনষ্ক হয়ে ইঁটের কারুকাজ দেখছে। তারপর বললো,
-No thanks. I will carry my memories. I don't like capturing lights।

বাড়ির ভেতরে উপর থেকে আলো পড়েছে। সিঁড়ির ওখানে দাঁড়িয়ে তার খুব কাছে যাই। একটা ইঁটে সে বসে পড়ে আর বলে,
-Shajeeb, Touch has no alternatives. We can take highest Quality pictures, even buy wonderful posters from stores. Can we feel Bricks like this there?"

সে ইঁটের ওপর তার পাতলা বেল্টে বাঁধা ঘড়ির সহ হাত ছূঁয়ে দেয়। আর বলে, I was brought up in an Orphanage near Murcia in Spain. সে বলতে থাকে That was made of red bricks. I also live in a Brick house. You know what, Bricks are not the same.আমি না বুঝে মাথা নাড়লে সে ব্যাখ্যা করে, Every brick tells different stories. I imagine people living here many years back - walking, eating, crying, shouting and talking like us"। তার পর বলে, "Photographs are so blind! They can hardly record reflected dead colors"

আমি তখন তার শ্রোতা। সে খুব মিহি গলায় কথা বলে যেন এতটুকু তাড়া নেই। তার চোখের সেই নীল আলোর বাইরে একটা বিষাদের মন আবিষ্কার করি।

আমি তার কথায় সায় দেই। ইটের ভেতর কত জীবনের কাহিনী বন্দী হয়ে থাকে। যেমন সেদিন দু'জন ছাড়া এই ঘরে আর কেউ ছিলাম না। দু'জন সিঁড়ি দিয়ে উপরে উঠতে থাকি। সাবধানে উঠতে হবে। মস ফার্ণ ছেয়ে আছে। সে খালি পায়ে হাঁটে। পায়ে সবুজ ময়লা। সে ইচ্ছে করেই একটু মাটি পায়ে মেখে নিতে চায়। তার নামতে সাহায্য দরকার। হাত বাড়িয়ে নামতে সাহায্য করি। কিছুক্ষণের জন্য একটি বিদেশী মেয়ের হাত আমার হাতে বন্দী হয়।

আমরা বোধহয় কাদার মতো নমনীয় জাতি। এখানে গলির মোড়ে রিক্সায় মেয়ে চলতে দেখলে প্রেম জন্ম নেয়, মার্কেটে চোখে চোখ পড়লে, খাবার দোকানের উল্টো টেবিলে অথবা ট্রেনে বাসে কাউকে দেখলে দু মিনিটে ভাব উড়ে আসে। সেই রেশ বহুদিন বয়ে বেড়াই। ঘুরে ফিরে দেখি। ভুলে যাই। এভাবে ক্রমাগত প্রেমের স্মৃতি গড়ে যাওয়া ভাল না মন্দ আমার জানা নেই।

সালভারেজ বেশ উল্লসিত। দারুণ কিছু ছবি তুলেছে সে। রোদ কমলা থেকে লালচে হয়ে যাচ্ছিল। আমি আর টিনা বাড়ির সামনে সিঁড়িতে পাশা পাশি বসে তার জন্য অপেক্ষা করছিলাম। সন্ধার আগেই রওয়ানা দিতে হবে।

তারপর সাদা গাড়িটা আমাকে এলিফেন্ট রোডে নামিয়ে দেয় আর আমি ক্লান্ত দেহে বাড়ি ফিরে ঘুমিয়ে পড়ি। কোথাও একটা নীল চোখ আমার চারদিকে প্রজাপতির মতো ডানা মেলে উড়ছিল। পরদিন ওরা চলে গেলে কাজে ব্যস্ত হই। তারপর শত শত স্মৃতির ভিড়ে ভুলে যাই সেসব।


মাস খানেক পর, সালভারেজ আমাকে একটা ধন্যবাদসূচক ইমেইল পাঠায়। সঙ্গে এটাচ করা কয়েকটা ছবি। একটিতে টিনা আর আমি বসে আছি সেই লাল বাড়ির সিঁড়িতে। দূরত্বটা অল্প । ভাল ক্যামেরা বলে টিনাকে খুব জীবন্ত দেখাচ্ছে। তার নীল চোখের মায়াটা বোঝা যাচ্ছে। তার হাত ছুঁয়ে আছে সোনারগাঁয়ের স্মৃতিময় ইটগুলোকে।

----
ড্রাফট ১.০
সেপ্টেম্বর ৮, ২০১০

পোস্টটি ১০ জন ব্লগার পছন্দ করেছেন

মুক্ত বয়ান's picture


এইটা কি আসল? নাকি গল্প?
পুরা মাথা ঘুইরা গেল। দুর্দান্ত বস.. দুর্দান্ত। Smile

স্বদেশ হাসনাইন's picture


এটা নিছক গল্প। অনেক ধন্যবাদ মুক্ত বয়ান

শওকত মাসুম's picture


দারুণ তো।

স্বদেশ হাসনাইন's picture


শওকত মাসুম , কৃতজ্ঞতা পড়ার জন্য

টুটুল's picture


দুর্দান্ত একটা গল্প দিয়ে শুরু

স্বাগতম আমরা বন্ধুতে
আশা করছি নিয়মিত আপনার লেখা পড়তে পারবো

স্বদেশ হাসনাইন's picture


ধন্যবাদ টুটুল

সাঈদ's picture


স্বাগতম।

দূর্দান্ত লেখা

স্বদেশ হাসনাইন's picture


অনেক ধন্যবাদ

আবদুর রাজ্জাক শিপন's picture


 

চমৎকার গল্প যথারীতি ।

 একটা ভুল চোখে পড়লো, প্রথমে টিনাকে নাম বলা হয়েছে 'সজীব' পরে ইংরেজীতে দু'বার লেখা হয়েছে, রাজীব ।

 

স্বাগতম, আমরাবন্ধুতে ।

১০

স্বদেশ হাসনাইন's picture


ধন্যবাদ অনেক।

মনযোগী পাঠের জন্য আবারও ধন্যবাদ। প্রথমে টিনার ডায়লগগুলো বাংলাতে ছিল, ইংরেজি করার সময় ভুল হয়েছে মনে হচ্ছে। ঠিক করে দিলাম।

১১

স্বদেশ হাসনাইন's picture


শুভেচ্ছা

১২

বাতিঘর's picture


আপনি এলেন, লেখলেন এবং পাঠকের হৃদয় জয় করলেন! অভিবাদন আপনাকে Big Hug Applause এরকম শব্দে শব্দে বিস্ময়ের জাগরণ আরো দেখতে চাই। বন্ধুতে সুস্বাগতম Party

(এবার সবিনয়ে ছোট্ট কিছু টাইপোর কথা বলি, " চিমনির গলা বেড়ে....।" ওখানে কী 'বেয়ে' হতো?( বলে নেয়া দরকার 'বেড়ে' শব্দের সঠিক মানে আমি জানি গো ভাইডি Sad তাই ভুল বলে থাকলে ক্ষমা চেয়ে নিলাম) 'সিএনএন' 'সূচক' 'দূরত্ব' 'লোকজন( য ফলা পড়ে গেছে ভুলে) ক্ষমা সুন্দর চোখে দেখবেন প্লিজ..ভুল ধরবার জন্যই ভুল ধরা না.. এটি করি নিজের দুবর্লতাগুলো শুধরে নিতেই। আশা করি সহযোগিতা পাবো।)

পাঠকের মন উড়ালপঙ্খী করে দেবার অসাধারণ ক্ষমতায় মুগ্ধ হতে চাই নিরন্তর। ভালো থাকা হোক। ঈদের শুভেচ্ছা জানবেন। Smile

১৩

স্বদেশ হাসনাইন's picture


ভুলগুলো শুদ্ধ করে দিলাম। বানান নিয়ে একেবারে অসতর্ক থাকি, একটু বিশুদ্ধবাদী চোখে পড়লে লজ্জায়ই পড়তে হবে। মাথায় কিছু থাকলে এত দ্রুত টাইপ করে প্রকাশ করতে থাকি যে ভুলে একাকার থাকে।

বিনা দ্বিধায় সমালোচনা করুন। যে বোক বিষয়ে। শিক্ষানবীশ হিসেবে ভুলগুলো জানাটাই সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি।

১৪

স্বদেশ হাসনাইন's picture


কমেন্ট মোছার বা এডিট করার উপায় জানিনা।

কমেন্টেও ভুল - যে কোন বিষয়ে হবে।

১৫

বাতিঘর's picture


ব্যাপক ধন্যবাদ ভাইটি Smile ঈদ কেমন করলেন গো ভাইটি?

১৬

তানবীরা's picture


খুব মিষ্টি গল্প।

মন্তব্য করুন

(আপনার প্রদান কৃত তথ্য কখনোই প্রকাশ করা হবেনা অথবা অন্য কোন মাধ্যমে শেয়ার করা হবেনা।)
ইমোটিকন
:):D:bigsmile:;):p:O:|:(:~:((8):steve:J):glasses::party::love:
  • Web page addresses and e-mail addresses turn into links automatically.
  • Allowed HTML tags: <a> <em> <strong> <cite> <code> <ul> <ol> <li> <dl> <dt> <dd> <img> <b> <u> <i> <br /> <p> <blockquote>
  • Lines and paragraphs break automatically.
  • Textual smileys will be replaced with graphical ones.

পোস্ট সাজাতে বাড়তি সুবিধাদি - ফর্মেটিং অপশন।

CAPTCHA
This question is for testing whether you are a human visitor and to prevent automated spam submissions.

বন্ধুর কথা

স্বদেশ হাসনাইন's picture

নিজের সম্পর্কে

আমি হাসনাইন । ছোট একটা ফার্মে কাজ করছি । সৌখিন লেখক । ক্রিকেট খেলতে পছন্দ করি । পকেটে পয়সা থাকলে এদিক ঘুরে খরচ করে ফেলি । সুনীলের লেখার ভক্ত, শামসুর রাহমানের কবিতা পড়ি। বিদেশী লেখকের মধ্যে ড্যানিয়েল স্টীলের লেখা ভাল লাগে । সবচেয়ে ঘৃণা করি স্বাধীনতার বিরোধী শক্তিকে । একাত্তর আমার সবচেয়ে বড় অহংকার।