ইউজার লগইন

ভাষা আন্দোলনের স্বজাতীয় ভিলেন

স্বাগত প্রশ্ন
ভাষা আন্দোলনের নিচের ইতিহাস উইকিপিডিয়া অবলম্বনে পুনর্লিখিত হলো। পাঠকের কাছে এ লেখাটি পাঠ শেষে সবিনয়ে জানতে চাইবো : ভাষা আন্দোলনে আমাদের স্বদেশীয় এবং স্বজাতীয় ভিলেন কারা? কেন তাঁরা এরূপ ভিলেন হয়েছিলেন?

রাষ্ট্রভাষা দাবি উত্থানের প্রেক্ষাপট
বাংলাকে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষার মর্যাদা দেয়ার প্রশ্নটি উত্থাপিত হয়
১৯৪৭ সালের ভারত বিভাগের আগে থেকেই। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পূর্বেই আলিগড়
বিশ্ববিদ্যালয়ের ড. জিয়াউদ্দিন উর্দুকে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা করার
প্রস্তাব করেন, তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ পাল্টা
বাংলা ভাষার প্রস্তাব দেন। বাংলাকে পূর্ব পাকিস্তানের প্রাদেশিক ভাষার
প্রথম আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব আসে 'গণ আজাদী লীগ' (পরবর্তীতে সিভিল লিবার্টি
লীগ)-এর পক্ষ থেকে ১৯৪৭ সালের জুলাই মাসে। তারা তাদের দাবির পক্ষে জোর
প্রচারণা চালাতে থাকে। তৎকালীন সময়ে সংবাদপত্রগুলো পাকিস্তানে বাংলা
ভাষার সম্ভাবনা নিয়ে বুদ্ধিজীবীদের কলাম এবং নিবন্ধ প্রকাশ করতে থাকে।
তন্মধ্যে ২২শে জুন দৈনিক ইত্তিহাদে প্রকাশিত আবদুল হকের কলাম ছিল প্রথম।
২৯ শে জুলাই মুহম্মদ শহীদুল্লাহর নিবন্ধটি ছিল বিরাজমান প্রেক্ষাপটে
অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। তবে এই সকল নিবন্ধের অধিকাংশের বিষয়বস্তু ছিল
বাংলাকে পূর্ব পাকিস্তানের প্রাদেশিক ভাষার মর্যাদা দেয়া প্রসঙ্গে। ১৯৪৭
সালের ৬ সেপ্টেম্বর ও ৭ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত 'পূর্ব পাকিস্তান গণতান্ত্রিক
যুব লীগ'-এর একটি সভায় একই দাবি উত্থাপিত হয়। ভারত বিভাগকালে অবিভক্ত
বাংলার প্রধানমন্ত্রী ছিলেন হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী। তিনি প্রধানমন্ত্রী
থাকাকালে তাঁর নিজ হাতে গড়া দৈনিক ইত্তেহাদ পত্রিকা প্রকাশ করেন। ১৯৪৬
সালে কলকাতায় প্রতিষ্ঠিত এই পত্রিকা অল্প কয়েকদিনেই মানুষের মন জয় করে।
এ পত্রিকার সম্পাদক ছিলেন সাহিত্যিক ও সাংবাদিক আবুল মনসুর আহমদ; এবং
সোহরাওয়ার্দীর ভাবশিষ্য তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া ১৯৪৮ সাল পর্যন্ত এ
পত্রিকার পরিচালনা বোর্ডের সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। প্রবন্ধকার
আব্দুল হকের ‘বাংলা বিষয়ক প্রস্তাব’, ‘উর্দু রাষ্ট্রভাষা হলে’, মাহাবুব
জামালের ‘রাষ্ট্রভাষা বিষয়ক প্রস্তাব’সহ বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ
প্রবন্ধ এ পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। এছাড়া পূর্ব বাংলার প্রথম পর্বের ভাষা
আন্দোলনের অনেক খবর গুরুত্ব সহকারে প্রকাশ হতো নিয়মিতভাবে। যার কারণে
বিভিন্ন সময়ে দৈনিক ইত্তেহাদ পূর্ব বাংলায় আসতে বাধাগ্রস্ত হয়। ১৯৫০
সালে বন্ধ হয়ে যায় পত্রিকাটি। বাংলাকে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা করার
লক্ষ্যে নতুন সংগঠন তমুদ্দন মজলিশ একটি বই প্রকাশ করে যার নাম
'পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা বাংলা, নাকি উর্দু?' বইটিতে তিন জনের লেখা ছিল,
তাঁরা হলেনঃ অধ্যক্ষ আবুল কাশেম, আবুল মনসুর আহমদ, এবং কাজী মোতাহার
হোসেন। তাঁরা এই বইয়ে বাংলা ও উর্দু উভয়কেই রাষ্ট্রভাষার মর্যাদা দেয়ার
সুপারিশ করেন। তাঁরা ফজলুল হক মুসলিম হলে ১২ই নভেম্বর একটি সভা করেন। এই
সভার আগে পূর্ব বঙ্গ সাহিত্য সমাজ ৫ই নভেম্বর এই সংক্রান্ত একটি সভা
করেছিল।

সেপ্টেম্বর ১৯৪৭-এ তমদ্দুন মজলিশ 'পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা কি হবে? বাংলা,
নাকি উর্দু?' নামে একটি পুস্তিকা প্রকাশ করে যেখানে সর্বপ্রথম বাংলাকে
পাকিস্তানের একটি রাষ্ট্রভাষা হিসাবে ঘোষণা করার দাবি করা হয় । উল্লেখ্য
সেই সময়ে সরকারি কাজকর্ম ছাড়াও সকল ডাকটিকেট, পোষ্টকার্ড, ট্রেন টিকেটে
কেবলমাত্র উর্দু এবং ইংরেজিতে লেখা থাকতো। পশ্চিম পাকিস্তানী শাসকগোষ্ঠী
বাংলা সংস্কৃতিকে হিন্দুয়ানী সংস্কৃতি এবং বাংলা ভাষাকে হিন্দুয়ানী ভাষা
হিসাবে অভিহিত করে এবং তারা পূর্ব-পাকিস্তানের সংস্কৃতিকে 'পাকিস্তানাইজ',
যেটি উর্দু এবং তাদের ভাষায় ইসলামিক, করার চেষ্টা চালাতে থাকে। তমদ্দুন
মজলিশের তৎকালীন সাধারণ সম্পাদক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞানের
অধ্যাপক আবুল কাশেম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফজলুল হক হলে পাকিস্তানের
রাষ্ট্রভাষা কী হওয়া উচিত সে ব্যাপারে একটি সভা আহবান করেন । সেই সভায়
বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার ব্যাপারে পাকিস্তান সরকারের কাছে নিয়মতান্ত্রিক
পন্থায় আন্দোলন করার ব্যাপারে সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। বাংলাদেশের অন্য সকল
আন্দোলনের মত ভাষা আন্দোলনের সূতিকাগারও তাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

নভেম্বর ১৯৪৭-এ পাকিস্তানের তৎকালীন শিক্ষামন্ত্রী ফজলুর রহমানের উদ্যোগে
পশ্চিম পাকিস্তানে আয়োজিত 'পাকিস্তান এডুকেশনাল কনফারেন্সে' পূর্ব
পাকিস্তান হতে আগত প্রতিনিধিরা উর্দুকে একমাত্র রাষ্ট্রীয় ভাষা হিসাবে
প্রতিষ্ঠার বিরোধিতা করেন এবং বাংলাকেও সম-অধিকার প্রদানের দাবি জানান। ৭
নভেম্বর ১৯৪৭-এ পূর্ব পাকিস্তান সাহিত্য সংসদের সভায় বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা
করার দাবি উত্থাপিত। ১৭ নভেম্বর ১৯৪৭-এ পূর্ব পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা
হিসাবে বাংলাকে ঘোষণা দেওয়ার জন্য শত শত নাগরিকের স্বাক্ষর সম্বলিত
স্মারকপত্র প্রধানমন্ত্রী খাজা নাজিমউদ্দিনের কাছে পেশ করা হয়।

কিন্তু বিদ্যমান অবস্থার নাটকীয় পরিবর্তন ঘটে ডিসেম্বর মাসে যখন ৫ই
ডিসেম্বর করাচীতে অনুষ্ঠিত শিক্ষা সম্মেলনে এই সংক্রান্ত একটি প্রস্তাব
গৃহীত হয়। প্রস্তাবে উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা ও মাধ্যম হিসেবে বিভিন্ন
প্রদেশে ব্যবহার এবং প্রাথমিক স্তরের আবশ্যিক বিষয় হিসেবে ব্যবহার করার
সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। তাত্ক্ষণিক প্রতিবাদে ৬ই ডিসেম্বর ঢাকা
বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গনে বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ছাত্ররা এসে জড়ো
হয়। সেখানে অনুষ্ঠিত সভায় বাংলা ভাষাকে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা
এবং পূর্ব পাকিস্তানের শিক্ষার মাধ্যম ও দাপ্তরিক ভাষা হিসাবে নির্ধারণ
করার দাবি জানানো হয়। ভাষার জন্য বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গনে অনুষ্ঠিত
প্রথম সভা ছিল সেটি। ডিসেম্বরের শেষের দিকে ছাত্ররা তাদের দাবি আদায়ের
লক্ষ্যে প্রথম রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ গঠন করে।

আন্দোলনের সূচনা
পশ্চিম পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সরকার বাংলাকে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষার
মর্যাদা দেয়ার ব্যাপারে ছিল সম্পূর্ণ উদাসীন। শিক্ষা সম্মেলনে গৃহীত
প্রস্তাব অনুযায়ী পাকিস্তান পাবলিক সার্ভিস কমিশন বাংলা ভাষাকে তাদের
বিষয় তালিকা হতে বাদ দেয়। স্টাম্প ও মুদ্রায় বাংলা ভাষার ব্যবহার বন্ধ
করে দেয়া হয়, যেখানে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক আমলেও এর প্রচলন ছিল। উদ্ভূত
পরিস্থিতিতে তমুদ্দন মজলিস পূর্ব বঙ্গের গণ-পরিষদের মন্ত্রী হাবিবুল্লাহ
বাহার এবং নুরুল আমিনকে নিয়ে বৈঠক করে, যেন তাঁরা সাধারণ পরিষদকে এই
ব্যাপারে অবহিত করেন। এছাড়াও তারা একই উদ্দেশ্যে পূর্ব বঙ্গের মূখ্য
মন্ত্রী খাজা নাজিমুদ্দিনের সাথে দেখা করেন। কিন্তু এই ব্যাপারে সোচ্চার
হন পূর্ব বঙ্গের সদস্য ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত।

গণপরিষদে ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের রাষ্ট্রভাষার দাবি
২৫ ফেব্রুয়ারী ১৯৪৮ কুমিল্লা থেকে নির্বাচিত বাঙালি গণপরিষদ সদস্য
ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত পার্লামেন্টে প্রথমবারের মত বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা হিসাবে
গ্রহণ করার জন্য একটি বিল আনেন। তাঁর বক্তৃতায় বাংলাকে অধিকাংশ জাতি
গোষ্ঠীর ভাষা হিসেবে উল্লেখ করে ধীরেন্দ্রনাথ বাংলাকে রাষ্ট্রভাষার
মর্যাদা দেয়ার দাবি করেন। এছাড়াও সরকারি কাগজে বাংলা ভাষা ব্যবহার না
করার সিদ্ধান্তের প্রতিবাদ জানান। মজলুম জননেতা আব্দুল হামিদ খান ভাসানী
সহ, বাঙালি পার্লামেন্ট সদস্যদের একাংশ এর পক্ষে সমর্থন দিলেও মুসলিম লীগ
সমর্থিত এমপিরা এর বিপক্ষে অবস্থান নেন। পূর্ব পাকিস্তান থেকে নির্বাচিত
সদস্য খাজা নাজিমুদ্দিন ছিলেন এই বিরোধিতার শীর্ষে এবং খাজা নাজিমুদ্দিন
এই প্রস্তাবের বিরোধিতা করে বক্তৃতা দেন। তার সক্রিয় সমর্থনে এই বিলটিকে
হিন্দুয়ানী সংস্কৃতিকে পাকিস্তানের সংস্কৃতিতে অনুপ্রবেশের চেষ্টা
আখ্যায়িত করে প্রধান মন্ত্রী লিয়াকত আলি খান এর তীব্র বিরোধিতা করেন এবং
প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আলী খান একে পাকিস্তানে বিভেদ সৃষ্টির চেষ্টা বলে
উল্লেখ করেন। উর্দুকে লক্ষ কোটি মুসলমানের ভাষা উল্লেখ করে তিনি বলেন
পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা কেবল মাত্র উর্দুই হতে পারে। অনেক বিতর্কের পর
সংশোধনীটি ভোটে বাতিল গণ্য হয়। সংসদীয় দলের আপত্তির কারণে অনেক বাঙালি
মুসলমান সদস্য ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত উত্থাপিত সংশোধনীটিকে সমর্থন করতে পারেন
নি। ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত দমে না যেয়ে তিনবার বিভিন্ন সংশোধনী সহ বিলটি
পুনরায় উত্থাপন করেন কিন্তু প্রতিবারই তা একই ভাগ্যবরণ করে।

প্রথম প্রতিক্রিয়া
গণপরিষদের ঘটনার প্রথম প্রতিক্রিয়া শুরু হয় ঢাকায়। ২৬ ফেব্রুয়ারি ঢাকা
বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা মেডিকেল কলেজ ও জগন্নাথ কলেজের উদ্যোগে শহরের
অধিকাংশ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ছাত্ররা ক্লাস বর্জন করে। তমুদ্দন মজলিস এই
সময়ে বিশেষ ভূমিকা পালন করে।

৪-৭ মার্চ ১৯৪৮ : বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা হিসাবে প্রতিষ্ঠাকে সামনে রেখে
তৎকালীন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র রাজনীতির শীর্ষমুখদের সমন্বয়ে গঠিত
হয় ষ্টুডেন্টস এ্যাকশন কমিটি। এই ষ্টুডেন্টস এ্যাকশন কমিটি ঢাকা
বিশ্ববিদ্যালয়কে কেন্দ্র করে বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা হিসাবে প্রতিষ্ঠার
আন্দোলনের রূপরেখা প্রণয়ন করে। ষ্টুডেন্টস এ্যাকশন কমিটির উদ্যোগে ১১
মার্চ ১৯৪৮ বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা ঘোষণার দাবিতে ধর্মঘটের ডাক দেওয়া হয়।

১১ই মার্চের কর্মসূচী নির্ধারণের জন্য ১০ মার্চ ফজলুল হক হলে এক সভা
অনুষ্ঠিত হয়। ১১ই মার্চ ভোরে পূর্ব পরিকল্পনা অনুযায়ী ঢাকা
বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন হল থেকে ছাত্ররা বের হয়ে আসে। ঢাকা
বিশ্ববিদ্যালয় সহ অন্যান্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পূর্ণ ধর্মঘট পালিত হয়।
সকালে ছাত্রদের একটি দল রমনা পোস্ট অফিসে গেলে তাদের গ্রেফতার করা হয়।
ছাত্রদের আরও একটি দল রাজনৈতিক নেতাদের সাথে সচিবালয়ের সামনে নবাব আবদুল
গণি রোডে পিকেটিং-এ অংশ নেয়। তারা গণপরিষদ ভবন (ভেঙ্গে পড়া জগন্নাথ হলের
মিলনায়তন), প্রধানমন্ত্রীর বাসভবন বর্ধমান হাউস (বর্তমান বাংলা একাডেমি),
হাইকোর্ট ও সচিবালয়ের সামনে দাঁড়িয়ে অফিস বর্জনের জন্যে সবাইকে চাপ
দিতে থাকে, ফলে বিভিন্ন স্থানে তাদের পুলিশের লাঠিচার্জের সম্মুখীন হতে
হয়। এক পর্যায়ে বিক্ষোভকারীরা খাদ্যমন্ত্রী সৈয়দ মোহাম্মদ আফজল ও
শিক্ষামন্ত্রী আবদুল হামিদকে পদত্যাগ পত্রে স্বাক্ষর করতে বাধ্য করে। এই
বিক্ষোভ দমনের জন্য সেনাবাহিনী তলব করা হয়। পূর্ব পাকিস্তানের জিওসি
ব্রিগেডিয়ার আইয়ুব খান (পরে পাকিস্তানের রাষ্ট্রপতি) মেজর পীরজাদার
অধীনে একদল পদাতিক সৈন্য নিয়োগ করেন এবং স্বয়ং গণপরিষদে গিয়ে খাজা
নাজিমুদ্দিনকে বাবুর্চিখানার মধ্য দিয়ে বের করে আনেন। বিকেলে এর
প্রতিবাদে সভা অনুষ্ঠিত হলে পুলিশ সভা ভেঙ্গে দেয় এবং কয়েকজনকে গ্রেফতার
করে। গ্রেফতারকৃতদের মাঝে অন্যতম ছিলেন শামসুল হক, শেখ মুজিবুর রহমান, অলি
আহাদ, শওকত আলি, কাজী গোলাম মাহবুব, রওশন আলম, রফিকুল আলম, শাহ্ মোঃ
নাসিরুদ্দীন, নুরুল ইসলাম প্রমুখ। ঐ সভায় সভাপতিত্ব করেন নঈমুদ্দিন আহমদ।

খাজা নাজিমুদ্দিনের সাথে চুক্তি
১৫ মার্চ ছাত্ররা বের হয়ে এসে আবার পিকেটিং শুরু করলে সচিবালয়ের
কর্মচারি এবং রেলওয়ে ক্লার্করা তাদের সমর্থন করে। এদিকে পাকিস্তানের
প্রতিষ্ঠাতা (কায়েদে আজম) মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ্‌-র সফরের দিন এগিয়ে
আসার কারণে ও মুসলীম লীগের অভ্যন্তরীণ কোন্দলের কারণে বিপর্যস্ত খাজা
নাজিমুদ্দিন আন্দোলনকারীদের সাথে আলোচনার আহবান জানান। তিনি কমরুদ্দিন
আহমেদের কাছে দুই জন প্রতিনিধি পাঠান চুক্তির লক্ষ্যে। কমরুদ্দিন দ্রুত
বিশ্ববিদ্যালয়ে গিয়ে অন্যান্য নেতাদের সাথে কথা বলেন। এরপর তিনি
নাজিমুদ্দিনের কাছে গিয়ে চুক্তি সম্পাদনের পূর্বে কারাগারে আটক নেতাদের
(শামসুল হক, শেখ মুজিবুর রহমান, অলি আহাদ প্রমুখ) সাথে কথা বলতে চান। এরপর
তাঁদের সম্মতিতে চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। এদিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেক
ছাত্র এই ব্যাপারে না জানায় তারা তাদের কর্মসূচি অব্যাহত রাখেন। যখন
ছাত্ররা এই ব্যাপারে জানতে পারেন, তখন তাঁরা এটাকে ষড়যন্ত্র মনে করে
চুক্তির ব্যাপারে খাজা নাজিমুদ্দিনের কাছে সুস্পষ্ট বক্তব্যের দাবি করেন।
কিন্তু খাজা নাজিমুদ্দিন এই ব্যাপারে মুখ খোলেন নি। পরবর্তীতে জিন্নাহ এই
অঙ্গীকারনামা বাতিল করেন এবং উর্দুকে (যা ছিল ৫% মানুষের মাতৃভাষা)
পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা করার ঘোষণা দেন। উপেক্ষিত হয়
পাকিস্তানের প্রায় ৫০% মানুষের মাতৃভাষা বাংলা।

মুহম্মদ আলী জিন্নাহ্‌র ঢাকা সফর
১৯শে মার্চ, ১৯৪৮-এ ঢাকায় এসে পৌছান মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ। ২১শে মার্চ
রেসকোর্স ময়দানে (বর্তমান সোহ্‌রাওয়ার্দী উদ্যান) এক গণ-সংবর্ধনা
অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয় যেখানে তিনি একটি ভাষণ প্রদান করেন। তাঁর ভাষণে
তিনি ভাষা আন্দোলনকে মুসলমানদের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টির ষড়যন্ত্র হিসেবে
উল্লেখ করেন। যদিও তিনি বলেন পূর্ববঙ্গের প্রাদেশিক ভাষা নির্ধারিত হবে
প্রদেশের অধিবাসীদের ভাষা অনুযায়ী, কিন্তু দ্ব্যর্থহীন চিত্তে ঘোষণা
করেন, উর্দুই হবে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা, অন্য কোন ভাষা নয়।
তিনি সতর্ক করে দিয়ে বলেন, জনগণের মধ্যে যারা ষড়যন্ত্রকারী রয়েছে,
তাদের কখনোই ক্ষমা করা হবে না। জিন্নাহ্‌-র এই মন্তব্যে তাৎক্ষণিকভাবে
বিক্ষোভ প্রদর্শন করে উপস্থিত ছাত্রসহ জনতার একাংশ। উর্দুই হবে
পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা- এই বিরূপ উক্তিতে আন্দোলনকারীরা ক্ষুব্ধ
হয়ে ওঠে। ২৪শে মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্জন হলে অনুষ্ঠিত সমাবর্তন
অনুষ্ঠানে মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ ‘ষ্টুডেন্টস রোল ইন নেশন বিল্ডিং’
শিরোণামে একটি ভাষণ প্রদান করেন। সেখানে তিনি ক্যাটেগরিক্যালী বাংলা
ভাষাকে রাষ্ট্রভাষা হিসাবে প্রতিস্ঠার দাবীকে নাকচ করে দিয়ে বলেন
‘পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হবে একটি এবং সেটি উর্দু, একমাত্র উর্দুই
পাকিস্তানের মুসলিম পরিচয়কে তুলে ধরে।‘ তার মুল বক্তৃতা থেকে :

‘The State language therefore, must obviously be Urdu, a language that
has been nurtured by a hundred million Muslims of this sub-continent, a
language understood throughout the length and breadth of Pakistan and
above all a language which, more than any other provincial language,
embodies the best that is in Islamic culture and Muslim tradition and
is nearest to the language used in other Islamic countries.’

যখন তিনি উর্দুর ব্যাপারে তার অবস্থানের পুনরুল্লেখ করেন উপস্থিত ছাত্ররা
সমস্বরে 'না, না' বলে চিৎকার করতে থাকেন। জিন্নাহর এই বাংলা বিরোধী স্পষ্ট
অবস্থানের ফলে পূর্ব পাকিস্তানে ভাষা আন্দোলন আরো বেশী গ্রহণযোগ্যতা লাভ
করে এবং আন্দোলন ঢাকার বাইরেও ছড়িয়ে পড়ে। একই দিনে রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম
পরিষদের একটি প্রতিনিধিদল জিন্নাহর সাথে সাক্ষাৎ করেন এবং বাংলাকে
রাষ্ট্রভাষা করার দবি জানিয়ে একটি স্মারক লিপি দেন। এই প্রতিনিধি দলে
ছিলেন শামসুল হক, কামরুদ্দিন আহমদ, আবুল কাশেম, তাজউদ্দিন আহমদে, মোহাম্মদ
তোয়াহা, আজিজ আহমদ, অলি আহাদ, নঈমুদ্দিন আহমদ, শামসুল আলম এবং নজরুল
ইসলাম। কিন্তু জিন্নাহ্ খাজা নাজিমুদ্দিনের স্বাক্ষরিত চুক্তিকে একপেশে
এবং চাপের মুখে সম্পাদিত বলে প্রত্যাখান করেন। অনেক তর্ক-বিতর্ক ও
অনিশ্চয়তার মধ্য দিয়ে সভাটি অনুষ্ঠিত হয়। ছাত্ররা বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা
করার জন্য জিন্নাহ্‌-র নিকট স্মারকলিপি পেশ করেন। ২৬ মার্চ ১৯৪৮ জিন্নাহ
ছাত্র নেতৃবৃন্দের সাথে রাষ্ট্রভাষা বিষয়ে বৈঠক করেন এবং বৈঠকে তিনি
উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা করার ব্যাপারে তার অনড় অবস্থানের কথা জানিয়ে দেন।
সেই সাথে ১৫ই মার্চ ষ্টুডেন্টস একশন কমিটির সাথে খাজা নাজিমুদ্দিনের
বাংলাকে পূর্ব-পাকিস্তানের প্রাদেশিক ভাষা হিসাবে স্বীকৃতির অঙ্গীকারনামা
বাতিল ঘোষণা করেন। ২৮শে মার্চ জিন্নাহ্‌ ঢাকা ত্যাগ করেন এবং সেদিন
সন্ধ্যায় রেডিওতে তার দেয়া বক্তব্যে তাঁর অবস্থানের কথা পুনর্ব্যক্ত
করেন। জিন্নাহ্‌-র ঢাকা ত্যাগের পর, ছাত্রলীগ এবং তমুদ্দন মজলিসের এক সভা
অনুষ্ঠিত হয়, যেখানে তমুদ্দন মজলিসের আহবায়ক শামসুল আলম তাঁর দায়িত্ব
মোহাম্মদ তোয়াহার কাছে হস্তান্তর করেন। পরবর্তীতে তমুদ্দন মজলিস আন্দোলন
ব্যর্থ হওয়ার জন্য কমিউনিস্টদের দায়ী করে একটি বিবৃতি প্রদান করে এবং
পরে তাঁরা আস্তে আস্তে আন্দোলনের পথ থেকে সরে আসেন।

জিন্নাহ্‌র ঢাকা-সফর পরবর্তী ঘটনাক্রম
৬ এপ্রিল ১৯৪৮ : জিন্নাহর ঢাকা ত্যাগের পর রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের
নেতৃত্বে বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্রভাষা করার আন্দোলন আরো বেগবান হয়ে ওঠে।
উপায়ন্তর না দেখে খাজা নাজিমুদ্দিন East Bengal Legislative Assembly
(EBLA) তে বাংলাকে পূর্ব পাকিস্তানের সরকারী ভাষা এবং ডাক টিকেট, ট্রেন
টিকেট, স্কুল সহ সর্বত্র উর্দুর পাশাপাশি বাংলা ব্যবহারের কথা উল্লেখ করে
একটি প্রস্তাব আনেন। যদিও এই প্রস্তাবের মুল উদ্দেশ্য ছিল বাংলাকে
রাষ্ট্রভাষা হিসাবে ঘোষণা করার আন্দোলনকে বিভ্রান্ত করা তথাপি এই
প্রস্তাবের ব্যাপারে তৎকালীন নেতৃবৃন্দ ইতিবাচক মনোভাব দেখান। ভাষা
আন্দোলনের অন্যতম প্রাণপুরুষ ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত এই প্রস্তাবে কিছু সংশোধন
প্রস্তাব করে বাংলাকে one of the ‘State languages of Pakistan’ করার জন্য
একটি সংশোধনী প্রস্তাব করেন। কিন্তু ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের সংশোধনী বাতিল
করে খাজা নাজিমুদ্দিনের মুল প্রস্তাবটি প্রাদেশিক গণপরিষদে গৃহীত হয়।

১১ সেপ্টেম্বর ১৯৪৮-এ মুহাম্মদ আলী জিন্নাহর মৃত্যু হয় এবং খাজা
নাজিমুদ্দিন পাকিস্তানের গভর্ণর জেনারেল হিসাবে নিযুক্ত হন। এর পরপরই
রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ এবং বাঙালি সংসদ সদস্যরা East Bengal
Legislative Assembly (EBLA) তে গৃহীত প্রস্তাবের পূর্ণ বাস্তবায়ন এবং
বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার জন্য নাজিমুদ্দিনের কাছে দাবী জানান।
নাজিমুদ্দিন পূর্ব পাকিস্তানের অধিবাসী হওয়া সত্বেও তিনি পুনরায় তার
অঙ্গীকার ভঙ্গ করেন এবং ক্ষমতার স্বার্থে রাষ্ট্রভাষার ক্ষেত্রে মোহাম্মদ
আলী জিন্নাহর পদাংক অনুসরণ করেন।

লিয়াকত আলি খানের ঢাকা সফর
১৯৪৮ সালের ১৮ নভেম্বর পাকিস্তানের প্রথম প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আলী খান
পূর্ব পাকিস্তান সফরে আসেন। লিয়াকত আলি খানের সফরকে কেন্দ্র করে ঢাকা
বিশ্ববিদ্যালয়ে রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন পুনরায় দানা বাধে। লিয়াকত আলীর
আগমন উপলক্ষ্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জিমনেশিয়াম মাঠে ঢাকা
বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-ছাত্রীদের একটি সমাবেশ আয়োজন করা হয়। সমাবেশে
বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-ছাত্রীদের অন্যান্য দাবী দাওয়ার পাশাপাশি বাংলাকে
রাষ্ট্রভাষা হিসাবে ঘোষণা করা ও East Bengal Legislative Assembly (EBLA)
তে গৃহীত প্রস্তাবের পূর্ণ বাস্তবায়ন করার দাবীতে একটি দাবীনামা প্রস্তত
করা হয়। দাবীনামাটি তৈরী করেন আব্দুর রহমান চৌধুরী (পরবর্তীতে বিচারপতি)।
২৭ নভেম্বর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের খেলার মাঠে তিনি এক ছাত্রসভায় ভাষণ
দেন। এই সভায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র ইউনিয়নের তরফ থেকে
প্রদত্ত মানপত্রে বাংলা ভাষার দাবি পুনরায় উত্থাপন করা হয়, কিন্তু তিনি
কোন মন্তব্য করেন নি।

আরবি হরফে বাংলা লেখার প্রস্তাব
৯ মার্চ ১৯৪৯-এ পূর্ব পাকিস্তানে বাংলাকে সরকারী কর্মকান্ড ও শিক্ষার
একমাত্র ভাষা এবং সেই সাথে উর্দুর পাশাপাশি রাষ্ট্রভাষা ঘোষণার অব্যহত
আন্দোলনের পরিপ্রেক্ষিতে খাজা নাজিমুদ্দিনের উদ্যোগে পাকিস্তান সরকার
বাংলাকে আরবি হরফে প্রচলন করার ব্যাপারে একটি প্রস্তাব দেয়। প্রস্তাবের
মুল উদ্দেশ্য ছিল হিন্দুয়ানী বাংলা হরফ থেকে বাংলাকে মুক্ত করে ইসলামী
ভাবাদর্শের সাথে সামন্জস্যপূর্ণ আরবি হরফে বাংলা লেখা প্রচলন করা। এই
লক্ষ্যে ৯ মার্চ ১৯৪৯ মৌলানা আকরাম খানকে চেয়ারম্যান করে ১৬ সদস্য
বিশিষ্ট একটি কমিটি গঠন করা হয়। এই লক্ষ্যে পাকিস্তান সরকার একটি বড়
আকারের ফান্ড গঠন করে এবং তৎকালীন শিক্ষামন্ত্রী পার্লামেন্টে এর সপক্ষে
বলেন :

‘The board is of the opinion that in the interest of national unity and
solidarity and the rapid advancement of general education in Pakistan,
it is necessary to have all the regional languages of Pakistan written
in the same script; the Arabic script was most useful for this purpose…’

ড. মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ সহ সকল ভাষাতত্ববিদ আরবি হরফে বাংলা লেখার এই
উদ্ভট প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন কিন্ত তদসত্বেও পাকিস্তান সরকার তাদের
মনোভাবের ব্যাপারে অনঢ় থাকে।

আওয়ামী মুসলিম লীগের প্রতিষ্ঠা
২৩ জুন ১৯৪৯-এ পূর্ব-পাকিস্তানের প্রতি পশ্চিম পাকিস্তানী শাসক গোষ্ঠীর
অব্যাহত উন্নাসিক দৃষ্টিভঙ্গী, বিভিন্ন ন্যায্য দাবী দাওয়া পূরনে
অস্বীকৃতি এবং ভাষার ক্ষেত্রে মুসলিম লীগ সরকারের নীতির বিরোধিতায় মজলুম
জননেতা মাওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানীর নেতৃত্বে গঠিত হয় আওয়ামী
মুসলিম লীগ। এর প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদক ছিলেন শামসুল হক (টাঙ্গাইল);
শেখ মুজিবুর রহমান ও খন্দকার মোশতাক আহমেদ নিযুক্ত হন যুগ্ম সম্পাদক
হিসাবে। একই সময়ে পশ্চিম পাকিস্তানেও পীর মানকি শরীফ এর নেতৃত্বে আওয়ামী
মুসলিম লীগ গঠিত হয়। পরবর্তীতে এই দুই দল একীভূত হয়ে পাকিস্তান আওয়ামী
মুসলিম লীগ গঠন করে এবং হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী এর আহবায়ক নিযুক্ত হন।
ভাসানী ১৯৪৯ থেকে ১৯৫৭ পর্যন্ত ৮ বছর আওয়ামী মুসলিম লীগের সভাপতির
দায়িত্ব পালন করেন এবং ভাষা আন্দোলনসহ পূর্ব পাকিস্তানের অধিকার আদায়ের
সংগ্রামে নেতৃত্ব প্রদান করেন। পাকিস্তানে প্রথম বিরোধী দল হিসাবে পূর্ব
পাকিস্তানী রাজনৈতিক নেতৃত্বে গড়ে ওঠা আওয়ামী মুসলিম লীগ ভাষা আন্দোলনে
গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে এবং রাজপথের আন্দোলন সংগঠনের পাশাপাশি
পার্লামেন্টেও রাষ্ট্রভাষা ভাষার দাবীতে সোচ্চার ভূমিকা পালন করে।

Dhaka University State Language Movement Committee প্রতিষ্ঠা
১১ মার্চ ১৯৫০-এ কমিউনিষ্ট ভাবধারার ছাত্র নেতা আব্দুল মতিনের নেতৃত্বে
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে গঠিত হয় Dhaka University State Language Movement
Committee. এই কমিটি ভাষা আন্দোলনের বিভিন্ন পর্যায়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা
পালন করে।

পার্লামেন্টে আরবি হরফে বাংলা লেখার ব্যাপারে আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব
এপ্রিল ১৯৫০ : পার্লামেন্টে আরবি হরফে বাংলা লেখার ব্যাপারে আনুষ্ঠানিক
প্রস্তাব উত্থাপন করা হয়। ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত এবং নবগঠিত আওয়ামী মুসলিম
লীগের নেতারা এর তীব্র প্রতিবাদ জানান। এ সময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে
পুনরায় রাষ্ট্রভাষা হিসাবে বাংলাকে প্রতিষ্ঠার দাবীতে আন্দোলন দানা বেধে
ওঠে।

The Basic Principle Committee (BPC) of the National Constitutional Assembly-এর রিপোর্ট
সেপ্টেম্বর ১৯৫০ : পূর্ব পাকিস্তানের অর্থনৈতিক বৈষম্য দূর এবং জনগণের
মৈলিক চাহিদা পূরণের উপায় নির্ধারণের লক্ষ্যে গঠিত The Basic Principle
Committee (BPC) of the National Constitutional Assembly পার্লামেন্টে
রিপোর্ট প্রদান করে। এই রিপোর্টে উর্দুকে একমাত্র রাষ্ট্রভাষা করার
প্রস্তাব করা হয়। BPC রিপোর্ট পূর্ব পাকিস্তানে তীব্র প্রতিক্রিয়া
সৃষ্টি করে। আওয়ামী মুসলিম লীগ BPC রিপোর্টকে প্রত্যাখ্যান করে এবং পূর্ব
পাকিস্তানের বাঙালি রাজনৈতিক নেতারা বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা ঘোষনার পাশাপাশি
অন্যান্য দাবী দাওয়ার রূপরেখা প্রণয়নের জন্য Grand National Convention
(GNC) আহবান করেন।

Committee of Action for Democratic Federation গঠন
১৪ নভেম্বর ১৯৫০ : পূর্ব-পাকিস্তানের রাজনৈতিক নেতা, শিক্ষক,
বুদ্ধিজীবিদের সমন্বয়ে গঠিত Committee of Action for Democratic
Federation ১৪ই নভেম্বর ১৯৫০ ঢাকায় আয়োজন করে Grand National
Convention. GNC থেকে বাঙালিদের মুল দাবীগুলির পাশাপাশি উর্দুর পাশাপাশি
বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা হিসাবে ঘোষণা করার প্রস্তাব গৃহীত হয়।

East Bengal Language Committee কর্তৃক আরবি হরফে বাংলা লেখার প্রস্তাব বর্জন
৭ ডিসেম্বর ১৯৫০ : মৌলানা আকরম খান এর নেতৃত্বে গঠিত ১৬ সদস্যবিশিষ্ট East
Bengal Language Committee আরবি হরফে বাংলা লেখার প্রস্তাবকে বাস্তবতা
বিবর্জিত এবং উদ্ভট হিসাবে আখ্যায়িত করে চূড়ান্ত রিপোর্ট প্রদান করে। এই
কমিটি রিপোর্টে পূর্ব পাকিস্তানের অফিস আদালত ও শিক্ষাক্ষেত্রে সর্বতোভাবে
বাংলা ব্যবহারের উপর গুরুত্বারোপ করে।

১০ ডিসেম্বর ১৯৫০ : মজলুম জননেতা ভাসানী জেল থেকে মুক্তি লাভ করেন।
মুক্তির পরপরই ভাসানী BPC রিপোর্ট (যাতে উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা করার
প্রস্তাব করা হয়েছিল) প্রত্যাখ্যান করেন এবং Grand National Convention এ
গৃহীত প্রস্তাবগুলি অবিলম্বে মেনে নেয়ার জন্য পাকিস্তান সরকারকে আহবান
জানান।

পূর্ব পাকিস্তান যুবলীগের জন্ম
ফেব্রুয়ারী ১৯৫১ : পূর্ব পাকিস্তান যুবলীগের জন্ম। এই যুবলীগ বাংলাকে
রাষ্ট্রভাষা ঘোষণার পাশাপাশি পাকিস্তান সরকার কর্তৃক চাপিয়ে দেওয়া
মুসলিম সংস্কৃতির পরিবর্তে পূর্ব বাংলার অধিবাসীদের নিজস্ব কালচার যেমন
পহেলা বৈশাখ, নবান্ন ইত্যাদি চর্চার ব্যাপারে উচ্চকন্ঠ ছিলো। যুবলীগ মুলত
পাকিস্তানের প‌্যান-ইসলামিক মতবাদ থেকে বেরিয়ে এসে পূর্ব-বাংলার নিজস্ব
সংস্কৃতির চর্চার ক্ষেত্রে একটি কন্ঠস্বর হিসাবে নিজেদের পরিচিত করে।

তৎপরবর্তী ঘটনাপ্রবাহ
১১ মার্চ ১৯৫১ : The Dhaka University State Language Movement Committee
পূর্ব বাংলার সকল পত্রপত্রিকায় এবং গণ পরিষদের সদস্যদের মাঝে বাংলাকে
উর্দুর পাশাপাশি রাষ্ট্রভাষা ঘোষণার দাবীতে একটি স্মারকলিপি পাঠায়।

২৭ মার্চ ১৯৫১ : পশ্চিম পাকিস্তানী শাসক গোষ্ঠী পুনরায় গণপরিষদেতে আরবি
হরফে বাংলা লেখার প্রস্তাবটি পেশ করে। এখানে উল্লেখ্য যে মৌলানা আকরম খান
এর নেতৃত্বে গঠিত ১৬ সদস্যবিশিষ্ট East Bengal Language Committee আরবি
হরফে বাংলা লেখার প্রস্তাবকে বাস্তবতা বিবর্জিত এবং উদ্ভট হিসাবে
আখ্যায়িত করে প্রত্যাখ্যান করলেও সেই রিপোর্টকে সাধারণ জনগনের সামনে
প্রকাশ করেনি পাকিস্তান সরকার। ততদিনে ক্ষমতাসীন মুসলিম লীগের এদেশীয়
সদস্যদের মধ্যেও অনেকে বাংলার পক্ষে স্পষ্ট অবস্থান গ্রহণ করেছেন। এরকমই
একজন হাবিবুল্লাহ বাহার এ্যাসেম্বলীতে এই প্রস্তাবের তীব্র বিরোধিতা করেন।
হাবিবুল্লাহ বাহারের সাথে ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত এই প্রস্তাবকে পূর্ব-বাংলার
জনগণকে শিক্ষা ক্ষেত্রে পঙ্গু করার জন্য একটি দূরভিসন্ধি হিসাবে অভিহিত
করে এই প্রস্তাব বাতিল করার দাবী জানান। পূর্ব বাংলার সংসদ সদস্যদের
একাংশের তীব্র বিরোধিতার মুখে প্রস্তাবটি প্রত্যাহারে বাধ্য হয় পাকিস্তান
সরকার।

জুলাই - ডিসেম্বর ১৯৫১ : এই সময়কালীন ভাষা আন্দোলনের নেতৃত্বে ছিলো
আব্দুল মতিনের নেতৃত্বাধীন The Dhaka University State Language Movement
Committee. ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে জুলাই, সেপ্টেম্বর, অক্টোবরে পৃথক পৃথক
সমাবেশ করে বাংলাকে উর্দুর পাশাপাশি রাষ্ট্রভাষা হিসাবে প্রতিষ্ঠার দাবী
জানানো হয়। এই সময়ের সমাবেশগুলিতে কাজী গোলাম মাহবুব, অলি আহাদ, গাজীউল
হক প্রমুখ সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন।

১৯৫২: ভাষা আন্দোলনের পুনর্জাগরণ
২৬ জানুয়ারী ১৯৫২ : The Basic Principles Committee of the Constituent
Assembly of Pakistan পুনরায় উর্দুকেই একমাত্র রাষ্ট্রভাষা হিসাবে
এ্যাসেম্বলীতে চূড়ান্ত নির্দেশনা প্রদান করে।

ভাষা আন্দোলনের পুনরায় জোরালো হওয়ার পেছনে ২৭শে জানুয়ারি ১৯৫২ সালের
খাজা নাজিমুদ্দিনের ভাষণ প্রধান নিয়ামক হিসেবে কাজ করে। তৎকালীন
প্রধানমন্ত্রীর পদে আসীন খাজা নাজিমুদ্দিন ২৫শে জানুয়ারি ঢাকায় আসেন এবং
২৭শে জানুয়ারি পল্টন ময়দানের এক জনসভায় দীর্ঘ ভাষণ দেন। তিনি মূলতঃ
জিন্নাহ্‌-র কথারই পুনরুক্তি করে বলেন, পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হবে
উর্দু। রেডিওতে সরাসরি সম্প্রচারিত তাঁর ভাষণে তিনি আরো উল্লেখ করেন কোন
জাতি দু'টি রাষ্ট্রভাষা নিয়ে সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে যেতে পারেনি।

২৭ জানুয়ারী ১৯৫২ : ঢাকা সফররত পাকিস্তানের তৎকালীন গভর্ণর জেনারেল খাজা
নাজিমুদ্দিন পল্টন ময়দানের সমাবেশে ঘোষণা করেন কেবল মাত্র উর্দুই হবে
পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা। সাথে সাথে সমাবেশস্থলে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা
দেয়। শ্লোগান ওঠে ‘রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই’। এই বক্তব্য সমগ্র পূর্ব
পাকিস্তানে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে।

২৮ জানুয়ারী ১৯৫২ : ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ ঢাকা
বিশ্ববিদ্যালয়ে একটি বিক্ষোভ সমাবেশের আয়োজন করে। এই সমাবেশ থেকে
নাজিমুদ্দিনের বক্তব্য প্রত্যাখ্যান করা ছাড়াও পূর্ব পাকিস্তানের
প্রধানমন্ত্রী এবং মন্ত্রীপরিষদকে পশ্চিম পাকস্তানের হাতের পুতুল হিসাবে
অভিহিত করা হয়।

৩০ জানুয়ারী ১৯৫২ : খাজা নাজিমুদ্দিনের বক্তব্য ভাষা আন্দোলনকে নতুন
মাত্রা দান করে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের ডাকে
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এইদিন সর্বাত্মক ধর্মঘট পালিত হয়। একই দিন মাওলানা
ভাসানীর সভাপতিত্বে আওয়ামী মুসলিম লীগের একটি সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায়
ভাসানীর নেতৃত্বে ভাষা আন্দোলনে ছাত্রদের পাশাপাশি আওয়ামী মুসলিম লীগের
সরাসরি এবং সক্রিয় অংশগ্রহণের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়।

৩১শে জানুয়ারী ১৯৫২ : ভাসানীর সভপতিত্বে পূর্ব-পাকিস্তানের সকল রাজনৈতিক,
সাংস্কৃতিক ও পেশাজীবিদের একটি সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। এই সম্মেলন থেকে
কাজী গোলাম মাহবুবকে আহবায়ক করে সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ
গঠিত হয়। সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ ২১ ফেব্রুয়ারী সমগ্র
পূর্ব-পাকিস্তানে সাধারণ ধর্মঘট আহবান করে।

৪ ফেব্রুয়ারী ১৯৫২ : ছাত্রদের ডাকে ঢাকা শহরের সকল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে
স্বত:স্ফূর্ত ধর্মঘট পালিত হয়। ছাত্ররা বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা ঘোষণার
দাবীতে তখনকার সময়ের সবচেয়ে বড় একটি মিছিল নিয়ে রাজপথ প্রদক্ষিণ করে।

১৮ ফেব্রুয়ারী ১৯৫২ : পাকিস্তান সরকার ২১ ফেব্রুয়ারী ডাকা সাধারণ
ধর্মঘটের পরিপ্রেক্ষিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এবং তৎসংলগ্ন এলাকায় ১৪৪
ধারা জারি করে এবং সকল সভা সমাবেশ নিষিদ্ধ ঘোষণা করে।

২০ ফেব্রুয়ারী ১৯৫২ : পাকিস্তান সরকার কর্তৃক ১৪৪ ধারা জারির
পরিপ্রেক্ষিতে সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ এর উদ্যোগে আবুল হাশিম
এর সভাপতিত্বে একটি সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় উপস্থিত সদস্যগণ ১৪৪ ধারা ভংগ
করার ব্যাপারে নেতিবাচক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। সভার একটি বড় অংশ ১৪৪ ধারা
ভংগের ব্যাপারে মত দিলেও অনেকেই এতে সহিংসতার আশংকায় বিপক্ষে মত দেন।

২১ ফেব্রুয়ারির ঘটনা
সকাল ৯টা থেকে বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ছাত্ররা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে
জিমনেশিয়াম মাঠের পাশে ঢাকা মেডিকেল কলেজের (তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের
অন্তর্গত) গেটের পাশে এসে জড়ো হয়। তারা ১৪৪ ধারা জারির বিপক্ষে স্লোগান
দিতে থাকে এবং পূর্ব বঙ্গ আইন পরিষদের সদস্যদের ভাষা সম্পর্কে সাধারণ
জনগণের মতকে বিবেচনা করার আহ্বান জানাতে থাকে।

সকাল ১১ টা : কাজী গোলাম মাহবুব, অলি আহাদ, আব্দুল মতিন, গাজীউল হক
প্রমুখের উপস্থিতিতে ছাত্র-ছাত্রীদের সমাবেশ শুরু। সমাবেশে ১৪৪ ধারা ভংগের
ব্যাপারে ছাত্র নেতৃবৃন্দ এবং উপস্থিত রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের মধ্যে
মতানৈক্য দেখা দেয়। আওয়ামী মুসলিম লীগের সাধারণ সম্পাদক শামসুল হক সভায়
উপস্থিত হয়ে ছাত্রদের ১৪৪ ধারা না ভাঙ্গার ব্যাপারে যুক্তি প্রদর্শন
করেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ড. এস এম হোসেইন এর নেতৃত্বে
কয়েকজন শিক্ষক সমাবেশ স্থলে যান এবং ১৪৪ ধারা ভংগ না করার জন্য ছাত্রদের
অনুরোধ করেন।
বেলা ১২টা থেকে বিকেল ৩টা : উপস্থিত ছাত্রনেতাদের মধ্যে আব্দুল মতিন এবং
গাজীউল হক ১৪৪ ধারা ভংগের পক্ষে মত দিলেও সমাবেশ থেকে নেতৃবৃন্দ এ
ব্যাপারে কোন সুনির্দিষ্ট ঘোষণা দিতে ব্যর্থ হন। এ অবস্থায় উপস্থিত
সাধারণ ছাত্ররা স্বত:স্ফূর্তভাবে ১৪৪ ধারা ভংগের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে এবং
মিছিল নিয়ে পূর্ব বাংলা আইন পরিষদের (বর্তমানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের
জগন্নাথ হলের অন্তর্গত) দিকে যাবার উদ্যোগ নেয়। এ সময় পুলিশ লাঠিচার্জ
এবং গুলি বর্ষণ শুরু করে। গুলিতে ঘটনাস্থলেই আবুল বরকত (ঢাবি এর
রাষ্ট্রবিজ্ঞান এর মাষ্টার্সের ছাত্র), রফিক উদ্দীন, এবং আব্দুল জব্বার
নামের তিন তরুণ মৃত্যু বরণ করেন। পরে হাসপাতালে আব্দুস সালাম যিনি
সচিবালয়ে কর্মরত ছিলেন মৃত্যু বরণ করেন। অহিউল্লাহ নামে ৯ বছরের একটি
শিশুও পুলিশের গুলিতে মারা যায়। পুলিশের সাথে ছাত্রদের ৩ ঘন্টাব্যাপী
সংঘর্ষ চলতে থাকে কিন্তু পুলিশ গুলিবর্ষণ করেও ছাত্রদের স্থানচ্যূত করতে
ব্যর্থ হয়।
বেলা ৪টা : ছাত্রদের মিছিলে গুলিবর্ষনের ঘটনা ঢাকায় ছড়িয়ে পড়লে হাজার
হাজার সাধারণ জনতা ঢাকা মেডিকেল কলেজের সামনে জড়ো হতে থাকে। গুলিবর্ষনের
সংবাদ আইন পরিষদে পৌছালে ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের নেতৃত্বে পূর্ব বাংলার ছয়জন
আইন পরিষদ সদস্য আইন পরিষদ সভা মুলতবী করে ঢাকা মেডিকেলে আহত ছাত্রদের
দেখতে যাবার জন্য মূখ্যমন্ত্রী নুরুল আমিনকে অনুরোধ করেন। সরকারী দলের
সদস্য আব্দুর রশীদ তর্কবাগীশও এই প্রস্তাবের সপক্ষে উচ্চকন্ঠ হন কিন্তু
নুরুল আমিন সকল দাবি উপেক্ষা করে আইন পরিষদের অধিবেশন চালাবার নির্দেশ
দেন। এর প্রতিবাদে পূর্ব বাংলার সদস্যরা পরিষদ থেকে ওয়াক আউট করেন। রাতের
বেলা ছাত্র নেতৃবৃন্দের উদ্যোগে ঢাকা শহরের প্রতিটি মসজিদে ও ক্লাবে পরদিন
সকালে পুনরায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে জমায়েত হবার আহবান সম্বলিত লিফলেট
বিলি করা হয়।

২১ ফেব্রুয়ারী ১৯৫২ পরবর্তী ঘটনাপঞ্জি
২২ ফেব্রুয়ারি : হাজার হাজার ছাত্র জনতা সকাল থেকেই ঢাকা
বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় জড়ো হতে থাকে। উপস্থিত ছাত্র-জনতা ২১ ফেব্রুয়ারী
নিহতদের স্মরণে কার্জন হল এলাকায় একটি জানাজা নামাজ আদায় করে এবং একটি
শোকমিছিল বের করে। শান্তিপূর্ণ মিছিলের উপর পুলিশ পুনরায় গুলি চালালে
শফিউর রহমানসহ চারজন ঘটনাস্থলেই মৃত্যু বরণ করেন। উত্তেজিত জনতা রথখোলায়
অবস্থিত সরকারপক্ষীয় পত্রিকা ‘দি মর্নিং নিউজ’ এর অফিসে আগুণ ধরিয়ে
দেয়। নুরুল আমিন পুলিশের পাশাপাশি আর্মি নামিয়ে ছাত্র-জনতার বিক্ষোভকে
নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করে। আর্মি ও পুলিশের বাধা উপেক্ষা করে ছাত্র-জনতা
ভিক্টোরিয়া পার্ক (বর্তমানে বাহাদুর শাহ পার্ক) এ জমায়েত হয় এবং সেখানে
অলি আহাদ, আব্দুল মতিন, কাজী গোলাম মাহবুব ব্ক্তব্য রাখেন।
উপায়ন্তর না দেখে নুরুল আমিন তড়িঘড়ি করে আইন পরিষদে বাংলাকে
পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হিসাবে স্বীকৃতি দেয়া সংক্রান্ত একটি প্রস্তাব
আনেন এবং প্রস্তাবটি সর্বসম্মতভাবে পাশ হয়।

২৩ ফেব্রুয়ারী ১৯৫২ : সমগ্র পূর্ব-পাকিস্তানে স্বত:স্ফূর্তভাবে ধর্মঘট
পালিত হয়। এর আগের দিন আইন পরিষদে রাষ্ট্রভাষা সংক্রান্ত প্রস্তাব আনার
পরেও নুরুল আমিনের পেটোয়া বাহিনী আন্দোলনকারীদের উপর দমন পীড়ন অব্যহত
রাখে। সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ ২৫ ফেব্রুয়ারী সমগ্র
পূর্ব-পাকিস্তানে সাধারণ ধর্মঘটের ডাক দেয়। ২৩ ফেব্রুয়ারী রাতে
ছাত্র-ছাত্রীরা বরকত শহীদ হওয়ার স্থানে ভাষা আন্দোলনে শহীদদের স্মরণে
একটি অস্থায়ী স্মৃতিস্তম্ভ নির্মান শুরু করে।

২৪ ফেব্রুয়ারী ১৯৫২ : ভোর ৬টার সময় ‘শহীদ স্মৃতিস্তম্ভের’ নির্মানকাজ
সমাপ্ত হয় এবং সকাল ১০টার দিকে শহীদ শফিউর রহমানের পিতাকে দিয়ে
স্মৃতিস্তম্ভটির ফলক উন্মোচন করা হয়। নুরুল আমিনের সরকার রাজপথে সর্বত্র
সেনাবাহিনী এবং পুলিশ মোতায়েন করে এবং ৪৮ ঘন্টার মধ্যে পরিবেশ স্বাভাবিক
করার ঘোষণা দেয়। এই ৪৮ ঘন্টার মধ্যে ভাষা আন্দোলনের সাথে সংশ্লিষ্ট
প্রায় সকল শীর্ষ নেতৃত্বকে গ্রেফতার করা হয়।

২৫ ফেব্রুয়ারী ১৯৫২ : ছাত্র বিক্ষোভকে দমাতে ভাষা আন্দোলনের সূতিকাগার
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ ঘোষণা করা হয়।
২৬ ফেব্রুয়ারী ১৯৫২ : ২৬ ফেব্রুয়ারি শহিদ মিনার পুনরায় উদ্বোধন করেন
আজাদ সম্পাদক আবুল কালাম শামসুদ্দিন। সেই দিন বিকেলেই সেনাবাহিনী ও পুলিশ
ঢাকা মেডিকেল কলেজের সম্মুখে স্থাপিত ‘শহীদ স্মৃতিস্তম্ভ’ গুড়িয়ে দেয়।
সরকারের দমন পীড়ন নীতিতে ঢাকায় ছাত্র আন্দোলন স্তিমিত হয়ে পড়ে কিন্তু
ঢাকার বাইরে আন্দোলন দানা বাধে। এবার বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা ঘোষণার পাশাপাশি
বর্বর নুরুল আমিনের পদত্যাগের দাবী ওঠে ভাসানীর নেতৃত্বাধীন আওয়ামী
মুসলিম লীগের কাছ থেকে।

৮ এপ্রিল ১৯৫২ : পাকিস্তান সরকার ২১ ফেব্রুয়ারীর ঘটনাকে পাকিস্তানের
মুসলিম সংস্কৃতি থেকে বিচ্যুত করার লক্ষ্যে হিন্দু এবং কমিউনিস্টদের একটি
চক্রান্ত হিসাবে অভিহিত করে। একই দিন প্রকাশিত একটি রিপোর্ট ছাত্রদের উপর
পুলিশের গুলিবর্ষনের ঘটনার কোন যুক্তিসংগত কারন দেখাতে ব্যর্থ হয়।

১৪ এপ্রিল ১৯৫২ : আইন পরিষদে পূর্ব বাংলার সদস্যরা ২১ ফেব্রুয়ারীর ঘটনার
পূর্ণ তদন্ত দাবি করেন এবং ২২ ফেব্রুয়ারী গৃহীত প্রস্তাবের ভিত্তিতে
বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা হিসাবে ঘোষণা করার ব্যাপারে দাবী উত্থাপন করলে আইন
পরিষদে অচলাবস্থা সৃষ্টি হয়।

১৬ এপ্রিল ১৯৫২ : ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় পুনরায় খুলে দেয়া হয়।

২৮ এপ্রিল ১৯৫২ : সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের উদ্যোগে বার
এসোসিয়েশন হলে একটি সেমিনার অনুষ্ঠিত হয়। সেমিনারে বক্তারা মিছিল
সমাবেশের উপর নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার, সকল বন্দীর মুক্তি এবং বাংলাকে
রাষ্ট্রভাষা হিসাবে ঘোষনার দাবী জানান।

২১ ফেব্রুয়ারী ১৯৫৩ : ১৯৫২ এর ছাত্র-জনতার আন্দোলনের এক বছর পূর্তিতে
হাজার হাজার জনতা অস্থায়ীভাবে নির্মিত স্মৃতিস্তম্ভে শহীদদের প্রতি
শ্রদ্ধা প্রদর্শন করে। সরকার সকল সভা সমাবেশ, মিছিল নিষিদ্ধ করলেও ভাসানীর
নেতৃত্বে আওয়ামী মুসলিম লীগের নেতা-কর্মী ও সাধারণ ছাত্র-জনতা খালি পায়ে
স্মৃতিস্তম্ভের নিকট সমবেত হন। এই দিন পূর্ব পাকিস্তানের জনগন শোকের
প্রতীক হিসাবে কালো ব্যাজ ধারণ করেন এবং শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে
অধিকাংশ দোকানপাট বন্ধ রাখা হয়।

৩ এপ্রিল ১৯৫৪ : মাওলানা ভাসানী, এ কে ফজলুল হক এবং হোসেন শহীদ
সোহরাওয়ার্দীর নেতৃত্বাধীন যুক্তফ্রন্ট পূর্ব-পাকিস্তানের প্রাদেশিক
শাসনভার গ্রহন করে। ভাষা আন্দোলনের মাধ্যমে পূর্ব-বাংলার জনগণের যে জাগরণ
শুরু হয় তার ফলেই প্রথমবারের মত মুসলিম লীগ বিতারিত হয় প্রাদেশিক সরকার
হতে।

৭ মে ১৯৫৪: যুক্তফ্রন্ট সরকারের উদ্যোগে পাকিস্তান সরকার বাংলাকে একটি রাষ্ট্রভাষা হিসাবে স্বীকার করে একটি প্রস্তাব গ্রহণ করে।

৩ ডিসেম্বর ১৯৫৫ : ভাষা আন্দোলনের ছাত্র-জনতার অন্যতম দাবী বাংলা একাডেমি আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা শুরু করে।

১৬ ফেব্রুয়ারী ১৯৫৬ : পাকিস্তানের গণপরিষদে বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা হিসাবে
স্বীকৃতি প্রদান করে তা সংবিধানের অন্তর্গত করার জন্য প্রস্তাব উত্থাপিত
হয়।

২১ ফেব্রুয়ারী ১৯৫৬ : প্রাদেশিক প্রধানমন্ত্রী আবু হোসেন সরকার কর্তৃক
শহীদ মিনারের ভিত্তি প্রস্তর স্থাপন। ১৯৬৩ সালের ২১ শে ফেব্রুয়ারী শহীদ
আবুল বরকতের মা হাসিনা বেগম কর্তৃক এই শহীদ মিনারের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন
করা হয়।

২৬ ফেব্রুয়ারী ১৯৫৬ : পাকিস্তান জাতীয় সংসদে বাংলা এবং উর্দুকে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হিসাবে স্বীকৃতি দিয়ে সংবিধান পাশ করে।

সংবিধানে রাষ্ট্র ভাষা বাংলা
৩ মার্চ ১৯৫৬-এ বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা হিসাবে স্বীকৃতি প্রদানকারী
পাকিস্তানের সংবিধান এইদিন থেকে কার্যকর হয় এবং ১৯৪৭ সালের সেপ্টেম্বরে
তমদ্দুন মজলিশের মাধ্যমে মায়ের ভাষায় কথা বলার যে আন্দোলনের শুরু
হয়েছিল তার সাফল্য অর্জিত হয়।

 

 

 
সূত্র : উইকিপিডিয়া

পোস্টটি ৭ জন ব্লগার পছন্দ করেছেন

অরিত্র's picture


চমৎকার। একটি পূর্ণাঙ্গ ইতিহাস পাঠ করলাম। ধন্যবাদ লেখককে

সোনাবীজ's picture


ধন্যবাদ।

ভাঙ্গা পেন্সিল's picture


আর যাই হোক...ত্রিশ মিনিটেই যে দুনিয়া পাল্টায় নাই সেটা বুঝা যাচ্ছে!

সোনাবীজ's picture


ভালো বলেছেন।

টুটুল's picture


পূর্ণ ইতিহাস Smile
ধন্যবাদ

সোনাবীজ's picture


ধন্যবাদ।

তানবীরা's picture


সরাসরি প্রিয়তে। নতুন করে আজ আবার ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস জানছি।

সোনাবীজ's picture


ধন্যবাদ।

মন্তব্য করুন

(আপনার প্রদান কৃত তথ্য কখনোই প্রকাশ করা হবেনা অথবা অন্য কোন মাধ্যমে শেয়ার করা হবেনা।)
ইমোটিকন
:):D:bigsmile:;):p:O:|:(:~:((8):steve:J):glasses::party::love:
  • Web page addresses and e-mail addresses turn into links automatically.
  • Allowed HTML tags: <a> <em> <strong> <cite> <code> <ul> <ol> <li> <dl> <dt> <dd> <img> <b> <u> <i> <br /> <p> <blockquote>
  • Lines and paragraphs break automatically.
  • Textual smileys will be replaced with graphical ones.

পোস্ট সাজাতে বাড়তি সুবিধাদি - ফর্মেটিং অপশন।

CAPTCHA
This question is for testing whether you are a human visitor and to prevent automated spam submissions.