কাপাসিয়া উপ-নির্বাচন: বঙ্গবন্ধুর দৃষ্টিতে
তানজিম আহমেদ সোহেল তাজ (পুরো নামটা কী ঠিকমত লিখতে পারলাম), সোহেল তাজ মানেই সবাই তাঁকে চেনেন। সুদর্শন স্বাস্থ্যবান তরতাজা তরুণ। লেখাপড়া কোথায় কী করেছেন জানিনা, সেটা খুব গুরুত্বপূর্ণও না, কথা বার্তায় চটপটে। এই যুবক কাপাসিয়া এলাকার সংসদ সদস্য যখন কাপাসিয়া এলাকার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন তখন প্রায় সকলেই খুশি হয়েছিলেন। আমার মুরুব্বীস্থানিয় কিছু সুশীল ভদ্রলোককে বলতে শুনেছি, ভাল পরিবারের শিক্ষিত রুচিশীল যুবক, এরকম আরো বেশি ছেলেময়েয়ে নেতৃত্বে আসলে দেশের ভাল হবে, রাজনীতিতে একটা গুণগত পরিবর্তন আসবে ইত্যাদি। তরুণ বয়েসের আরো কিছু ভাল পরিবারের ছেলে এই সংসদে আছে, তাঁদের ব্যাপারেও আমি অনেকের মাঝে এই ধরনের মুগ্ধতা দেখি, এমন কী নাজিউর রহমান মঞ্জুর পুত্রের উপরও একই মাত্রার আস্থা ও প্রশংসা শুনি। এই ধরনের কথা শুনলে আমি সেই অর্থে বিরোধিতাও করতে পারি না কিন্তু আবার মনের মধ্যে কেমন যেন একটু অস্বস্তি বোধ করি। আমি নিজে বিশিষ্ট বা ভাল বংশের মানুষ না সেই জন্যেই বোধ হয়।
তাজুদ্দিন আহমেদের ছেলের কথায় ফিরে আসি, এরপর নতুন প্রজন্মের সেই তরুণ নেতা মন্ত্রী হলেন, মন্ত্রী থেকে পদত্যাগ করলেন। সেই পদত্যাগ গ্রহণ করা না করা নিয়ে নাটক হল। সংসদ থেক পদত্যাগ করলেন সেটা নিয়েও নাটক হল। শেষে তিনি পদত্যাগ করলেনই। তাঁর শূন্য করে দেওয়া আসনে আবার নির্বাচন হচ্ছে। তিনজন প্রতি আছেন, একজন তাজউদ্দিন আহমেদের কন্যা, আরেকজন তাজউদ্দিন আহমেদের ভাই এবং আরেকজন তাজউদ্দিন আহমেদের কেউ না। কন্যাকে আওয়ামী লীগের প্রার্থী, ভাই স্বতন্ত্র এবং কেউ-না যুবকটি কমিউনিস্ট পার্টির প্রার্থী। ৩০শে সেপ্টেম্বর সেই উপ নির্বাচনে ভোট গ্রহণ হবে।
নির্বাচনী তফসিল ঘোষণার কয়েকদিন আগে এরেকটি ঘটনা ঘটেছে। বাংলাদেশের বেশ কয়েকজন সাধারণ মানুষ বঙ্গবন্ধুর অসমাপ্ত আত্মজীবনী পড়ে ফেলেছেন, এদের মধ্য এই অধমও আছি। আমি বাংলা ইংরেজি দুইটাই কিনেছি, তবে ইংরেজিটা পড়ি নাই। বাংলাটা পড়ে এবং এর ভাষা প্রকরণ এবং শব্দ এইসব দেখে আমার মনে হয়েছে বঙ্গবন্ধু যেন তার অননুকরিণীয় ভঙ্গিতে আমার সাথে কথা বলছেন। আমার কাছে বইটা ভাল লেগেছে এবং (আমার বন্ধুদের অনেকেই এটা শুনলে হাসেন) আমার মনে হয় রাজনীতিতে বঙ্গবন্ধুর আদর্শগত এবং শ্রেণীগত অবস্থানেরও একটা চিত্র এই গ্রন্থে পাওয়া যায়। এই বইটা পড়ার পর থেকে আমি অনেক রাজনৈতিক ঘটনায় বঙ্গবন্ধুর অবস্থান থেকে তাঁর দৃষ্টিতে দেখার চেষ্ঠা করেছি- যেন বঙ্গবন্ধু নিজেই বিচার করছেন ঘটনাবলী। আমি মজা করার জন্যেই করতাম। কিন্তু প্ল্যানচেটে ভূত আনতে গেলে যেটা হয়, মাঝে মাঝে ভয় পেয়ে যাই। ভাবছি কাপাসিয়ার নির্বাচনে আওয়ামী লীগ যেভাবে কাজ করছে সেটাকে বঙ্গবন্ধুর দৃষ্টিতে দেখার চেষ্টা করিনা কেন।
মনে করেন বঙ্গবন্ধুর সামনে বিষয়টা এসেছে, কাপাসিয়াতে উপনির্বাচন, দলের প্রার্থী মনোনয়ন দেওয়া দরকার। বঙ্গবন্ধু আওয়ামী লীগের প্রধান হিসেবে কী ধরনের প্রার্থী মনোনয়ন দিতেন। বঙ্গবন্ধুর মত করে ভাবার চেষ্টা করি। কিভাবে? বঙ্গবন্ধুর আত্মজীবনী তো রয়েছেই, সেখানে তাঁর চিন্তার একটা লাইন পাবেন। সেই সাথে একই ধরনের পরিস্থিতিতে অন্যান্য ক্ষেত্রে বঙ্গবন্ধু কী সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন সেগুলি তো ইতিহাসেরই অংশ। এগুলির সাথে যোগ করুন বঙ্গবন্ধুর সাধারণ আদর্শিক অবস্থান।
আগে দেখি এই এলাকাতেই আওয়ামী লীগের পর বঙ্গবন্ধুর জীবদ্দশায় যে কয়েকটা নির্বাচন হয়েছে সেখানে কারা কারা আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পেয়েছিলেন। তিনটা নির্বাচন হয়েছিল এই সময়কালএর মধ্যে। ১৯৫৪র যুক্তফ্রন্ট নির্বাচন, ১৯৭০এর ঐতিহাসিক নির্বাচন এবং স্বাধীনতার পর ১৯৭৩এর নির্বাচন। ১৯৫৪র নির্বাচনে যুক্তফ্রন্টএর প্রার্থী কে ছিলেন সেটা এই মুহূর্তে বের করতে পারছিনা, ১৯৭০এর কেন্দ্রীয় পরিষদের আর ১৯৭৩এ জাতীয় সংসদের প্রার্থী ছিলেন তাজউদ্দিন আহমেদ। আর ১৯৭০এ প্রাদেশিক পরিষদের প্রার্থী ছিলেন এডভোকেট কাজী শাহাবুদ্দিন আহমেদ। লক্ষ্য করবেন এই এলাকায় সহ সারা দেশে ১৯৭০ সনে যারা আওয়ামী লগের প্রার্থী ছিলেন এর সকলেই ছিলেন বয়েসে নবীন এবং শিক্ষিত মধ্যবিত্ত পরিবারের কিংবা চাষাভুষা ঘরের সন্তান। তাজউদ্দিন আহমেদও ছিলেন তাই। এমন কী ১৯৫৪সনের নির্বাচনেও, আত্মজীবনীতে তিনি বলছেন, বঙ্গবন্ধু পুরোনো বিত্তবান ঘরের লোকগুলিকে মনোনয়নের বিরোধিতা করেছিলেন।
এবার বিবেচনা করুন বঙ্গবন্ধুর আদর্শিক অবস্থানের কথা। আগে দেখি বঙ্গবন্ধু সরোয়ার্দী সাহেবের সাথে কেন মুসলিম লীগ ত্যাগ করলেন। তিনি কী আদর্শ পরিবর্তন করেছিলন? বঙ্গবন্ধুর নিজের জবানীতে পড়ুন। তিনি বলছেন তাঁরা মুসলিম লীগ ত্যাগ করেন নাই, তাঁরা চেয়েছিলেন মুসলিম লীগ জনগণের সকল প্রতিনিধিত্বকারী একটা অসাম্প্রদায়িক দল হবে, এটা না হয়ে মুসলিম লীগ চলে গেল খাজা, রাজা, খান বাহাদুরদের মত কিছু পরিবারের হাতে। বঙ্গবন্ধু বলছেন দেশের মধ্যবিত্ত এবং শ্রমিক কৃষককে প্রতিনিধিত্ব করার জন্যে আমাদের দেশে (সেই সময় পূর্ব পাকিস্তানে) একটা দল দরকার। তাঁর মতে কমিউনিস্ট পার্টি সেই সময় জনগণের চেতনার স্তরের সাথে নিজদেরকে উপস্থাপন করতে পারতো না। সেই লক্ষেই আওয়ামী লীগ গঠনের উদ্যোগ। বঙ্গবন্ধুর আত্মজবিনী দেখুন, ভদ্রলোকের সারা জীবনের স্বপ্ন ছিল একটি অসাম্প্রদায়িক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থা যেখানে বাঙালি নিজেকে শাসন করবে। সাম্রাজ্যবাদের দুষ্ট প্রভাব বঙ্গবন্ধু পছন্দ করেননাই এবং জনগণের উপর আমলাদের মাতব্বরিও তাঁর ভাল লাগেনি। এমনকি অবসরপ্রাপ্ত আমলাদের মন্ত্রী ও অন্যান্য রাজনৈতিক পদে নিয়োগকেও তিনি সমর্থিন করেননাই। বাঙালির রাজনৈতিক প্রজ্ঞার উপর তাঁর অনেক আস্থা ছিল। এসব কারণেই তিনি গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত স্থানীয় সরকারের হাতে প্রকৃত শাসনভার অর্পণের কথা বলেছেন।
এইসব বিবেচনা মাথায় রেখে আপনি যদি কাপাসিয়া উপনির্বাচনে প্রার্থী মনোনয়ন দিতে বসেন। আপনি কী জোহরা তাজউদ্দিনের কাছে গিয়ে জানতে চাইবেন যে তাঁর পরিবারের কে ইলেকশন করবে? নাকি আপনি আপনার দলের নেতাকর্মীদের মতামত নিয়ে একজন প্রার্থী ঠিক করবেন? আপনি কী একটা বিশেষ পরিবারকে একটা এলাকার একমাত্র প্রতিনিধি ধরে নেবেন?
আমার মনে হয় শেখ হাসিনা এই মনোনয়নটি যেভাবে দিয়েছেন এটা দেখে বঙ্গবন্ধু তার 'হাচু'র প্রতি বিশেষ প্রসন্ন হতেননা।
আমি তাজউদ্দিন আহমেদের কন্যার ব্যক্তিগত যোগ্যতা, দক্ষতা কিংবা গুনগুন নিয়ে প্রশ্নই করছি না। সংসদ সদস্য হওয়ার জন্যে বিশেষ কোন যোগ্যতা থাকার প্রয়োজন নেই, যে কেউ যাতে সংসদ সদস্য পদে নির্বাচনের জন্যে দাড়াতে পারেন সেই রাস্তা উম্মুক্ত থাকতে হয়, জনগনই নির্ধারন করবে তারা কাকে চায়। আমি শুনেছি বিদ্যায় বুদ্ধিতে তিনি একজন বিশিষ্ট মহিলা। ভদ্রমহিলা তাজউদ্দিন আহমেদ বিষয়ক অনেক লেখালেখি করেছেন তার কয়েকটা আমি পড়েছি।
আমি এটাও মনে করি কেবল মাত্র তাজউদ্দিন আহমেদের কন্যা হওয়া কোনও অযোগ্যতা নয়। এবার নজর দিয়ে দেখতে গেলে আমার কেবল মনে হয়েছে যে প্রক্রিয়ায় তাঁকে মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে এটা গণতান্ত্রিক পন্থা হয়নি এবং কেবল মাত্র পিতৃ পরিচয়ের কারণেই তাকে মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে, এটাও ঠিক হয়নি। আমি যতটুকু জানি, আওয়ামী লীগের দলীয় শ্রীঙ্গ্খলায় রিমির বিশেষ কোন সংশ্লিষ্টতা নেই। এমনকী তিনি আওয়ামী লীগের অমূষ্ঠানিক সদস্য ছিলেন কিনা সেটা নিয়েও আমার সন্দেহ রয়েছে।
এই উপনির্বাচনটা পর হয়ে যাবে। এখানে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন কে পেলো কে পেলোনা তাতে খুব একটা কিছু হয়তো যায় আসেনা। কিন্তু ওই যে বললাম, বঙ্গবন্ধুর দৃষ্টিতে দেখতে যাই। এই খেলাটার শেষে মাঝে মাঝেই আত্কে উঠি। এখানেও ভয় পেয়েছি। অল্প যেটুকু গণতন্ত্র রয়েছে সেটুকুও কী তবে আবার কয়েকটা পরিবারের হাতে চলে যাচ্ছে? বঙ্গবন্ধু থাকলে ওঁর প্রিয় কন্যা হাচুর এই কাজের ধারাটা কী এটা পছন্দ করতেন?





এবি তে সুস্বাগত।
ধন্যবাদ।
প্ল্যানচেটে ডেকে আনলে নির্ঘাত তাঁরা তাঁদের কন্যাদের অন্ততঃ একটি করে চড় দিতেন..
~
ধন্যবাদ
১৯৯১ সালের নির্বাচনে হারার পর আওয়ামী লীগ হোন্ডা-গুন্ডা-আমলা-কামলা-ব্যবসায়ীনির্ভর দলে পরিণত হয়েছে। তবে সেই সুত্রে কাপাসিয়ায় সিমিন হোসেন রিমি-একজন ভালো প্রার্থী।
পোষ্ট ভালো লেগেছে।
গার্জিয়ান না থাকলে যা হয় আর কি!
উল্টা-পাল্টা কাজ করে বেড়ায়, বাড়ন করার কেউ নাই!
ভালো লাগলো আপনার লেখাটা।
এ বি তে স্বাগতম। নিয়মিত লিখবেন আশা করি।
প্ল্যানচেটে ডেকে আনলে নির্ঘাত তাঁরা তাঁদের কন্যাদের অন্ততঃ একটি করে চড় দিতেন..
ভালো লাগলো আপনার লেখাটা।
এ বি তে স্বাগতম। নিয়মিত লিখবেন আশা করি।
অয়েলকাম!
মন্তব্য করুন