ইউজার লগইন

জীবিকা অথবা জীবন- ৩

মগের পানিতে চুবিয়ে পাউরুটি খেতেখেতে মনু মিয়া বর্ণনা করছিলো তার ঘরের বর্তমান বেহাল অবস্থা। এ থেকে উত্তোরণের কঠিন এক মরণ-পণ সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়ার উদ্দেশ্যেই মূলত তার আগমন। কিন্তু মামা যাদু সরকারের কথা তার সমস্ত আগ্রহের আগুনে যেন জল ঢেলে দেয়। পেটে প্রচণ্ড ক্ষুধা থাকলেও তার খেতে ইচ্ছে হয় না আর। পাউরুটির একটি টুকরো খেতেই তার ক্ষিদে মরে গিয়েছিলো যেন। আসার পথে দেখেছে শীতালক্ষ্যা নদীর পাড়ে অনেক লোক ঝাঁকায় করে বালু অথবা পাথর নিয়ে ছোটছোট জাহাজে ফেলছে। অনেক আগে তাদের গ্রামের হবিউল্লা এখানে কাজ করার গল্প করেছিলো। কিন্তু যাদু সরকার যদি কাজের কোনো ব্যবস্থা করতে না পারে, তাহলে তাকে সেখানে গিয়েই কাজের সন্ধান করত হবে। তবে, সেখানে কাজ করার অনেক রকম যন্ত্রণা আর বিপদও আছে।কাজের হুড়োহুড়ির সময় ততটা সাবধানতা অবলম্বন করা সব সময় সম্ভব হয়ে ওঠে না বলে, মাঝেমাঝে সামনের জনের ঝাঁকা থেকে অসাবধানে পাথর গড়িয়ে পড়ে হাতে পায়ে আঘাত লাগার ঘটনাও আছে বিস্তর।

তাকে তন্ময় হয়ে কিছু একটা ভাবতে দেখে যাদু সরকার বললো, এত চিন্তা করিস না! ব্যবস্থা একটা অইবোই!
কী আর ব্যবস্থা অইবো! বলে, অন্তর্গত হতাশা চেপে ফের চুপচাপ নিজের ভাবনায় হারিয়ে যায় মনু মিয়া। যে লোক ভাতের অভাবে বেকারি থেকে বাসি পাউরুটি এনে খায়, সেই লোক যে কতটা কাজের তা আচরণ দেখেই তার অনুধাবন করা উচিত ছিলো। সে মনেমনে সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলে যে, এখান থেকে আজই সে চলে যাবে। খুঁজে বের করবে শীতালক্ষ্যার পাড়ে স্বল্প পরিচিত হবিউল্লাকে।

যাদু মিয়া খাওয়া শেষ করে ঘরের বেড়ায় ঝুলানো হুঁকোটা নামিয়ে ভেতরের পানি বদলায়। তারপর খোলে নতুন পানি ঢেলে নিয়ে বাঁশের চোঙ থেকে তামাক বের করে নিয়ে ছিলিম সাজায়। টিকার অভাবেই হয়তো তাকে দেখা যায় নারকেলের ছোবা দিয়ে আগুন ধরিয়ে গুরুৎ গুরুৎ শব্দে তামাক টানতে।

যাদু মিয়া তামাক সেবনে মগ্ন হয়ে গেলে মনু মিয়ার হতাশা আরো বাড়ে। সে সঙ্গে কী বলে এখান থেকে বেরিয়ে যাবে সে সংলাপের জন্যই হয়তো মনেমনে শব্দ হাতড়ে ফেরে।

হুঁকো টানতে টানতে শেষের দিকে দীর্ঘ একটি গুররর শব্দ তুলে শূন্যে ধোঁয়া ছাড়তে ছাড়তে যাদু মিয়া হঠাৎ কথা বলে ওঠে, বুঝলি মামু! কাম একটা আছে! বছর কামলার মতন। ট্যাহা-পইসা কি দিবো হেইডা লইয়া কোনো কতা অইছে না!

যাদু মিয়ার কথা শুনে ভেতরে ভেতরে বেশ আগ্রহী হয়ে উঠলেও মনু মিয়া কেমন শূন্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে যাদু মিয়ার মুখের দিকে।

যাদু মিয়া ছিলিম খুলে নিয়ে হুঁকোটা ফের বেড়ায় লটকিয়ে দিয়ে বাইরে গিয়ে ছিলিমের পোড়া তামাক ঝাড়ে। মাটিতে বার দুয়েক হালকা ভাবে আছড়ে ছাই আর পোড়া তামাকের গুঁড়ো ফেলে দিয়ে ফিরে এসে হুঁকোর নইচায় ছিলিমটা বসিয়ে দিয়ে মনু মিয়ার দিকে তাকিয়ে বললো আবার, বছর কামলার কাম বইল্যা তরে কইতাম যুত পাইতাছি না। অহন তুই কি কস?

ট্যাহা পইসা না পাইলে আমার এহানো আইয়া লাভডা অইলো কি?

তাইলে ল যাই! এক লগে সব কতা নিজের কানেও হুইন্যা আইবি!

মনু মিয়ার মনে হয় ব্যাপারটা অন্তত একবার হলেও দেখা উচিত। সে শুনেছে শহুরে মানুষ নিজেরা গরম ভাত খায় আর পাশেই দু-তিনদিনের বাসি অথবা পচা পান্তাভাত খায় কাজের মানুষ। বাইরের ঠাঁট বজায় রাখার জন্য মানুষ যে কত রকম চালাকি আর প্রতারণার আশ্রয় নেয় তার কিছুটা হলেও নিজের চোখে দেখতে পাবে। এতদিনকার শোনা কথার সঙ্গে বাস্তবের মানুষগুলো কেমন সেটাও মিলিয়ে দেখার একটি আগ্রহ তৈরী হয় তার মনে। কিন্তু মনের কথা মনে চেপে রেখেই সে তার মামা যাদু সরকারের সঙ্গে রাস্তা পাড়ি দিতে থাকে।

খুব বেশিক্ষণ হাঁটতে হয় না তাদের। একটি দেয়াল ঘেরা বাড়ির কাছাকাছি পৌঁছে যাদু সরকার বললো, আইয়া পড়ছি মামু! দুই বুড়াবুড়ি ছাড়া বাইত কেউ নাই! কয়ডা গরু-ছাগল আর হাঁস-মুরগি আছে হুনছি।

তাইলে কী কাম করন লাগবো?

যাই না আগে। এর পরে জানন যাইবো কী কাম করাইবো?

বড়সড় বন্ধ লোহার গেটের ফাঁকে উঁকি মেরে যাদু সরকার বললো, কেউ আছেননি?

কেরে?

ভেতর থেকে কারো কর্কশ কণ্ঠ ভেসে এলে যাদু সরকার মনু মিয়াকে বললো, আর কদ্দুরা সবুর কর!

ক্ষানিক পর বড় গেটের মাঝে একটি ছোট জানালার মত দরজা খুলে একজন মাঝ বয়সী লোক মুখ বাড়ায়। কারে চাই? কোন কামে?

যাদু সরকার জানায়, আমি যাদু সরকার। কয়দিন আগে চাচার লগে কতা অইছে। আমার আওনের কতা আছিল।

খাঁড়াও। আমি আগে জিগাইয়া আই!

মনু মিয়া এবার তার কৌতুহল দমিয়ে না রাখতে পেরে বলে ফেলে, এত বড় বাইত বুড়াবুড়ি করে কি? পোলাপাইন নাই?

আছে রে! হুনছি সবেই বড়বড় চারকি করে। জাফান-আম্রিকা থাহে।

এই ব্যাডায় তাইলে ক্যাডা?

চহিদার।

বুড়াবুড়ি কোট্টেকোট্টে কষ্ট না পাইয়া পোলা-মাইয়াগ কাছে গেলেগাইত্তো পারে! কি, পারে না?

যাদু সরকার হুঁহ বলে একবার হাসে। মনু মিয়ার জিজ্ঞাসার কোনো জবাব দেয় না।
ঠিক তখনই আধা মানুষ উচ্চতায় আরেকটি দরজা খুলে লোকটি মাথা বের করে বলে, ভিতরে আইও!

তারা ঢুকেই বিস্তীর্ন ঘাসের ওপর পেতে রাখা টেবিল-চেয়ার নিয়ে বসে থাকা দুজন বেশ বয়স্ক নর-নারীকে দেখতে পায়। এত বয়সে নর-নারী কেউ এতটা সুন্দর আর মায়াকাড়া হতে পারে তা যেন ভাবনায় ছিলো না মনু মিয়ার। অথচ মত্যুর আগে তার নানি অনেক বয়স হওয়ার কারণে শেষ দিকে আর হাঁটাচলা করতে পারতেন না। দীর্ঘদিন বিছানায় গড়াগড়ি খাচ্ছিলেন বলে, কাউকে ডাকলে সে না শোনার ভান করে সরে যেতো। এ করে করে বিছানা আর পরনের কাপড় প্রায়ই নষ্ট করে ফেলতেন।
দুর্গন্ধে কাছে যাওয়া যেতো না। তবু অসহায় অবস্থা দেখে শেষ কদিন সে নিজেই তার নানির কাপড় বিছানা পরিষ্কার করা থেকে খাওয়ানো, প্রতিদিন গোসলের সময় ভেজা কাপড়ে শরীর মুছিয়ে দেওয়া, মাথায় নারকেল তেল দিয়ে চুল আঁচড়ে দেওয়া সহ সবই করেছে। এ নিয়ে অন্যান্যরা তাকে নানির সম্পদের লোভী বললেও তার নানি বেশ খুশি ছিলেন তার উপর। প্রতিদিনই দোয়া করতেন, তার যেন সব দিক দিয়ে উন্নতি হয়।

যদিও বর্তমানে তার ঘোরতর দুর্দশা চলছে, তবুও সে বিশ্বাস করে মানুষের দোয়া, মন থেকে কারো জন্য কিছু চাওয়া বিফলে যায় না। সে শুনেছে যে, তাদের এলাকার মুন্সীরা অনেক আগে মাটি কাটার কাজ করতো। গরুর গাড়ি চালাতো। কিন্তু সেই মুন্সীর কোনো এক বংশধরই নাকি তার মায়ের অথবা দাদির দোয়াতে জীবনে অঢেল সম্পদের মালিক হয়েছিলো। লঞ্চ থেকে স্টিমারেরও মালিক হতে পেরেছিলো। তাই সে মনেপ্রাণে বিশ্বাস করে য, তার নানির চাওয়া কিছুটা দেরি হলেও অপূর্ণ থাকবে না।
(চলবে)

পোস্টটি ১১ জন ব্লগার পছন্দ করেছেন

সকাল's picture


সাথে আছি, ভাই।

জুলিয়ান সিদ্দিকী's picture


জেনে মনে বেশ সাহস পেলাম। ধন্যবাদ।

নাজমুল হুদা's picture


অনেক দেরীতে এলেন । যাক, তবুও তো এলেন । আরও একটু লম্বা গল্প আশা করেছিলাম এবার । পরেরবার নিরাশ করবেন না । সাথে থাকবার নিশ্চয়তা । অনতিবিলম্বে পরের পর্ব দিন ।

জুলিয়ান সিদ্দিকী's picture


ভাইগো, সময়! সময়ের কারণে গল্প অল্প। পরের বার দুটো পরিচ্ছেদ একসঙ্গে দিতে চেষ্টা করবো।

অরিত্র's picture


চমৎকৃত হলাম

জুলিয়ান সিদ্দিকী's picture


চমৎকৃত হওয়া ভালো না। বিশেষ করে পাঠকদের। চমৎকৃত মানুষ নির্বাক হয়ে যায় বলে পাঠোত্তর মতামতটা পাওয়া যায় না।

টুটুল's picture


আপনার লেখা একটু সময় নিয়ে পড়তে হয়। লেখার ব্যাপ্তি অনেক বড় থাকে... কল্পনায় অনেক জায়গা নেয় Smile

সঙ্গে আছি ... চলুক কিন্তু

পিকনিকে আসেন

জুলিয়ান সিদ্দিকী's picture


‌আমি যেই সেই দেশে থাকি না, হুঁহুঁ! আপনি যদি আসা-যাওয়ার পেলুন টিকেটও দেন, তবুও আশা দেখি না। এই দেশের নাম আরব!

এইবার আপনারা যান। পরের কোনোবার হয়তো আমিও থাকবো।

সঙ্গে থাকার জন্য ধন্যবাদ।

তানবীরা's picture


এতো দেরীতে দিলে আগের পর্ব ভুলে যাই।

চলুক

১০

জুলিয়ান সিদ্দিকী's picture


তাইলে তো আরো ভালো। প্রতিবারই শুরু থেকে পড়তে পারবেন। Big smile

১১

শওকত মাসুম's picture


এতো দেরীতে কেন?

১২

জুলিয়ান সিদ্দিকী's picture


দেরি হয়ে যায়- তাই! Smile

১৩

থিও's picture


Smile Smile

১৪

জুলিয়ান সিদ্দিকী's picture


Big smile

মন্তব্য করুন

(আপনার প্রদান কৃত তথ্য কখনোই প্রকাশ করা হবেনা অথবা অন্য কোন মাধ্যমে শেয়ার করা হবেনা।)
ইমোটিকন
:):D:bigsmile:;):p:O:|:(:~:((8):steve:J):glasses::party::love:
  • Web page addresses and e-mail addresses turn into links automatically.
  • Allowed HTML tags: <a> <em> <strong> <cite> <code> <ul> <ol> <li> <dl> <dt> <dd> <img> <b> <u> <i> <br /> <p> <blockquote>
  • Lines and paragraphs break automatically.
  • Textual smileys will be replaced with graphical ones.

পোস্ট সাজাতে বাড়তি সুবিধাদি - ফর্মেটিং অপশন।

CAPTCHA
This question is for testing whether you are a human visitor and to prevent automated spam submissions.

বন্ধুর কথা

জুলিয়ান সিদ্দিকী's picture

নিজের সম্পর্কে

অনেক কিছুই করতে মন চায়। কিন্তু লেখলেখিতে যে আনন্দটা পাই তার তুলনা খুব কম আনন্দের সঙ্গেই চলে।