ইউজার লগইন

জীবিকা অথবা জীবন- ৫

রান্নাঘরে খুটখাট শব্দ শুনে মনু মিয়া এগিয়ে গিয়ে দেখলো সালমা বেগম একটি টিন হাতে নিয়ে কিছু করছেন। হয়তো খুলতেই চেষ্টা করছিলেন। তা দেখে সে বললো, নানি আমি কিছু করনের আছে?

করলে তো অনেক কিছুই করা পারছ।

কন কি করন লাগবো? বলতে বলতে এগিয়ে গিয়ে সালমা বেগমের পাশে দাঁড়ায় সে।

তিনি টিনটা এগিয়ে দিয়ে বললেন, এইটার ঢাকনাটা দেখ দেখি খোলা পারছ কি না!

চুলোর পাশেই পেতলের একটি খুন্তি পড়েছিলো মেঝেতে। সেটি তুল নিয়ে টিনের ঢাকনার পাশে লাগিয়ে সামান্য চাড় দিতেই সেটা উঠে এলো। সালমা বেগম খুশি হয়ে বললেন, আরে করছস কি? এই বুদ্ধিটা তো আমারও জাননের কথা আছিলো!

মনু মিয়া হাসে। বলে, নানি, অহন আফনের বুদ্ধিরও বয়স অইছে। এইসব ছোডমোডো বুদ্ধি আফনের মাতাত কাম করে না!

ঠিকই কইছসরে! আমার বয়স হইছে। এই কথাটা মনে থাকে না। অনেক বছর ধইরা নিজে নিজেই সব করতাছি তো, তার লাইগ্যা বুঝা পারি না!

টিনের ঢাকনা খুলে এগিয়ে দেওয়ার সময় মনু মিয়া টিনের ভেতরে তাকিয়ে দেখলো অনেকগুলো সিমের বিচি। আর তা দেখতে পেয়ে তার মনে হলো এত বড় বাড়ি, কত জায়গা এমনি এমনি খালি পড়ে আছে। অথচ শীত চলে গেলেও সিম লাগানোর কথা মনে হয়নি কারো। তার বেশ খারাপ লাগতে লাগলো। বললো, নানি, ঘরে সিমের বীজ আছে, লাগাইলেন না?

এইগিলা তো আমার গাছেরই সিমের বীজ। এইবার শইলে তাল পাইনাই।

সে বুঝতে পারলো, শহরের মানুষ হলেও তিনি সংসারী। মাটি বুঝেন। ফসল বুঝেন। সে মনেমনে ঠিক করে ফেলে যে, এখন থেকে এ সংসারের ভালোর জন্য বিনা খরচের কিছু করতে হলে আর কাউকে জিজ্ঞেস করবে না। সে ফের জিজ্ঞেস করলো, সিমের বীজ দিয়া করবেন কি?

ভিজামু। তারবাদে বালুতে ভাজমু!

এ কথা শুনে কেমন অবাক হয়ে তাকায় সে সালমা বেগমের মুখের দিকে। আর তার অবাক দৃষ্টি দেখেই যেন তিনি তার মনোভাব আঁচ করতে পেরে বললেন, তুই কি মনে করছস এই বুড়ির দাঁত নাইকা? আমগো দুইজনরে দেখলে কি তর এমনই মনে হয়?

মনু মিয়া এ কথার জবাব দেওয়া নিরাপদ মনে করে না। সে কথা ঘুরিয়ে বলে, না, মনে করলাম হুঁটকি দিয়া রানবেন!

তর নানা ওইসবের বাস হুনবার পারে না বইল্যা আনে না। আমিও রান্দি না। রান্দা জানিও না। তয় কি জানস? এইসব শুটকি খাইবার মন চায়। কিন্তু কেমনে খামু ক? পাইলে তো!

এ কথা শুনে বিপুল আগ্রহে সে বলে উঠলো, আমি কিছু কিছু রান্দা জানি! মারে দেখছি সিমের বীজ দিয়া হুটকি রানতে!

সালমা বেগম কৌতুহল নিয়ে তাকান মনু মিয়ার দিকে। বলেন, হাচা কথা? তুই রান্দা জানস?

কিছু কিছু জানি! বলে দাঁত বের করে বোকার মত হাসতে থাকে সে।

তাইলে ক তো হুনি, কি কি রান্দা পারছ?

এবার খানিকটা বিভ্রান্ত দেখা যায় মনু মিয়াকে।

কি? রান্দা পারলে চুপ কইরা আছস কেন?

আমরা অইলাম গ্যারাইম্যা মানু। আমগো রান্দা কি আর আফনেরা সাব মানষ্যে খাইতারবেন?

আরে ছেরা ক না হুনি! তুই রান্দা পারলে তো মাঝে মইধ্যে আমি বিছনা থাইক্যা উঠা না পারলে চাইরটা ভাত পাকাইতে পারবি! হোটেল থাইক্যা ভাত-তরকারি কিনা আননের থাইকা তো ভালো হইবো। নাকি কস?

যদিও সালমা বেগমের জন্ম-বৃদ্ধি-বাস শহরেই। তবুও ছোটবেলা মাঝেমধ্যে নানার বাড়ি যেতেন মায়ের সঙ্গে। তার গ্রাম প্রীতিকে পছন্দ করতেন না সালমা বেগমের বাবা কালেক্টর অফিসের মেজবাবু সামসুদ্দিন চৌধুরী।

তিনি মাঝে মধ্যে কোনো কাজে কলকাতা গেলে পরদিনই মা তার হাত মুঠো করে ধরে গ্রামের বাড়ি ছুটতেন। ফিরে আসতেন তার বাবা ফিরে আসার আগেই। নানি অথবা বড় মামির হাতের রান্না, কি মাছ, কি গোস্ত, এমনকি শাক-শুঁটকি যাই রান্না করতেন তাই যেন অসাধারণ স্বাদ-গন্ধে মন ভরিয়ে দিতো। হিন্দু-মুসলিম দাঙ্গার সময়, কে কোথায় ছিটকে গেলেন, জীবীত কি মৃত তারও কোনো হদিস পাননি। সালমা বেগম কী করে যে এ বাড়িতে এসে জুটেছিলেন তাও আজ আর মনে করতে পারেন না। মনে করতে পারেন না সেই নদীটির নাম। মায়ের সঙ্গে নানার বাড়ি বলতে কোন গ্রামে যেতেন। ঘোড়াগাড়ি চড়ে দীর্ঘ একটি সময় চলার পর লঞ্চে উঠতেন। তারপর আরো দীর্ঘ সময় পর তারা দুটো কাঠের উপর দিয়ে হেঁটে নদীর তীরে নেমে পড়তেন। ক্ষেতের আইল ঘুরে ঘুরে পথ চলতে চলতে গাছ-গাছড়ার নিবিড় ছায়া ঢাকা একটি গ্রামের ভেতর দিয়ে পৌঁছে যেতেন নানার বাড়ি। শুধু আবছা মত মনে পড়ে একটি নদী। অনেকগুলো নৌকা। লঞ্চ আর স্টিমার আসা যাওয়া করতো সে নদীতে। মাঝে মাঝে স্টিমারের ভেপু শুনে জেগে উঠতেন মাঝরাতে।

মনু মিয়া জিভ দিয়ে একবার তার নিচের ঠৌঁট চাটে। বলে, ভাত-ডাইল, মাছ-গোস সালুন, ভর্তা-শাকপাতা!

তাইলে তো ভালাই পারস মনে কয়! কবে রাইন্দা খাওয়াবি ক!
মুরগা রান্দা পারস?

মনু মিয়া সম্মতির ভঙ্গীতে মাথা দোলায়।

তাইলে আইজই তোর রান্দার পরীক্ষা হইয়া যাউক!

মনু মিয়া সে কথার জবাব না দিয়ে খানিকটা ইতস্ত করে বললো, নানি, বিয়ানে আফনেরা কিছু খান না?

খাই তো! সকালে চা-নাস্তা করি। তর নানা ফজরের নমাজ পড়বার গেলে ফিরনের সময় হোটল থাইকা নাস্তা কিনা আনে। আমি ততক্ষণে চা বানায়া থুই। তারপর তিনি কিছুটা সন্দেহের দৃষ্টিতে তাকিয়ে বললেন, এই কথা জিগাছ কেন? তর কি ক্ষিদা লাগছে?

ভোর বেলা ঘুম ভাঙার কিছুক্ষণ পরই তার বেশ ক্ষুধা লাগে। সে সময় সে রাতের বেলা রেখে দেওয়া ভাত খায়। কিন্তু এখানে এত বেলা হয়ে গেল এখনও খাওয়ার কোনো সম্ভাবনা দেখছে না। তাই সে বললো, বিয়ান বেলা ঘুম ভাঙলে আমার জব্বর ভোক লাগে!

তাইলে ফ্রিজে দেখ কাইলকার ভাত-তরকারি আছে। গরম কইরা খাইয়া ল!

মনু মিয়া অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকে সালমা বেগমের মুখের দিকে। কোথায় ভাত-তরকারি রাখা আছে কথাটা সে বুঝতে পারেনি। সে ভাবে কথাটা আবার জিজ্ঞেস করবে কিনা।
তাকে চুপ করে থাকতে দেখে তিনি বললেন, আয় আমার লগে!

তিনি বড় একটি ঘরের ভেতর ঢুকতেই মাঝখানে একটি বিশালাকৃতির টেবিল দেখতে পেলো। টেবিলটার চারদিকে বেশ কটি চেয়ার। এ ঘরটি আগে দেখেনি সে। এখানে আসার কোনো প্রয়োজনই পড়েনি। একটি বড়সড় সাদা বাকসের দরজা খুলে সালমা বেগম বললেন, দুটো ছোট ছোট ঢাকনাঅলা পাত্র দেখিয়ে বললেন, এই দুইটা বাইর কর। সব পরিষ্কার কইরা খাবি কইলাম। খাওয়া হইলে ডিশ দুইটা ধুইয়া পরিষ্কার কইরা থুবি!

পাত্র দুটো বের করার জন্য বাকসটার ভেতরে হাত ঢুকাতেই তার মনে হলো বাকসটার ভেতর দিকটা বেশ ঠাণ্ডা।

(চলবে।)

আগের পোস্টগুলো:
http://amrabondhu.com/juliansiddiqi/2046
http://amrabondhu.com/juliansiddiqi/2058
http://amrabondhu.com/juliansiddiqi/2137
http://amrabondhu.com/juliansiddiqi/2178




পোস্টটি ১৪ জন ব্লগার পছন্দ করেছেন

টুটুল's picture


সাথে আছি কিন্তু Smile

লেখার শেষে পূর্বের লিংক গুলো দিয়ে দেয়া যায়?

জুলিয়ান সিদ্দিকী's picture


ধন্যবাদ। দিয়ে দিলাম। কিন্তু লিঙ্ক দেওয়াটা সুবিধার হলো না।

লিজা's picture


মানুষকে মানু বলে বরিশালের দিকে। কুমিল্লায়ও বলে নাকি? আজকে প্রথম পর্ব থেকে পড়ে আসলাম। ভালো হচ্ছে। তবে ভাষাগুলো জট পাকিয়ে যাচ্ছে মাথায়।

জুলিয়ান সিদ্দিকী's picture


শুধু কুমিল্লা , বরিশাল নয়। চিটাগাঙ বি বাড়িয়ার কোথাও, আবার ময়মনসিং এর কোথাও কোথাও।

ভাষাগুলো মানে- সংলাপ নাকি লেখার ধরনটা?

মীর's picture


ভালু লাগলু। অসংখ্য ধন্যবাদ।

জুলিয়ান সিদ্দিকী's picture


ধইন্যাপাতা!

নাহীদ Hossain's picture


ভাল হচ্ছে। পরেরটুকু পড়ার আকর্ষন পাচ্ছি

জুলিয়ান সিদ্দিকী's picture


ধন্যবাদ। জেনে ভালো লাগলো।

জ্যোতি's picture


ভালো লাগছে।

১০

জুলিয়ান সিদ্দিকী's picture


ধইন্যা।

১১

নাজমুল হুদা's picture


এগিয়ে যান । সাথে আছি ।

১২

জুলিয়ান সিদ্দিকী's picture


অনেক ধইন্যাপাতা।

১৩

তানবীরা's picture


পরের পর্বের জন্য অপেক্ষায় Laughing out loud

১৪

জুলিয়ান সিদ্দিকী's picture


ধইন্যাপাতা এক গোছা।

১৫

থিও's picture


মুরগা রান্দা পারস!

মনু মিয়া মাথা নাড়ালো। নাড়ালো কি হ্যা বুঝাইতে নাকি না বুঝাইতে

১৬

জুলিয়ান সিদ্দিকী's picture


ফাঁকি দিছেন বুঝাই যায়।

মনু মিয়া জিভ দিয়ে একবার তার নিচের ঠৌঁট চাটে। বলে, ভাত-ডাইল, মাছ-গোস সালুন, ভর্তা-শাকপাতা!

-যেহেতু গোস-এর কথা আছে। মাথা নাড়াটাও সম্মতির পর্যায়ে পড়ে। তবুও যখন জটিল মনে হয় মাথা নাড়ানোর জাগায় সম্মতি যোগ কইরা দিলাম।

মন্তব্য করুন

(আপনার প্রদান কৃত তথ্য কখনোই প্রকাশ করা হবেনা অথবা অন্য কোন মাধ্যমে শেয়ার করা হবেনা।)
ইমোটিকন
:):D:bigsmile:;):p:O:|:(:~:((8):steve:J):glasses::party::love:
  • Web page addresses and e-mail addresses turn into links automatically.
  • Allowed HTML tags: <a> <em> <strong> <cite> <code> <ul> <ol> <li> <dl> <dt> <dd> <img> <b> <u> <i> <br /> <p> <blockquote>
  • Lines and paragraphs break automatically.
  • Textual smileys will be replaced with graphical ones.

পোস্ট সাজাতে বাড়তি সুবিধাদি - ফর্মেটিং অপশন।

CAPTCHA
This question is for testing whether you are a human visitor and to prevent automated spam submissions.

বন্ধুর কথা

জুলিয়ান সিদ্দিকী's picture

নিজের সম্পর্কে

অনেক কিছুই করতে মন চায়। কিন্তু লেখলেখিতে যে আনন্দটা পাই তার তুলনা খুব কম আনন্দের সঙ্গেই চলে।