জীবিকা অথবা জীবন- ৬
চারটা মোরগ আর ষোলোটা মুরগির ভেতর দশটা মুরগি ডিম দেয়। প্রতিদিন সকালে গোয়াল ঘরের কাজ সেরে গুনেগুনে মোরগ মুরগিগুলোকে পাশের দেয়ালের সঙ্গে লাগানো তিনদিকে তারের জাল দিয়ে ঢাকা আলাদা খাঁচায় ঢুকিয়ে দিয়ে খুদ-কুঁড়ো খেতে দিয়ে মুরগির খোঁয়াড় পরিষ্কার করার আগে ডিম আছে কি না উঁকি মেরে দেখে মনু মিয়া। সে এখানে আসার আগে সব ডিম নিয়ে যেতো আজগর চকিদার। রহমান সাহেব আর সালমা বেগম স্বাস্থ্য আর বয়সের কারণে ডিম-দুধ খাওয়া ছেড়ে দিয়েছেন অনেক দিন।
মনু মিয়া অবাক হয়ে বলেছিলো, কন কি নানি? মুরগার পিছে যত খাওন খরচ যায় হেই ট্যাহা ডিমা বেইচ্যাই পাওনের কতা! চহিদাররে দিলে খরচ কমলো কেমনে?
মনু মিয়ার কথা শুনে সালমা বেগম হাসতে হাসতে বাঁকা হয় যান। শেষে রহমান সাহেবকে ডেকে বলেন, মন্টুর বাপ হুনছো পাগলের কথা?
রহমান সাহেব স্ত্রীর কথা বুঝতে না পেরে বলেন, কোন কথা?
তিনি মনু মিয়াকে দেখিয়ে বললেন, এই পাগলে কয়, আণ্ডা বেইচা মুরগার খাওন কিনা আনবো!
স্ত্রীর কতা শুনে হাসিমুখে রহমান সাহেব বললেন, কথা তো ঠিকই কইছে! খুদ-কুঁড়া কিনতে বিশ-পঁচিশ ট্যাকার কম লাগনের কথা না। হিসাব কইরা দেখছো কতট্যাকা যায়? পোলায় কথা তেমন ভুল কয় নাই!
সালমা বেগম ফের হাসতে হাসতে বলেন, কে বেচবো, তুমি? রাস্তায় ঘুইরা ঘুইরা চিল্লাইবা আণ্ডা রাখবেন, আণ্ডা!
হুন বউ, হাসনের কথা না কইলাম। আমরা কি ঘরে ঘরে দুধ বেচতে যাইতাম? পারুলের মায় আইসা দুধ দোয়াইয়া মাইপ্যা নিয়া যাইতো না? হ্যায় কি তোমারে দুধের ট্যাকা দিতো না? এমন কারু লগে কথা কইয়া নিলেই হইবো। তিন-চাইরদিন পরপর আইসা আণ্ডা নিয়া গেল!
তাইলে যার ব্যবস্থা তারে করতে কও! বলে, সালমা বেগম রান্নায় মনোযোগ দিয়েছিলেন।
রহমান সাহেব বলেছিলেন, কাইলকা তুই আমার লগে বাজারে যাবি। নাইলে রাস্তার মোড়ে যেই মুদি দোকানটা আছে না, দোকানদারের লগে কথা কইয়া লবি। হ্যায় যেই দামে কিনে তুইও তারে হেই দামে দিয়া দিলি!
আমগো গ্যারাম এমন না। দুই-তিন দিনে ডিমা ব্যাহারি আইয়ে। বাড়ি বাড়ি ঘুইরা ডিমা কিন্যা নেয়। কোনো কোনো বাইত থাইক্যা একটা ডিমাও কিনে।
এমন চমৎকার একটি ব্যাপার জানা ছিলো না রহমান সাহেবের। বললেন, এমন হইলে তো ভালাই অইতো।
পরদিনই বাজারে গিয়ে ডিম বিক্রতাদের সঙ্গে কথা বলে তেমন একটা পাত্তা পায় না মনু মিয়া। শেষে রাস্তার মোড়ের বুড়ো মুদি দোকানী ইসুব মিয়ার সঙ্গেই কথা পাকা করে আসে। আর এ কথা কোনোভাবে জানতে পেরে আজগর চকিদার রান্নাঘরের দরজায় দাঁড়িয়ে বললো, আম্মায় কি গরিবের প্যাডে লাত্থি দিতে পারলেন?
সালমা বেগম অবাক হয়ে বললেন, এইটা কেমন কথা কইলি তুই? তোর প্যাটে লাথি মারলাম ক্যামনে?
আজগর সালমা বেগমের দিকে মুখ তুলে তাকায় না। হয়তো তার ভেতরকার ক্রোধ দৃষ্টিকেও আচ্ছন্ন করে থাকতে পারে। তাই তার চোখ তুলে তাকানোর সাহস হয় না। বলে, আণ্ডাগুলা আমি নিতাম। মনু মিয়ার কথায় বুদ্ধি বদলায় ফালাইলেন। আমার অন্যায়ডা কি?
সালমা বেগম এবার বুঝতে পারেন যে, আজগরের মূল রাগ মনু মিয়ার ওপর। তাই কৌশলে মনু মিয়ার ওপর দোষটা চাপিয়ে দিলো। তবে, আজগর অনেকদিন ধরেই এখানে আছে। বলতে গেলে কিশোর বয়স থেকেই। কিন্তু মনু মিয়ার মন মানসিকতা আর আজগরের মন মানসিকতায় অনেক প্রভেদ। মনু মিয়া যতটা আন্তরিকতা নিয়ে কাজকর্ম করে তার মাঝে এমনটা কখনোই দেখা যায়নি। সুতরাং আজগরকে গুরুত্ব দেওয়ার কোনো মানে নেই। তাই তিনি কিছুটা রুক্ষস্বরে বললেন, তোরে কি মাসে মাসে বেতন দেই না? দুই ঈদে নতুন কাপড় দেই না? বেতনের পরেও তিনবেলা ডাইকা আইনা খাইতে দিয়াও যদি তর মনে হয় যে, প্যাটে লাত্থি মারতে পারি, তাইলে তর মত এমন নিমক হারাম আমার বাইত্যে থাকনের কাম নাই!
রহমান সাহেব স্ত্রীর উচ্চকিত কণ্ঠস্বর শুনতে পেয়ে ছুটে এলেন। উচ্চ রক্তচাপের রোগি এভাবে রাগারাগি করলে বিপদের সম্ভাবনা বেড়ে যায়। তাই তিনি রান্না ঘরের দিকে এগিয়ে এসে বললেন, এত চ্যাতলা কেন? তারপর আজগরের দিকে তাকিয়ে বললেন, কি কইছছ তুই?
আজগর কোনো জবাব না দিয়ে তেমনি আনত দৃষ্টিতে দাঁড়িয়ে থাকে।
সালমা বেগম বললেন, মুরগির আণ্ডা দেওন বন্ধ হইছে দেইখ্যা তার জিগরে লাগছে। কয় প্যাটে লাত্থি মারছি! এমন নিমক হারামরে কামে রাখলেও আরো বিপদ হইবো! এইটারে বিদায় করনের ব্যবস্থা কর! গতরে চর্বি হইয়া গেছে!
হয়তো প্রসঙ্গ থেকে দূরে নিতেই রহমান সাহেব বললেন, তরে যে কইছিলাম রাজমিস্ত্রিরে খবর দিতে, কইছিলি?
নাহ! গিয়া হুনি কামে গেছে!
তরে না কইছিলাম সক্কাল সক্কাল যাইতে!
আমি যাওনের আগেই হ্যায় বাইর হইয়া গেছে।
রহমান সাহেব খানিকটা বিরক্ত হয়ে বললেন, তরে এত কইরা কই, তাও যদি কোনো একটা কাম ভালা মতন করতে পারতি!
আজগর চুপচাপ থাকলে রহমান সাহেব বললেন, সন্ধ্যার সময় আবার যাবি। কাইল সক্কাল সক্কাল আইয়া পড়তে কবি! তারপর তিনি ফের বলেন, মনে থাকবো তো? নাকি ইয়ার-দোস্তরা গেইটের সামনে আইলে সব ভুইল্যা যাবি?
না। ভুলুম না!
মনে কইরা কইস। বিষ্টি-বাদলার দিন আইতে বেশি দেরি নাই!
আজগর দাঁড়িয়ে থাকলে, তিনি আবার জিজ্ঞেস করেন, কিছু কইবার চাস?
দশটা ট্যাকা যদি দিতেন!
দশট্যাকা দিয়া করবি কি? আর যা তর বেতন সব নিয়াও আরো বিশট্যাকা বেশি নিয়া নিছস! পুরা মাসতো পইরাই থাকলো!
এবার আজগর চোখ তুলে তাকায়। বলে, শেষবার দেন, এই মাসে আর চাইতাম না!
রহমান সাহেব হেসে উঠে বললেন, আগেও তো এই কথাই কইছিলি!
আজগর কিছু না বলে মাথা চুলকায়।
(চলবে)





ভালোই এগোচ্ছে। বুড়ো মানুষ দুজন কত একা।
(
মানুষ বয়স্ক হলে যে কতটা একা হয়ে যান অনেকের ছেলেমেয়ে-নাতিনাতনীরা বোঝেন না। বৃদ্ধ বয়সে ওরা অন্যান্যদের মনোযোগ প্রত্যাশা করেন। এবং সেটা কখনোই প্রকাশ করতে চান না। নাজমুল ভাইয়ের পিকনিক স্পটে ব্যাগ মাথার নিচে দিয়ে শুয়ে থাকার ছবিটা যদি এখন দেখেন তাহলে আপনি কষ্ট পাবেন। কারণ বয়স্কদের নিয়ে কিছুটা হলেও ভাবনা আপনার মাঝে আছে বলে মনে করি।
দুই বয়স্ক মানুষের প্রতি আপনার মনোযোগের জন্য আপনাকে অভিবাদন।
আপনি আমার ছবি দেখে কষ্ট পেয়েছেন ? আমি আপনাকে বা আপনার ছবি দেখতে পেলে আনন্দিত হতাম ।
এই সিরিজটার জন্য অপেক্ষায় থাকি। কাহিনী জমাট বাঁধছে। চালিয়ে যান জুলিয়ান ভাই।
অনেক ধন্যবাদ। আপনাদের কয়েকজনের অপেক্ষা আমার জন্য অনেক বড় ব্যাপার।
সংলাপে স্বকীয়তা। ভাল লাগল।
ধন্যবাদ।
এই সিরিজটার জন্য অপেক্ষায় থাকি। আর একটু রেগুলার যদি দিতেন ----------
সুযোগ পইলেই তো দিয়া ফালাই।এ্ই যেমন আগে পোস্ট, পরে কমেন্ট।
সালমা বেগম আর রহমান সাহেবের মুখে বোধহয় প্রমিত মানাতো ভাল । মুরগিদের ডিম পাড়ার ব্যাপার অন্যরকম, দিনে পাড়ে বলে জানতাম ।
প্রতীক্ষা পরের পর্বের ।
ঈমানে কনচাইন নাতনির লগে প্রমিত ভাষায় কথা কননি?
আমার মনে হয়একান্ত নিজস্ব বলয়ে কেউ প্রমিত ভাষায় কথা বলে না।
আমাদের প্রমিত ভাষাটা মনে হয় এখনও ঠিক হয় নাই। আর চলিত ভাষা যেটা সেটাকে অনেকেই বলেন ঘটিদের ভাষা।
গল্পে মনু মিয়া কিন্তু উঁকি দিলেও ডিম দেখেনাই। আর আমরা ছোটবেলায় সকালেই তো মুরগির খোঁয়াড়ে উঁকি মারতাম! ডিমও পাইতাম। তবে, হাঁসের না মুরগির মনে নাই।
আমাদের ঘরের ভাষা অনেকটা্ই ঘটি । তাই....
সকালে হাসেঁর ডিম --- আমার মনে আছে ।
যারা ওপাররে মানুষ তাদের ছাড়া আর কেউ সে ভাষায় কথা বলে না। অবশ্য অনেকে নিজের পরিবারের লোকা ছাড়া অন্যদের সঙ্গে চলিত রূপে কথা বলে। এখন যে ভাষায় কমেন্ট করছি সে ভাষায় আমি কথা বলতে পারি না। আর চেষ্টা করলে জানতে চায় আমি ঘটি কি না।
ছুটিতে দেশে গেলে ডিমের ব্যাপারটা পরীক্ষা করে দেখবো।
আমার চৌদ্দ পুরুষ এপারের । তবে ওপারের বেশ কাছাকাছি । সুযোগ হলে আপনাকে আমার বাসায় নিয়ে এসে আমাদের ঘরের ভাষা শুনাবার ব্যা্বস্থা করা হবে ।
ডিমঃ ঠিকাছে দেখে এসে জানাবেন । আমারও ছোটবেলার স্মৃতি ।
অপেক্ষা পরের পর্বের....।
দিয়ালাইছি!
যাক, এই পর্ব আগের তুলনায় তারাতারি এল
এর পরেরটা আরো তাড়াতাড়ি দিলাম। সময় পাইলেই লিখ্যা ফালাই!
মন্তব্য করুন