ইউজার লগইন

একটুখানি ছোটবেলা ২

শীত শেষ হয়ে আসছে । আর মাত্র কদিন পরেই ফাল্গুন । চারিদিকে ফাগুনের প্রস্তুতি শুরু হয়ে গিয়েছে । কোন এক নিবিড় আঁধারে লুকিয়ে থাকা সবুজ পাতার ঝাঁক উঁকি দিয়ে দেখছে এই প্রাচীন বৃদ্ধা ধরণীকে । সেই সাথে বিদায় নেবে পুরনো শুকনো পাতারা । সবাই ভুলে যাবো বিগত শীতের যত কষ্টগুলো । কষ্ট ভুলানোর জন্যই হয়তো প্রকৃতি দান করে এই সুদর্শন স্নিগ্ধ ঋতুকে ।
অনেক ছোট বেলায় যখন চিনতামনা ফাল্গুন বা হেমন্ত , শুধু বুঝতাম শীত, গ্রীষ্ম আর বর্ষা । আর জানতাম শুকনো পাতা ঝরা শেষ হলে আসবে নতুন পাতা গজানোর দিন । বাতাসে মৌ মৌ ঘ্রাণ । তখন যে , আমের ফুল ফোটারও দিন । আর সেই পাগল করা ঘ্রাণ আসে আমের মুকুল থেকে ।
পহেলা ফাল্গুন আমাদের পালন করা হত না । আমরা বৈশাখের প্রথম দিনটিকেই যা একটু আদর আপ্যায়ন করতাম । তবে ফাগুন আমাদের একটা জিনিস মনে করিয়ে দিত তা হল , আর কদিন পরেই একুশে ফেব্রুয়ারী । মনে মনে পরিকল্পনা করতাম , শহীদ মিনারে দেবার জন্য ফুল জোগাড় হবে কোত্থেকে । আমরা ছাদে মাটি জমিয়ে শুধু গাঁদা ফুল ফোটাতাম । অনেক চেষ্টা করেও গোলাপ ফুটত না সেখানে । আর ছিল রজনীগন্ধা । সেই গাঁদা ফুল আবার চুরি হয়ে যেত । যার ফলে একুশে ফেব্রুয়ারী পর্যন্ত ফুল বাঁচিয়ে রাখা ছিল আমাদের জন্য যুদ্ধ জয়ের মতই একটা ব্যাপার ।
সেই সামান্য গাঁদা আর কোন এক সরকারী বাগান থেকে চুরি করা দু একটা দামী ফুল দিয়েই হত আমাদের শ্রদ্ধা নিবেদন । তখন কি আর জানতাম , চুরি করা দ্রব্য দিয়ে অন্তত শ্রদ্ধা নিবেদন হয়না । সামান্য একটা ফুল দিয়েই ভালোবাসা জানানো যায় ।
কিন্তু তখন তো আমাদের ফ্যান্টাসীর দিন । কোন নীতি , নিয়ম আমরা বুঝতে চাইতামনা । সারাক্ষন উড়ে বেড়াতেই বেশী ভালো বাসতাম । তখন মুগলী আর টারজানের আশ্চর্য জগত নিয়ে গভীর জ্ঞ্যানগর্ভ (!) আলোচনাই ছিল প্রধান বিষয় । আর একটু বড় হয়ে স্পেল বাইন্ডার আর ওশান গার্ল !! এই ছিল তখনকার আমাদের জগত । সেই জগতের আর একটি মজার উপাদান ছিল বই । এর বই ও নিয়ে , ওর বই এ নিয়ে পড়ছে তো পড়ছেই । ফেরত দেবার নাম নেই । কেউ ফিরিয়ে নেয়ও না । কেউ এসে খোঁজ দেয় , কার বাড়িতে দেখে এসেছে ট্রাংক ভর্তি বই , তালা মেরে রেখে দিয়েছে । সেগুলো কি ? তিন গোয়েন্দা !! খাইছে !! মুসার ডায়ালগ দিয়ে কূট পরিকল্পনায় বসা , কিভাবে উদ্ধার করা যায় ওই গুপ্তধন ।
ছোট এক বিন্দুর মতই ছিল আমাদের সেই আনন্দ জগত । বিটিভি , স্কুল , খেলার মাঠ , বন্ধুর বাড়ি , একটু বন জঙ্গল , ব্যাস ! আমাদের এই জগত । আমরা তাই নিয়ে মহানন্দে মেতে থাকতাম দিনের পর দিন ।

এর মাঝেও কিছু কিছু কালো দাগ থাকত এদিক সেদিক । শোনা যেত , আট! বছরের মেয়ে আর নয়! বছরের ছেলে প্রেম করছে স্কুলের পাশে কোন এক ঝোপের মধ্যে Shock । আমরা যেয়ে ধরে বলতাম ' নাট বল্টু টাইট করে দেব , আর এসব করবি Angry ? কখনো আর দেখা যেতনা তাদের সেই প্রেম লীলা !! শত হলেও ছোট বাচ্চা তো , নিশ্চই বড় কাউকে দেখে শিখেছিল ওই সব ।
আবার হয়তো খবর আসত , কার নাম কার নাম যোগ দিয়ে দেয়াল ভরে ফেলা হয়েছে । তখন আমরা তেরো-চৌদ্দ । এসব বিষয় যেমন লজ্জার তেমন ছিল আশ্চর্যের । খাইছে !! কার নাম !! দেখতে গিয়ে কান নাক সব লাল করে ফিরে আসতাম । আমি কার কি ক্ষতি করলাম ? দেয়ালে যে আমার নামটাই জ্বলজ্বল করছে !! তারপর হয়তো কিছুদিন দুঃখে কষ্টে সেচ্ছা নির্বাসন At Wits End
আবার কিছুদিন যেতে না যেতেই শোনা যেত , অমুককে একটা চিঠি দিয়েছে তমুক । সেটা প্রেমপত্র ! অতি আশ্চর্য ! তমুক আবার প্রেম পত্রও লিখতে জানে । হাসাহাসি হত আমাদের বন্ধুদের মধ্যে Smile)
এসব যেইসেই খবরের মাঝেই আসত কারো পত্রিকায় লেখা ছাপা হওয়ার খবর । আমরা অবাক বিষ্ময়ে দেখতাম , কাগজে ছাপা হওয়া আমাদের সেই সাধারণ কারো লেখা । তারপর শয়নে স্বপনে সেই দৃশ্যই দেখতাম কয়েকদিন ধরে Rolling Eyes । নিজে উতসাহিত হতাম । খুব ইচ্ছা হত নিজের নাম পত্রিকায় ছাপার অক্ষরে দেখতে Waiting
আমাদের সেই সময়ে আর একটা ক্রেইজ ছিল কোন কিছু জমানো । আমি আর আমার বোন জমাতাম স্টিকার । বিভিন্ন ধরণের রঙ্গীন স্টিকারগুলোর প্রতি ছিল আমাদের অপরিসীম লোভ । অনেক কষ্টে টাকা জমিয়ে কেনা হত সেগুলো । তারপর যত্ন করে আটাতাম ডায়েরীর পাতায় । অদ্ভুত ছেলেমানুষি নেশা ছিল সেটা , যার কোন যৌক্তিকতা ছিলনা । আর ওই বয়সে যুক্তির ধারই বা কে ধারত । যেমন , ঘরে মেহমান । আম্মু একা হয়তো সামলাতে পারবেনা , তাতে কি ? আমি আর আমার বোন ছাদে বসে ছোট্ট হাড়িতে পিকনিক করছি মহানন্দে । ডেকে আনছি পাশের বাসার অকম্মাগুলোকেও Phbbbbt!
এখন মনে হয় আসলে ছোট্ট বেলা কখনো কারো গোছানো হয়না । হওয়া উচিতও না । সব নিয়ম , কানুন , আদেশ , উপদেশ হাওয়ায় উড়ানোর শুধু ওইটুকু সময় । ওই সামান্য ছেলেবেলা । ছেলেবেলা শেষ হলেই তো আসে ভাবগম্ভীর আর যুক্তির ধ্বজাধারী বড়বেলা । আমরা সবাই আসলে মনে মনে ছোটবেলাকেই বেশী ভালোবাসি । বার বার ফিরে যেতে চাই সেই সময়ে Rolling Eyes

যে রোদ এখন চরাচরে
আকাশ জুড়ে , বেধেছে ঘর
এ রোদ দেখেছি অন্য কোথাও
কোন এক সুদূর শৈশবে
সে রোদ বাঁধত বাসা
চেতনায় অনুভবে ।

আসলে নানারকম দায়িত্ব আর মানসিক চাপে বার বার স্মৃতিতাড়িত হই । মনে হয় , ধুর .....সব কিছু ছেড়েছুড়ে আবার যদি ফিরে যেতে পারতাম সেই সুদূর শৈশবে । আমার মনের ভিতর ঘাপটি মেরে বসে থাকা স্মৃতিরাই আমাকে বারবার খোঁচা দেয় এসব লিখতে । আর তাই আমি ছাইপাশ লিখি আর ব্লগ সংখ্যা বাড়াই কেবল দিনদিন । Tongue

পোস্টটি ১৪ জন ব্লগার পছন্দ করেছেন

মীর's picture


স্টিকারের খাতা ছিলো। অনেকগুলো। বাসায় গিয়ে খুঁজতে হবে। পুস্ট দারুণস্য দারুণ হৈসে। নস্টালজিক হইলাম।

আজম's picture


গ্রামের বাড়ির আমগাছ গুলো সবে মাত্র বড় হতে শুরু করেছে...৪/৫ টা গাছে হয়ত মুকুল আসত। আমি আর আমার ছোট বোন সারবেই করতাম কোন গাছটার কত আম ধরার পসেভেলিটি Sad পরের বছর আর কোন কোন গাছে আম ধরবে Sad
এখন সব গাছেই আমের মুকুল আসে কিন্তু গ্রামেই যাওয়া হয় না Sad( Sad(

স্টিকার জমানো...স্পেলবাইন্ডার.... Sad( Sad(

নস্টালজিক ।

নাজমুল হুদা's picture


এখন আর সেদিন নাই । এ যুগের শহুরে (এমন কি গ্রামেরও) ছেলেমেয়েরা বইয়ের বোঝা টানে, দিনরাত ভালো রেজাল্টের জন্য যুদ্ধ করে । এদের শৈশব নাই, কৈশোর নাই - আসলে এরা জীবনের প্রাথমিক স্বাদটুকু থেকে পুরোপুরি বঞ্চিত ।
পোস্ট ভালো লাগলো, দারুন ! আমারও ইচ্ছে হচ্ছিল ফিরে যেতে সেই স্বপ্ন জগতে !

নুশেরা's picture


সবার ছোটবেলাগুলোতে কিছু কমন পড়ে Smile

ভালো লাগলো স্মৃতিকাতরতা

তানবীরা's picture


লিজার বর্ণনার হাত এতো সুন্দর যে ভাষায় প্রকাশ করতে পারবো না।

নিজেকে হারিয়ে যেনো পাই ফিরে ফিরে ...............
অনেক কিছুই কমন পরে গেলোরে

রাসেল আশরাফ's picture


নস্টালজিক হলাম। Sad Sad

লিজা's picture


মীর - Smile আপনিও তাইলে স্টিকার দলের সদস্য Big smile চিমটি ......মীর ভাই ।
আজম - সত্যি , স্মৃতিরা খুব কষ্ট দেয় মানুষকে Sad । আপনিও আমাদের দলের সদস্য , তাই চিমটি Big smile
হুদা ভাই -

আমারও ইচ্ছে হচ্ছিল ফিরে যেতে সেই স্বপ্ন জগতে

ইশ !! যদি যেতে পারতাম Sad
নুশেরা'পু আর তানবীরা'পু - কি কি কমন পড়ল বলতে হবে Big smile
রাসেল ভাই - Smile

জুলিয়ান সিদ্দিকী's picture


ছোটবেলাকার সেইছাইপাশ গুলা কিন্তু এখন মহামূল্যবান মণির মতই উজ্জ্বল মনের কোচড়ে!

(এ অংশটা বেশ ভালো লাগার!)

উলটচন্ডাল's picture


আমিও স্টিকার দলের সদস্য !! Big smile

লেখা সেইরকম জটিল।

১০

লীনা দিলরুবা's picture


কার নাম কার নাম যোগ দিয়ে দেয়াল ভরে ফেলা হয়েছে । তখন আমরা তেরো-চৌদ্দ । এসব বিষয় যেমন লজ্জার তেমন ছিল আশ্চর্যের । খাইছে !! কার নাম !! দেখতে গিয়ে কান নাক সব লাল করে ফিরে আসতাম । আমি কার কি ক্ষতি করলাম ? দেয়ালে যে আমার নামটাই জ্বলজ্বল করছে !! তারপর হয়তো কিছুদিন দুঃখে কষ্টে সেচ্ছা নির্বাসন

হাহাহা। কি লেখা হয়েছিল Wink
লিজা + ..

আমাদের পাড়ায় প্রতি বছর খেতাব দেয়া হতো, লোকজনের গোপন ঘটণা বের করে বছর শেষে তাকে সেটার স্যাটায়ার করে কিছু একটা খেতাব লিখে ১ জানুয়ারী সবার বাড়ির গেটে সেঁটে দেয়া হত। প্রেম-পরকিয়া কোন কিছু বাদ থাকতোনা। পাড়ার লোকজন আতঙ্কে থাকতেন কে কি খেতাব পান। খেতাব দাতাদের ধরবার জন্য রাত জেগে পাহারার ব্যবস্থা ছিল কিন্তু কিভাবে যেন সেটি ঠিকই প্রচার হয়ে যেত। খেতাব প্রদানের জন্য পুলিশ কেস ও হয়েছিল একবার। সেই এক দিন ছিল।

১১

মীর's picture


গুড টু সী ইয়' Smile

১২

লিজা's picture


ধইন্যা Smile

মন্তব্য করুন

(আপনার প্রদান কৃত তথ্য কখনোই প্রকাশ করা হবেনা অথবা অন্য কোন মাধ্যমে শেয়ার করা হবেনা।)
ইমোটিকন
:):D:bigsmile:;):p:O:|:(:~:((8):steve:J):glasses::party::love:
  • Web page addresses and e-mail addresses turn into links automatically.
  • Allowed HTML tags: <a> <em> <strong> <cite> <code> <ul> <ol> <li> <dl> <dt> <dd> <img> <b> <u> <i> <br /> <p> <blockquote>
  • Lines and paragraphs break automatically.
  • Textual smileys will be replaced with graphical ones.

পোস্ট সাজাতে বাড়তি সুবিধাদি - ফর্মেটিং অপশন।

CAPTCHA
This question is for testing whether you are a human visitor and to prevent automated spam submissions.

বন্ধুর কথা

লিজা's picture

নিজের সম্পর্কে

♥__̴ı̴̴̡̡̡ ̡͌l̡̡̡ ̡͌l̡*̡̡ ̴̡ı̴̴̡ ̡̡͡|̲̲̲͡͡͡ ̲▫̲͡ ̲̲̲͡͡π̲̲͡͡ ̲̲͡▫̲̲͡͡ ̲|̡̡̡ ̡ ̴̡ı̴̡̡ ̡͌l̡̡̡̡.__♥