ইউজার লগইন

ফৌজি বাণিজ্য: শেষ পর্ব

অনেকেই হয়তো শুনেছেন। তারপরেও বিবিসির বিশেষ এই ধারাবাহিক প্রতিবেদন এখানে দেওয়ার উদ্দেশ্য দুটি। একটি হচ্ছে, যারা বিবিসি শোনেন না তাদের বিষয়টি জানানো। আরেকটি হচ্ছে নিজের কাছে রেকর্ড রাখা।
রিপোর্টগুলো তৈরি করেছেন বিবিসির কামাল আহমেদ। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট বিবেচনায় বিষয়টি স্পর্শকাতর হলেও সবার জানার প্রয়োজন থেকেই আমার এই পোস্ট। মোট তিনটি পর্বে ৯টি রিপোর্ট এখানে দেওয়ার ইচ্ছা ছিল। আজ ৭ম থেকে ৯ম পর্ব। এটাই শেষ পর্ব।

ফৌজি বাণিজ্য: প্রথম পর্ব

ফৌজি বাণিজ্য: দ্বিতীয় পর্ব

শিল্প পরিচালনায় উদ্যোগী সেনাবাহিনী

ব্যবসা বাণিজ্যে সশস্ত্রবাহিনীর সরাসরি অংশগ্রহণের নিদর্শন হচ্ছে রাষ্ট্রায়ত্ত্ব খাতের অন্যতম বৃহৎ শিল্প প্রতিষ্ঠানটির অধিগ্রহণ এবং তাকে কেন্দ্র করে নতুন নতুন উদ্যোগ গ্রহণ।

সাধারণভাবে যদিও অনেকে বলে থাকেন যে রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন ভারী শিল্প প্রতিষ্ঠান – বাংলাদেশ মেশিন টুলস ফ্যাক্টরি ( বি এম টি এফ) কে অব্যাহত লোকসান এবং অব্যবস্থাপনার হাত থেকে বাঁচানোর জন্য সরকার তার ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব সেনাবাহিনীর কাছে হস্তান্তর করেছে – সরকারী নথিপত্রে দেখা যায় ঠিক উল্টো তথ্য।

ঢাকার আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কাছেই বিমানবন্দর সড়ক ধরে কিছুটা দূর গেলেই দেশের সবচেয়ে বড় রাষ্ট্রায়ত্ত্ব শিল্প - বাংলাদেশ মেশিন টুলস ফ্যাক্টরী বা বিএমটিএফ। রাষ্ট্রায়ত্ত খাতের লোকসানী প্রতিষ্ঠানগুলোকে সরকার যখন বেসরকারীকরণ নীতির আওতায় তালিকাভূক্ত করে বেসরকারীকরণ বোর্ড বা প্রাইভেটাজাইশেন বোর্ডের কাছে হস্তান্তর করে তখন সেনাবাহিনী এগিয়ে আসে বিএমটিএফ অধিগ্রহণের জন্য।

পয়লা জুন দু‘হাজার সালে প্রকাশিত বাংলাদেশ সরকার এক গেজেট প্রকাশের মাধ্যমে বাংলাদেশ মেশিন টুলস ফ্যাক্টরী লিমিটেডকে সেনাবাহিনীর কাছে হস্তান্তরের আদেশ জারী করে।

ঐ গেজেট নোটিশে সরকারের ঐ সিদ্ধান্তের পটভূমি বর্ণনা করে বলা হয়

“ সরকারের বেসরকারীকরণ নীতির আওতায় প্রতিষ্ঠানটি বেসরকারীকরণের তালিকাভুক্ত করা হলে এবং বাংলাদেশ সেনাবাহিনী প্রতিষ্ঠানটির ১৫৩.৪৭ একর জমিসহ এর পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণে আগ্রহ প্রকাশ করলে গত চৌঠা ফেব্রুয়ারী ১৯৯৮ তারিখে প্রাইভেটাউজেশন বোর্ড তার এক সভায় প্রতিষ্ঠানটির উক্ত পরিমাণ জমিসহ বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর নিকট হস্তান্তরের ব্যবস্থাগ্রহণের জন্য শিল্প মন্ত্রণালয়কে অনুরোধ করে।“

ঐ গেজেটে আরো বলা হয় যে এরপর প্রাইভেটাইজেশন বোর্ডের সুপারিশের ভিত্তিতে অর্থনৈতিক বিষয় সংক্রান্ত মন্ত্রীসভা কমিটি সচিবপর্য্যায়ের আরেকটি উপ-কমিটিকে এবিষয়ে প্রক্রিয়া নির্ণয়সহ সুপারিশ পেশ করার দায়িত্ব দেয়।

এরপর গেজেটে বলা হয়:

“উক্ত কমিটি কর্তৃক পেশকৃত সুপারিশসমূহ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত হয় এবং তদনুসারে মন্ত্রণালয়ের আদেশ এর মাধ্যম বাংলাদেশ ইস্পাত ও প্রকৌশল কর্পোরেশনের কাছ থেকে প্রতিষ্ঠানটি প্রত্যাহার করে তার ব্যবস্থাপনা ও পরিচালনার দায়িত্ব সেনাবাহিনীকে ন্যস্ত করার সিদ্ধান্ত হয়।“

গেজেটে দেখা যায় সেনাবাহিনী ১৫৩.৪৭ একর জমিসহ মেশিন টুলস ফ্যাক্টরী পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণের আগ্রহ প্রকাশ করলেও সরকারী সিদ্ধান্তে প্রস্তাবিত হেভী ইন্ডাস্ট্রিয়াল কমপ্লেক্সের জমি এবং বাংলাদেশ রেলওয়ের কিছু জমিসহ মোট ২৪৭.৬৬ একর জমিসহ প্রতিষ্ঠানটি তাদের কাছে হস্তান্তর করা হয়।

ঐ গেজেটের সিদ্ধান্ত অংশের গ অনুচ্ছেদে বলা হয় :

“বাংলাদেশ মেশিন টুলস ফ্যাক্টরী লিমিটেড এর একক অস্তিত্ব বজায় থাকবে এবং তা প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর তত্ত্বাবধানে কোম্পানী হিসাবে পরিচালিত হবে।“

কিন্তু, সেনাবাহিনীর পক্ষে যাঁরা এই মেশিন টুলস ফ্যাক্টরী পরিচালনা করছেন তাঁরা ইতোমধ্যেই ঐ ফ্যাক্টরীর স্থাপনার মধ্যে আরো তিনটি প্রতিষ্ঠান স্থাপন করে সেগুলো কোম্পানী হিসাবে চালু করেছেন৻

এগুলো হলো : বাংলাদেশ ফুটওয়্যার এন্ড লেদার প্রোডাক্টস লিমিটেড, বাংলাদেশ মেশিন টুলস ফ্যাক্টরী সিএনজি কনভারশন লিমিটেড এবং বিদেশে কর্মসংস্থানে আগ্রহীদের বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণের জন্য বিএমটিএফ ট্রেনিং ইনিষ্টিটিউট।

এই তিনটি নবগঠিত প্রতিষ্ঠানের মধ্যে প্রথমটি একটি যৌথ উদ্যোগ প্রতিষ্ঠান - যার অপর অংশীদার হচ্ছে ট্রেড মিউচূয়াল হংকং।

ট্রেড মিউচুয়াল হংকং ৫১ শতাংশ মালিকানার অধিকারী এবং হংকংয়ে নিবন্ধিত হলেও এর পরিচালকদের মধ্যে রয়েছেন বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত একজন কর্মকর্তা।

কোন প্রক্রিয়ায় এই প্রবাসী বাংলাদেশ সেনা কর্মকর্তার কোম্পানীর সাথে যৌথ অংশীদারী কোম্পানী প্রতিষ্ঠিত হয়েছে তার কোন ব্যাখ্যা কতৃপক্ষের কাছ থেকে পাওয়া যায় নি।

কয়েকশত একর জমির মূল্য সম্পদের হিসাবে অন্তর্ভূক্ত করা ছাড়াই সরকার মেশিন টুলস ফ্যাক্টরীর শেয়ার মূলধন হিসাবে আশি কোটি টাকা হিসাব করেছে এবং বৈদেশিক ও সরকারী ঋণের মোট ২৮৮ কোটি টাকা ইক্যুইটি হিসাবে গেজেটে উল্লেখ করে।

এছাড়া রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন ব্যাংকগুলোর সুদ মওকুফ করা হয় ৮৭ কোটি টাকারও বেশী। তার ওপর সেনাবাহিনীর জন্য বরাদ্দ করা বাজেট থেকে ৬৮ কোটি টাকা এই বাণিজ্যিক উদ্যোগের জন্য বরাদ্দ করা হয়।

সুতরাং, দেখা যাচ্ছে যে শিল্প এলাকার মূল্যবান জমির হিসাব বাদ দিয়েই প্রতিষ্ঠানটিতে রাষ্ট্রীয় তহবিলের পাঁচশো কোটিরও বেশী টাকা বিনিয়োগ করা হয়েছে।

ষাটের দশকে প্রতিষ্ঠিত মেশিন টুলস ফ্যাক্টরী মূলত চালু হয় ১৯৮০তে এবং বর্তমান পরিচালনাকারী কর্তৃপক্ষ বা সেনাবাহিনীর দাবী অনুযায়ী অতীতে প্রকল্পটি কোন লাভের মুখ না দেখলেও তারা দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকে এটি লাভ করছে।

সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী মেশিন টুলস ফ্যাক্টরী ২০০৮-৯ অর্থবছরে আট কোটি বাইশ লাখ টাকা মুনাফা করেছে। স্পষ্টতই বিনিয়োগের বিপরীতে আয়ের হার ব্যাংকে সঞ্চয়ী হিসাবে সুদ থেকে যা আয় হয় তার চেয়েও অনেক কম।

সাবেক মন্ত্রীপরিষদ সচিব ডঃ আকবর আলী খান বিষয়টি সম্পর্কে বলেন যে লাভ হওয়াটাই বড় কথা নয় – কত বিনিয়োগ হয়েছে এবং বিনিয়োগের অনুপাতে কত রাভ হয়েছে সেটা দেখা দরকার।

তিনি বলেন যে আমাদের দেশে আমরা যখন কোন প্রতিষ্ঠানকে টাকা দেই বা কোন সম্পদ দেই তখন সেই সম্পদটা কিন্তু হিসাবে ধরা হয় না। বিলেতে রিসোর্স অ্যাকাউন্টিং বলে যে নিরীক্ষাব্যবস্থা চালু আছে সেখানে কতোটা সম্পদ বিনিয়োগ করে কি রিটার্ন পাওয়া গেছে সেই হিসাব করা হয়।

ডঃ খান বলেন যে দুর্ভাগ্যজনকভাবে আমাদের দেশে সম্পদ কতো দেওয়া হয়েছে সেই হিসাবটা করা হয় না। এমনকি লাভ লোকসানের হিসাবটাও সবসময় খোলাসাভাবে বলা হয় না।

মেশিন টুলস ফ্যাক্টরীতে অন্যান্য শিল্পের জন্য যন্ত্রপাতি এবং সরঞ্জাম ও খুচরা যন্ত্রাংশ তৈরী ছাড়াও বছরে প্রায় ছশো গাড়ী সংযোজন করা হয়। এখানে মূলত টয়োটা এবং সুজুকি ব্রান্ডের জীপ, ট্রাক এবং পিক আপ তৈরী করা হয়।

এদিকে, ঐ গেজেটেই ঘ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে:

“সেনাবাহিনীর নিকট ন্যস্ত উক্ত ফ্যাক্টরীর ২৪৭.৬৬ একর জমির মধ্যে ডিজেল প্লান্টের জন্য সরকারী সিদ্ধান্ত মোতাবেক জমি পরবর্তীতে প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়/ বাংলাদেশ সেনাবাহিনী বিডিআরের নিকট হস্তান্তর করিবে। “

গেজেটে বর্ণিত পটভূমিতেও মেশিন টুলস ফ্যাক্টরীর জমির একটি অংশ বাংলাদেশ ডিজেল প্লান্টের জন্য বাংলাদেশ রাইফেলস বা বিডিআরের কাছে হস্তান্তর করার সিদ্ধান্তের কথা বলা আছে।

কিন্তু, শেষপর্য্যন্ত বাংলাদেশ ডিজেল প্লান্ট বা বিপিএলও সরকার সেনাবাহিনীর কাছে হস্তান্তর করেছে। ছাব্বিশে এপ্রিল ২০০৭ সালে শিল্প মন্ত্রণালয়ের এক প্রজ্ঞাপনে অন্য অনেকগুলি কারণের মধ্যে বলা হয় :

“যেহেতু, প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির বৈঠকে প্রতিষ্ঠানটিকে সেনাবাহিনীর নিকট হস্তান্তরের সিদ্ধান্ত নিয়েছে এবং যেহেতু বেসরকারীকরণের জন্য তালিকাভূক্ত প্রতিষ্ঠানটিকে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী লাভজনক শিল্প প্রতিষ্ঠান হিসাবে বহাল রাখার লক্ষ্যে বাণিজ্যিক ভিত্তিতে পরিচালনা ও ব্যবস্থাপনার আগ্রহ ব্যক্ত করেছে -সেহেতু সরকারী সিদ্ধান্ত অনুযায়ী জনস্বার্থে বিপিএল বাণিজ্যিক ভিত্তিতে পরিচালনার জন্য বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর কাছে হস্তান্তর করা হলো। “

জমির মূল্য ছাড়াই প্রায় আশি কোটি টাকার বিনিয়োগসহ এই প্রতিষ্ঠানটি বিডিআরকে দেবার কথা থাকলেও শেষপর্য্যন্ত তা দেওযা হয় সেনাবাহিনীকে।

আর, প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় বিষয়ক যে সংসদীয় স্থায়ী কমিটি সেনাবাহিনীর কাছে প্রতিষ্ঠানটি হস্তান্তরের সুপারিশ করেছিলো সেই কমিটির সভাপতি যে ছিলেন একজন সাবেক সেনাপ্রধান - সেটি কোন কাকতালীয বিষয় কীনা তা নিশ্চিত করা মুশকিল।

তবে, বিষয়টি সম্পর্কে জানতে চাইলে অবসরপ্রাপ্ত লেফটেন্যান্ট জেনারেল মাহবুবুর রহমান জানান যে তাঁর স্মৃতিশক্তি অনুযায়ী তাঁর নেতৃত্বাধীন সংসদীয় কমিটি বাংলাদেশ মেশিন টুলস ফ্যাক্টরী সেনাবাহিনীর কাছে হস্তান্তরের কথা বলেছিলো।

লেফটেন্যান্ট জেনারেল রহমান বলেন যে আমার সময় যেটা হয়েছে সেটা হলো অষ্টম পার্লামেন্টে – প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত ষ্ট্যান্ডিং কমিটিতে কথা হয় ডিজেল প্লান্টের বিষয় নয় – রাজেন্দ্রপুরের বাংলাদেশ মেশিন টুলস ফ্যাক্টরির কথা আলোচিত হয়। ডিজেল প্লান্ট সম্পর্কে আমার কমিটিতে মোটেই আলোচনা হয় নি।

জেনারেল রহমান আরো বলেন যে মেশিন টুলস ফ্যাক্টরি সরকারের নির্দেশে সেনাবাহিনী নেয় এবং তারা এটিকে ভালো অবস্থায় নিয়ে এসেছে।

সৈনিকদের কল্যাণের উদ্দেশ্যে গৃহীত প্রকল্পগুলোর তালিকা অনেক দীর্ঘ। সেনাকল্যাণ সংস্থা, আর্মি ওয়েলফেয়ার ট্রাষ্ট, বাংলাদেশ এয়ার ফোর্স ওয়েলফেয়ার এসোসিয়েশন বি এফ এ ডাব্লু এ, বাংলাদেশ ন্যাভাল ফোর্স ওয়েলফেয়ার এসোসিয়েশন বি এন এফ ডাব্লু এ , রিটায়ার্ড আর্মড ফোর্সেস ওয়েলফেয়ার এসোসিয়েশন আর এ ডাব্লু , ডিফেন্স অফিসার্স হাউজিং সোসাইটিজ ইত্যাদি। কিন্তু, তারপরও কল্যাণমূলক বাণিজ্যিক উদ্যোগের বাইরে সশস্ত্রবাহিনী শুধুমাত্র বাণিজ্যিক লক্ষ্য নিয়েই ভারী শিল্পে সরাসরি যুক্ত হয়েছে।

আপাতদৃশ্যে মনে হয় যে যদি কোন প্রকল্পে সামরিকবাহিনীর নাম জড়িত থাকে তাহলে তার গুণগুণ বিচারে রাজনীতিক কিম্বা আমলাদের দৃষ্টিভঙ্গী বেশ নমনীয় হয়ে থাকে। ফৌজি বাণিজ্যের অষ্টম পর্বে আমরা নজর দেবো নৌবাহিনীর সরাসরি পরিচালনাধীন প্রতিষ্ঠানগুলোর দিকে।


সেনাবাহিনীর পথেই নৌবাহিনী

বাংলাদেশ নৌবাহিনীও সেনাবাহিনীর মতোই উদ্যোগী হয়ে অধিগ্রহণ করে রাষ্ট্রীয় খাতের জাহাজ নির্মাণ শিল্প।

বাংলাদেশে গত প্রায় এক দশকে জাহাজ নির্মাণ শিল্প যখন একটি দ্রুত বিকাশমান শিল্পখাত হিসাবে গড়ে উঠছিলো ঠিক তখনই দেশের সবচেয়ে পুরোনো শিপইয়ার্ডটি আস্তে আস্তে ধ্বংসের দিকে অধ:পতিত হচ্ছিলো।

অন্যান্য রুগ্ন শিল্প বেসরকারীকরণ করা হলেও খুলনা শিপইয়ার্ডের ক্ষেত্রে দেখা গেল ব্যতিক্রম।

বিরাষ্ট্রীয়করণের জন্য নির্ধারিত দুটি প্রতিষ্ঠান - বাংলাদেশ মেশিন টুলস ফ্যাক্টরী এবং বাংলাদেশ ডিজেল প্লান্ট যেমন সেনাবাহিনীর আগ্রহে সরকার তাদের কাছে হস্তান্তর করেছে ঠিক তেমনই নৌবাহিনী আগ্রহী হয়ে খুলনা শিপইয়ার্ডের নিয়ন্ত্রণভার সরকারের কাছ থেকে চেয়ে নিয়েছে।

নৌবাহিনীর এই আগ্রহের প্রতিফলন পাওয়া যায় ৫ই মে ১৯৯৯-এ শিল্প মন্ত্রণালয়ের এক বিজ্ঞপ্তিতে:

‘সরকারের বেসরকারীকরণ নীতিমালার আওতায় প্রতিষ্ঠানটি বেসরকারীকরণের তালিকাভূক্ত করা হলে বাংলাদেশ নৌবাহিনী ইহাকে উজ্জীবিত ও লাভজনক প্রতিষ্ঠানে পরিণত করার লক্ষ্যে বাণিজ্যিক ভিত্তিতে পরিচালনা ও ব্যবস্থাপনার আগ্রহ ব্যক্ত করে।‘

১৯৫৪ সালে প্রতিষ্ঠিত খূলনা শিপউয়ার্ডের বিনিয়োগের পরিমাণ প্রায় নব্বুই কোটি। বাংলাদেশ নৌবাহিনীর ওয়েবসাইটে দেওয়া তথ্য অনুযায়ী স্বাধীনতার পর ১৯৭৬ সাল পর্যন্ত শিল্প মন্ত্রণালয়ের অধীনে ইস্পাত ও প্রকৌশল সংস্থার প্রতিষ্ঠান হিসাবেও খুলনা শিপইয়ার্ড লাভজনক ছিলো।

প্রতিষ্ঠানটি পরে অবশ্য রুগ্ন শিল্পে পরিণত হয়। তবে, নৌবাহিনী দায়িত্বগ্রহণের পর নৌবাহিনীর নিজস্ব জাহাজ ও নৌযানগুলোর মেরামত ও আধুনিকায়নের পাশাপাশি তা বাণিজ্যিক ভিত্তিতে অন্যদের জন্যও জাহাজ বা নৌযান নিমার্ণের কাজ করছে।

এই শিপইয়ার্ডের নিয়ন্ত্রণ গ্রহণের পর নৌবাহিনী তার নিজস্ব বাজেটের সাড়ে একষট্টি কোটি টাকাও বিনিয়োগ করেছে প্রতিষ্ঠানটিতে।

নৌবাহিনী অপর আরেকটি প্রতিষ্ঠানও সরাসরি পরিচালনা করে থাকে - যেটি হচ্ছে নারায়ণগঞ্জের ডকইয়ার্ড অব ইঞ্জিনিয়ারিং ওয়ার্কস লিমিটেড। এধরণের প্রতিষ্ঠানগুলো বাণিজ্যিকভিত্তিতে পরিচালনায় আগ্রহের কারণ সম্পর্কে নৌ সদরদপ্তরের সাথে যোগাযোগ করা হলেও এবিষয়ে তাঁদের কোন বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

তবে, খুলনা শিপইয়ার্ডের একটি প্রকাশনায় প্রতিষ্ঠানটি নৌবাহিনীর ব্যবস্থাপনায় কীভাবে গেল তার একটি ভিন্নধরণের বিবরণ তুলে ধরা হয়েছে:

‘প্রতিষ্ঠার পর থেকে ১৯৬৫ সাল পর্যন্ত জার্মান এবং ব্রিটিশ কোম্পানিগুলো এই শিপইয়ার্ড পরিচালনা করে আসছিলো। স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালের ২৬শে মার্চ প্রতিষ্ঠানটি হস্তান্তর করা হয় বাংলাদেশ ষ্টিল ইঞ্জিনিয়ারিং কর্পোরেশন বা বিএসইসির কাছে। আশি সাল পর্যন্ত এটি পরিচালিত হতো সামান্য মুনাফায় - কিন্তু নব্বুইয়ের দশকে তা লোকসান করতে থাকে৻ পরে, সরকার তা বেসরকারীকরণের সিদ্ধান্ত নেয় এবং ১৯৯৯ সালের তেসরা অক্টোবর সরকার তা বাংলাদেশ নৌবাহিনীর কাছে হস্তান্তর করে। বর্তমানে বাংলাদেশ নৌবাহিনী এটিকে একটি লাভজনক বাণিজ্যিক উদ্যোগ হিসাবে পরিচালনা করছে। ‘

নৌবাহিনীর এই প্রকল্প কতোটা মুনাফা করছে সেই তথ্য অবশ্য প্রকাশ করা হয় নি। এই প্রকল্পের প্রধান ক্রেতা অবশ্য নৌবাহিনী নিজে।

এছাড়া, কোষ্টগার্ড, বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ পরিবহণ সংস্থা এবং কয়েকটি সরকারী প্রতিষ্ঠান এই শিপইয়ার্ড থেকে বিভিন্নধরনের উপকরণ এবং সেবা নিয়ে থাকে।

কিন্তু, সরকারি পৃষ্ঠপোষকতার বাইরে তার বাণিজ্যিক সম্ভাবনা কতোটা তা প্রশ্নসাপেক্ষ। তবে, নৌপরিবহন মন্ত্রী শাজাহান খানের কথায় এটা স্পষ্ট যে খুলনা শিপইয়ার্ডের প্রতি রাষ্ট্রের আনুকূল্য যথেষ্ট।

মি খান বলেন যে খুলনা শিপইয়ার্ড এবং নারায়ণগঞ্জ ডকইয়ার্ড – এই দুটিই হলো মুলত শিল্প মন্ত্রণালয়ের অধীন প্রকল্প। এটি লাভজনক প্রতিষ্ঠান ছিলো না। সরকার ‌এটি নেভিকে দেয় এবং পরবর্তীতে চলতি মূলধন হিসাবে নেভিকে একশো কোটি টাকা দেওয়া হয় এটা চালু করার জন্য ।

মন্ত্রী বলেন যে এরপর সরকারের জাহাজগুলো – যেমন বি আই ডাব্লু টি সির চারটি জাহাজ এখন সেখানে মেরামতাধীন আছে। এগুলো তারা টেন্ডারের মাধ্যমেই নিয়েছে। তারা বাইরের কাজও করে।

বাংলাদেশে বেসরকারী খাতে জাহাজ নির্মাণ শিল্প এখন অনেকটাই সমৃদ্ধি অর্জন করেছে। আর এক্ষেত্রে অনেকটা পথিকৃৎ এর ভূমিকা হচ্ছে চট্টগ্রামের ওয়েষ্টার্ণ মেরিন শিপইয়ার্ডের।

এই বেসরকারি খাতের জাহাজ নির্মাতারা খুলনা শিপইয়ার্ডের চেয়ে প্রযুক্তি, ব্যবস্থাপনা এবং আন্তর্জাতিক পরিসরে বিপণনে অনেক বেশী এগিয়ে।

চট্টগ্রামের ওয়েষ্টার্ণ মেরিন শিপইয়ার্ডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সাখাওয়াত হোসেন বলছিলেন যে - তাঁর প্রতিষ্ঠান বিদেশীদের কাছ থেকে যেসব জাহাজ নির্মাণের আদেশ পেয়েছে তা পূরণ করতে তাঁদের এক হাজার শ্রমিককে আগামী তিনবছর একনাগাড়ে কাজ করতে হবে।

মি হোসেন বলেন যে বাংলাদেশে স্থানীয় চাহিদা পূরণের জন্য প্রায় দুশো ডকইয়ার্ড আছে। এরা লঞ্চ, কার্গোবাহী নৌযান তৈরী করে এবং পুরোনো জাহাজের মেরামত করে থাকে। আর উন্নতমানের জাহাজ তৈরীর ইয়ার্ড আছে মাত্র তিন চারটি যারা বিদেশে জাহাজ রপ্তানি করে থাকে।

সাখাওয়াত হোসেন বলেন যে সরকারীভাবে একটি প্রতিষ্ঠান আছে যারা গুণগত মান বজায় রাখে – খুলনা শিপইয়ার্ড - তবে তারা নিজেদের যেসব ছোট ছোট বোট তৈরী করতে হয় সেগুলো করে থাকে। মূলত তারা তাদের নিজেদের চাহিদাটা পূরণ করে থাকে।

মি হোসেন বলেন যে বিদেশের বাজারে রপ্তানীর জন্য খুলনা শিপইয়ার্ড তাদের কোন প্রতিদ্বন্দ্বী নয়।

বিকাশমান বেসরকারি খাতের পাশাপাশি রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতার ওপর নির্ভরশীল প্রতিষ্ঠান শেষপর্যন্ত আবারো একটা রুগ্নশিল্পের রুপ লাভ করবে বলে আশংকা অনেকেরই।

অবসরপ্রাপ্ত সামরিক-বেসামরিক আমলা, ব্যবসায়ী এবং নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিদের মধ্যে একধরণের ঐক্যমত্য দেখা যায় এই মর্মে যে তাঁরা সবাই মনে করেন রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন এসব প্রতিষ্ঠানকে সরাসরি সশস্ত্রবাহিনীর কাছে হস্তান্তর বিরাষ্ট্রীয়করণ নীতির পরিপন্থী এবং তা তাঁরা সমর্থন করেন না।

ঢাকা মেট্রোপলিটন চেম্বার অব কমার্স এন্ড ইন্ডাষ্ট্রির সাবেক সভাপতি এবং তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা সৈয়দ মঞ্জুর এলাহী বলেন যে তিনি সবসময়েই সরকারকে বলে এসেছেন যে ব্যবসা করার সরকারের কাজ নয় – ইট ইজ নট দ্য বিজনেস অব দ্য গর্ভণমেন্ট টু বি ইন বিজনেস।

তিনি বলেন যে সামরিকবাহিনীর ক্ষেত্রেও আমার একই কথা। তাদের ব্যবসায় বা শিল্পে যাওয়া উচিৎ নয়। এটা একদিকে যেমন ঝুঁকিপূর্ণ – তেমনি এখানে কোন স্বচ্ছ্বতাও নেই, জবাবদিহিতাও নেই।

একই অভিমত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা এবং সাবেক আমলা ডঃ আকবর আলী খানের। ডঃ খান বলেন যে ব্যবসায় অনেক ঝুঁকি থাকে। আর সেসব ঝুঁকি সামাল দিতে এসব বাহিনীর কন্টিনজেন্সি তহবিল ব্যবহার করা উচিৎ হবে না।

ডঃ খান বলেন যে কোন বাহিনীকে এসব প্রতিষ্ঠান তখনই দেওয়া যায় যখন তারা শুধুমাত্র সামরিক সরঞ্জাম তৈরী করবে। কিন্তু, এর বাইরে অন্য কোন কারণে এগুলো তাদেরকে দেওয়া ঠিক হবে না। বরং, তখন বিবেচনা করা উচিৎ যে সম্পদের সবচেয়ে লাভজনক ব্যবহার কী হতে পারে।

রাষ্ট্রীয় অর্থে এধরণের প্রতিষ্ঠান পরিচালনার অভিজ্ঞতা যে পাকিস্তানের নৌবাহিনীর জন্যও সুখকর ছিলো না সেকথা উল্লেখ করে সেনাবাণিজ্য বিষয়ে বিশেষজ্ঞ এবং পাকিস্তান নৌবাহিনীর সাবেক গবেষণা পরিচালক ডঃ আয়েশা সিদ্দিকা বলছেন বাংলাদেশের জন্যও এধরণের পদক্ষেপ শুভ হবে না।

ডঃ সিদ্দিকা বলেন যে সত্যি কথা বলতে কী এটা হবে একটা বিপর্যয়। তিনি বলেন যে আমি আমার অভিজ্ঞতা থেকে বলতে পারি - আমি পাকিস্তান নৌবাহিনীর গবেষণা পরিচালক হিসাবে কাজ করেছি - আমার অভিজ্ঞতা বলে যে সামরিকবাহিনী মনে করে যে তারা প্রতিরক্ষা শিল্প চালাতে পারে - কিন্তু এটা তাদের ভুল ধারণা।

ডঃ সিদ্দিকা বলেন যে যখনই সেনাবাহিনী এধরণের শিল্পের দায়িত্ব নেই সাথে সাথে তাতে অদক্ষতা দানা বাঁধতে শুরু করে। করাচী শিপইয়ার্ডের কথাই ধরুন না কেন ? সশস্ত্রবাহিনী তার দায়িত্ব নেবার পর যে তার দক্ষতা বেড়েছে তা নয়। বরং, তার আগে করাচী শিপইয়ার্ড যখন বেসামরিক বিশেষজ্ঞদের পরিচালনায় ছিলো তখন তা আরো দক্ষতার সাথে চলছিলো।

তিনি বলেন যে একই কথা বলা চলে মেশিন টুলস ফ্যাক্টরীর ক্ষেত্রে। আমার মনে হয় এটা খুব বাজে একটা প্রস্তাব।

এধরণের প্রতিষ্ঠান পরিচালনায় নৌবাহিনীকে সম্পৃক্ত করার পিছনে নীতিনির্ধারকদের যে মনস্তাত্ত্বিক একটা প্রভাব রয়েছে সেটা নৌপরিবহনমন্ত্রী শাজাহান খানের কথায় অনেকটাই স্পষ্ট।

সামরিকবাহিনীর পরিচালনাধীন এসব প্রতিষ্ঠানের আর্থিক স্বচ্ছ্বতা এবং জবাবদিহিতার ব্যবস্থা কী ? একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র কাঠামোর সাথেই তা কতোটা সঙ্গতিপূর্ণ? বাণিজ্যিক কার্যক্রমে সম্পৃক্ত হওয়ার জন্য যে সেনাসদস্যদের যে চরম মূল্য দিতে হয়েছে তার কোন প্রভাব কী পড়ছে বিদ্যমান ব্যবস্থায়? এসব প্রসঙ্গ ফৌজি বাণিজ্যের আগামী পর্বে।

বিডিআর বিদ্রোহের শিক্ষা উপেক্ষিত

বাণিজ্যিক কার্যক্রমে সশস্ত্রবাহিনীর জড়িত হবার সবচেয়ে বেশি মূল্য দিয়েছে বাংলাদেশের সেনাবাহিনী। কিন্তু, তারপরও কেউ তা থেকে কোন শিক্ষা নিয়েছে বলে মনে হয় না।

বাংলাদেশের সামরিকবাহিনী যেসব বাণিজ্যিক প্রকল্পে যুক্ত হয়েছে সেগুলোর আর্থিক কার্যক্রমের স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহিতার বিষয়টি একেবারেই খোলাশা নয়। আর সেকারণে বাণিজ্যিক কার্যক্রমে সম্পৃক্ত হওয়ার কী প্রভাব সেনাবাহিনীর ওপর পড়ছে তাও অস্পষ্ট।

পাঁচ নম্বর নর্থউড ওয়ে, মিডলসেক্স, এইচ এ সিক্স, ওয়ান এ ইউ। এই ঠিকানাটি ছাপা রয়েছে সেনা হোটেল ডেভলেপমেন্টস লিমিটেড নামের একটি কোম্পানীর রেজিস্ট্রিকৃত সংঘ স্মারক বা মেমোরেন্ডাম এন্ড আর্টিকেল অব এসোসিয়েশনে। সেনা হোটেল লিমিটেডের পঞ্চাশ শতাংশ শেয়ারের মালিক এসোসিয়েটেড বিল্ডিং ডিজাইন লিমিটেডের রেজিস্টার্ড অফিসের ঠিকানা এটি।

এসোসিয়েটেড বিল্ডিং ডিজাইন লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক হলেন ড: আলী আল মাহদাওয়ি - কিন্তু এসোসিয়েটেড বিল্ডিংয়ের পক্ষে প্রতিনিধি হিসাবে সেনা হোটেল ডেভলপমেন্টসে পরিচালক হয়েছেন দুজন -কাজী মেসবাহউদ্দিন এবং গ্রাহাম জনি ওয়াকার।

সেনা হোটেল ডেভলেপমেন্টসের বাকী পঞ্চাশ শতাংশ শেয়ারের মালিক হচ্ছে সেনা কল্যাণ সংস্থা।

কিন্তু, ঐ ঠিকানায় এসোসিয়েটেড বিল্ডিং ডিজাইন লিমিটেড কিম্বা তাঁর পরিচালক বা ব্যবস্থাপনা পরিচালকদের কাউকেই পাওয়া যায় নি। ব্রিটেনের বিভিন্ন ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের তথ্যপঞ্জী বা বিজনেস ডিরেক্টরিতেও এই কোম্পানীর কোন অস্তিত্ত্ব পাওয়া যায় নি।

কোন প্রক্রিয়ায় এই কোম্পানীটি বাংলাদেশে সেনাবাহিনীর একটি বাণিজ্যিক প্রকল্পে সম্পৃক্ত হয়েছে তার কোন জবাবও তাই পাওয়া যায়নি।

এরকম আরেকটি প্রকল্প হচ্ছে সেনা প্যাকেজিং লিমিটেড। সেনা প্যাকেজিং লিমিটেডে নব্বুই শতাংশ শেয়ারের মালিক হচ্ছে সিঙ্গাপুরের কোম্পানী শ্যামরক এসোসিয়েটস আর বাকী দশ শতাংশের মালিক সেনা কল্যাণ সংস্থা।

শ্যামরক এসেসিয়েটস সম্পর্কে যতোদূর জানা যায় তা হলো এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক হলেন বাংলাদেশের একজন অবসরপ্রাপ্ত সেনাকর্তকর্তা - ক্যাপ্টেন গোলাম হোসেন।

আর সেনাবাহিনীর সরাসরি পরিচালনাধীন প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ মেশিন টুলস ফ্যাক্টরীর ভিতরে যে যৌথ উদ্যোগ জুতা প্রস্তুতকারী কারখানা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে সেটিরও অংশীদার হংকং ভিত্তিক যে কোম্পানী - তার পরিচালক বাংলাদেশেরই একজন সাবেক সেনাকর্মকর্তা।

এসব বাণিজ্যিক উদ্যোগ গ্রহণের যৌক্তিকতা, প্রক্রিয়ার স্বচ্ছ্বতা, বিনিয়োগের নিরাপত্তা ইত্যাদি বিভিন্ন প্রশ্নে সেনাসদরের সাথে বার বার যোগাযোগ করেও কোন ব্যাখ্যা পাওয়া যায় নি।

এই পটভূমিতেই প্রশ্ন উঠছে যে রাষ্ট্রীয় অর্থে বা সদস্যদের চাঁদায় প্রতিষ্ঠিত এসব প্রতিষ্ঠানের হিসাব কতোটা উন্মুক্ত।

সামরিকবাহিনীর পরিচালনাধীন এসব প্রতিষ্ঠানের জবাবদিহিতা এবং স্বচ্ছ্বতার বিষয়টিকেও অনেকে এক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ বলে বর্ণনা করছেন। সাবেক মহাহিসাব নিযস্ত্রক ও নিরীক্ষক এম হাফিজউদ্দিন খান বলেন সামগ্রিকভাবে সমাজ এবং সরকার উভযের পক্ষ থেকেই বিষযটি দেখা উচিত।

মি খান বলেন যে বাংলাদেশে সামরিকবাহিনী যে এসব নানাধরনের কাজে জড়িত হয়ে পড়ছে সেটা অন্যান্য দেশে খুব একটা দেখা যায় না। ইন্দোনেশিয়া, পাকিস্তান এবং থাইল্যান্ডে এটা কিছুটা দেখা গিয়েছিলো – অর্থাৎ যেসব দেশে সামরিক শাসন ছিলো সেসব দেশেই ব্যবসা-বাণিজ্যে সেনাবাহিনীর এধরণের প্রভাব দেখা যায়।

বিশ্বের প্রায় সব দেশেই সামরিকবাহিনী তার প্রাতিষ্ঠানিক শৃংখলার জন্য দৃষ্টান্ত হিসাবে বিবেচিত হয়ে থাকে। যেকারণে এই বাহিনীতে চেইন অব কমান্ড হচ্ছে অলংঘনীয় একটি বিষয়। আর, সেকারণেই সাধারণত কোন কমান্ডিং অফিসারের অধীনস্ত কর্মকর্তারা তাঁদের অধিনায়কের কোন সিদ্ধান্ত সম্পর্কে প্রশ্ন তোলেন না।

সেনাবাহিনীর যোগসূত্র রয়েছে কিন্তু, সরাসরিভাবে তা প্রতিরক্ষা বাজেটের অন্তর্ভুক্ত নয় এধরণের প্রতিষ্ঠানগুলোর বিষয়ে রাষ্ট্রীয়ভাবে কোন হিসাব নিরীক্ষার ব্যবস্থা নেই।

এসব প্রতিষ্ঠানের পরিচালনা পর্ষদ - অর্থাৎ আর্মি ওয়েলফেয়ার ট্রাষ্ট বা সেনা কল্যাণ সংস্থার বোর্ড অব ট্রাষ্টির মধ্যেই তাদের হিসাব-নিকাশ সীমাবদ্ধ।

কিন্তু, সেনা ও নৌবাহিনী সরাসরি যেসব প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করছে সেগুলোর হিসাব নিরীক্ষা রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে হওয়ার কথা।

সাবেক মহাহিসাব নিরীক্ষক এম হাফিজউদ্দিন খান যদিও বলছেন যে প্রতিরক্ষা হিসাব নিয়ন্ত্রণ ও নিরীক্ষার কাজে নিয়োজিত উপ-নিয়ন্ত্রকের দপ্তরে জনবলের অভাবে এসব হিসাব বছর বছর যথাসময়ে সম্পন্ন করা হয় না।

তবে, বর্তমান মহাহিসাব নিযন্ত্রক ও নিরীক্ষক আহমেদ আতাউল হাকিম বলছেন যে প্রতিরক্ষা বাহিনী হচ্ছে একটি শৃঙ্খলা মেনে চলার প্রতিষ্ঠান। ফলে, প্রতিরক্ষা বাজেটের হিসাব নিরীক্ষায় দেখা গেছে তাতে খুব একটা অনিয়ম পাওয়া যায় না।

মি হাকিম বলেন যে মেশিন টুলস ফ্যাক্টরি বা শিপইয়ার্ডের মতো প্রতিষ্ঠানের হিসাব নিরীক্ষা করে তাঁর দপ্তরের অধীনস্থ বাণিজ্যিক নিরীক্ষার দায়িত্বপ্রাপ্ত উপ নিরীক্ষক। তিনি বলেন যে এদুটো প্রতিষ্ঠানের হিসাব নিরীক্ষা সম্পণ্ন হয়েছে এবং তিনি প্রতিবেদনের জন্য অপেক্ষা করছেন।

বাণিজ্যিক উদ্যোগে সশস্ত্রবাহিনীর জড়িত হবার সবচেয়ে বড় ঝুঁকি অবশ্য তাঁদের পেশাগত। আর, বাংলাদেশে তার সবচেয়ে বড় শিকারও হয়েছে সেনাবাহিনী।

২০০৯ সালের ফেব্রুয়ারীতে আটষট্টি জন পদস্থ সেনা কর্মকর্তার প্রাণহানি ঘটে যে বিডিআর বিদ্রোহে সেই বিদ্রোহের বিষয়ে গঠিত সরকারী তদন্ত কমিটি তার রিপোর্টে সুপারিশ করেছে যে সশস্ত্রবাহিনী বা নিরাপত্তাবাহিনীকে বাণিজ্যিক কোন কর্মকান্ডে জড়িত করা থেকে বিরত থাকতে হবে।

ঐ কমিটি তার রিপোর্টে বলেছে যে ঐ বিদ্রোহের পিছনে অন্য অনেক বিষয়ের মধ্যে বিডিআর সিপাহীদের ডাল-ভাত কর্মসূচী বা ন্যায্যমূল্যে বিভিন্ন পণ্য বিক্রির কর্মকান্ডে জড়িত করায় একধরণের অসন্তোষ সৃষ্টি হয়েছিলো।

ঐ অসন্তোষের কারণ হিসাবে কথিত দুর্নীতির অভিযোগের কথাও ঐ তদন্ত রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়েছে। বিডিআর বিদ্রোহের বিষয়ে সরকারী ঐ তদন্ত কমিটিতে সেনাবাহিনীর প্রতিনিধি ছিলেন এবং রিপোর্টটি কমিটিতে সর্বসম্মতভাবে গৃহীত হয়েছিলো।

ঐ তদন্ত কমিটির প্রধান আনিসুজ্জামান খানের কাছে সেনাবাহিনীর এসব বাণিজ্যিক উদ্যোগ সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন সেনাবাহিনী অথবা আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী যেকোন বাহিনীকেই সবধরণের আর্থিক কারবার থেকে দূরে রাখা উচিত।

মি খান বলেন সেনাবাহিনী দেশরক্ষা করবে – তাদের কাজ শিল্প চালানো কিম্বা বিভিন্ন পণ্য বিপণন করার কথা নয়।

আনিসুজ্জামান খানের এই বক্তব্যের কিছুটা হলেও সমর্থন পাওয়া গেলো সাবেক সেনাপ্রধান এবং বর্তমানে রাজনীতিক - প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটির নেতৃত্ব দিয়েছেন অবসরপ্রাপ্ত লেফটেন্যান্ট জেনারেল মাহবুবুর রহমান বলেন যে সেনাবাহিনীর তার নিজের যে চার্টার অব ডিউটিজ আছে তার বাইরে বিশেষ করে আর্থিক লেনদেন তা শিল্প কিম্বা ব্যবসা যে কারণেই হোক না কেন সেটা ঠিক নয়।

মি রহমান বলেন যে এধরণের কাজে যুক্ত হওয়ায় ইতোমধ্যেই সেনাবাহিনীকে চরম মূল্য দিতে হয়েছে। তিনি এ প্রসঙ্গে বিডিআরের ডালভাত কর্মসূচীতে তাদের জড়িত হওয়া এবং তার পরিণতির কথা উল্লেখ করেন।

সৈনিকেরা যে দায়িত্ব পালনের শপথ নিয়ে ঐ বাহিনীতে নিয়মিত সৈনিকে রুপান্তরিত হয় সেই দায়িত্বের প্রস্তুতি - প্রশিক্ষণ এগুলো মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে বলে বলছেন সামরিক ও নিরাপত্তা বিষয়ে বিশেষজ্ঞ বাংলাদেশ ইনিষ্টিটিউট অব পিস এন্ড সিকিউরিটি ষ্টাডিজের প্রধান অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল এম মুনীরুজ্জামান।

সাবেক মহাহিসাব নিরীক্ষক এম হাফিজউদ্দিন খান অবশ্য এক্ষেত্রে আরো একধাপ এগিয়ে বলছেন যে এধরণের ব্যবস্থার ইতি টানা প্রয়োজন। তিনি বলেন যে সেনাবাহিনীর পরিকল্পনায় যেসব প্রকল্প রয়েছে তার যে দীর্ঘ তালিকা তা কোনভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। তিনি বলেন যে সেনাবাহিনীর এসব বাণিজ্যিক প্রকল্প তাদের কাছ থেকে অন্য কারো কাছে হস্তান্তর করা উচিৎ।

জাতীয় সংসদের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির সভাপতি সাবেক প্রতিরক্ষা সচিব ইদ্রিস আলী অবশ্য কল্যাণমূলক কাজের লক্ষ্যে বাণিজ্যিক কার্য্যক্রম সেনাবাহিনী সীমিত আকারে পরিচালনা করলে তাতে কোন সমস্যা দেখেন না। তবে, তিনিও এক্ষেত্রে সৈনিকদের পেশাগত কাজের সাথে ভারসাম্য রক্ষার ওপর গুরুত্ব আরোপ করেন।

সশস্ত্রবাহিনীর এসব বাণিজ্যেক কার্যক্রমে যুক্ত হওয়ার বিষয়টিকে ঘিরে সামরিক - বেসামরিক উভয়ক্ষেত্রেই নেতৃস্থানীয় নীতিনির্ধারকদের অনেকের মধ্যেই একধরণের অস্বস্তির লক্ষ্যনীয়। সেনাবাহিনীর সাথে সম্পর্কিত এসব ব্যবসা বা শিল্পের পরিধি যতোই বিস্তৃত হবে এবিষয়ে বির্তকও যে ততো বাড়বে তাতে কোন সন্দেহ নেই।

পোস্টটি ১৩ জন ব্লগার পছন্দ করেছেন

মুকুল's picture


প্রশংসনীয় কাজ হয়েছে। অনেক ধন্যবাদ আপনাকে।

নুশেরা's picture


পরিশ্রমকে সাধুবাদ।

রাসেল আশরাফ's picture


কষ্ট যখন করছেন আরেকটু করেন আগের দুই পর্বের লিঙ্কটা যদি এখানে দিয়ে দিতেন।তাইলে খুব ভালো হতো।প্রিয়তে নিতে আমার মতো অধমের সুবিধা হতো।

মীর's picture


সাংবাদিক হো তো অ্যায়সা। হ্যাটস অফ টু কামাল ভাই।
সামনা-সামনি অভিনন্দন জানানোর আগ্রহ রাখি।

ভাঙ্গা পেন্সিল's picture


শেয়ার করছি তিন পর্বই।

জ্যোতি's picture


বান্ধাইয়া রাখার মতো পোষ্ট। কত কি যে জানি না!অনেক ধন্যবাদ মাসুম ভাই পোষ্ট এর জন্য।

নাজনীন খলিল's picture


রূপগঞ্জের সাম্প্রতিক ঘটনার কথা মনে পড়ে গেল। Sad

প্রিয় পোস্টে গেল।

তানবীরা's picture


রূপগঞ্জের কথা ভাবছি আর ভাবছি আর কতো চাই। কোন সরকারী চাকুরীতে কাউকে সারা জীবনের জন্য বাসা বাড়ি প্লট দেয়া হয় না। দেয়া হয় শুধু সেনাবাহিনীকে, কেনো? চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের এই মানে কি? যে সেনাবাহিনীতে কাজ করেছে সে সুবিধা নিক, মৃত্যু পর্যন্ত নিক, তার স্ত্রীও নিক কিন্তু সন্তানেরা, নাতি নাতনী চৌদ্দ পুরুষ কেনো নিবে?

পৃথিবীর কোন দেশে এই ব্যবস্থা আছি কি? এশিয়ার কথা জানি না কিন্তু ইউরোপে নেই জানি। এখানে কোন সরকারী চাকুরেই বাসা পায় না কিন্তু বাড়ি কিনতে চাইলে সরকার চালিত ব্যাংক থেকে সহজ শর্তে ঋন পায় বলে জানি

শাওন৩৫০৪'s picture


কালেকশন, কালেকশন পোষ্ট---কালেক্টেড!!

১০

সাহাদাত উদরাজী's picture


আমাদের হিসেব এ জন্য মিলে না!

১১

সাঈদ's picture


ঠিক এই সময়েই রুপগঞ্জের ঘটনা ঘটলো।

১২

অমি's picture


এই মাত্র বিবিসিতে শুনলাম: ঢাকার অদুরে বিদ্যুত উপকেন্দ্র চালু হচ্ছে কয়েক দিনের মধ্যেই। খরচ হয়েছে ৩ কোটি ১০ লাখ ডলার। জার্মান ৪০%, সেনাবাহিনী ৩০% আর যাদের মাধ্যমে এসেছে তাদের বাকিটা

মন্তব্য করুন

(আপনার প্রদান কৃত তথ্য কখনোই প্রকাশ করা হবেনা অথবা অন্য কোন মাধ্যমে শেয়ার করা হবেনা।)
ইমোটিকন
:):D:bigsmile:;):p:O:|:(:~:((8):steve:J):glasses::party::love:
  • Web page addresses and e-mail addresses turn into links automatically.
  • Allowed HTML tags: <a> <em> <strong> <cite> <code> <ul> <ol> <li> <dl> <dt> <dd> <img> <b> <u> <i> <br /> <p> <blockquote>
  • Lines and paragraphs break automatically.
  • Textual smileys will be replaced with graphical ones.

পোস্ট সাজাতে বাড়তি সুবিধাদি - ফর্মেটিং অপশন।

CAPTCHA
This question is for testing whether you are a human visitor and to prevent automated spam submissions.

বন্ধুর কথা

শওকত মাসুম's picture

নিজের সম্পর্কে

লেখালেখি ছাড়া এই জীবনে আর কিছুই শিখি নাই।