তবলার যাদুকর
১.
আমি খুবই সাধারণ একজন শ্রোতা। গান শুনি, কারণ শুনতে ভাল লাগে। জগজিৎ সিং-এর গজল আর বন্যার রবীন্দ্রনাথের গান শুনে আমি ঘন্টার পর ঘন্টা কাটিয়ে দিতে পারি। ঢাকায় জগজিৎ সিং আসলেও একবারও দেখতে যেতে পারিনি। একবার একটা টিকেট হাতে নিয়েও কাজের কারণে যেতে পারিনি।
ভার্সিটি জীবনে শিল্পকলায় বন্ধুদের নিয়ে খুব যাওয়া হতো, বেশির ভাগই রবীন্দ্রনাথের গান শুনতে। চাকরি জীবনে অনেক অনুষ্ঠানে চাইলেই যাওয়া যায়, কিন্তু কাজের ধরণের কারণে আর যেতে পারি না। কারণ আমার কাজই সন্ধ্যায়।
আমি সামিনার খুব ভক্ত। এতোটাই ভক্ত যে, গত বছর এক অনুষ্ঠানে ফাহমিদা নবীর সঙ্গে জীবনের প্রথম আলাপের আমার প্রথম কথা ছিল 'আমি সামিনার খুব ভ্ক্ত।' যিনি আলাপ করিয়ে দিয়েছিলেন তিনি পরে আমাকে বকা দিয়ে বলেছিলেন, কাজটা ঠিক হয়নি। ঈর্ষা জিনিষটা খুবই খারাপ।
ছাত্র জীবনে একবার টিকেট কিনে সামিনার গান শুনতে গেছিলাম। একটা গান গেয়ে সামিনা অসুস্থ্য হয়ে পড়ায় সেই গান আর শোনা হয়নি।
গত বছর এইচএসবিসির শতবর্ষের গান শুনতে গেছিলাম। শ্রীকান্ত হাইলেন বৃষ্টি তোমাকে দিলাম। একমঞ্চে শাহনাজ, সাবিনা, রুনা, হৈমন্তি শুক্লা, শ্রীকান্ত. জব্বার, মিতা হক কে গান গাইতে দেখা ও শোনা অবশ্যই দারুণ এক অভিজ্ঞতা। বিশেষ করে রুনার গাওয়া পরদেশী মেঘ, আর কোথা যাসনে গানটা যেন এখনও কানে লেগে আছে।
২.
তবে কালকের অভিজ্ঞতার সঙ্গে কোনোটাই তুলনীয় নয়। কাল ছিল ওস্তাদ জাকির হোসেন সন্ধ্যা। বলা যায় তিনি প্রায় দেড় ঘন্টা হাতের যাদু দেখালেন। হল ভর্তি মানুষ। অনুষ্ঠান শুরু হওয়ার পর থেকে দেড় ঘন্টা একটি মানুষও কথা বলেছে বলে মনে হয়নি। মন্ত্রমুগ্ধ ছির সবাই। তবলা আর সারেঙ্গি ছাড়া আর কোনো আওয়াজ ছিল না। কথা যা বলেছেন তা ওস্তাদ নিজেই।
প্রথম আলোর সংবাদটি থেকে তুলে দেই কিছু অংশ। কারণ আমার পক্ষে এর বর্ণনা দেওয়া সম্ভব না।
সারেঙ্গিতে কিরোয়ানি রাগে আলাপ শুরু করেছিলেন ওস্তাদ সাবির খান। তার সঙ্গে জাকির হোসেন ধা ধিন ধিন তা বোলে বিলম্বিত তিন তালে পেশকার দিয়ে পরিবেশনা শুরু করেন। এরপর একে একে তিনি সেলামি, কায়দা, রেলা ও টুকরা পরিবেশন করেন। বাদনের ফাঁকে ফাঁকে পরিবেশনার বিষয়টি জানিয়ে দিচ্ছিলেন। মুখে বোল তুলে সেটিকে বাজিয়ে শুনিয়েছেন। সরস কথোপকথন ছিল মাঝেমধ্যে। যেমন ‘কায়দা’ বাজানোর আগে বললেন, ‘এবার শুনুন কায়দা। তবে এটি আল-কায়দা নয়।’
বড়ই বৈচিত্র্যময় ছিল তাঁর পরিবেশনা। কখনো দ্রুত, কখনো ধীরে খাদে নেমে যাচ্ছিল তাল-লয়। একপর্যায়ে বললেন, ‘এবার বৃষ্টির তাল।’ তারপর যে জিনিস তিনি পরিবেশন করলেন, তা এককথায় বিস্ময়কর। এক বাঁয়ার সঙ্গে একজোড়া ডাইনা (তবলা)। ডাইনার ওপর আঙুলের চাঁটিতে মনে হলো কখনো বৃষ্টি পড়ছে টিনের চালে, কখনো তার রিমঝিম লয়, কখনো মুখর বৃষ্টির ঝমঝম শব্দ। মাঝে মাঝে বাঁয়াতে (ডুগি) মন্দ্রস্বরে গুমগুম মেঘের গর্জন। বৃষ্টি পর্বের পর শোনালেন রেলের গতি। সেই যে ‘রেলগাড়ি ঝমাঝম পা পিছলে আলুর দম’ ছড়ার ছন্দ, যেন সেই ছন্দ উঠে এল বাদনের মাহফিলে।
বিভিন্ন ছন্দে বাজিয়েছেন জাকির হোসেন। কখনো দ্রুত ছুটে চলা ঘোড়ার খুরের শব্দ, কখনো ঝরনাধারার কলতান, কখনো বা বজ্রধ্বনি। ঘণ্টা খানেক সুরতালের ইন্দ্রজালে মোহিত করে রেখেছিলেন দুই ওস্তাদ।
এবার কিছু ছবি





৩.
ভদ্রলোক সম্ভবত নিরাপত্তার দায়িত্বে। অনুষ্ঠান শুরু হয়েছে। ওস্তাদ জাকির হোসেন বাজাচ্ছেন। প্রায় ২০/২৫ মিনিট হয়ে গেল। একটু প্ই ধৈর্য্য হারালেন নিরাপত্তার দায়িত্বের এক ভদ্রলোক। আপন মনেই বলে উঠলেন, 'এতোক্ষণ ধইরা খালি তবলাই বাজায়, গান গাইবে তাহলে কখন?'





ছেলেরা যে হাত দিয়ে অনেক ভালো ভালো কাজও করতে পারে, তার সবচেয়ে উৎকৃষ্ট উদাহরণ ওস্তাদ জাকির হোসেন
কালকের জাদু দেখার অনেক ইচ্ছা ছিলো... কিন্তু
অনেক বছর আগে ওসমানী মিলনায়তনে একবার বাপ বেটার পরিবেশনা ছিলো, যথারীতি সেখানেও যাওয়ার সুযোগ হয় নাই, কিন্তু পরদিন পত্রিকায় সেই পরিবেশনার একটা ছবি দেখছিলাম, সাদাকালো সেই ছবিটা এখনো চোখে লেগে আছে। মঞ্চের দু'পাশে দুইজন তবলা বাজাচ্ছেন, একসময় আল্লারাখা তবলা বাদ দিয়ে জাকির হোসেনের দিকে হাত বাড়িয়ে তালি দিতে লাগলেন... একটা স্থির চিত্র, কিন্তু মনে হয়েছিলো যেন পুরো ঘটনাটা দেখতে পাচ্ছি। সেই ছোটবেলা থেকে এই ছবিটা মনে গেঁথে আছে...
অডিও ভিডিও কিছু করেন নাই?
হ..। তখন ভোরের কাগজ না যেন প্রথম আলো (প্রথম আলো তখনো বাজারে না আসলে ভোরের কাগজই হওয়ার কথা.. ফিচার পাতাটা মনে হয় ছিল ''মেলা'') বেশ কাভারেজ দিছিলো..। .. ঐবার'ই ঐ কাভারেজ পইড়া জানছিলাম ওস্তাদ ঝাকির হোসেন নামে কেউ আছেন। পরে মুভারস এন শেকারস এ শেখর সুমনের সাথে জাকির হোসেনের ইন্টারভিউ দেইউখা তো মুগ্ধ হয়া গেছলাম..
উমম... প্রথম আলোর তো কথাই নাই, কিন্তু আমি যেই শোর কথা কইতেছি তখন সম্ভবত ভোরের কাগজও হয় নাই। আমি ছবিটা দেখছিলাম দৈনিক বাংলায়।
তাইলে মনে হয় আপনার আর আমার বর্ণনা দুই ভিন্ন ট্যুরের বর্ণনা..। আমি ভোরের কাগজ নাইলে প্র আলো তে পড়ছিলাম..।
হ
ওস্তাদ জাকির হোসেনের চুল টা সেইরকম লাগে.. আমার জীবনের একটা শখ ছিল এইরাম চুল রাখা...
ওস্তাদ জাকির হোসেন কিন্তু মাল পীস..। আফসোস গানের কিছুই আমি বুঝিনা..। এই লাইনে আমিও খালি শ্রোতা
আপনি গান বুঝেন না দেইখাই তো আপনার সম্মানে উনি গান করেন নাই, খালি তবলা বাজাইছেন
খেক খ্বেক খেক
নজরুলের মন্তব্যটা বাধাইয়া রাখার মতো
ইশ্ যদি সাংবাদিক হইতে পার্তাম
এইটা প্রথম আলোর নিজস্ব প্রোগ্রাম ছিল।
এইটা সবচেয়ে জটিল হয়েছে।
জাকির হোসেনের নাম প্রথম শুনি সুমনের গানে। এত হ্যান্ডসাম তবলাবাদক জগতে আর একটাও নাই
তাঁর হাতটাই তো বাঁধাইয়া রাখার মতো। চেহারা তো বাড়তি।
সামনাসামনি শোনা... ঈর্ষা করলাম।
জাকির হুসেনের কিছু যুগলবন্দি আছে বিভিন্ন ইন্সট্রুমেন্টের সাথে, খুব ভালো লাগে শুনতে। সবচেয়ে ভালো লেগেছিলো সন্তুরের সঙ্গে যেগুলো।
জাকিরের একটা ইন্টারভিউ পড়েছিলাম আশির দশকে, তখনই তিনি নিজস্ব বিমান নিয়ে ওয়ার্ল্ড ট্যুরে ঘুরতেন!
========================
এই জাতের লোক কক্সবাজার গিয়া বলে, একটার পর একটা খালি ঢেউই আসতেছে, এইখানে কি ঢেউ গুণতে আসছি?
সুন্দরবন গিয়া বলে, ধুর খালি গাছ আর গাছ, গাছের চোটে কিচ্ছু দেখা যায় না...
হু, আমিও গাছের চোটে বাঘ দেখতে পারি নাই। পরে অবশ্য বাঘ দেখছি চিড়িয়াখানায়। আর এখন মাঠে দেখতে চাই।
ইডাও কি কর্পোটেট তবলা শোনা ?
পোস্টের ব্যাপারে বিশেষ কিছু বলার নাই, ওস্তাদ জাকির হোসেনের তবলা শুনসি। সামনা-সামনি দেখার সৌভাগ্য হয় নি। কিছুটা দুধের স্বাদ ঘোলে মিটে গেল। মাসুম ভাই কেমন আছেন?
ভাল আছি সম্ভবত। আপনি কেমন?
এসব শুনলে মন্টাই খ্রাপ হয়। কোপাল নিয়ে জন্মাইছেন। আর আমার হইলো কপাল।
আমি তো গেছিলাম ডিউটি দিতে।
তবলা শোনা আপনার ডিউটি?কোপাল। সবই কোপাল।
এটা আমিও কইসিলাম। চিমটি। কিন্তু আপা মনে হয় এইটা শুইন্যা যক্ষ তিতা। কেমন যেনো একটা লুক দিয়েছিলেন।
একটা সিনেমা দেখেছিলাম "সাজ"। ওখানে জাকির হুসাইনের তবলা শুনেছিলাম সামনা সামনি
আমারেও একটা লুক দিছিলো।
সাজ আমিও দেখছিলাম। চিমটি। আমিও সামনা সামনি তবল বাজানো দেখছিলাম কিন্তু।
সাজ সিনেমাটা তো লতা-আশারে নিয়া খানিকটা।
তে রে কে টে লেখাটা আমাকে মেরেকেটে গেল।
এরকম গুণীজনের তবলা সামনাসামনি শোনার সৌভাগ্য কী আমার কখনো হবে?
হবে হবে
'এরেই বুঝি কয় তেলের মাথায় তেল, আর ন্যাড়া মাথায় চাটি'
সেদিন ভি আইপি মহলে বসে দেখলেন ক্রিকেট... আজকে আবার জাকির হুসেনের তবলা' আপনি পাইছেনটা কি মিয়াভাই
...হিংসায় অঙ্গ যায় জ্বলিয়া
....জাকির হুসেন দেখি তেমন বুড়াই হন নাই..
পুষ্টের জন্ন ব্যাপক ধইন্যা।
১)আহা! টিকেটটা দান করে দিতেন
এইরণের টিকেটের আগাম বুকিং দিয়া রাখলাম
আমিও সামিনা ভক্ত, ওর রূপ-গুণ সবকিছুর।
২)রুনা লায়লাদের গ্রুপ ছবিটা খুবই সুন্দর লাগছে।
ওস্তাদ জাকির হোসেন দেখি ব্যাপক সুন্দর মানুষ, ওনার ছবিগুলারে লাইক দিলাম।
৩) শেষটায় যথারীতি মাসুমীয় টুইস্ট
রিয়েল ওস্তাদ। ওনার কবে চিপ পেকে গেল! সেই ছোট থেকে ওনার নাম জানি। টিভিতে অনেক দেখেছি। ইন্ডিয়ান জী টিভিতে আগে ওনাদের অনেক অনুষ্টান হত। লাল চা খেয়ে তাজমহল চা পাতার বিজ্ঞাপনে তিনি বলতেন, ওয়াহ তাজ!
আমি বাংলাদেশের এ রকম একজন ওস্তাদকে জানি। বাংলাদেশের সরোদের যাদুকর ওস্তাদ শাহাদাত হোসেন খান। তবলার সাথে সরোদ, যেন দুলাভাই আর শালী! চমৎকার ভাল লাগে। জীবনে অনেকবার শুনেছি।

সরোদের যাদুকর ওস্তাদ শাহাদাত হোসেন খান ও তবলার যাদুকর ওস্তাদ জাকির হোসেন খানকে যদি একসাথে বসাতে পারতাম!
জাকির হোসেনের তবলা লহরা অনেক পরে শুনেছি। আমি তাঁকে দেখি হিট অ্যান্ড ডাস্ট ছবিতে প্রথম।
মন্তব্য করুন