সব কিছুই আগের মতো
দালালদের সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করলেন বঙ্গবন্ধু। এর আগে আইন সংশোধন করে দালালদের মুক্তি দেওয়া হয়। মুক্তি পায় অনেক অনেক দালাল। ১৯৭৩ সালে ডিসেম্বরে তিনি বললেন,
এসব লোক দীর্ঘদিন ধরে আটক রয়েছেন, এতদিন তারা নিশ্চয়ই গভীরভাবে অনুতপ্ত। তারা নিশ্চই তাদের অতীত কার্যকলাপের জন্য অনুশোচনায় রয়েছেন।.......মুক্ত হয়ে দেশগঠনের পবিত্র ও মহান দায়িত্ব গ্রহনের পূর্ণ সুযোগ তারা গ্রহণ করবেন এবং তাদের অতীতের সকল তৎপরতা ও কার্যকলাপ ভুলে গিয়ে দেশপ্রেমের উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করবেন।
এরপর আসল ১৯৭৪। বঙ্গবন্ধু লাহোরে ইসলামী সম্মেলনে যোগদান শেষে ফিরলেন। কিন্তু স্বাভাবিকভাবেই কেউ মনে রাখলো না বঙ্গবন্ধুর আশাবাদের কথা। বরং দালালরা পেয়ে যায় সুযোগ। কাজেও লাগালো সেই সুযোগ।
বেআইনী ঘোষিত জামায়াতে ইসলামী, নেজামে ইসলামী, মুসলিম লীগ, পি.ডি.পি. প্রভৃতি দলের একশ্রেণীর সদস্য এবং অন্যান্য পাকিস্তানপন্থীরা বেনামীতে রাজনীতির আসরে নামার জন্য 'চাঁদ তারা মার্কা' পতাকা নিয়ে জাতীয় গণতন্ত্রী দল নামে একটি নতুন দল গঠন করেন।
প্রথম সভায় 'ভারতের রাহুগ্রাস' থেকে বেরিয়ে লাহোরে ইসলামী সম্মেলনে যোগদান করার জন্যে বঙ্গবন্ধুকে অভিনন্দন জানানো হয়। এছাড়াও অবিলম্বে পাকিস্তানের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা এবং ব্যবসা-বাণিজ্য শুরু করার জন্য দাবি জানানো হয়। শুধু তাই নয়, এই মহল মুক্তিযুদ্ধে ক্ষতিগ্রস্ত রাজাকার, আলবদর, আলশামস এবং কারাগারে আটক দালালদের জন্য সরকারের কাছে ক্ষতিপূরণও দাবি করে।
এরপরই শুরু হয় সারা দেশে মসজিদে মসজিদে এবং ধর্মীয় সমাবেশের মাধ্যমে তীব্র সরকারবিরোধী প্রচারণা।
এসময় একটি ঘটনা ঘটেছিল। দৈনিক সংবাদ তখন প্রগতিশীল পত্রিকা। সেখানে একটি কবিতা লিখলেন কবি দাউদ হায়দার। কবিতাটির নাম ছিল,
'কালো সূর্যের কালো জ্যোৎসায় কালো বন্যায়'। তিনি ঐ কবিতাতে হযরত মোহাম্মদ (সাঃ), যিশুখ্রীষ্ট এবং গৌতম বুদ্ধ সম্পর্কিত অবমাননাকর উক্তি ছিল জানিয়ে সাধারণ মানুষের ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত করার অভিযোগ করা হয়েছিল। ঢাকার এক কলেজ-শিক্ষক ঢাকার একটি আদালতে এই ঘটনায় দাউদ হায়দারের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেছিলেন।
চাকরি থেকে সংবাদ বরখাস্ত করলো দাউদ হায়দারকে। ক্ষমাও চাইলো। কিন্তু তাতেও কাজ হলো না। নতুন গঠিত জাতীয় গণতন্ত্রী দল ঢাকায় সমাবেশ করলো, মিছিল করলো। লিফলেট বের হলো। দাউদ হায়দারের ফাঁসি চাইল তারা। মহানবীকে অশ্রদ্ধার শাস্তি চাওয়া হল।
ধর্মীয় উম্মাদনা এবং এর প্রভাব নিয়ে শংকিত প্রায় একশ বুদ্ধিজীবী একটি যৌথ বিবৃতি দিলেন। ধর্মকে ব্যবহারের বিরোধীতা করলেন তারা। বলা হল, এর উদ্দেশ্য ধর্ম নয়, রাজনীতি।
কিন্তু সরকার কি করলো? ধর্ম নিরপেক্ষ সরকার হলেও তারা যে ধর্মের কোনো ধরণের অবমাননার ব্যাপারে কঠোর তা বার বার তারা বলতে লাগলেন। এরপর গ্রেপ্তার করা হল দাউদ হায়দারকে। বলা হল, নিরাপত্তামূলক গ্রেপ্তার।
বাংলাদেশ সরকার তখন চায়নি আন্তর্জাতিকভাবে মুসলিম সরকারদের সাহায্য হারাতে। ১৯৭৪ এর ২০ মে সন্ধ্যায় তাঁকে জেল থেকে মুক্তি দেওয়া হয় এবং ২১শে মে সকালে বাংলাদেশ বিমানের একটা রেগুলার ফ্লাইটে করে তাকে কলকাতায় পাঠানো হয়। ওই ফ্লাইটে তিনি ছাড়া আর কোনো যাত্রী ছিল না। আর ফিরতে পারলো না দাউদ হায়দার।
স্বাধীন বাংলাদেশে সেই প্রথম সাম্প্রদায়িক রাজনৈতিক শক্তি তাদের প্রভাব ও ক্ষমতা দেখলো ও দেখালো। সে সময়ে আওয়ামী লীগ সরকার প্রথমে ছিল উদাসীন, পরে করলো আত্মসমর্পন।
তারপর ২০১৩। গণতন্ত্রী দল নেই, আছে হেফাজত, যাদের ছায়ায় জামায়ত। পত্রিকার বদলে এবার ব্লগ। কবিতার বদলে পোস্ট। কিন্তু সরকারের আচরণ সেই একই। ইতিহাস ঘুরে ফিরেই আসে। তারপরেও ইতিহাস থেকে কেউ শিক্ষা নেয় না।
তথ্যসূত্র:
১. বাংলাদেশের রাজনীতি, ১৯৭২-৭৫: হালিম দাদ খান, আগামি প্রকাশনী
২. ইতিহাসের রক্তপলাশ, পনেরই আগস্ট পঁচাত্তর: আবদুল গাফফার চৌধুরী, জোৎস্না পাবলিশার্স
৩. বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবকে ঘিরে কিছু ঘটনা ও বাংলাদেশ: ড. এম ওয়াজেদ আলী
৪. উইকিপিডিয়া





আমার নানা আমাকে প্রায়ই মনে করিয়ে দিতেন,
এর শেষ নাই মনে হয়।
এবার আমরা যারা শিক্ষা নিতে চাই তারা কি শিক্ষা নিব বলতে পারেন?
অন্তত: এই সরকারের সময়ে এমনটা আশা করিনি । মন খুলে একটা কথা বলছি না ভয়ে । কান্না পায় শুধু রাগে, দু:খে, অপমানে, অসহায়ত্বে ।
কিছু দেখতে নেই;
কিছু শুনতে নেই,
কিছু বলতে নেই।
পলিটিক্স ইজ মাংকি বিজনেস!
সবাই বরং এইটা পড়েন, তিনিই সব
জেপনে বিনুদনের প্রয়জন আছে!
মাসুম ভাই,
শোভন যদি আজ বেচে থাকতন, তিনিও কি আটক হতেন ? মামলা খেতেন ? মাথা গুলিযে যাচ্ছে খালি ! সংসদ থেকে বলা হল রাজিব ২য় মুক্তিযুদ্ধের ১ম শহীদ । এটা কি সরকার এখন নিয়ে নেবে ? ডিগবাজিতে হাছিনা এবার বিশ্ব-বেহায়াকে ছাড়িয়ে গেল বুঝি !
দাউদ হায়দারের কথা জানা ছিলো তবে ঘটনাটা জানতাম না।
দেশে ফিরতে না দেয়া একটা অমানুষিক অপরাধ
দেশ আগাচ্ছে... কালে কালে তাদের শক্তি বাড়ছে... কিন্তু কোন সরকারই এদের নিয়ে কোন ধরনের দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা নিতে পারেনি।
`গণতন্ত্রী দল নেই, আছে হেফাজত, যাদের ছায়ায় জামায়ত। পত্রিকার বদলে এবার ব্লগ। কবিতার বদলে পোস্ট। কিন্তু সরকারের আচরণ সেই একই। ইতিহাস ঘুরে ফিরেই আসে। তারপরেও ইতিহাস থেকে কেউ শিক্ষা নেয় না।'
খুবই তথ্যবহুল লেখাটা। ভাল লেগেছে! অনেক কিছু জানলাম! ভাল থাকবেন!
মন্তব্য করুন