মনের ভেতরের মন
সোহান ভুল করছে। হয়তো আমিও করছি। আমি যে ভুল করছি তা আমি বুঝতে পারছি। আর এই বুঝতে পারার জন্যই প্রতিটা মুহূর্তে আমি বেশ অস্বস্তি নিয়ে পার করছি। কারণ এভাবে চলতে থাকলে বিষয়টা একদিন সবার নজরেই পড়বে। তখন সমাজ সংস্কারের চিরায়ত নিয়ম অনুসারে নিন্দার ঝড়টা আমার গায়ে এসেই কাটার মতো বিঁধবে।
আমার নিজের মানসিক অবস্থা নিয়ে আমি খুব দ্বিধার মধ্যে আছি। একবার আমার মনে হচ্ছে আমার জীবনটা আমার। শুধু আমার না, প্রতিটা মানুষের জীবনই তার নিজস্ব। তার ভাবনা-চিন্তা, বেঁচে থাকার পদ্ধতি, তার পছন্দ-ভালো লাগা না লাগা সব কিছুই একান্ত তার। আমরা নিজেদের প্রয়োজনেই, নিজেদের স্বার্থ এবং সুবিধার্থেই কিছু বলয় তৈরি করি। আর পরবর্তী সময়ে অন্যের উপর জোর করে কোনো কিছু চাপিয়ে দেয়ার ক্ষেত্রে সেই বলয়টাকেই অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করি। আবার মনে হয়, না আমার জীবনটা শুধু আমার না, আমার সাথে জড়িয়ে আছে আরও অনেকগুলো সম্পর্ক...।
আমি যখন আমার ছেলের সঙ্গে রাতে একসাথে খেতে বসি রবিনের চোখে চোখ পড়তেই আমি খুব অস্বস্তি বোধ করি। যদিও রবিনের সাথে আমার সম্পর্কটা বেশ বন্ধুত্বপূর্ণ। এতই বন্ধুত্বপূর্ণ যে রবিন যখন তার বিশ্ববিদ্যালয়ের বন্ধুদের গল্প করে তখন যতবারই সে পুতুলের কথা বলে ততবারই লজ্জায় লাল হয়ে ওঠে। কিছুদিন আগে পুতুলকে এনে আমার সাথে পরিচয় করিয়ে দেয়। আর এখন তো পুতুলের সাথে দিনভর আনন্দ করা, খুনসুটি করা গল্পগুলো আমাকে না বললে যেন ওর ঘুম আসে না। আর বলবে নাই বা কেন? গত ১২ বছর ধরে আমাদের মা ছেলের সংসার। ওর বাবার সঙ্গে যখন আমার ডিভোর্স হয়ে যায় তখন প্রথম কিছুদিন ছেলের ভবিষ্যতে নিয়ে আমি অনেক বেশি চিন্তিত ছিলাম। কিন্তু এরপরই পত্রিকার চাকরিটা আমার জীবনের মোড়ই ঘুরিয়ে দেয়। রবিনের বাবা রফিক রবিনকে নিজের কাছে নেয়ার জন্য সেরকম কোনো ঝামেলা করেনি বলে আমাকে তেমন একটা ভোগান্তি পোহাতেই হয়নি। বেশ তো চলছিলাম আমরা মা ছেলে। ছেলের প্রেমের গল্প শুনে এবং পরবর্তীতে পুতুলকে দেখে পুত্রবধূ হিসেবে ওকে ভাবতে আমার ভালোই লাগছিল। কিন্তু সোহানকে নিয়ে তো আর পারছি না। এটা ঠিক সোহানকে একা দোষী করা ঠিক হবে না। সোহান আমাকে ভালোবেসেছে আমিও তো ফেরাতে পারিনি ওকে। কতই বা হবে সোহানের বয়স। আমার রবিনের বয়সী কিংবা তারচেয়ে দু’চার বছর বেশি।
সোহান যখন রাতে আমার মোবাইলে ফোন করে আমি অষ্টাদশী তরুণীর মতো উৎসাহী হয়ে উঠি। আমার হৃদস্পন্দন বেড়ে যায় এবং ওর সাথে কথা বলতে খুব ভালো লাগে। ভালো লাগাটা এমন পর্যায়ে যে ও যখন কোনো কিছু নিয়ে অভিমান করে বা মন খারাপ করে তখন আমার অস্থিরতা বেড়ে যায়। মনে হয় এক্ষুণি ওর রাগটা ভাঙিয়ে দিই।
সোহানের সাথে আমি আমার অফিস এবং অফিসের বাইরে কযেকবার রেস্টুরেন্টে গিয়ে দেখা করলেও সেভাবে কোথাও বেড়াতে যাইনি। ইদানিং সোহান গোঁ ধরেছে আমাকে নিয়ে বেড়াতে যাবে সেন্টমার্টিনে। আমার এক মন ভেতরে ভেতরে খুবই আনন্দিত হয়। কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে আরেক মনে জমা হয় ভয়, না, আমি তো সমাজের বাইরের কেউ নই। সমাজ নয়, আমার ছেলের সামনে আমি দাঁড়াব কিভাবে?
আমার খুব কান্না পাচ্ছে। আমার ভেতরে কি কোনো চাওয়া ছিল? ছিল কোনো অপূর্ণতা? সোহান নামের ছেলেটা খুব সহজে সেই অপূর্ণতা বুঝে গেল এবং সেখানেই টোকা দিল। বাঙালি মেয়েরা চল্লিশেই বুড়ি। আর আমার চলছে তেতাল্লিশ। তেতাল্লিশ বছরের জীবনে আবার বাইশ বছরের একটি ছেলেও আছে। অথচ আমি কিনা এই বয়সে আরেক ভালোবাসার মানুষের জন্য কেঁদে বুক ভাসাচ্ছি?
জানি অনেকেই বলবে চরিত্রের বিকৃতি, মানসিকতার বিকৃতি ঘটেছে। কিন্তু আমার অপূর্ণতা, আমার একাকীত্বতা কেউ বুঝবে না, বুঝতে চাইবে না। সোহান খুব সুদর্শন একটা ছেলে। গান বাজনা করে। একবার কোন একটা প্রোগ্রামের প্রেস বিজ্ঞপ্তি দেয়ার জন্য এসেছিল আমার অফিসে। কথা বলার এক ফাঁকেই ওর গানের কথা নিয়ে কিছুক্ষণ গল্প করলাম। এভাবে দু’তিনবার। এরপর সে আমার ফোন নম্বর নিয়ে ফোন করত আমাকে। প্রথম প্রথম বিরক্ত হলেও সেভাবে বলার কিছু ছিল না। কারণ ওর বেশির ভাগ কথাই থাকত ওর গান নিয়ে। শো নিয়ে। আমার সাংবাদিকতার খবর নিয়ে। সম্বোধনটা আমাদের আপনি পর্যায়েই ছিল। একদিন ও বলল, আপনি তো বয়সে আমার অনেক বড়, আমাকে তুমি করেই বলেন। আমিও ভাবলাম তাই তো, তুমি তো বলাই যায়। এরও অনেকদিন পর বলল, যদি আপনাকে তুমি বলতে চাই। ও কথা শেষ করার আগেই আমি কিছুটা বিরক্ত হয়ে বললাম, এটা কি ধরণের কথা? ও বলল, না তুমি সম্বোধনটা অনেক আপন না, তাই বলছিলাম। আপনার আপত্তি থাকরে বাদ দিন।
সোহানের গলাটা শুনে আমার বুকটা কেমন কেঁপে উঠেছে। গলা শুকিয়ে আসছিল। আমি খুবই অস্বস্তির মধ্যে পড়ে গিয়েছিলাম। আমার সমস্যা কোথায়?
সোহানের গল্পগুরো খুব অদ্ভূত। মন ভালো হয়ে যাওয়ার মতো গল্প। রঙধনুর গল্প, রঙ হওয়ার গল্প; সেই রঙে রঙিন মেঘ হয়ে ভেসে বেড়ানোর গল্প, প্রজাপতির জীবন, উড়ু উড়ু প্রজাপতি, তালগাছের মাথায় প্রজাপতি হয়ে বাবুই পাখির বাসায় লুকিয়ে যাওয়ার গল্প কি অদ্ভূত! সত্যি বলতে কি ওর গল্পের সঙ্গে আমিও হারিয়ে যেতাম কোথায় যেন!
ও আমাকে বলে, চলো আমরা কাকের জীবন বেছে নিই। সারাক্ষণ শুধু কা-কা কা-কা।
আমি ওর কথা শুনে কপালে ভাঁজ ফেলে বলি, এটা কী ধরনের কথা? আমরা কাক হবো কেন? মানুষ পাখি হতে চায়, চড়ুই, বাবুই, শালিক, ময়না, টিয়া, কতকিছু...। আর তুমি কি না বলছ কাকের জীবন? কেন আমরা কি খুব পঁচে গেছি?
আরে না, বলে সে কী হাসি ওর। কাকের জীবন মানে নিরাপদ। কাককে সবাই যন্ত্রণা ভেবে দূর দূর করে তাড়িয়ে দেয়। আর এই সুযোগে কাক থাকে নিজের মতো স্বাধীন। কখনো রাস্তায় ঝুলতে থাকা তারের উপর, কখনো ডাস্টবিনের ময়লার ভেতর। কিন্তু স্বাধীন তো! ওর কথা শুনে গা আমার রি রি করে ওঠে। কী এক পাগলের পাল্লায় পড়লাম। আমার সংসারে মন বসে না। আগের মতো ছেলের ভার্সিটির গল্প শুনতে তীব্র আগ্রহ হয় না। কেন জানি না কাক জীবনটা বেছে নিতে ইচ্ছে করে। ইচ্ছে করে প্রজাপতি হয়ে তালগাছের উপর বাবুই পাখির বাসায় গিয়ে লুকাতে।
লোকে শুনলে বলবে বুড়ো বয়সে ভীমরতি। ছেলের বয়সী ছেলের সঙ্গে লীলাখেলা...। আরও কথা সুমিষ্ট (!!) উপমা!
রবিনের বাবাকে ছেড়ে এত দীর্ঘ সময় একা থাকতে এতটুকু কষ্ট হয়নি, অথচ মাত্র কিছুদিনেই সোহানকে হারিয়ে ফেলার ভয় মনটাকে অস্থির করে তুলছে। আমার সহকর্মী লুবনা সেদিন বলল, আপনি আর আগের মতো প্রাণবন্ত নেই। কেমন যেন চুপ হয়ে গেছেন। কী হয়েছে? আমার মন চাইছিল লুবনাকে বলে দিই আপানারা আমাকে নিয়ে যা ভাবছেন তার মধ্যে অতিরিক্তটুকু বাদে মূল বিষয়টা সত্যি। আমি ভালোবেসেছি। আর ভালোবাসার স্পর্শ পেতে আকুল হয়ে উঠেছি। কিন্তু আমার কিছুই বলা হয় না। আমার কথাগুলো গল্প হয়ে উড়ে যায় মেঘের দেশে, রঙধনু হয়ে রঙ ছড়িয়ে রঙিন আবেশে। নিচে শুধু আমি পড়ে থাকি একা, অদ্ভূত দহনে পুড়তে থাকে মন। মনের ভেতরের মন।





অন্যরকম গল্প!
প্রেমের কি বয়স আছে?
ধন্যবাদ অনিমেষ রহমান।
আপনার কি মনে হয়?
প্রেম যে কোনো বয়সে-
যে কোনো দেশে-
যে কোনো দিনে কিংবা রাতে
সময়ে কিংবা অসময়ে হতে পারে।
আমিও তাই মনে করি অনিমেষ ভাই
গ্রেট। আমি খুব পছন্দ করলাম সোহানের বান্ধবীটাকে। আর সেটা মনে হয় লেখকের লেখনীর গুণেই।

যাই হোক ঝর্ণা আপু, ওয়েলকাম টু এবি
লেখার আকাশে উড়াউড়ি আনন্দময় হোক
আমি দুলছি আনন্দে
ভিন্ন রকম গল্প! বেশ ভাল লেগেছে!
গল্পের শেষ কিভাবে হচ্ছে জানার ইচ্ছা হল!
শেষ বলে কিছু নেই

পরে কি হলো, তা জানার ইচ্ছে রইল।
বেশ ভাল গল্প হয়েছে।
ভবিষ্যত কি আগাম বলা যায় !!!
ভাব মারার চেষ্টা করলাম!!!!
এবিতে স্বাগতম।
অন্যরকম গল্প। ভালো লাগলো ।
নিয়মিত লিখো ঝর্ণা। ভালো থেকো
মেসবাহ ভাই এই সুন্দর ভুবনের সন্ধান তো আপনার কাছ থেকেই পেয়েছি।
গল্পের শেষ কিভাবে হচ্ছে জানার ইচ্ছা হল!
গল্প কি শেষ হয়নি!!!
আমি তো ভেবেছিলাম শেষ।
চমৎকার লেখনী। নিজের সম্পর্কে লেখা কথাগুলিও চমৎকার।
এবি তে সুস্বাগত।
ভাল থাকুন। অনেক ভাল। প্রতিটি দিন, প্রতিটি ক্ষণ।
আপনারাও ভালো থাকুন প্রতিটি মুহূর্ত।
স্বাগতম এবিতে
টুটুল ভাই আমি কি আপনাকেই ফোন করেছিলাম বাংলায় লিখার সমস্যা নিয়ে ?
অন্যরকম গল্প। ভালো লাগলো পড়তে।
ধন্যবাদ

প্রথম লেখাতেই বাজিমাত।
এই সব আর কছুই নয়।বন্ধু বলেই একটু বেশি ভালোবাসাবাসি।
আমি কৃতজ্ঞ এই সব ভালোবাসার কাছে।
মন্তব্য করুন