ইউজার লগইন

আত্মীয়

মানুষ যে কতটা আগ্রহ নিয়ে কথা বলতে পারে তা এ মুহুর্তে মোসাদ্দেক আলীকে না দেখলে বিশ্বাস হতো না সেতুর।তিনি এত আগ্রহ নিয়ে কথা বলছেন যে তিনি খেয়ালই করছেন না তিনি যাকে কথা গুলো বলছেন সে আদৌ শুনছে কিনা। সেতু মোসাদ্দেক আলীর কথা শুনছে খুবই দায়সারা ভাবে।ব্যাপারটা অনেকটা এরকম যদি এখানে মোসাদ্দেক আলী কথা না বলে ,রান্নাঘরে একটা কাপ ভাংগার শব্দ হলে সে শব্দ যেমন সেতুর কর্ণকুহরে প্রবেশ করত,ঠিক তেমনি মোসাদ্দেক আলীর বকর বকরও তার কানে যাচ্ছে বিচ্ছিন্নভাবে।সে মাঝে মাঝে হা হু শব্দ করছে এবং বরাবরের মতো এবারও খুব বিরক্ত হচ্ছে।কিন্তু সে মুখটা খুব স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা করছে।তারপরও তার মনে হচ্ছে যেকোনো মুহূর্তে তার মুখ ফসকে কোনো উল্টাপাল্টা কথা বেরিয়ে যাবে।আর সেজন্যই সে তার শ্বশুরের সামনে বসে থাকতে চাচ্ছে না।কিন্তু মানুষটা এমন আগ্রহ করে কথা বলছে যে তার মুখের উপর উঠে যেতে খুব অস্বস্তি হচ্ছে সেতুর।
মানুষ যখন আগ্রহ নিয়ে কিছু করে তখন সে মানুষটার জন্য একধরনের মায়া হয়।কখনো কখনো সে মায়া তীব্র ভালোবাসায় পরিনত হয়।যেমন-কেউ যদি খুব আগ্রহ নিয়ে কথা বলে,আগ্রহ নিয়ে খাওয়া দাওয়া করে,শুনতে কিংবা দেখতে খুব ভালো লাগে।
মোসাদ্দেক আলীর উপর আজ দুপুর থেকে সেতুর মেজাজটা খুব খারাপ হয়েছিল।সারাদিন ঝমঝম বৃষ্টি হচ্ছে।এরমধ্যে মানুষটা সকালে বেরিয়েছে।আর এসেছে এখন সন্ধ্যায়,তাও বৃষ্টি মাথায় নিয়ে।ছাতা ছাড়া সারাদিন এই বৃষ্টির মধ্যে কোথায় ছিল,কি খেয়েছে এসব নিয়ে ভাবনার অন্ত ছিল না সেতুর।যদিও ভাবনার তেমন কোনো প্রয়োজন ছিল না ।তবুও সেতু ভেবেছে।এবং ভাবতে ভাবতে একটা সময় সে বুঝতে পেরেছে তার মধ্যে মারাত্মক রকম অস্থিরতা কাজ করছে।কারণ সে কোথাও স্থির হয়ে বসতে পারছিল না।কোনো কাজে মন বসাতে পারছিল না।তার সারাক্ষণই মনে হচ্ছিল মানুষটা কোনো বিপদে পড়েনি তো!
এমন ঘটনা যে এবাড়িতে এই প্রথম ঘটেছে তা কিন্তু নয়।প্রায় সমুই এ ধরনের ঘটনা এ বাড়িতে ঘটে।সেতু প্রতিবারই ঠিক করে এরপর থেকে এমন কোনো ঘটনা ঘটলে সে আর ভুল করেও দুঃশ্চিন্তা করবে না।কিন্তু শেষ মুহুর্তে সে আর দুঃশ্চিন্তা না করে থাকতে পারে না।দুঃশ্চিন্তার সংগে তার যেন অদৃশ্য চুক্তি।
সেতু তার শ্বশুর মোসাদ্দেক আলীকে খুব একটা অপছন্দ করে না।তবে আবার পছন্দ বলতে যা বোঝায় ঠিক তেমনও কিছু না।পছন্দ অপছন্দের মাঝামাঝি একটা ঝুলন্ত অবস্থা। সেতুর ক্ষেত্রে মোসাদ্দেক আলীর জন্য ঝুলন্ত অবস্থা হলেও মোসাদ্দেক আলী কিন্তু সেতুকে খুবই পছন্দ করেন।অবশ্য একথা সেতু খুব ভালো করেই জানে।
মোসাদ্দেক আলী এখনো বকেই চলছেন।বুঝলে বৌমা আমার শালীর মামাতো দেবরের ছোটো ছেলের বাসায় ছিলাম আজ সারাদিন।খুব যত্ন করেছে আমাকে।আজকে তো আস্তেই দিচ্ছিল না।কি আন্তরিক ব্যবহার!আহ! মনটা ভরে যায়।তোমাকে নিয়ে যেতে বলেছে।একদিন তোমাকে নিয়ে যাবো।
সেতু মোসাদ্দেক আলীর শালীর মামাতো দেবরের ছোটো ছেলেকে চেনে না এবং তার নামও জানে না।সে চুপ করে আছে।আর দেয়াল ঘেঁষে লকলকিয়ে বেড়ে ওঠা মানি প্ল্যান্টের পাতাগুলো দেখছে।পাতাগুলোতে ধূলো জমে আছে।গত দু’দিন মোছা হয়নি।সময় পায়নি।সংসারের সব কাজ একা হাতে সামলাতে এখন সে মাঝে মাঝে হাঁপিয়ে ওঠে।
মোসাদ্দেক আলী আবার বলল,চিনেছ তো বৌমা মজিদকে?খুব ভালো ছেলে।এ বয়সী ছেলেরা তো আজকাল আর বড়জনদের দেখলে আদব লেহাজ দেখায় না।কিন্তু এ ছেলেটা খুবই ভালো।আন্দরকিল্লায় থাকে।অনেকদিন পর দেখা হয়েছে আজ।ওর বউটাও খুব ভালো।আসল কথা কি জানো বৌমা,জাতের ধারা,রক্তের ধারা।বড় বংশের ছেলে এরা।এদের ব্যবহারই আলাদা।
সেতু বড় বংশের ছেলে মজিদকে দেখার ব্যাপারে কোনো কৌতুহল কিংবা আগ্রহ দেখাচ্ছে না।তবে তার পেশা কি তা জানতে কিছুটা উসখু খুসকু করছিল মন।কারণ এমন অনেক বড় বংশের ছেলে তার শ্বশুর মোসাদ্দেক আলীর আত্মীয় যাদের পরিচয়ের সাথে প্রশংসার কোনো মিল থাকে না।একবার মোসাদ্দেক আলী বাসায় তার ছোটো বোনের জায়ের ভাইকে বাসায় এনে ব্যাতিব্যস্ত হয়ে পড়লেন কি করবেন না করবেন তা নিয়ে।সেতু নাস্তা নিয়ে ড্রইং রূমে এসে দেখে তার শ্বশুরের খান্দানি বংশের খান্দানি আত্মীয় সোফায় জড়সড় হয়ে বসে আছে।মাথায় তেল দিয়ে চুলগুলো সিঁথি করে আঁচড়ানো।লাল ক্যাট ক্যাটে রঙের একটা শার্ট গায়ে দেয়া এবং ঘরের ভেতর পুরনো দিনের গগলস স্টাইলের একটা সানগ্লাস চোখে একজন ২০/২২ বছরের তরুণ বরে আছে।সেতুকে দেখেই সে ছেলে বসা থেকে দাঁড়িয়ে সালাম দিল।তার পান খাওয়া ঠোঁট দুটি লাল হয়ে ছিল।
সেতু নিজেকে সামলে নিয়ে সেই তরুণকে বসতে বলে জিজ্ঞেস করল,কি করেন আপনি?
তরুণ জবাব দিল,জি গ্যারেজে কাজ করি।
ও,বলে সেতু মুখে একটা হাসি ঝুলিয়ে খুব বিরক্তি নিয়ে শ্বশুরের দিকে তাকিয়ে সেখান থেকে উঠে গেল।
কারণ সেতু এই ক’বছরে তার শ্বশুরের বড় বংশের বড় আত্মীয় স্বজনদের দেখে দেখে ক্লান্ত।যাদের অবস্থা খুবই করুণ শুধুমাত্র তারাই যেন তার শ্বশুরের সাথে আত্মীয়তার সম্পর্কটা ধরে রেখেছে।
লতায় পাতায় প্যাঁচানো প্যাঁচানো আত্মীয় স্বজন খূঁজে বের করা মোসাদ্দেক আলীর বদ অভ্যাসগুলোর একটি। শুধু লতায় পাতায় নয়, মাঝে মাঝে তিনি পাতার শিরায় শিরায় পর্যন্ত পৌঁছে যান।তার ছেলে মেয়েরা খুবই বিরক্ত বাবার এই আত্মীয় খোঁজার কাজে ।মোসাদ্দেক আলীর স্ত্রীও খুবই বিরক্ত ছিলেন।তবু যতদিন বেঁচে ছিলেন স্বামীর এই যন্ত্রণা তিনি মুখ বুজে সহ্য করেছেন।
বাংগালী নারীদের অনেক কিছুই সহ্য করতে হয়।যার সহ্য ক্ষমতা যত বেশী তিনি তত বেশী দৃষ্টান্তমূলক সম্মানিত নারী!
কিন্তু এখন তিনি নেই,তার এই যন্ত্রণা এসে পড়েছে সেতুর কাঁধে।সেতুর কাঁধে এসে পড়েছে বলতে ব্যাপারটা এমন নয় যে কেউ জোর করে এটা সেতুর কাঁধে চাপিয়ে দিয়েছে।বরং সেতু অনেকটা যেঁচে এই দায়িত্ব কাঁধে নিয়েছে।কারণ মোসাদ্দেক আলীর কাছে তার অনেক ঋণ।যখন সেতুর চারপাশটা অদ্ভুত আঁধারে ঢেকে গিয়েছিল,স্বার্থের কারণে মুহুর্তেই বদলে গিয়েছিল চেনা মানুষের চেনারূপ,অথৈ সমুদ্রে খাবি খাওয়া সাঁতার না জানা মানুষ যেমন খড়কুটো পেলে ডুবতে ডুবতেও শেষ মুহুর্তে ডাংগায় এসে দাঁড়ায়,খোঁজে জীবনের মানে ঠিক তেমনই সময় মোসাদ্দেক আলী মানুষটা সেতুর পাশে এসে দাঁড়িয়েছিল খড়কুটোর মতো।বলেছিল,তোমার বাবাই তো দরকার। যদি আমি তেমন বাবা হই।
মোসাদ্দেক আলী অবশ্য তেমন বাবা হতে পারেন নি।তিনি তার চেয়েও প্রিয় হয়েছেন।প্রিয় হতে হতে সেতু একটা সময় খেয়াল করল তিনি কিছু কিছু ক্ষেত্রে বেশ যন্ত্রণাও হচ্ছেন।এই মানুষটা সেতুকে সবসময় সাহস দেন।স্বপ্ন দেখান।মানুষটাকে ভেতরে ভেতরে সেতু খুবই ভালোবাসে।আর অনেক বেশি ভালোবাসে বলেই কেউ তাকে নিয়ে কোনো খারাপ কিছু বললে সেতুর খুব রাগ হয়।সেই রাগের হালকা ঝাপটা গিয়ে মোসাদ্দেক আলীর উপরও পড়ে কখনো কখনো।তবে সে যে তার শ্বশুরকে খুব ভালোবাসে এটা সে তার শ্বশুরকে বোঝাতে চায় না।
একবার মোসাদ্দেক আলী সন্ধ্যার দিকে তার একজন আত্মীয়,আপন আত্মীয়, তার বড় মেয়ের ননদের মামাতো জায়ের বোনকে নিয়ে এসেছে।মাঝবয়সী এই ভদ্রমহিলা কিছুক্ষণ কথা বলার পর এক ফাঁকে সেতুকে বলল,আপনার সাথে একটু জরুরী কথা আছে।
সেতু খুবই বিরক্ত হওয়া সত্ত্বেও চেহারা যথেষ্ট স্বাভাবিক রেখে জিজ্ঞেস করল,কি জরুরী কথা?
ভদ্র মহিলা বললেন,একা বলতে পারলে ভালো হতো।
চেনা নেই, জানা নেই, একটা মহিলা হুট করে কোথ থেকে এসে এমন নাটক করছে কেন সেতু কিছুতেই বুঝতে পারছিল না।সে অলস ভংগিতে ঐ মহিলাকে নিয়ে ড্রইং রুম ছেড়ে তার বেডরুমে এসে বসল।সেখানে তার ছোট্ট মেয়ে উপমা ঘুমাচ্ছিল।
ভদ্র মহিলা বললেন ,সম্পর্কে আপনি আমার কি হবেন আমি জানি না,আর আমি জানতেও চাই না।আমার বড় দুলাভাইয়ের সাথে কেমন দুঃসম্পর্কের আত্মীয়তা আছে আপনার শ্বশুরের।আমার বড় দুলাভাই কোথ থেকে একদিন ওনাকে আমার বাসায় নিয়ে হাজির,এরপর থেকে আপনার শ্বশুর প্রায় দিন কনো না কোনো কারণ ছাড়া আমার বাসায় গিয়ে পড়ে থাকে।আমার বাচ্চাদের সাথে গল্প করে।ওদের পড়ালেখার ডিস্টার্ব হয়।এখন একজন মানুষকে তো মুখের উপর না বলে দেয়া যায় না।আর উনি যে রকম মানুষ উনাকে না করলে যে উনি খুব শুনবেন তা মনে হয় না।এ জাতীয় বেয়াক্কেল টাইপের মানুষ আমি আমার জীবনে দেখিনি।
ভদ্র মহিলার কথা শুনে সেতুর চেহারাটা লজ্জায় লাল হয়ে উঠেছিল।ঐ মহিলা আবার বলল,আজ যে আমি আপনার বাসায় এসেছি বেড়াতে আসিনি।আমার বেড়ানোর অনেক জায়গা আছে।শুধু কথাগুলো বলার জন্য আপনার বাসায় এসেছি।আপনি আপনার শ্বশুরকে আমার বাসায় যেতে মানা করে দেবেন।মানুষ আপন মেয়ের বাসায় বেড়াতে পারে না আর উনি কিনা খূঁজে খূঁজে লতায় পাতায় প্যাঁচানো আত্মীয়তা রক্ষা করছেন,অসহ্য!
ভদ্র মহিলা চলে যাওয়ার পর সেতু মোসাদ্দেক আলীকে গিয়ে বলল,বাবা আপনি আর কখনো এদের বাসায় যাবেন না।
মোসাদ্দেক আলী বললেন,কেন বৌমা?এরা তো খুবই ভালো মানুষ।আমি গেলে শিরিনের ছেলে মেয়েগুলো কি যে খুশি হয়!কেন শিরিনের কথা বার্তা তোমার ভালো লাগে নি?
মোসাদ্দেক আলীর সরলতা দেখে সেতুর কান্না চলে এলো।সে কাঁদতে কাঁদতে বলল,আপনাকে যেতে মানা করেছি,আপনি যাবেন না।বলেন,আর কখনো এরকম খূঁজে খূঁজে মানুষের বাসায় যাবেন না।
সেতুর চোখে পানি দেখে মোসাদ্দেক আলী বললেন,ঠিক আছে যাব না।কিন্তু তুমি কাঁদছ কেন মা?
সেই ঘটনার পর বেশ কিছুদিন মোসাদ্দেক আলীর আত্নীয় খোঁজার কাজ বন্ধ ছিল।কিন্তু আজ আবার মজিদ নামের নতুন আত্মীয়ের কথা শুনে সেতু মনে মন দীর্ঘশ্বাস ফেলে।
রাতে মোসাদ্দেক আলী কিছুই খায় নি।জ্বর এসেছে।সেতু,মোসাদ্দেক আলীর মাথায় পানি ঢালছে।আর কিছুক্ষণ পর পর টেম্পারেচার দেখছে থার্মোমিটারে।রাত বাড়ার সাথে সাথে জ্বরওবাড়ছে।সেতু খুবই চিন্তিত।এত রাতে দাক্তার পাবে কোথায়?তার উপর এই ঝড়
বৃষ্টি। মোসাদ্দেক আলীর জ্বর ক্রমশ বাড়ছে।
রায়হান নির্লিপ্তভাবে শুয়ে আছে।উপমা বাবার সাথে গুটুর গুটুর কথা বলছে।মোসাদ্দেক আলীর অসুখ বিসুখে রায়হান কখনো বিচলিত হয়না।ছোটবেলা থেকে সে এমনই দেখে এসেছে তার বাবাকে।অনিয়মটাই নিয়ম হয়ে গেছে তার বাবার ক্ষেত্রে।আগে মা চিৎকার চেঁচামেচি করত।মা মারা যাওয়ার পর কিছুদিন এই চেঁচামেচি বন্ধ ছিল।এখন আবার সেতু শুরু করেছে।
সেতু খুবই চিন্তিত ভংগিতে রায়হানকে বলল,বাবার জ্বর যেভাবে বাড়ছে কি হবে বল তো?
রায়হান বলল, কিছু হবে না।কাল সকালে দেখবে সব ঠিক হয়ে গেছে।
সেতু বিরক্ত হয়ে বলল,নিজের বাবার প্রতি তোমাদের কোনো ভাইবোনেরই দেখি মায়া-দয়া বলে এক জিনিস নেই।কি অদ্ভুত পৃথিবী,তাই না?
রায়হান চাপা একটা হাসি দিয়ে বলল,আসলে বাবাকে আমরা ছোটোবেলা থেকেই এরকম উড়নচন্ডী স্বভাবের দেখে এসেছি তো তাই অভ্যস্ত হয়ে গেছি।তুমি শুধু শুধু দুঃশ্চিন্তা করো না তো, দেখবে বাবা কাল সকালে একদম ঠিক হয়ে গেছে।য়াজ সারাদিন কোথায় ছিল জিজ্ঞেস করনি?
সেতু জবাব দেয়,কোন এক মজিদের বাসায়।
সে আবার কে? জিজ্ঞেস করে রায়হান।
বাবার বড় বংশের আত্মীয়।বলে সেতু।
রায়হান কোনো কথা না বলে সেতুর দিকে তাকিয়ে হাসল।
মোসাদ্দেক আলীর বড় বংশের আত্মীয়ের কথাটা কিন্তু মথ্যা নয়।তবে বড় বংশের লোকেরা সবাই যে বড় বড় কাজ করবে এমন্তো কোনো কথা নেই।মোসাদ্দেক আলীর সাথে তার ছেলে, মেয়ে ,ছেলের বৌ সবার বিরোধ ও এটা নিয়ে।বেছে বেছে তিনি যেসব বড় বংশের আপন আত্মীয় স্বজন খুঁজে বের করেন তাদের সাথে নিজেদের সামাজিক অবস্থানটা মিলে না।আর যাদের সামাজিক অবস্থান ভালো তারা ঐ শিরিন ক্যাটাগরীর।বিরক্তি প্রকাশ করতে দ্বিধা করে না।শুধু মোসাদ্দেক আলীই এই বিরক্তি কিংবা অপমানটা বঝে না।
কথা প্রসংগে মোসাদ্দেক আলী প্রায় বলেন যে কোনো মানুষের সামান্য ঠিকানা জানলে তিনি সে মানুষটাকে খুঁজে বের করতে পারেন।একবার তিনি তার এক চাচাতো ভাইকে করাচী থেকে খুঁজে বের করেছিলেন।অনেকদিন ধরে চাচাতো ভাইটি নিখোঁজ ছিল।চাচাতো ভাইয়ের মা আর বউ সারাক্ষণ কাঁদতো দেখে তিনি পাকিস্তান আমলে তরুণ বয়সে চাচাতো ভাইকে খুঁজতে করাচী চলে গেছেন।তাও আবার কাউকে কিছু না বলে।পরে তাকে খুঁজতেই কোনো মানুষ পাওয়া যাচ্ছিল না।সবাই ভাবেছিল মোসাদ্দেক আলী বোধহয় বেঁচে নেই।প্রায় ১৫ দিন পর মোসাদ্দেক আলী চাচাতো ভাইকে সাথে নিয়ে বিজয়ীর বেশে গ্রামে ফিরেছিল।
সেতু শোবার আগে আবার মোসাদ্দেক আলীর জ্বর মাপল থার্মোমিটারে।জ্বর ১০৩ ডিগ্রী।সেতু মোসাদ্দেক আলীর কানের কাছে মুখ নিয়ে বলল,বাবা,বাবা, মাথায় পানি দিই?
মোসাদ্দেক আলী জ্বরের ঘোরে কি বললেন সেতু বুঝল না।
সে পানি আনতে গিয়ে রায়হানকে ডাকল।রায়হান মোসাদ্দেক আলীর পাশে বসে বলল,বাবা,বাবা,বেশি খারাপ লাগছে?
সেতু মোসাদ্দেক আলীর মাথায় পানি ঢালে।
রায়হান সেতুকে বলল,বড় ভাইয়া আর আপাকে ফোন দিব?
সেতু বলল,বুঝতে পারছি না।রাত তো অনেক হয়েছে।ওনারা আবার টেনশন করবে।আচ্ছা আর কিছুক্ষণ দেখি।বেশি খারাপ হলে ক্লিনিকে নিয়ে যাবো।
বাইরে প্রচন্ড বৃষ্টি হচ্ছে।মোসাদ্দেক আলী বিড় বিড় করে কি যেন বললেন।
রায়হান বাবার পাশে বসে আবার জিজ্ঞেস করে,বাবা,এখন কেমন লাগছে?
মোসাদ্দেক আলী চোখ মেলে রায়হানের দিকে তাকান।তারপর রায়হানের মুখের দিকে হাত বাড়িয়ে বলেন,তোর মার কথা মনে পড়ছে রে বাবা।কতদিন সে আমার সাথে স্বপ্নে দেখা দেয় না।
বিড়বিড় করতে করতে একটা সময় মোসাদ্দেক আলী ঘুমিয়ে পড়লেন।
সেতু ড্রইং রুমের সিংগেল খাটটার পাশে থাকা সোফাতে বসে ঝিমাতে থাকে।রায়হান গিয়ে শুয়ে পড়েছে।সকালে ওকে অফিসে যেতে হবে।
সকালে ঘুম থেকে উঠে সেতু মোসাদ্দেক আলীর কপালে হাত দিয়ে দেখে কপালটা ঠান্ডা হয়ে আছে।হঠাৎ করে কি ভীষণ ভয় পেয়ে সে তাড়াতাড়ি শ্বশুরের বুকের কাছে কান লাগিয়ে শ্বাস প্রশ্বাসটা দেখে।না,বেঁচে আছে।
নিজের ছোট বারান্দায় গিয়ে সেতুর মনটা খুব ভালো হয়ে গেল।তেত্রিশটা বেলী ফুটেছে তার ছোট্ট বেলী ফুল গাছটাতে।
রায়হান অফিসে যাওয়ার সময় মোসাদ্দেক আলী ঘুমিয়ে ছিলেন।তবে গায়ে জ্বর ছিল না।রায়হান যাবার সময় বলে গেছে সেতুকে,বাবা যেন কোথাও বের না হয় খেয়াল রেখো।বিকেলে অফিস থেকে ফিরে ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাব।
মোসাদ্দেক আলীর ঘুম ভাংগে সকাল দশটার দিকে।হাত মুখ ধূয়ে দুর্বল শরীরে নাস্তা খেতে খেতে বললেন,বৌমা আমি একটু বের হবো।
সেতু কিছুটা অবাক হয়ে বলল,এই শরীরে কোথায় যাবেন?
মোসাদ্দেক আলী কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন ,মজিদের বাসায়।
মজিদটা আবার কে?সেতু কিছুটা খেঁকিয়ে ওঠে।
কাল যে গেলাম,ঐ আমার শালীর মামাতো দেবরের...।
মোসাদ্দেক আলীকে কথা শেষ করতে না দিয়ে সেতু বলল,হ্যাঁ,মনে পড়েছে।কিন্তু এখন আবার কেন যাবেন?কাল গিয়ে বৃষ্টিতে ভিজে একবার জ্বর বাঁধালেন,আজ আবার কি?
মোসাদ্দেক আলী কথার জবাব দেয় না।
সেতু বিরক্ত হয়ে বলল,আমি কিছু জানি না,আপনার যা খুশি আপনি তা করেন।খুঁজে খুঁজে আত্মীয়তা রক্ষা করেন।কেন বোঝেন না মানুষ এসবে বিরক্ত হয়।বয়স তো কম হয়নি।
মোসাদ্দেক আলী আস্তে আস্তে বলেন,বৌমা,রূপালীর চেহারাটা না অবিকল তোমার শাশুড়ির মতো।
রূপালীটা আবার কে?আপনাকে নিয়ে তো আর পারা গেল না বাবা।আপনি বরং এ বাসা থেকে চলে যান।শুধু আমি একা জ্বলব কেন?আপনার তো আরও ছেলে-মেয়ে আছে ওদেরকেও একটু জ্বালান।
সেতুর কথা শুনে মোসাদ্দেক আলী বিহবল চোখে তাকিয়ে থাকে সেতুর দিকে।
শ্বশুরের দিকে তাকাতেই সেতুর মনটা খারাপ হয়ে গেল।সে গলার স্বর নামিয়ে বলল,রূপালী কে?
মোসাদ্দেক আলী বিড় বিড় করে বলল,মজিদের বউ।
সেতু বলল,ও।এখনই যেতে হবে?
না, মানে...।
আপনাকে তো একা ছাড়া যাবে না বাবা।আপনার ছেলে বলেছে আপনাকে যেন কোথাও বের হতে না দিই।
মোসাদ্দেক আলী কিছু বলে না।উপমা এসে দাদা ভাইয়ের গা ঘেঁষে বসে।
সেতু বলল,আমি একটু রান্নাটা সেরে নিই।তারপর আমিসহ যাব মজিদের বউকে দেখতে।ঠিক আছে?
মোসাদ্দেক আলী খুশিতে বসা থেকে দাঁড়িয়ে বলল,সত্যি তুমি যাবে?
জ্বি বাবা,যাব।তবে কথা হচ্ছে আপনি কিন্তু এরপর থেকে আর খূঁজে খূঁজে মানুষের বাসায় যেতে পারবেন না।
মোসাদ্দেক আলী সেতুর কথা না শুনে নাতনীর সাথে কি যেন কথায় মন দিলেন।

পোস্টটি ৮ জন ব্লগার পছন্দ করেছেন

বিষণ্ণ বাউন্ডুলে's picture


অনেক সুন্দর করে লিখেছেন গল্প টা, ভাল লাগলো পড়তে।

মোহছেনা ঝর্ণা's picture


ধইন্যা পাতা
কেমন আছেন বাউন্ডুলে ভাইজান?

মীর's picture


গল্পটা একবার পড়লাম। তবে মনে হচ্ছে আরো কয়েকবার পড়তে হবে।

মোহছেনা ঝর্ণা's picture


একবার পড়েছেন বলে ধইন্যা পাতা
আরো পড়বার আশা ব্যক্ত করেছেন বলে একশো ধইন্যা পাতা

নিভৃত স্বপ্নচারী's picture


ভাল লাগলো।

মোহছেনা ঝর্ণা's picture


ভালো লাগার জন্য ধইন্যা পাতা

তানবীরা's picture


অনেক সুন্দর করে লিখেছেন গল্প টা, ভাল লাগলো পড়তে।

মোহছেনা ঝর্ণা's picture


ধইন্যা পাতা

জটিল বাক্য's picture


বাংগালী নারীদের অনেক কিছুই সহ্য করতে হয়।যার সহ্য ক্ষমতা যত বেশী তিনি তত বেশী দৃষ্টান্তমূলক সম্মানিত নারী!

গল্পের অন্ত্রের ভেতরের এই কথাটি চরম সত্য কথা।

মোসাদ্দেক আলী এবং সেতু চরিত্র দুটি অনবদ্য। যদিও আমাদের সমাজে দুটো চরিত্রই এখন বিলুপ্তপ্রায়। আজকাল আমাদের আবেগ অনুভূতিতেও বাজার অর্থনীতির ছোঁয়া। মোসাদ্দেক আলীরা যতদিন টিকে থাকবে ততদিন প্রেম প্রীতিও টিকে থাকবে।

ভালো লেগেছে।

১০

মোহছেনা ঝর্ণা's picture


আজকাল আমাদের আবেগ অনুভূতিতেও বাজার অর্থনীতির ছোঁয়া।
বাহ! দারুণ বলেছেন তো !
ধইন্যা পাতা এত চমৎকার ভাবে বলার জন্য।

মন্তব্য করুন

(আপনার প্রদান কৃত তথ্য কখনোই প্রকাশ করা হবেনা অথবা অন্য কোন মাধ্যমে শেয়ার করা হবেনা।)
ইমোটিকন
:):D:bigsmile:;):p:O:|:(:~:((8):steve:J):glasses::party::love:
  • Web page addresses and e-mail addresses turn into links automatically.
  • Allowed HTML tags: <a> <em> <strong> <cite> <code> <ul> <ol> <li> <dl> <dt> <dd> <img> <b> <u> <i> <br /> <p> <blockquote>
  • Lines and paragraphs break automatically.
  • Textual smileys will be replaced with graphical ones.

পোস্ট সাজাতে বাড়তি সুবিধাদি - ফর্মেটিং অপশন।

CAPTCHA
This question is for testing whether you are a human visitor and to prevent automated spam submissions.

বন্ধুর কথা

মোহছেনা ঝর্ণা's picture

নিজের সম্পর্কে

আমি খুব সাধারণ একজন।জীবন নিয়ে আমার তেমন কোনো অতৃপ্তি নেই।সেদিক দিয়ে সুখী মানুষ আমাকে বলা যায়। জীবনে আমি যা চেয়ছি ,তাই পেয়েছি।তীব্রভাবে চেয়েছিলাম ভালোবাসার মানুষটিকে।সৃষ্টিকর্তা যেদিন সত্যি তাকে শুধুই আমার করে দিয়েছে সেদিন আমি রবীন্দ্রনাথের মতোই মনে মনে বলেছিলাম,আমি পাইলাম,ইহাকে আমি পাইলাম।'বন্ধু ' শব্দটি ভীষণ প্রিয় আমার।আছে কিছু প্রাণের বন্ধুও।বই পড়তে ভালো লাগে।বেড়াতে ভালো লাগে।মাঝে মাঝে মনে হয় যদি ইবনে বতুতার মতো পর্যটক হতে পারতাম! লেখালেখির প্রতি বেশ দুর্বলতা আমার।লিখিও প্রচুর।যা মনে আসে।ওগুলো আদৌ লেখা হয়ে উঠে কি না ,তা আমি জানি না। আমি যখন লিখি নিজেকে আমার মুক্ত মানুষ মনে হয়।আমার মনে হয় আমার একটা উদার আকাশ আছে।লেখালেখিটা হচ্ছে সেই উদার আকাশে নিজের ইচ্ছে মতো ডানা মেলে উড়ে যাওয়া।উড়ে যাওয়া।এবং উড়ে যাওয়া।