আমরা অসুস্থ সরকার চাই না
দু’সপ্তাহ আগে একদিন অবরোধের দিন জরুরি কাজে আগ্রাবাদে যেতে হয়েছিল।অনেকদিন পর একা একা বাসার বাইরে যেতে কেমন যেন লাগছিল।মনে হচ্ছিল সব কেমন অন্যরকম। বাসা থেকে অন্যরা বলে দিয়েছিল,সাবধানে যাস।ভাবখানা এমন যে আমি বোধহয় নতুন পথ চলতে শিখেছি।
বাসা থেকে বের না হলেও টিভি চ্যানেল আর পত্রিকার কল্যানে দেশের অস্থির পরিস্থিতির খবর ঠিকই জানতাম।কিন্তু সেদিন আগ্রাবাদে যাওয়ার জন্য বাসা থেকে বেরিয়ে দেখি রাস্তা অনেক বেশি ফাঁকা।সাধারণত অবরোধ হলে দূর পাল্লার গাড়ি চলাচল বন্ধ থাকে বা চললেও খুব কম চলে।কিন্তু অবস্থা তো দেখি হরতালের চেয়েও খারাপ।
যাক অনেক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকার পর একটা সিএনজি পেলাম।অন্যসময় সিএনজি ড্রাইভাররা যা ভাড়া তার চেয়ে অনেক বেশি চায়।দরদাম করতে হয় ।এদিনের সিএনজি ড্রাইভার দেখলাম যা ভাড়া তাই চাইল। সিএনজিতে বসে জিজ্ঞেস করলাম,আজ সিএনজি এত কম কেন? গন্ডগোল হচ্ছে নাকি।
তিনি বললেন, হ্যাঁ ,হঠাৎ হঠাৎ করে ককটেল মারে।আগুন লাগাইয়া দেয়।তাই ভয়ে কেউ বাইর হইতে চায় না।
তখন বেআক্কেলের মতো প্রশ্ন করে বসলাম, আপনি বের হলেন কেন?
প্রশ্নের জবাব না দিয়ে দেওয়ানহাটের রাস্তাটা অস্বাভাবিক গতিতে সাঁই সাঁই করে পার হয়ে বললেন,এই রাস্তাগুলাতে হামলা করে বেশি।
এককেজি চাল কেনার মতো টাকা থাকলেও বাইর হইতাম না আফা।জানের মায়া সবারই আছে।গত দু’দিন অবরোধের জন্য গাড়ি চালাই নাই।আর কয়দিন না চালাই চলমু ,বলেন। এমন যদি হইত অবরোধ, হরতাল যার যা খুশি দেক, কিন্তু আমাদের খাওয়ার চিন্তা করার আগেই ঘরে খাবার আইনা দেয়, তাইলে না হইত সেইটা জনগনের জন্য আন্দোলন।এখন তো সেইটা বহুত দূরের কথা,আমরা খাইটা খাই সেইটাও পছন্দ না নেতা নেত্রীগো।গাড়ির লগে আস্ত মানুষ পুড়াইয়া দেয়।
সে রাতেই টিভিতে দেখলাম মিরপুরে যাত্রীবাহী গাড়িতে আগুন দিয়েছে দুর্বৃত্তরা।আগুনে পুড়ে গেছে ১৯টি তাজা প্রাণ।
আর এখন তো প্রতিদিন আগুন লাগানোর উৎসব চলছে দেশের আনাচে কানাচে,পথে প্রান্তরে।
আগুনে পুড়ে মৃতের তালিকাটা দিনে দিনে যেভাবে বাড়ছে তাতে কেবল স্তব্ধ হয়ে যাই।
নিজেদের ক্ষমতার লোভী স্বার্থের জন্য সাধারণ মানুষকে এত নির্বিকারে হত্যা করার নজির এবারই প্রথম নয় আমাদের দেশে।তবে ব্যাপকতা যেন অন্যবারের চেয়ে অনেক বেশি।
প্রতিদিন এভাবে আগুনে মানবদেহ ঝলসে দিয়ে যে ক্ষমতারোহনের চেষ্টা আমাদের রাজনৈতিক নেতা নেত্রীদের তাতে এখন আর তাদের ধিক্কার জানানোর বোধ হয় না।কারণ তারা ধিক্কারেরও অধম।
ক্ষোভ হয় নিজের প্রতি,কেন এসব অনাচারের বিরুদ্ধে গর্জে উঠতে পারি না।
কেন সব কিছু সয়ে যাচ্ছি,সবকিছু মেনে নিচ্ছি খুব নিরবে?আমরা মেনে নিচ্ছি বলেই তো প্রাণটা বিলিয়ে দিয়ে আসতে হয় আমাদের।যে প্রাণটা আমাদের রাজনৈতিক নেতা নেত্রীরা তাদের লোভী স্বার্থের জন্য কেড়ে নিচ্ছে খুব নির্মম ভাবে সে প্রাণের অস্তিত্ব এবং সে প্রাণটি বেড়ে উঠতে যে কত কাঠখড় পোড়াতে হয়েছে তার আপনজনদের সে খবর কি জানেন আমাদের প্রিয়(!!) নেতা নেত্রীরা।
এইসব জ্বালাও পোড়াও রাজনীতিতে আমাদের নেতা নেত্রীদের কিছু হয় না,কিছু হয় না তাদের স্ত্রী,পুত্র,কন্যাদেরও।তারা দিব্যি আছে।কে জানে তাদেরকে বোধহয় দেশের জনগণের কাতারে হিসেব করা যায় না।
ঘর থেকে বের হয়ে যাওয়া মানুষটা আবার সুস্থভাবে ঘরে ফিরে আসতে পারবে কিনা সারাটাক্ষণ এই আতংক মনটাকে অস্থির করে রাখে। যার সাথেই দেখা হয় কিংবা ফোনে কথা হয় বলবে দেশের পরিস্থিতি ভাল না ,সাবধানে থাকবেন,সাবধানে থেকো কিংবা সাবধানে থাকিস।কখন যে কী হয়!! কথাগুলো এবং আতংকের ধরণ কেন জানি বারবার ৭১ এর কথা মনে করিয়ে দেয়।
হরতাল ,অবরোধে সাধারণ মানুষদের মধ্যে কেউ শখ করে ঘরের বাহিরে যায় না।যারা চাকরি করে তারা চাকরি বাঁচানোর তাগিদেই নিশ্চিত বিপদ হতে পারে জেনেও অনিশ্চয়তার মধ্যে ঘরের বাহিরে যায়।সেইসব মানুষকে আগুনে ঝলসে দিয়ে জনগণের(!!) জন্য যে আন্দোলন রাজনীতিবিদরা করছেন সেসব দগ্ধ মানুষ কি সে জনগণের অংশ নয়??
আর যেসব বাহন চালকেরা এই প্রতিবন্ধকতার মধ্যেও তার বাহনটি নিয়ে বের হয় তারাও কত বাধ্য হয়ে বের হয় তা তো সেই সিএনজি চালকের কথা থেকে স্পষ্টই বোঝা যায়।তাহলে কেন এসব খেটে খাওয়া মানুষগুলোর উপর এই অনাচার।
ছোট্ট শিশু সাদিয়া,কী দোষ ছিল তার?কোন অপরাধে ঝলসে দেয়া হলো তার ছোট্ট কোমল দুটি পা।যন্ত্রণাকাতর সাদিয়া যখন মা মা করছিল আমাদের দুই নেত্রী কি পেরেছে তার মাকে এনে দিতে।যদি এনে দেয়ার ক্ষমতা না থাকে তাহলে ছিনিয়ে নেবার স্পর্ধা করে কিভাবে??
ছেলের বউ,এক নাতনীর লাশ এবং ছেলেসহ অন্য দু’নাতনীর আগুনে পোড়া শরীরের যন্ত্রনা দেখে সাদিয়ার দাদীতো ঠিকই বলেছে,এই ভোট ভোট করে আর কতজনের বুক খালি হবে।
যারা মারা গেছে তারা তো গেছেই,যারা দগ্ধ হয়ে বেঁচে থাকার নামে প্রতিদিন মারা যাচ্ছে তাদের এই যন্ত্রণার প্রলেপ কি জানা আছে আমাদের জনদরদী রাজনীতিবিদদের।
প্রতিবার ভোট আসে কান্নার রোল নিয়ে।ভোটের পরও সেই কান্নার রোল থামে না।কত মানুষের উচ্ছ্বল প্রাণের উপর পথ মাড়িয়ে ক্ষমতার মসনদে বসে আমাদের নেতা নেত্রীরা সে কথা কি তাদের একবারও মনে পড়ে না?একান্ত নিভৃতেও কি তাদের বুকটা একবার কেঁপে উঠে না?পাপ নাকি বাপকেও ছাড়ে না।
ভোট হয়।যেভাবেই হোক না কেন হয়।কেউ ক্ষমতা হারায়।কেউ ক্ষমতা যোগায়।কিন্তু এই ক্ষমতার আদান-প্রদানের মাঝখানটাতে যে হারিয়েছে , স্বামী কিংবা স্ত্রী,পুত্র,কন্যা,ভাই-বোনসহ পরিবারের নিকটজনদের কিংবা একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যাক্তিটিকে সে পরিবারে এই ভোটের হাওয়া কি কোনোদিন,কোনো এক মুহুর্তের জন্য আনন্দের বার্তা বয়ে আনতে পারবে?তাদের মনে যে ক্ষোভের উদগীরণ হয়েছে,কষ্টের যে দগদগে ঘা হয়েছে তা কি কোনো দিন মুছে দেয়া যাবে?জবাব কি দেবে আমাদের রাজনৈতিক মান্যবরেরা।
জবাব তারা দেবেন না জানা কথা।জবাব থাকলেই তো দেবে।
আর তাই অসুস্থ রাজনীতির আগুনে দগ্ধ হওয়া গীতা সেনের কথাটাই আওড়াই বারবার।আমাদের ষোলকোটি জনতার অন্তরের কথাটাই বলেছেন তিনি।“আমরা অসুস্থ সরকার চাই না।’’
আমরা অসুস্থ রাজনীতিও চাই না।
সুস্থ সরকার কি পাব আমরা??





অসুস্থ রাজনীতি চাই না।
মীর ভাই আমরা চাইলেও কি,না চাইলেও কি?? কেউ কি আমাদেরকে জিজ্ঞেস করতে আসবে কোনোদিন??
মীর ভাই আমরা চাইলেও কি,না চাইলেও কি?? কেউ কি আমাদেরকে জিজ্ঞেস করতে আসবে কোনোদিন??
মীর ভাই আমরা চাইলেও কি,না চাইলেও কি?? কেউ কি আমাদেরকে জিজ্ঞেস করতে আসবে কোনোদিন??
সুস্থ সমাজই সুস্থ সরকারের নিশ্চয়তা দিতে পারে। 'চারিদিকে নাগিনীরা ফেলিছে নিঃশ্বাস।'
ভালোই বলেছেন
সময় ভালো না, সাবধানে থাইকেন আপু!
কবে যে সময় ভাল হবে????????????কবে যে সময় ভাল হবে????????????
ধন্যবাদ আপনাকে।
মীরের সাথে একমত। আমরা অসুস্থ সরকার চাই না, অসুস্থ রাজনীতিও চাই না।
আপনাকেও ধন্যবাদ।
অসুস্থ রাজনীতি চাই না।
মন্তব্য করুন