ইউজার লগইন

একটি বইয়ের জন্মকথা

আমার মেজো ভাই রিমন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াকালীন সময়ে প্রতিবছর বই মেলায় যেত ।আর রাতে আমাকে ফোন করে বলতো আপু আজ বই মেলায় গিয়েছি।এই এই (বই এবং লেখকের নাম উল্লেখ করে) বই কিনেছি, নতুন বইয়ের মোড়ক উন্মোচন দেখেছি,খুব ভাল লেগেছে।এর পরই বলতো আপু তোমার বই কখন বের হবে? যখন তোমার বই বের হবে তখন মেলায় তোমার বইয়ের মোড়ক উন্মোচনের সময় আমি আমার বন্ধুদের নিয়ে অনেক মজা করব।কারণ তখন মনে হবে এই মেলায় আমারও একটা অধিকার আছে।এই মেলায় আমার আপুর একটা বই আছে।আপু তুমি লিখছ না কেন? চমৎকার একটা গল্প নিয়ে একটা বই লিখে ফেলো তো।
আমার ভাইয়ের উচ্ছ্বাস দেখে আমি উচ্ছ্বাসিত হতাম।আর ভাবতাম অন্তত ছোট ভাইয়ের উচ্ছ্বাস সত্যি করার জন্য হলেও আমার একটা চমৎকার গল্প লেখা উচিৎ।
রিমন শুধু বই বের করার ব্যাপারেই উচ্ছ্বাসিত ছিল না।ও বলতো আপু ,তোমার কাজ হচ্ছে অসাধারন একটা গল্প লেখা,বই বিক্রি নিয়ে তোমাকে একটুও টেনশন করতে হবে না।আমার বন্ধুরা তোমার সব কিনে ফেলবে।তারপর একে একে বন্ধুদের নামও বলে যেত।
এ বছর বই মেলায় আমার প্রথম বই(আমার ভাইয়ের সে কাঙ্ক্ষিত বই) বের হচ্ছে। তবে এখন আর রিমন ঢাকায় থাকেনা।পড়ালেখার পাট চুকিয়ে কর্মজীবনে পা দিয়েছে।
অসাধারণ সেই গল্প লিখতে পেরেছি কিনা বলতে পারব না।তবে চেষ্টা ছিল এবং আগামীতেও থাকবে।

আমার তিন ভাই।সুমন, রিমন, জীবন। সবার ছোট জীবন। আমার বই নিয়ে আমার এই ভাইটির প্রথম কমেন্ট আপু তুমি এখন সবাইকে অটোগ্রাফ দিবে তাই না? আর সবাই বলবে দেখো দেখো জাইফার মায়ের বই।
আমি বললাম,কেন জীবনের আপুর বই বলবে না?
ও একটা লাজুক হাসি দিয়ে বলল,আমার আপু যে লেখালেখি করে এটা আমার স্কুলে আমার বন্ধুরা তো জানেই,আমার টিচাররাও জানে।

এবার আমার বড় ভাই সুমনের গল্প।আমি যখন ই কোনো লেখা লিখতাম সুমন কিছু দূর পড়ে বলতো না এটা খুব একটা যুঁতের হলো না।তোমাকে আরো ভাল লিখতে হবে। তারাশংকরের “কবি” পড়ে মুগ্ধ হওয়া আমার ভাই বলতো কবির মতো কিছু একটা লিখতে পার না আপু? আমি তো টাসকি খাওয়ার যোগাড়।তারাশংকরের কবির মতো কিছু লেখার ভাগ্য যদি আমার হতো আহ জীবনটা তো সেদিন ই ধন্য হয়ে যেত।আমি সুমনের পছন্দ হওয়ার মতো একটা গল্প লিখতে মরিয়া হয়ে থাকি।আর একদিন আমার “দাবী” নামের একটা গল্প পড়ে সুমন বলেছিল আপু তোমার এই গল্পটা চমৎকার হয়েছে এবং এই গল্প পড়ে মনে হয়েছে তুমি পারবে।সেদিন যে আমার কী ভাল লেগেছিল!!
আমার বই বের করা নিয়ে রিমনের মতো সুমনের ও সে কী উচ্ছ্বাস!!কিন্তু শর্ত সেই একই।আপু তোমাকে কিন্তু দারুন একটা গল্প লিখতে হবে। সুমন প্রায়ই বলতো আপু তোমার বই যখন বের হবে শুধু বইয়ের মোড়ক উন্মোচন অনুষ্ঠানে এটেন্ড করার জন্য হলেও আমি ঢাকায় চলে যাব।
আপুর লেখালেখির জন্য সুমনকে বেশ যন্ত্রণাও পোহাতে হয়েছে,পত্রিকা অফিসে আপুর লেখা পৌঁছে দেয়া, প্রয়োজনীর পেপারটা না পেলে সেটা কালেকশান করে দেয়া এবং বাসায় আপুর লেখা(যেগুলো আপুর কাছে হীরা –যহরতের চেয়েও দামী)ছাপা হওয়া পত্রিকাগুলো যক্ষের ধনের মতো সামলে রাখার দায়িত্ব সুমনের।
আমার প্রথম বই “নৈঃশব্দ্যের ভেতর” বের করার চিন্তা ভাবনা যখন করছিলাম তখন ভাবছিলাম আমার ভাই সুমনের পছন্দ হবে তো।

আমার ছোট দেবর রায়হান। দেখতে যেমন সুদর্শন ,কথা-বার্তায় ও ঠিক তেমন ই বুদ্ধিদীপ্ত।কিছু মানুষ থাকে যারা আশেপাশে থাকলেই মনটা ভাল হয়ে যায়, অনেক বিষন্নতার মধ্যেও হাসতে ইচ্ছে করে, গল্প করতে ইচ্ছে করে রায়হান ঠিক তেমন ই একজন মানুষ।
আমার বই নিয়ে আমার দেবরও বেশ উৎসাহী। আমার জানামতে আমার বইয়ের প্রথম গ্রাহক এবং পাঠক আমার ছোট দেবর রায়হান।যখন থেকে বই মেলা শুরু হয়েছে ও ফোন করে জিজ্ঞেস করতো ভাবী আপনার বই কখন মেলায় আসবে? কত নম্বর স্টলে পাওয়া যাবে?
এরপর মেলায় যেদিন “নৈঃশব্দ্যের ভেতর” প্রথম গেল রায়হান সেদিন ই কিনেছে ,গিফট করেছে এবং সবচেয়ে গুরুত্বপুর্ণ যে বিষয় তা হলে ওর এত ব্যস্ততার মধ্যেও বইটা পড়ে অনুভূতির কথা জানিয়েছে।
আমি যখন বই বিক্রির কথা বলছিলাম,বিক্রি হবে কিনা ভাবছিলাম, প্রকাশক এর ব্যবসা যেন ঝুঁকিতে পড়ে না যায় এসব বলছিলাম রায়হান আমাকে অভয় দিয়ে বলেছে এত ভাবার মতো কিছু হয় নি। একটা বই বের হয়েছে এই আনন্দের কাছে কতগুলো বই বিক্রি হয়েছে কিংবা হয়নি এটা খুবই নগন্য বিষয়। আর আমরা সবাই আপনার সাথে আছি না। এই হলো আমার ছোট দেবর।এমন ছোট ভাইয়েরা পাশে থাকলে আমার তো একটু দুঃসাহস হবেই।
আর সেই দুঃসাহস ই হলো এবারের বই মেলায় আমার প্রথম বই “নৈঃশব্দ্যের ভেতর” ।
এই বইটি প্রকাশের ক্ষেত্রে যে ক’জন মানুষের কথা না বললে আমার পুরো আয়োজনটিই ব্যর্থ কয়ে যাবে তারা হলেন,প্রিয় গিয়াস ভাই,প্রথম আলো বন্ধুসভার বিভাগীয় সম্পাদক থাকার সময় গিয়াস ভাই ই তো সব চেয়ে বেশি প্রেরণা দিয়েছেন লেখার জন্য।সানজিদা মালেক-আজাদীর আজমিশালী পাতার বিভাগীয় সম্পাদক।বলা যায় লেখালেখির এই পথচলাটা সোনালী আপুর কারণেই এখন পর্যন্ত ধরে রাখা সম্ভব হয়েছে।বন্ধু আসমা বীথি, বইটি প্রকাশের জন্য আন্তরিক সহযোগিতার জন্য।
আর যে মানুষটির কারণে আমার মতো নবীন লেখকেরা স্বপ্ন দেখার দুঃসাহস করতে পারে সে প্রিয় রাশেদ রউফ ভাইয়া।শৈলী প্রকাশনীর স্বত্তাধিকারী রাশেদ ভাইয়ার কাছে আমার অনেক ঋন।রাশেদ ভাইয়ার আন্তরিকতা এবং নতুনদের উৎসাহ দেয়ার মানসিকতার কারণেই তো আলোর মুখ দেখেছে “নৈঃশব্দ্যের ভেতর” ।

পোস্টটি ১০ জন ব্লগার পছন্দ করেছেন

তানবীরা's picture


অনেক অনেক শুভকামনা ঝর্ণা।

মোহছেনা ঝর্ণা's picture


ধন্যবাদ তানবীরা আপু Big smile

আরাফাত শান্ত's picture


অনেক অনেক শুভকামনা আপু!

মোহছেনা ঝর্ণা's picture


ধন্যবাদ শান্ত Party

জাকির's picture


শুভ কামনা থাকল ! আশা করি আগামীতেও পথ চলায় পাশে পাবেন এমন কিছু মানুষ।

মোহছেনা ঝর্ণা's picture


ধন্যবাদ ভাইয়া, দোয়া করবেন Big smile

নিভৃত স্বপ্নচারী's picture


আপনার জন্য অনেক শুভকামনা থাকলো ।

মোহছেনা ঝর্ণা's picture


ধন্যবাদ ভাইয়া স্বপ্নচারী Big smile

মন্তব্য করুন

(আপনার প্রদান কৃত তথ্য কখনোই প্রকাশ করা হবেনা অথবা অন্য কোন মাধ্যমে শেয়ার করা হবেনা।)
ইমোটিকন
:):D:bigsmile:;):p:O:|:(:~:((8):steve:J):glasses::party::love:
  • Web page addresses and e-mail addresses turn into links automatically.
  • Allowed HTML tags: <a> <em> <strong> <cite> <code> <ul> <ol> <li> <dl> <dt> <dd> <img> <b> <u> <i> <br /> <p> <blockquote>
  • Lines and paragraphs break automatically.
  • Textual smileys will be replaced with graphical ones.

পোস্ট সাজাতে বাড়তি সুবিধাদি - ফর্মেটিং অপশন।

CAPTCHA
This question is for testing whether you are a human visitor and to prevent automated spam submissions.

বন্ধুর কথা

মোহছেনা ঝর্ণা's picture

নিজের সম্পর্কে

আমি খুব সাধারণ একজন।জীবন নিয়ে আমার তেমন কোনো অতৃপ্তি নেই।সেদিক দিয়ে সুখী মানুষ আমাকে বলা যায়। জীবনে আমি যা চেয়ছি ,তাই পেয়েছি।তীব্রভাবে চেয়েছিলাম ভালোবাসার মানুষটিকে।সৃষ্টিকর্তা যেদিন সত্যি তাকে শুধুই আমার করে দিয়েছে সেদিন আমি রবীন্দ্রনাথের মতোই মনে মনে বলেছিলাম,আমি পাইলাম,ইহাকে আমি পাইলাম।'বন্ধু ' শব্দটি ভীষণ প্রিয় আমার।আছে কিছু প্রাণের বন্ধুও।বই পড়তে ভালো লাগে।বেড়াতে ভালো লাগে।মাঝে মাঝে মনে হয় যদি ইবনে বতুতার মতো পর্যটক হতে পারতাম! লেখালেখির প্রতি বেশ দুর্বলতা আমার।লিখিও প্রচুর।যা মনে আসে।ওগুলো আদৌ লেখা হয়ে উঠে কি না ,তা আমি জানি না। আমি যখন লিখি নিজেকে আমার মুক্ত মানুষ মনে হয়।আমার মনে হয় আমার একটা উদার আকাশ আছে।লেখালেখিটা হচ্ছে সেই উদার আকাশে নিজের ইচ্ছে মতো ডানা মেলে উড়ে যাওয়া।উড়ে যাওয়া।এবং উড়ে যাওয়া।