ইউজার লগইন

জোৎস্না জড়ানো শিহরণ - শেষ পর্ব

জোৎস্না জড়ানো শিহরণ - ১
জোৎস্না জড়ানো শিহরণ - ২
জোৎস্না জড়ানো শিহরণ - ৩

ঠিক তখনই দরজা ঠেলে রেস্টুরেন্টে ঢুকে কাঙ্খিত মেয়েটি। অনুসূয়াকে সুরেশের বিপরীতে বসে থাকতে দেখে এক মূহুর্ত থেমে যায়। তারপর হেঁটে নিজের নিত্যদিনের আসনে বসে। রেস্টুরেন্টটাতে এই সময় কখনো তেমন ভীড় হয় না। বাঁধা-ধরা কিছু লোকই এখানে নিয়মিত আসে। খুব কম দিনই সুরেশ বা মেয়েটা তাদের নির্দিষ্ট আসনটা হারিয়েছে। বেলা একটার পর কিছুটা ব্যস্ত হয়ে উঠে এই রেস্টুরেন্ট। তারপর আড়াইটার পর আবার ঝিমিয়ে পড়ে।

মেয়েটার দিকে অর্ডার নিতে এগিয়ে আসার আগেই সে উঠে ধীরে রেস্টুরেন্ট থেকে বের হয়ে যায়। সুরেশের বুক থেকে দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসে।

- দেখেছো, কষ্ট পেয়ে বেরিয়ে গেছে।

অনুসূয়া সুরেশের দিকে তাকালে সুরেশ বলে যায়, “গত সপ্তাহ দু'য়েক আমি এখানে আসিনি। দেশ থেকে আসার পর এখানে আসাতে হয়ে পড়ি অনিয়মিত। প্রতি সপ্তাহ আসতাম, তার টানে। কেমন শান্ত হয়ে পড়েছিল সে দিনে দিনে, যেন খুঁজতে চাইছিল, আমার ভেতরের কোন সমস্যা। যে সমস্যা আমাকে তার কাছে এগিয়ে আসতে বাধা দিচ্ছে। মেয়েটা যে অবিবাহিত, তা আমি নিশ্চিত। কোন স্থায়ী বয়ফ্রেন্ড যে নেই, তাও আমি নিশ্চিত। কিন্তু একটা মেয়ের এভাবে আমাকে দিনের পর দিন আকাঙ্খা করা...”

অনুসূয়া সুরেশের কথা শেষ না হতেই বলে, “তুমি কিভাবে এতো নিশ্চিত হলে যে, সে তোমাকে এতটা আকাঙ্খা করছে? তুমি কি কোথাও ভুল করছো না?”

- এ কথা যদি মাস দুই আগেও বলতে, তাহলে মেনে নিতাম। কিন্তু এখন আর নয়। তুমি দেখলে না, সে এখানে বসে থাকতে পারলো না। খাওয়া না খেয়েই বেরিয়ে পড়লো।
- সে তো অন্য কোনখানেও বেরিয়ে পড়তে পারে! অন্য কোথাও হয়তো যাওয়ার কথা ছিল, ভুলে গিয়ে এখানে এসে পড়েছে আজ।
- দেখো, আমি তাকে জানি। অন্ততঃপক্ষে আমাদের ব্যাপারে আমি তাকে ভালভাবেই চিনি। তৃতীয় কারো পক্ষে আমাদের এই সম্পর্কটা উপলব্ধি করা সম্ভব নয়। তাই তোমাকে আমি যা বলছি, তা যদি তুমি বিশ্বাস না করো, আমার বলার আর কিছু নেই।
- তাহলে এই সম্পর্কটা এতদিন ঝুলিয়ে রাখলে কেন?
- আমি বিবাহিত। আমার সন্তান আছে। আমাকে অনেক কিছুই ভাবতে হয়। তার হয়তো তেমন কোন পিছুটান নেই। তাই যতদিন যাচ্ছিল, তার আবেদন আমার কাছে তীব্র হয়ে উঠছিল। আমি এতদূর ভেবে উঠিনি। আমার কাছে একটু বেশিই মনে হচ্ছিল।
ধীরে ধীরে তার পোষাক আশাকে পরিবর্তন আসলো। বুঝলাম, সে আমার সাথে শারীরিক সম্পর্কে যেতে চায়। মাঝে মাঝে একদম ডানা কাটা পরী হয়ে উঠছিল। আসলে এটা আমি স্বীকার করবো, এরা বেশ জানে, কীভাবে একটা পুরুষের কাছে নিজেকে পুরো মেলে দিতে হয়। একটা পুরুষের আকর্ষণ কীভাবে পুরো টেনে নিতে হয়। আমি তার মাঝে পুরোপরিই হাবুডুবু খাচ্ছিলাম। কিন্তু বুঝে উঠতে পারছিলাম না, তার কাছাকাছি কীভাবে আসবো। ভয়ও হচ্ছিল, আমাকে বিবাহিত জানলে কীভাবে রিএ্যাক্ট করবে সে।

এদিকে ফল হলো উল্টো। আমার শীতলতায় সে ক্ষুব্ধ হলো খুব। স্ত্রী মাত্র তখন দেশে গেল। আমি সেই সুযোগই খুঁজছিলাম। তার ক্ষুব্ধতা দেখে ভাবলাম, এবারে সব কিছু খুলে বলতে হবে। তার উপরই সব ছেড়ে দেবো। সত্য জেনে সে যদি সম্পর্ক রাখতে চায়, তবে আমিও সে পথ ধরবো। আর যদি সে রিএ্যাক্ট করে, তবে তাকে দুর্ভাগ্য বলে মেনে নেবো। কিন্তু তা আর হলো না। এসময়ে একদিন একটা সুদর্শন যুবককে নিয়ে রেস্টুরেন্টে এলো। যুবকের সাথে লাঞ্চ টেবিলে হাসাহাসি, অন্তরঙ্গ ভাব-বিনিময় চললো। আমাকে ইনসেন্স স্টিকের মত জ্বালানো পোড়ানোর সব ব্যবস্থা হলো। চরম কষ্ট নিয়েও সেদিন রেস্টুরেন্ট ছেড়ে বেরিয়ে না যাবার জিদ চাপলো। আমিও টেবিলে বসে লাঞ্চ সারতে থাকলাম, নির্জীব, নিস্পৃহ থেকে। তারপর একসময় লাঞ্চ সেরে তারা একে অন্যের হাত ধরাধরি করে বেশ ঢলোঢলোভাবে রেস্টুরেন্ট থেকে বের হয়ে গেলো। বের হওয়ার সময় আড়চোখে আমার দিকে একটু তাকালোও, আমার ভাব-অবস্থা বোঝার জন্য। আমি সেদিকে মোটেও মনোযোগ দিলাম না। ঝিম মেরে বসে থাকলাম লাঞ্চ টেবিলে কতক্ষণ। তারপর একটা কষ্টের দীর্ঘশ্বাস ছাড়লাম। মাথার মধ্যে বিদ্যুৎ চমকে গেলো। মনে হলো, কামনার তীব্র সুখ কী, তা আমি তাকে ঠিকই টের পাওয়াবো।

এতটুকু বলে সুরেশ ঘেমে উঠে। চুপ করে থাকে কিছুক্ষণ অনুসূয়া। বিষয়টাকে মাথার মধ্যে নিয়ে উপলব্ধি করতে থাকে। তারপর বলে উঠে একসময়, “আচ্ছা বলতো, তুমি এক্সাক্টলি কি চাচ্ছো?

সুরেশ স্থির হয়ে যায় শোনার সাথে সাথে। নিশ্চল থেকে কিছুক্ষণ বলতে থাকে, “তুমি বোধ হয়, ঠিক জায়গাটাই টোকা দিলে। আমিও বোঝার চেষ্টা করছি, কী চাই আমি! তবে এতটুক বলতে পারি, সোল ছাড়া শরীর কখনো আশা করি নি। আত্মা বলার চাইতে ইংরেজি 'সোল'(soul) শব্দটাই আমার কাছে এখানে বেশ অর্থপূর্ণ। সে যদি আমার আত্মাকে স্পর্শকে করতে না পারে, এবং আমি যদি তারটাকে স্পর্শ করতে না পারি, তবে কিসের মিলন, কিসের প্রেম! শরীরে শরীরে শুধু শুধু যে আনন্দ, সেটাতে আমি নেই, সে সময়ও আমার নেই। আমি তো আরো গভীরে পৌঁছতে চাই, গহীন সমুদ্রের আরো গহীনে। তারপর দু'হাত দু'দিকে প্রসারিত করে উপুড় হয়ে, গভীর তলদেশ থেকে ধীরে ধীরে জলের উপরিভাগে ভেসে উঠতে চাই, একেবারে জীবন্মৃত।"

- বুঝেছি, তুমি বেশ জ্বরে আক্রান্ত। কিন্তু তোমার থেকে বারো-পনেরো ছোট বয়েসী একটা মেয়ে থেকে কিভাবে গভীর কিছু এত আশা করছো? সে কি সে গভীরতার তলদেশে একেবারেই পৌঁছে যেতে পারে?
- কিন্তু সেটা আমিও ভেবেছি। তবে বিশ্বাস করি, সেও পারে। ওই যে জানতে চেয়েছিলে, আমি আমার স্ত্রীর সাথে কানেক্ট করছি কী না। যদি ঠিকমত কানেক্ট করে, তবে আমার কাছে এই বয়সের ব্যবধানটাকে মোটেও সমস্যা মনে হয় না। আর কানেক্ট করছে না বলে মনে হচ্ছে, কোথাও কোন কিছু বাধা হয়ে ব্যবধান তৈরি করে দিচ্ছে।

সুরেশের কথা বলা চলতে থাকে। “আরেকটা কথা আমি তোমাকে বলতে চাইছিলাম। যা শুনে মনে হবে, আমি এত বেশি আত্মকেন্দ্রিক, লোভী, স্বার্থে অন্ধ। মেয়েটাকে নিয়ে আমি স্বপ্ন দেখি, যেমনই দেখতাম চৈতালীর সাথে সম্পর্ক হওয়ার কালে। চৈতালীর বদলে যদি সে হতো, তার রঙ্গিন স্বপ্ন। এই যেমন আমাদের পরিবারে এলে সে সেটাকে কিভাবে খুশি ভাবে নিবে। তাকে দেখে আমার পরিবার এপ্রিশিয়েট করবে। সবাই আমার পছন্দকে তারিফ করবে। পৃথিবীর দুই মেরুর দুই ভিন্ন পরিবার থেকে আসা দু'টি পরিবারের মধ্যে একটা সংহতি গড়ে উঠবো। আমার সাথে মেয়েটার মধুর স্বপ্নিল সময় এবং সম্পর্কের ভাবনা তো আছেই। ইস, এই সব স্বপ্ন-ভাবনায় কোথায় যে চৈতালী মিলিয়ে যায়, আমার হুশ থাকে না। আমার এই স্বপ্ন বাস্তবে চৈতালী তো নেই, তার অস্তিত্বই যেন আমার কাছে মৃত। হায় চৈতী। এমন কি, আমার বাচ্চাদের স্থান দখল করে নিচ্ছে, আমার আর তার সম্পর্কের ফলে জন্ম নেয়া সন্তান কল্পনায়। আমি চাইবো, আমার প্রথম সন্তানটা হোক মেয়ে, দেখতে অবিকল ওর মত। তাছাড়া স্বপ্নে সে সন্তান ভাবনাটা আমার এমনই হচ্ছে যে, দু'টো ফুটফুটে আদরের সন্তান পাবো আমরা, যারা নতুন নতুন স্বপ্নের দুয়ারের দ্বার খুলে এগিয়ে যাবে, আমাদের এই প্রেমকে আরো জাগিয়ে তুলবে। বাচ্চাদের নিয়ে আমাদের মধ্যে মান-অভিমানও ভরে উঠবে। আমি আমার এখনকার সন্তানদের নিয়ে এমন স্বপ্ন দেখি না এখন আর। তাদের মার মতই তারাও আমার অস্তিত্ব এবং সত্ত্বা থেকে, এভাবে থেকে থেকে হারিয়ে যায়। আমি এমন স্বার্থপর হলাম কেমন করে, বলতো?” সুরেশের নিজের প্রতি আক্ষেপ বেড়েই চলে, “আমি নিজেই বুঝে উঠতে পারছি না, আমার কি করা উচিত?”

অনুসূয়া নিজেও কিছু বলার মত খুঁজে পায় না। ফ্যাল ফ্যাল শূন্যতায় বিষয়গুলোকে বোঝার চেষ্টা করে সেও।

লিভিং রুপে ঢুকে ভূত দেখার মত আঁৎকে উঠে অনুসূয়া। মুখে ফুটে বেরিয়ে আসে, “একি!” ক্লান্ত বিধ্বস্ত চেহারার সুরেশ বসে তারই লিভিং রুপে। মুখে, কপালে, চোখের উপরে ছোট ছোট ব্যান্ডেজ লাগানো। বাঁ-হাতটাও ব্যান্ডেজ করা। সকাল দশটা থেকে অনুসূয়ার অফিস। এখন নয়টা বাজবে বাজবে করছে। এত সকাল সকাল এই অবস্থায় সে কেন এখানে, বুঝে উঠে না অনুসূয়া। ভয় পেয়ে যায় সে। স্বাতী সকাল সকাল বেরিয়ে গেছে বাসা থেকে স্কুলে। দরজা লাগানো ছিল না। সেই ফাঁকে সুরেশ এসে এখানে ঠাঁই নিয়েছে। সুরেশের এমন থমকে থাকা চেহারা অনুসূয়াকে ভয় পাইয়ে দেয়। কিছু জিজ্ঞেস করার আগে স্থির উদ্ভ্রান্ত সুরেশ বলে উঠে, “আমার সব শেষ হয়ে গেছে অনুসূয়া। আর আমি, আমিই সব কিছুর জন্য দায়ী।” অনুসূয়া থমকে যায় কিছুক্ষণ। নিজের অজান্তেই তার মুখ থেকে স্বগতোক্তির মত বেরিয়ে আসে, “কি, কি হয়েছে?”
- আমি নিজ হাতে আমার স্ত্রী, পুত্র-কন্যাকে মেরে ফেলেছি।
- কি, কি বলছো এসব? চীৎকার করে উঠে অনুসূয়া।
- হ্যাঁ, গভীর রাতে তারা মারা গেছে। শুধু আমি বেঁচে আছি। শান্তভাবে বলে সুরেশ।
- সত্যি করে বলো সুরেশ কি হয়েছে? আমি অন্ততঃ বিশ্বাস করি না, তুমি নিজের হাতে কাউকে মারতে পারো।
- বক্র হাসি হাসে সুরেশ। তুমি পুলিশ স্টেশানে যাও। শুনবে, তারা লাশ পোস্টমর্টেমে পাঠিয়ে দিয়েছে। শীতল কন্ঠ তার। আমি খুনি অনু। আমি একটা খুনি ছাড়া কিছু নই। আমিই তাকে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিয়েছি।
- কিভাবে? অসহিষ্ণু অনুসূয়া। বিষয়টা জানার জন্য সে প্রচন্ড উদগ্রীব।

আজই বোস্টন ফেরার ইচ্ছা আমার একেবারেই হচ্ছিল না। চারদিনের ছুটির দু'দিন গিয়েছে। আর একটা দিন আমি সেখানে কাটাতে চেয়েছিলাম। তার বাবার ওখানে। সেরকম পরিকল্পনাই ছিল তার চাপেই জোর করেই ঘুম থেকে উঠলাম। কিছুতেই ড্রাইভ করার ইচ্ছে করছিল না আমার। সেই জোর করলো। আর একদিনও থাকবে না সে। বাসায় ফিরে আজ বিশ্রাম নিয়ে কাল বাচ্চাদের স্কুলে পাঠাতে হবে। সেটাই না কি তাকে তাড়া করছিল। কিন্তু আমি বুঝতে পারছিলাম, ভেতরে ভেতরে সে আমাকে মোটেই সহ্য করতে পারছিল না। আমি বললাম, আমার মাথা ধরে আছে। সে ভীষণ রাগ দেখিয়ে বললো, সেই ড্রাইভ করবে। আমাকে গাড়ী ড্রাইভ করতে হবে না। কিন্তু সেও যে রাতে ঠিকমত ঘুমায় নি, সেটা আমার একদম জানা ছিল না। রাতে শোয়ার আগে আমার সাথে কথা কাটাকাটি হয়েছিল। তখন রাগ করে সে তার বাবার বাড়ির অন্য আরেক রুমে ছেলেমেয়েদের নিয়ে ঘুমিয়ে পড়ে। খুব ভোরে ঘুম থেকে উঠে মুখ কালো করে যাবার জন্য তাড়া দিতে থাকে। আমি এত সকাল বেলা বাড়ি থেকে বেরুতে প্রস্তুত ছিলাম না। চাইছিলাম, ভাল ভাবে ঘুমিয়ে নিয়ে ধীরে সুস্থে রওয়ানা দিতে। এ তো আর অল্প দূর ড্রাইভ নয়। মানুষ সাধারণতঃ পথে এক রাত হোটেলে কাটিয়ে তারপর দিন আবার যাত্রা শুরু করে, যেমন আমরা বোস্টন থেকে আসার সময় করেছিলাম। তার মাও চাচ্ছিল, আমরা অন্ততঃপক্ষে সকালে ভালভাবে খেয়ে দেয়ে আরাম করে যাত্রা শুরু করি। কিন্তু সে কিছুতেই দেরী করবে না। বুঝেছি, অনেকদিন থেকে আমার প্রতি ভেতরে তার চেপে থাকা রাগ, আমার তাকে অবহেলা। এসবই ছিল, তার প্রতিক্রিয়া। তাই আমার মত করে নয়, তার মত করে সব করতে চাওয়া। কাউকে যদি তোমার অসহ্য লাগে, তখন তো আর কোন যুক্তি কাজ করে না।

নিউইয়র্কে এসে পৌঁছলে, আমি রাতটা হোটেলে কাটাতে চেয়েছি। ড্রাইভ করে তখন আমি ক্লান্ত, যদিও সেও ড্রাইভ করেছে যাত্রার শুরু থেকে দুপুর অবধি। তাকে ননস্টপ ড্রাইভ করতে দেখে লাঞ্চের পর আমাকে ড্রাইভ করতে হয়েছিল। খুব সকালে যাত্রা করে, আমিও খুব ক্লান্ত হয়ে পড়ি। কিন্তু সে রাতে হোটেলে না কাটিয়ে মাঝরাতের মধ্যে বাসায় ফিরতে চেয়েছিল। অনেক মানা করেছি। আমার কথা শুনবে না। বাচ্চাদের দিকে তাকিয়ে বলেছিলাম, একটু রেস্ট নাও। রাতটা কোনমতে হোটেলে কাটাও। খুব ভোরে উঠেই যাত্রা শুরু করবো আমরা। কিন্তু কারো থেকে মন একবার উঠে গেলে বোধ হয়, তার সব কথাই তখন তেতো লাগে। আমার কথা সে শুনবে কেন? আমি যা করতে চাই, তার উল্টোটা তখন করতে হয়। তা ছাড়া আগের রাতের ঝগড়াটাও তার মাথাটাকে বিগড়ে দিয়েছে। আমার শত জোর-আপত্তিতেও, তার রাত না কাটানোর সিদ্ধান্ত পাল্টায় নি। বাচ্চারাও চাচ্ছিল, রাতটা বিশ্রাম নিতে কোন হোটেলে। তখন সে রেগে বলে, তোমরা তোমাদের বাবার সাথে থাকো। আমি নিজেই একা একা বাসায় ফিরবো।

কিছুই আর করার ছিল না। তখন রাত নয়টা বেজে গেছে। আমি আর পারছিলাম না। ঘন্টাখানেকের উপর হলো, রাস্তায় গাড়ি থামিয়ে ডিনার সেরেছি। ডিনারে ওর মানসিকতা জেনে হোটেলে থাকার চিন্তা বাদ দিয়েছি। ইচ্ছার বিরুদ্ধে গাড়ি চালাচ্ছিলাম। ভালও লাগছিল না। সেটা বুঝে সেই আমাকে সরিয়ে নিজেই ড্রাইভ করতে শুরু করলো। কিন্তু সে যে আমার চাইতেও অনেক ক্লান্ত এবং পরিশ্রান্ত ছিল, তা রাত সাড়ে এগারোটায় এক্সিডেন্টের আগ পর্যন্ত টের পাইনি। আমি গাড়ির পেছনের সিটে বসে ঝিমুচ্ছিলাম। আমার বাম পাশে আমার ছেলে। আর তার মার ড্রাইভার সিটের পাশে বসা মেয়েটা। তার মাই তাকে বলেছে, সামনের সিটে বসে পেছনে আমাকে ঘুমাতে দিতে। অথচ আমার ড্রাইভিং-এর সময়টা চৈতালী সবসময় আমার পাশের সিটে ছিল। তার ক্লান্তিটা আমি একদমই টের পাইনি অথবা টের পেতে সে দেয় নি। তার ঘরে ফেরার তাড়া আছে বলে হয়তো। ধারণা করা যাচ্ছে, ড্রাইভ করতে করতে সে ঘুমিয়ে পড়ায় রাস্তার ডান পাশ কাটিয়ে বা সরে এসে বাম পাশের ভূমির সমান্তরাল নীচু লম্বা খাদে পড়ে গিয়েছিল।

এবার ঝিম মেরে যায় সুরেশ। স্বগতোক্তির মত বলতে থাকে, আমার সব শেষ হয়ে গেছে অনু। শুধু আমি বেঁচে রইলাম কেন? শিশুর মত বুক চিরে কাঁদতে থাকে সে।
- অনুসূয়া স্তব্ধ হয়ে পড়ে। সেও অনেকটা স্বগতোক্তির মত বলতে থাকে, এই অবস্থায় পুলিশ তোমাকে ছেড়ে দিলো কি করে?
- পুলিশ তো ছাড়তে চায় নি। আমিই চলে আসতে চেয়েছি। আর পারছিলাম না। তার জন্যই তো তোমার কাছে আসা।

একটু নাড়া দিয়ে উঠে অনুসূয়া। অমঙ্গল ও দুঃস্বপ্ন তাকে তাড়া করলেও সে তা থেকে মুক্তি খুঁজেছে সব সময়। এখন এই বয়স্ক নতুন শিশুটির চোখে স্নেহ কোমল দৃষ্টিতে সে তাকায়। তাকিয়ে থেকে থেকেই বলে, সুরেশ বাবু, “তুমি আর কখনো আমার কাছে এসো না।”

পোস্টটি ৪ জন ব্লগার পছন্দ করেছেন

সবুজ পাহাড়ের রাজা's picture


আপনি দারুন লিখেন।
মুগ্ধ পাঠকের মত বসে বসে সবগুলো পোস্ট পড়লাম।

শামান সাত্ত্বিক's picture


বাহ্‌। দারুণ অনুপ্রেরণা পেলাম। অনেক ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা।

আরাফাত শান্ত's picture


এই সিরিজটা পড়া হয় নি এখনি পড়ে নিচ্ছি!

শামান সাত্ত্বিক's picture


অপেক্ষায় আছি।

রায়েহাত শুভ's picture


গল্পটা দারুণ। প্রতিটা পর্বেই ভিন্ন ভিন্ন মোড় নিয়েছে, লেখন শৈলীর কারণে এই টার্নগুলোতে ঘুরতে কোনোই অসুবিধা হয় নি। শুধু শেষে এসে কিছুটা তাড়াহুড়ার প্রবনতা মনে হ'ল। সময় থাকলে শেষটা আরেকবার ভেবে দেখতে পারেন...

শামান সাত্ত্বিক's picture


আমিও সেটা বোঝার চেষ্টা করছি। কোন জায়গায় একটু তাড়াহুড়ো হলো, বলে একটু সাহায্য করবেন কি? বিশেষ করে, কোন টার্ণ-টাতে। ধন্যবাদ।

নিভৃত স্বপ্নচারী's picture


শেষটায় এসে কিছুটা তাড়াহুড়া থাকলেও চমৎকার লাগলো লেখাটা।

শামান সাত্ত্বিক's picture


আমি আসলে তাড়াহুড়োর ব্যাপারটা বোঝার চেষ্টা করছি। অনেক ধন্যবাদ আপনাকে।

শাশ্বত স্বপন's picture


আমরা এ রকম সমাজ চাই না। বলেছিলাম আর পড়ব না কিন্ত পড়লাম।আমাদের দেশ, সমাজ নিয়ে লিখুন। আপনাকে দিয়ে হবে। ভাল লিখতে পারেন।

১০

শামান সাত্ত্বিক's picture


শাশ্বত স্বপন, দেখুন আমরা কিন্তু সফোক্লিসের অদিউপাস (ইডিপাস) পড়ি। কেন পড়ি, তা নিশ্চয়ই জানেন।
ভারতীয় ক্যানাডিয়ান চলচ্চিত্র পরিচালক দীপা মেহতা-র ফায়ার চলচ্চিত্র নিয়ে তর্ক-বিতর্ক হয়েছে, সেখানে নারী-সমকামিতার একটা দৃশ্য আছে। অভিনেত্রী শাবানা আজমিকে কোন এক ভারতীয় টিভি চ্যানেলে প্রশ্ন করা হয়েছিল, তা সম্পর্কে যে, এসব তো ভারতে ঘটে না। শাবানা আজমি না কি উত্তরে বলেছিলেন, আমাদের চারপাশে যে ঘটনা ঘটছে, তার যদি একটা নির্দিষ্ট দূরত্ব দিয়ে বৃত্ত আঁকা যায়, সে বৃত্তের মাঝে কয়টা ঘটনাই বা আমরা জানি।
আমি গল্পে বিষয়টাকে যেভাবে এনেছি, সেটা অন্যভাবেও বাংলাদেশে ঘটতে পারে বা ঘটছে। হয়তো এখনো তা উৎকট হয়ে উঠেনি। নারীরা যখন বাইরে এগিয়ে আসছে এবং নিজেদের সম্পর্কে সচেতন হয়ে উঠছে, তখন তাদের অধিকার ও মর্যাদার দাবীটা বড় হয়ে দেখা দেবে, তা বলাই বাহুল্য। আর পুরুষ শাসিত বা গতানুগতিক চিন্তা-ভাবনাগুলোও চরম নাড়া খেতে থাকবে। এবং সেটা আমাদের সমাজে খাওয়া শুরুও হয়েছে।
আমি জানিনা, আমার গল্পের অন্তর্নিহিত বিষয়, পাঠকের কতটুকু বোধগম্য হয়েছে, তার সাথে পাঠক কতটুকু কমিউনিকেট করতে পেরেছে। সাহিত্য-শিল্প কোন ভৌগলিক সীমারেখা মেনে চলে না বলেই তা পুরো মানবজাতির জন্যই প্রয়োজনীয় হয়ে উঠে। ভিন্ন পারিপার্শ্বিকতার মধ্যে আমি বিষয়টাকে তুলে ধরলেও আমরা যখন একই মানব জাতি এবং একই রকমের আবেগ-অনুভূতিকে ধারণ করি। যে ঘটনা আপনি এখন শুনতে চাচ্ছেন না, তা একসময় যে আপনার পরিচিত ঘটনা হয়ে উঠবে না, তার কি কোন নিশ্চয়তা আছে? সমাজ এগিয়ে যাচ্ছে, জটিলতা বাড়ছে। সে নতুন পরিস্থিতিকে সামাল দিয়েও আমাদের উঠতে হবে। তার ভেতরের স্পন্দনকে উপলব্ধি করতে হবে।
অন্ধ হলে কি প্রলয় বন্ধ হয়?

১১

তানবীরা's picture


আমরা এ রকম সমাজ চাই না।

লেখক সমাজের একটা ঘটনাকে তুলে ধরেছেন। সমাজ কিনতু আমাদের চাওয়া আর না চাওয়া মিলিয়েই। চাই না বলতে পারি কিনতু ঘটনাকে কি রুখতে পারি?

আমার লেখাটাকে মোটেও কোন অস্বাভাবিক সমাজ বিছছিনন কিছু মনে হয়নি, হয়তো আমি ঐ সমাজের (পরবাসী) অংশ বলেই Sad

১২

তানবীরা's picture


গল্পটা দারুণ। প্রতিটা পর্বেই ভিন্ন ভিন্ন মোড় নিয়েছে, লেখন শৈলীর কারণে এই টার্নগুলোতে ঘুরতে কোনোই অসুবিধা হয় নি। শুধু শেষে এসে কিছুটা তাড়াহুড়ার প্রবনতা মনে হ'ল। সময় থাকলে শেষটা আরেকবার ভেবে দেখতে পারেন...

১৩

বিষণ্ণ বাউন্ডুলে's picture


যা বলব ভেবেছিলাম।

মন্তব্য করুন

(আপনার প্রদান কৃত তথ্য কখনোই প্রকাশ করা হবেনা অথবা অন্য কোন মাধ্যমে শেয়ার করা হবেনা।)
ইমোটিকন
:):D:bigsmile:;):p:O:|:(:~:((8):steve:J):glasses::party::love:
  • Web page addresses and e-mail addresses turn into links automatically.
  • Allowed HTML tags: <a> <em> <strong> <cite> <code> <ul> <ol> <li> <dl> <dt> <dd> <img> <b> <u> <i> <br /> <p> <blockquote>
  • Lines and paragraphs break automatically.
  • Textual smileys will be replaced with graphical ones.

পোস্ট সাজাতে বাড়তি সুবিধাদি - ফর্মেটিং অপশন।

CAPTCHA
This question is for testing whether you are a human visitor and to prevent automated spam submissions.

বন্ধুর কথা

শামান সাত্ত্বিক's picture

নিজের সম্পর্কে

নিঃশব্দের মাঝে গড়ে উঠা শব্দে ডুবি ধ্যাণ মৌণতায়