"নিওলিবারাল পুঁজিবাদ"-এর অলীক ভূত এবং বাংলাদেশের সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বাস্তবতা
একটা কথা ক'দিন ধরে মাথার মধ্যে ঘুরছে। '৭৫-এর ১৫ আগষ্ট এবং ৪ নভেম্বরের পর বাংলাদেশের রাজনীতিতেও একপক্ষের ফাঁকা মাঠে গোল দেবার চমৎকার অবস্থা তৈরি হয়ে গিয়েছিলো। এবং এই সুযোগটা ক্ষমতালিপ্সু জেনারেল জিয়া ঠিকই একতরফা কব্জা করে নিয়েছেন। এই ধুরুন্ধর লোভী জেনারেল প্রো-পাকিস্তানী দাওয়াই অব্যর্থভাবে ব্যবহার করেছেন।
উনি জানতেন প্রো-পাকিস্তানী আবহ তৈরি করতে হলে যুদ্ধাপরাধী রাজাকার শাহ আজিজুর রহমান, আব্দুল আলীম এদেরকে তার মন্ত্রীসভায় স্থান দিতে হবে। সে সাথে বহুদলীয় গণতন্ত্রের নামে ধর্মভিত্তিক রাজনীতিকে বৈধতা দিয়ে জামায়াতে ইসলাম, মুসলিম লীগকে রাজনীতি করার পুরো সুযোগ দিতে হবে। আর অন্যদিকে কমিউনিস্ট পার্টিকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছে।
তাকে তখন বাংলাদেশে মার্কিন-পাকিস্তানী অক্ষ শক্তির বিজয় রথকে এগিয়ে নেয়ার মিশনে নামতে হয়েছিল। বাংলাদেশে মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষের শক্তিকে দুর্বল করে ফেলার পরিকল্পনায় এগুচ্ছিলেন রীতিমত। যে কারণে চীনাপন্থী বাম-রা এসে পড়ে তার দলে, মন্ত্রীতে। এসব কাজই তিনি করছিলেন একতরফাভাবে, রাজনীতিশূন্যতায়, আওয়ামীলীগের বিপন্ন অস্তিত্বের সুযোগে।
তখন জয় হয়েছিলো মার্কিনী সিআইএ এবং পাকিস্তানী আইএসআই-এর। যে পাকিস্তানীরা ৯ মাসের যুদ্ধে আমাদের সেনাবাহিনীর মুক্তিযোদ্ধাদের সহজে কাবু করতে পারেনি, সেই মুক্তিযোদ্ধারা ধীরে ধীরে সেনাবাহিনীতে কাবু হচ্ছিলেন।
এখন সময় অনেকটা ঘুরে গেছে। এখন অক্ষশক্তিতে সে সময়ের পরাজিত ভারত জয়ীর বেশে এসেছে। একসময় '৭১-এর বিপক্ষে থাকা মার্কিনীদের, নাছোড়বান্দা ভারতের সাথে পেরে না উঠে কৌশলী হতে হচ্ছে। আর এ সুযোগে আওয়ামীলীগ আপাতঃ এক ফাঁকা মাঠ তৈরি করতে পেরে একতরফাভাবে ক্ষমতাকে ধরে রেখেছে।
'৭৫ উত্তর বাংলাদেশের বাস্তবতায় যুদ্ধবিধ্বংস বাংলাদেশের জনগণের অস্তিত্ব রক্ষার সংগ্রামটাই ছিল মুখ্য। সেসময়ে মধ্যবিত্ত জনগণও যথেষ্ট দরিদ্র ছিল। মুক্তিযুদ্ধে যারা বাংলাদেশকে সমর্থন করেনি, সেই মধ্যপ্রাচ্যের আরব বিশ্ব এবং পশ্চিমা বিশ্বও বাংলাদেশের প্রতি সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেয়। স্বভাবতঃই জনগণ হয় খুব খুশি। মেনে নেয় সে সময়ের শাসকদের সংবিধানকে বুটের তলায় পিষ্ট করে ক্ষমতারোহণের একতরফা যাবতীয় অন্যায় অসদাচারণ। বিচার-বহির্ভূত এবং প্রহসনমূলক রাষ্ট্রীয় হত্যাকান্ডকেও বিনা বাক্যে মেনে নেয়। এমনই অবস্থা ছিল দুর্ভাগা এই দেশের।
এরপর আরো একবার ফাঁকা পোস্টে গোল দেয়ার অবস্থা তৈরি করার চেষ্টা হয়েছিল। যেভাবে নেতৃত্ব শূন্য করা হয়েছিল '৭৫-এ আওয়ামীলীগকে, অনেকটা সেভাবেই ২০০১-এ ২১ আগষ্টে তৎকালীন বিরোধী দলীয় নেতা, শেখ হাসিনাকে মেরে ফেলে আওয়ামীলীগকে দিশাহারা করার পরিকল্পনার ছক আঁটা হয়েছিল। কিন্তু সে প্রচেষ্টা ব্যর্থ হওয়াটাই এখন বিএনপির জন্য কাল হয়ে এসেছে। বিএনপি সেটা আগেভাগে বুঝতে পেরেছিলো বলে যে-কোন মূল্যে ২০০৬-এ নিজস্ব তত্ত্বাবধায়ক সরকার দ্বারা ক্ষমতা ধরে রাখার প্রাণপাত চেষ্টা করেছিল।
এখন সময় পাল্টিয়েছে। বাংলাদেশের মধ্যবিত্ত জনগণ তখনকার মত দরিদ্র নয়। এখন মধ্যবিত্তের আয়তনও অনেক বেড়েছে। এখন বাংলাদেশে পুঁজিপতিও হয়েছে বেশ। এখন কেউ চাইবে না, সন্ত্রাস, সংঘাত, জঙ্গীবাদ বাংলাদেশকে কাবু করুক, এর মেরুদন্ডকে ভাঙ্গুক। দেশ যখন শক্তিশালী একটা অর্থনৈতিক ভিত্তি তৈরির দিকে এগিয়ে যাচ্ছে, মানুষের আকাঙ্খা দিন দিন বেড়ে যাচ্ছে, জনগণের আত্মনিয়ন্ত্রনাধিকার বাড়ছে, সেখানে রাজনীতি এসে সবকিছু তছনছ করুক, এটাও কেউ চায় না।
সুতরাং এখন আওয়ামীলীগ নিরঙ্কুশ জনসমর্থন না পেলেও জনগণের নিজের মত পথ চলতে সমস্যা না হওয়ায়, আওয়ামীলীগের এইভাবে ক্ষমতায় আসীন তাদের জন্য তীব্র মনঃপীড়া হয়ে আসছে না। দেশের স্থিতিশীলতাই জনগণের কাম্য এবং তা অবশ্যই সন্ত্রাসের পথ ধরে অস্থিতিশীল হোক সেটা কারোরই কাম্য নয়।
বাংলাদেশের বর্তমান প্রেক্ষাপটে যদি কোন পন্ডিত বুদ্ধিজীবি কলামিষ্ট "নিওলিবারাল পুঁজিবাদ" তত্ত্ব এনে এখন দাঁড় করান, তবে বলবো তিনি ভুল করছেন। কেননা, এখানে 'রাজাকার' শত্রু হিসেবে এলেও যা হয়েছে এতদিন, তাতে দেশের, জনগণের, সর্বোপরি এদেশের পুঁজিপতিদের নাভিশ্বাসই উঠেছে। তাদের ক্ষতিই হয়েছে, কারো কোন অনন্ত মুনাফা হয়ে উঠেনি। আর এই পুঁজিপতিরাই হলেন, এদেশের অর্থনৈতিক মেরুদন্ড। যুক্তরাষ্ট্রের সুস্পষ্ট শত্রু আল-কায়দা হলে, মুনাফাটা তারা করেছে দেশের বাইরে থেকে, অন্য দেশকে আক্রমণ করে, দখল করে। আর ভারতের শত্রু মাওবাদীরা হলে সেখানে পুঁজিপতিরা বাংলাদেশের পুঁজিপতিদের মত এভাবে সর্বদিক থেকে আক্রান্ত হয়নি কখনো। অতএব, পন্ডিত লেখকদের সামাজিক এবং অর্থনৈতিক বিশ্লেষণ সঠিক খাতে প্রবাহিত হওয়া বাঞ্জনীয়।
মনের কথা বললেন
ধন্যবাদ অতিথি।
ভাল বলেছেন।
পড়ার জন্য কৃতজ্ঞতা, সামছা আকিদা জাহান।
মন্তব্য করুন