ইউজার লগইন

জীবনের গল্প, আছে বাকী অল্প

গোবিন্দের ঠাকুমার বয়স হয়েছে অনেক। এক নজর দেখলেই দারিদ্রক্লিষ্ট জীবনের বর্তমান হাল বুঝতে কারো কষ্ট হয় না। সিঁথির সিঁদুর মুছে গেছে কবে, নানা আচার অনুষ্ঠানের সাথে বিদায় নিয়েছে জীবনের সব রং। ছোট ছোট সাদা চুল, গলায় রুদ্রাক্ষের মালা আর বিবর্ণ সাদা কাপড়ে জড়ানো শরীরটা বয়ে চলেছে যেন হাজার বছর ধরে। ছোট্ট যে শিশুকে বুকে জড়িয়ে সব ভুলে থাকার চেস্টা করেছে এতো গুলি বছর, বড় হওয়ার পর ধীরে ধীরে তার "মা"য়ের প্রয়োজন ফুরিয়ে গেছে অনেক খানি। দিনমজুরী করে যা আয় রোজগার হতো, নানান অসুখ বিসুখে তাও আর হয়না। মফস্বলের শহরের এক কোনায় বাপ দাদার ভিটায় মাটির দুইটি ঘরে কোন রকমে কয়েকজনের থাকার ব্যাবস্থা রয়েছে শুধু। জল, স্নানের সব প্রয়োজন পুকুর ঘাটেই মেটাতে হয় তাদের। গোবিন্দ সবে কৈশোরে পা দিয়েছে, পড়ালেখা ছেড়ে বাদাম বিক্রি করে যা টাকা পায় তাই দিয়ে খেয়ে না খেয়ে চলে তাদের সংসার। গোবিন্দের ঠাকুমা একসময় পরিবারের সকল কর্মযঞ্জের কেন্দ্রবিন্দু ছিল, তার যত্নেই সত্মান, নাতিনাতনী বড় হয়েছে। তার হাতের রান্না খেয়েই কাটিয়েছে অনেক বছর । কিন্তু এখন নিজের কাছে যেমন, পরিবারের কাছেও এক রকম বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে। ভগবানের কাছে দিন রাত কেঁদেও এই যন্ত্রণাময় জীবন থেকে নিস্তার মেলে না। শেষ পর্যন্ত তাই বেছে নিতে হয় ভিক্ষার ঝুলি।

পরিবারের সকলের চোখ ফাঁকি দিয়ে দিনের কোন একটা সময় বের হয়ে পড়ে। অনভ্যস্ততার কারনে কারো ঘরে গিয়ে হাত পাততে পারে না। ঘরের দাওয়ায় বসে জিরিয়ে নিতে গিয়ে কারো চোখে পড়ে গেলে দুই চার টাকা অথবা একবেলা খাওয়া বা চাল আটা যা পায় তাই নিযে চুপি চুপি ঘরে ফিরে আসে । নিজেকে তখন তার আর বোঝা বলে মনে হয় না।

এবার শীতটা পড়েছে গত বছরের তুলনায় একটু যেন বেশীই। প্রতিবারই এই সময় শরীরের চামড়ায় ফাটল ধরে, কিন্তু এবারের মতো আগে কখনো মাঠে ঘাটে হাটতে হয়নি তাকে । সারাদিন পর ঘরে ফিরে পায়ের দিকে নজর পড়ে তার, চামড়া ফেটে রক্ত ঝরছে সেখান থেকে। ডাক্তার দেখানো কিম্বা ওষুধ কেনার সামর্থ তার নাই, প্রতিবেশীর বাসা একমাত্র ভরসা। সে বাড়িতে তার আনাগোনা নিয়মিত। কোথাও কোন ব্যাবস্থা না হলেও না খেয়ে থাকতে হয় না তার, কারন তার জন্য ও বাড়ির দরজা সব সময় খোলা থাকে। তাকে ওষুধপত্র দিয়ে এক জোড়া স্যান্ডেলের ব্যবস্থাও করে দেয় তারা। স্যান্ডেল জোড়া অনেক চেষ্টা করেও ব্যাবহার করতে পারে না সে। জীবনে কখনো এ জিনিষটা তার পরা হয়নি, তাই হাঁটতে গিয়ে পা থেকে খুলে বেরিয়ে যেতে চায় শুধূ। কয়দিন ধরে অনেক চেষ্টার পর, শেষে না পেরে দড়ি দিয়ে পায়ের সাথে বাঁধতে হয়। স্যান্ডেল পড়া নিয়ে এমন সমস্যা দেখে একজোড়া পুরনো জুতা দেয়া হয় তাকে। সেটাই কোন রকমে পায়ে গলিয়ে দুদিন পর থেকে আবার পথে বের হতে হয় তাকে।

কুয়াশা ভেজা সকালে সূর্য্যের মুখ দেখা যাবে না বুঝে, ছেঁড়া কাথাটা গায়ে দিয়ে জুবুথুবু বসে থাকে ঘরের দাওয়ায়। কোঁচকানো চামড়ার ফাঁক গলে ছোট হয়ে আসা ছানি পড়া চোখে উদাস হয়ে আকাশ দেখে আর মনে মনে বলে, "ভগবান পরের শীতটা আসার আগেই হামাক নিয়্যা যাও, হামি মুক্তি চাই, হামাক মুক্তি দেও"।

পোস্টটি ৯ জন ব্লগার পছন্দ করেছেন

টুটুল's picture


ভগবান পরের শীতটা আসার আগেই হামাক নিয়্যা যাও, হামি মুক্তি চাই, হামাক মুক্তি দেও

কি আর বলি :(

সোহেল কাজী's picture


লেখাটা ভেতরটা নাড়িয়ে দিলো।
গোবিন্দের ঠাকুমার মত এমন অনেকেই যখন মৃত্যু কামনা করে তখন আমরা হয়তো ভাঁপ উঠা পিঠায় ফু দিতে ব্যাস্ত থাকি উষ্ণ উনোনের পাশে।

নজরুল ইসলাম's picture


ভালো লাগলো লেখাটা

সাঈদ's picture


আসলেই কষ্ট হয় এসব মানুষদের কষ্ট দেখলে।

দারুন্স । ১০ তারা দিলাম।

নুশেরা's picture


বড় বেশী বাস্তব, বড় বেশী জীবন্ত...

নীড় সন্ধানী's picture


আপনার গল্প লেখার হাত কিন্তু বেশ পেকেছে। যেন নিজ চোখে দেখে লেখা, সেরকম নাকি? :)

লোকেন বোস's picture


সুন্দর লেখা

শাওন৩৫০৪'s picture


অনেক রকম মানুষের অনেক রকম কষ্ট আছে...দেখা হয়না অনেক কিছুই...সুন্দর লিখছেন খুব...

তানবীরা's picture


খুব ভালো লিখেছেন সুবর্না।

মন্তব্য করুন

(আপনার প্রদান কৃত তথ্য কখনোই প্রকাশ করা হবেনা অথবা অন্য কোন মাধ্যমে শেয়ার করা হবেনা।)
ইমোটিকন
:):D:bigsmile:;):p:O:|:(:~:((8):steve:J):glasses::party::love:
  • Web page addresses and e-mail addresses turn into links automatically.
  • Allowed HTML tags: <a> <em> <strong> <cite> <code> <ul> <ol> <li> <dl> <dt> <dd> <img> <b> <u> <i> <br /> <p> <blockquote>
  • Lines and paragraphs break automatically.
  • Textual smileys will be replaced with graphical ones.

পোস্ট সাজাতে বাড়তি সুবিধাদি - ফর্মেটিং অপশন।

CAPTCHA
This question is for testing whether you are a human visitor and to prevent automated spam submissions.

বন্ধুর কথা

সুবর্ণা's picture

নিজের সম্পর্কে

কী লিখব বুঝতে পারছিনা, পরে এক সময় লিখব|