ফুটবল ফুটবল দুরন্ত ফুটবল (২)
বিরাশি'র বিশ্বকাপের সময় আমি নিতান্ত'ই বালক আর ছিয়াশি সালে উত্তুঙ্গ কিশোর। বিরাশিতে আমার সুনির্দিষ্ট দলের প্রতি সমর্থন ছিলো না আর ছিয়াশিতে জার্মানি-জার্মানি বইলা আমি গলা কাঁপাই। এই পছন্দের বিষয়টা আমি অকপট কইতে পারি অন্যগো চাইতে আলাদা হওনের চেষ্টা থেইকা হইছিলো। বাঙালিরা তখন আর্জেন্টিনা ব্রাজিল শিবিরে বিভক্ত হইয়া গেছে অলরেডি। মধ্যবিত্ত শহুইরা হিসাবে পপ্যুলার চয়েসের বিরোধী হওনের যেই ভন্ডামির স্বভাব আত্মস্থ করছি তখন কেবল তার নিরীখেই আমি জার্মান সাপোর্টার। যদিও যূক্তির অভাব হয় নাই কখনোই আমার তথ্যবাদী একটা মনোভঙ্গী ঐ আমলেই আয়ত্ব করছি প্রথম। কারণ তখন ঢাকা শহরে রঙীন টেলিভিশনের বিস্তার ঘটছে ভালোই কিন্তু আমাগো বাসায় তার প্রবেশ ঘটে নাই তখনো। খবরের কাগজে রঙীন ছবি তখন দূর্লভ বা একেবারেই ছিলো না। তার উপর আমাগো বাসায় রাখা হইতো আভিজাত্যের দৈনিক সংবাদ। জার্মানীর পতাকার রঙটা হয়তো স্মার্ট লাগতো তখন। কিন্তু ছিয়াশি'র জার্মানরে সমর্থনের কোন কারণই ছিলো না তাগো খেলা দেইখা কিংবা ফলাফলে।
একজন জার্মান সাপোর্টার হিসাবে আমি সেই সময়টায় বন্ধুকূলে প্রায় একঘরেই হইয়া পড়ছিলাম। তবু মনে শান্তি ছিলো ঝাঁকের কই হইতে হয় নাই আমারে। কিন্তু খেলা দেখতে বইসা দেখি জর্ম্মনরা শরীরি ফুটবল ছাড়া আর কিছু খেলে না। তাও যদি সেই খেলা দিয়া তারা জিততে পারতো! গ্রুপ পর্যায়েই তারা একেবারে হাইরাই বসলো ডেনমার্কের লগে। ডেনমার্কে তখন তখন লম্বা চওড়া মিডফিল্ডার প্রেবেন এলকায়ের আর জেসপার ওলসেন যূগ পাল্টানো খেলা খেলে। ইউরোপের বরফবর্তী একটা জাতি আক্রমনাত্মক ফুটবলে মানুষের হৃদয় ভরাইয়া দিছিলো ঐ সময় গ্রুপ পর্বে। উরুগুয়ের মতোন লাতিন দলরে গ্রুপ ম্যাচে ৬ - ১ ব্যবধানে হারাইছিলো। মনে পড়ে ঐ সময় জার্মানীর দ্বিতীয় রাউন্ডে উঠনটাই অনিশ্চিত হইয়া পরাতে আমি মনে মনে সিদ্ধান্ত নিয়া রাখছিলাম ডেনমার্কের সমর্থক হইতে হইবো। কিন্তু ডেনমার্ক রীতিমতো মনে দাঁগা দিয়া হারলো দ্বিতীয় রাউন্ডেই। স্পেনের এমিলিও বুত্রাগুয়েনোর হ্যাট্রিকে স্পেন সেই খেলা জিতছিলো যদ্দূর মনে পড়ে ৫-১ গোলে।
জার্মানরা কিন্তু ঠিকই মরক্কোরে হারাইয়া কোয়ার্টার ফাইনালে চইলা গেলো। লোথার ম্যথিয়াস, ব্রেমা আর বের্থোল্ডের কল্যানে আমি তখন জোর গলায় কথা বলতে শুরু করছি কেবল। আজকের ব্রাজিলিয়ান কোচ দুঙ্গা আর লোথার ম্যাথিয়াসের খেলার ধরনটা ছিলো প্রায় এক। তারা শরীরি শক্তির ফুটবলের সাথে মাথা ব্যবহার করতো বেশ। মাঠ বড় কইরা এদিক ওদিক প্রতিপক্ষরে ব্যতিব্যস্ত রাখা আর মধ্যমাঠেই যেকোনো আক্রমণ ঠেকাইয়া দেয়াতে ম্যাথিয়াস ছিলো ওস্তাদ। জার্মানগো সাপোর্ট করি কিন্তু ব্রাজিলের খেলাতে পরান জুড়ায়। সেই ব্রাজিলও হাইরা গেলো কোয়র্টার ফাইনালে ফ্রান্সের সাথে। তয় মনে আছে ঐ খেলা হইছিলো সক্রেটিশের ব্রাজিল আর গোল কিপার জোয়েল বাটের সাথে। নির্ধারিত সময়ে একটা আর ট্রাইব্রেকারে সম্ভবতঃ দুইটা পেনাল্টি ঠেকাইয়া সে ফ্রান্সের দলরে ফাইনালে তুইলা ফেলছিলো। পেনাল্টি মিস করছিলো কারেকা আর সক্রেটিশ নিজে। ঐ সময় নাকি সক্রেটিশরে পেনাল্টি মাস্টার কওয়া হইতো সে নাকি তার আগের একশোটা পেনাল্টি কিকের একটাও মিস করে নাই। ঐ খেলায় পেনাল্টি মিস কইরা সে প্রমাণ করছিলো তার মনুষ্যত্ব। অতিমানব হইলো অন্য একজন...
কোয়ার্টার ফাইনালে ম্যারাডোনা হাত দিয়া গোল করলো। পাঁচ ফুটি এক খেলোয়াড় ছয় ফিট লম্বা গোলকিপার পিটার শিল্টনের মাথার উপর দিয়া আঙুলের ছোঁয়ায় বল পোস্টে ঠেইলা দিছিলো। সেই হাতের ছোঁয়া বুঝতে ভাষ্যকারগোও বেশ খানিক সময় লাগছিলো। ইংল্যান্ডের খেলোয়াড়রা প্রতিবাদ শুরু করাতে বার বার দেখতে বোঝা গেলো তার জারিজুরি। কিন্তু রেফারি তখন খেলা চালাইতেছে আর্জেন্টিনা ১ - ইংল্যান্ড ০ এই তরীকায়। তয় ম্যারাডোনা সেই তার বিখ্যাত গোলের দৌড়টা শুরু করলো তার পরেই। মধ্যমাঠে বল ধইরা ৫/৬ জনরে কাটাইয়া প্রায় জিরো ডিগ্রী থেইকা বল গোলে পাঠানোর সেই দৃশ্য আমার মতোন আর্জেন্টিনা বিরোধীরেও মন্ত্রমূগ্ধ কইরা রাখছিলো নিদেনপক্ষে আধাঘন্টা।
সেমিফাইনালেও ম্যারাডোনা বেলজিয়ামের বিরুদ্ধে প্রায় একই ধরনের আরেকটা গোল কইরা প্রমাণ করলো আগেরটা ফ্লুক ছিলো না। আর ফাইনালে আমার সমর্থিত জার্মানগো বিরুদ্ধেও সে একাই খেললো প্রায় অখ্যাত ভালদানো আর বুরুচাগারে নিয়া। রুমেনিগে আর রুডি ফোয়েলারের গোলে অনেক্ষণ সমতায় থাকলেও শেষ পর্যন্ত খেলায় আর্জেন্টিনার চ্যাম্পিয়নশীপের বাঁশি বাজলো...





ভাস্করদা, ছিয়াশিতে আমাদের সব রাফ (নিউজপ্রিন্টের) খাতার ওপরে ম্যারাডোনার বলে লাথি দেয়া ছবি সহ ক্যাপশন থাকতো না, মেক্সিকো ৮৬।
আমার সবচেয়ে মেমোরেবল বিশ্বকাপ মেমোরী
খালি খাতা? ভিউ কার্ড ও আছিল, আর সেই সাথে আছিল রুড গুলিত এর হেই ব্রেইড করা বাবরি!
এক্কেরে নস্টালজিক করে দিলেন! ... ভুলেই গেছিলাম, ম্যারাডোনার বল পায়ে দৌড়ানোর ছবিওয়ালা নোটখাতার কথা! ... আহারে!
আমি ঐ খাতা অ্যাভয়েড করতাম ভাব মাইরা :p।
তয় ম্যারাডোনার ঐ গোলের ফার্স্ট ম্যুভওয়ালা খাতাার কাভারগুলিও ভালো লাগতো।
ওরে খাইছে, ৮৬ তে আমি পিচকা পুলা আছিলাম, বেশির ভাগই মনে নাই, হালকার উপর ঝাপসা কিনা সব
, তাই লেখা পইড়া একটু হইলেও আনন্দের আঁচ পাইলাম
আপনেরা তো সেইদিনকার পোলাপাইন...lol। আমেরিকার ফুটবল জোয়ার নিয়া একটা পোস্ট মারেন। ঐ এলাকার বিশ্বকাপ উত্তেজনার কথা জানতে মন চায়।
হা হা হা, গুরু, যথার্থ কইছেন, তয় আম্রিকার ভুদাইগো লইয়া আর পারি না, এইখানের ভুদাইগুলান না দেহে ফুটবল না দেখে ক্রিকেট। হেরা হেগো নিয়াই বাঁচে না, বালের বেসবল , বাস্কেটবল আর আম্রিকান ফুটবল দেখে। ফুটবলরে কয় সকার। এর চেয়েও দুঃখজনক হইলো, কিছু পাইছি ফুটবল ভালু পায়, তাও বেশির ভাগই মাইয়া!
আমি তাই এগো ফুটবল নিয়া কোন উত্তেজনা না দেইখা আর লেখার ইচ্ছা হারায়লাইছি। কি কমু কন! তয়, জার্মানীর খেলা দেখলাম, ভাইরে ভাই, ইরাম খেল্লে কাপ আবারো হেরাই লইবো, পডলোস্কি এমুন নাত্তি মারছে, গোলি ভুদাই হাত বাড়ায়াও ঠেকাইবার পারে নাই, আর্জেন্টিনার সাপুর্টার না হইলে এইবার শিউর জার্মানিরে সাপুট দিতাম, কিন্তু বুঝতেই পারতাছেন, পুরানা বেতা ভুলতাম পারি না। আর একুরেসি কি, মনে হয় যেন ফুটবল না, তীর মারতাছে, বিশেষ কইরা ভলি কইরা মাঠের এইপাশ থিক্কা যেমনে আধামাঠ পার কইরা মাঠের কোনা বরাবর পাস দিল, দেইক্কা আমার আত্মার পানি শুকায়া গেছে। আর কুনু মিস নাই, আর্জেন্টিনা যদি আবার জার্মানীর মুকাহ্মুখি হয়, খবর আছে!
মনে পইড়া গেলো, মরোক্কো ইংল্যান্ডের গ্রুপে গ্রুপ চ্যাম্পিয়ান হওয়ায় ডেনমার্কের লগে জিতলে জার্মানীর খেলতে হইতো স্পেনের লগে, আর হারলে মরোক্কো ... পেপারগুলাতে মন্তব্য আসছিলো যে পেশাদার জার্মানরা সেইজন্য ইচ্ছা কইরা ডেনমার্কের কাছে হারছে
... সেই কারণটা হয়তো মনে গাঁইথা গেছে, এই জন্যই এখনও ওয়ার্ল্ড কাপে যেই দলটারে আমি সবচেয়ে ভয়ংকর মনে করি সেইটা জার্মানী, ওয়ার্লড কাপের প্রতি এদের এ্যাটিচিউডই আলাদা
আমিও জার্মানির ভক্ত ছিলাম এককালে, অন্য কোন কারণে না, তাদের জার্সিটার কালার কম্বিনেশন (তাদের পতাকার মতো্ই) খুব স্টাইলিশ লাগতো
পরের পর্ব অর্থাৎ ইটালিয়া৯০'র জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করতেছি
ঐ আমলে যদ্দূর মনে পড়ে প্রিজমাটিক মোটিফে শোল্ডারে পতাকার রঙ দিয়া একটা প্যাটার্ন ছিলো। অনেক স্মার্ট।
৯০'এর বিশ্বকাপ আমার প্রিয় বিশ্বকাপ...
আমি নির্দিষ্ট কোনো দলের সমর্থক ছিলামনা। ছিয়াশিতে মনে হয় ফ্রান্সের সমর্থক ছিলাম প্লাটিনির জন্য। গায়ের জোর গোয়াইরা খেলার জামানায় প্লাটিনি আনছিলো নান্দনিকতার ছোঁয়া। আর ফ্রি-কিকে রেইনবো নামের জাদুকরী শটের উদ্ভাবক ছিল সে। দুই বছর আগে ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়নে সারা দুনিয়া অবাক হইয়া দেখছে তার অদ্ভূত সব গোল। বিপক্ষ গোলকিপার সেভ করার চেষ্টারও সুযোগ পেতনা, যেই বল মনে হচ্ছে বাইরে যাচ্ছে উপর দিয়া সেইটাই সুইং করে গোলপোস্টে ঢুকে যাইত। সেমি ফাইনালে সম্ভবত হারছিল টাইব্রেকারে জার্মানির কাছে। খুব কষ্ট পাইছিলাম।
আর ম্যারাডোনার জন্য আর্জেন্টিনারো সমর্থক ছিলাম।
বাহ দারুন সিরিজ। খুবই ভালো লাগলো। ৮৬ তে আমি স্কুলে যাওয়াও সুরু করি নাই বিধায় খুব একতা কন্ট্রিবিউট করতে পারলাম না।
পরের পর্বের অপেক্ষায়।
৮৬ 'র বিশ্বকাপের সময় আমি নিতান্তই শিশু। কিন্তু বিশ্বকাপ নিয়া উন্মাদনার কথা মনে আছে। খেলারও টুকিটাকি মনে আছে।
মন্তব্য করুন