ইউজার লগইন

পৃথিবীর ঠিকানায় আমরা খুব ভালো নাই রুদ্র'দা...

তখন আমি নিতান্তই কৈশোরকাল অতিক্রম করতেছি। মহল্লার বড় ভাই তপন বড়ুয়ার লগে শাহবাগে যাই। পিজির পিছনের বটগাছ তলায় বসি। আড্ডাবাজি চলে। সব প্রতিবাদী তরুণেরা কবিতা শোনায়। আর চলে প্রতিষ্ঠিত প্রাতিষ্ঠানিকগো গালাগালি। ঐ খান থেইকা উঠি যখন রাত বাড়তে থাকে। যাই আজিজ মার্কেটের দিকে। তখন মাত্র মার্কেটের নির্মাণ কাজ চলে। একটা দোকান একলা একলা বাণিজ্য করে। পাঠক সমাবেশ। আমরা দোকানের পিছনে সিঁড়ির নীচে ফরহাদ+মজহার টি স্টল থেইকা চা কিনা খাই। ঐ খানে আরেকদল কবিকূলের লগে আরেক দফা আড্ডা। রাত আরো ঘন হয়। চারুকলার দিকে যাই সবাই দল বাইন্ধা। সেইখানে অন্ধকারে আড্ডা তখন মাত্র শুরু করেন সত্তরের প্রাণ চঞ্চল তরুণের দল।

রুদ্র মোহাম্মদ শহীদুল্লাহরে আমি সেইখানেই প্রথম দেখি। তিনি ঐ আড্ডার মধ্যমনি। তারে ঘিরা থাকা মানুষেরা গান গায়। ঐ সব কেরম গান! বাংলা ভাষায় এমন গান কখনো শুনি নাই। সুরে ও সঙ্গতে লোকজ বাংলার প্রতিচ্ছবি। আর কথায়? সেতো প্রলয়! তারা অন্তর বাজায় নিরন্তর প্রলয়ে।

সমাজের শেকলে আটকা পড়েছে পা
সোহাগে নাম রেখেছ নারী...

আমার সেই প্রথম শিক্ষা। নারী অধিকার সম্পর্কীত বোধোদয়। মায়ের কান্নারে চিনতাম। কিন্তু এই যে স্বীকারোক্তি আমার মা'ও তো এমন পারে নাই! রুদ্র'দার পংক্তি যেনো আমারে চিনতে শিখায় সমাজ-সংস্কৃতি-মানুষ।

ভালো আছি, ভালো থেকো
আকাশের ঠিকানায় চিঠি লিখো...

ঐ অন্ধকারের আড্ডাতেই আমি ভালোবাসার মর্তবা শিখি। ভালোবাসার দীর্ঘ পথের দিশা জানতে পারি। ভালোবাসার জটিলতারে ভাঙতে শিখি। প্রবল অনুভূতিরে শ্রদ্ধা করতে শিখি।
সেই রুদ্র'দারে খুব বেশিদিন সেই আড্ডায় পাই নাই। তিনি প্রথম গেলেন মিঠাপুকুর। তারপর গেলেন নিরন্তরের স্রোতে।

রুদ্র মোহাম্মদ শহীদুল্লাহরে কেউ চেনে বিদ্রোহের কবি হিসাবে। কেউ চিনে তার প্রেম অন্ত্যপ্রাণ। আর আমি সেই কৈশোরকালের বিস্মিত চোখে দেখছিলাম একজন মানুষরে। কেবলি একজন মানুষ। এখন যার অভাব বোধ করি জীবনের প্রতিক্ষণে। সমাজের সকল স্তরে শোণীতে...

আমার এ মরুভূমি,
দূরে সুদূরে তুমি।
স্বপনের দালান-কোঠা রইলো পড়ে রে...

পোস্টটি ৭ জন ব্লগার পছন্দ করেছেন

মেসবাহ য়াযাদ's picture


আমি সামান্য কদিনের জন্য খুব কাছে পেয়েছিলাম রুদ্র'দাকে।
মানুষটা জীবদ্দশায় বড়োবেশি অতৃপ্ত ছিল।
তাঁর আত্মার শান্তি হোক...

জ্যোতি's picture


ভালো আছি, ভালো থেকো
আকাশের ঠিকানায় চিঠি লিখো...

এই গানটা দিয়েই বোধ হয় রুদ্র মোহাম্মদ শহীদুল্লাহর নাম জেনেছি। তারপর কবিতা পড়া এবং তারঁ সম্পর্কে টুকিটাকি জানা। কবি হিসেবে আমার পছন্দের । অকালেই চলে গেলেন বলে আমরা বঞ্চিত হলাম। তাঁর আত্নার শান্তি হোক।

টুটুল's picture


প্রেমময়ী রুদ্র...

আমার ভিতরে বাহিরে অন্তরে অন্তরে,
আছো তুমি হৃদয় জুড়ে।

ঢেকে রাখে যেমন কুসুম, পাপড়ির আবডালে ফসলের ঘুম।
তেমনি তোমার নিবিঢ় চলা, মরমের মূল পথ ধরে।

পুষে রাখে যেমন কুসুম, খোলসের আবরণে মুক্তোর ঘুম।
তেমনি তোমার গভীর ছোঁয়া, ভিতরের নীল বন্দরে।

ভাল আছি ভাল থেকো, আকাশের ঠিকানায় চিঠি লিখো।
দিয়ো তোমার মালাখানি, বাউলের এই মনটারে।
আমার ভিতরে বাহিরে………

রুদ্র ভক্তকুলের জন্য

জ্যোতি's picture


টুটুলকে ধইন্যা। অনেকদিন গান টা শুনি না।আজ শুনব বাসায় গিয়ে।

হাসান রায়হান's picture


আমি প্রথম নাম শুনি- "জাতির পতাকা খামচে ধরেছে সেই পুরানো শকুন" দিয়া।

আহমেদ রাকিব's picture


চলে যাওয়া মানে প্রস্থান নয়, নয় বন্ধন ছিন্ন করা আর্ত রজনী
চলে গেলে মনে হয় তুমি সমস্ত ভুবন জুড়ে আছ।

লীনা দিলরুবা's picture


আফিম তবুও ভালো, ধর্ম সে তো হেমলক বিষ
রুদ্র মোহাম্মদ শহীদুল্লাহ

যেমন রক্তের মধ্যে জন্ম নেয় সোনালি অসুখ
তারপর ফুটে ওঠে ত্বকে মাংসে বীভৎস ক্ষরতা।
জাতির শরীরে আজ তেম্নি দ্যাখো দুরারোগ্য ব্যাধি
ধর্মান্ধ পিশাচ আর পরকাল ব্যবসায়ি রূপে
ক্রমশঃ উঠছে ফুটে ক্ষয়রোগ, রোগের প্রকোপ

একদার অন্ধকারে ধর্ম এনে দিয়েছিল আলো,
আজ তার কংকালের হাড় আর পঁচা মাংসগুলো
ফেরি কোরে ফেরে কিছু স্বার্থাণ্বেষী ফাউল মানুষ-
সৃষ্টির অজানা অংশ পূর্ণ করে গালগল্প দিয়ে।
আফিম তবুও ভালো, ধর্ম সে তো হেমলক বিষ।

ধর্মান্ধের ধর্ম নেই, আছে লোভ, ঘৃণ্য চতুরতা,
মানুষের পৃথিবীকে শত খণ্ডে বিভক্ত করেছে
তারা টিকিয়ে রেখেছে শ্রেণীভেদ ঈশ্বরের নামে।
ঈশ্বরের নামে তারা অনাচার করেছে জায়েজ।

হা অন্ধতা! হা মুর্খামি! কতোদূর কোথায় ঈশ্বর!
অজানা শক্তির নামে হত্যাযজ্ঞ কতো রক্তপাত,
কত যে নির্মম ঝড় বয়ে গেল হাজার বছরে!
কোন্ সেই বেহেস্তের হুর আর তহুরা শরাব?
অন্তহীন যৌনাচারে নিমজ্জিত অনন্ত সময়?
যার লোভে মানুষও হয়ে যায় পশুর অধম।

আর কোন দোজখ বা আছে এর চেয়ে ভয়াবহ
ক্ষুধার আগুন সে কি হাবিয়ার চেয়ে খুব কম?
সে কি রৌরবের চেয়ে নম্র কোন নরোম আগুন?

ইহকাল ভুলে যারা পরকালে মত্ত হয়ে আছে
চলে যাক সব পরপারে বেহেস্তে তাদের
আমরা থাকবো এই পৃথিবীর মাটি জলে নীলে,
দ্বন্দ্বময় সভ্যতার গতিশীল স্রোতের ধারায়
আগামীর স্বপ্নে মুগ্ধ বুনে যাবো সমতার বীজ .........

রুদ্র'কে মনে পড়ে!

লীনা দিলরুবা's picture


প্রিয় রুদ্র,
প্রযত্নে, আকাশ

তুমি আকাশের ঠিকানায় চিঠি লিখতে বলেছিলে। তুমি কি এখন আকাশ জুরে থাকো? তুমি আকাশে উড়ে বেড়াও? তুলোর মতো, পাখির মতো? তুমি এই জগত্সংসার ছেড়ে আকাশে চলে গেছো। তুমি আসলে বেঁচেই গেছো রুদ্র। আচ্ছা, তোমার কি পাখি হয়ে উড়ে ফিরে আসতে ইচ্ছে করে না? তোমার সেই ইন্দিরা রোডের বাড়িতে, আবার সেই নীলক্ষেত, শাহবাগ, পরীবাগ, লালবাগ চষে বেড়াতে? ইচ্ছে তোমার হয় না এ আমি বিশ্বাস করি না, ইচ্ছে ঠিকই হয়, পারো না। অথচ এক সময় যা ইচ্ছে হতো তোমার তাই করতে। ইচ্ছে যদি হতো সারারাত না ঘুমিয়ে গল্প করতে - করতে। ইচ্ছে যদি হতো সারাদিন পথে পথে হাটতে - হাটতে। কে তোমাকে বাধা দিতো? জীবন তোমার হাতের মুঠোয় ছিলো। এই জীবন নিয়ে যেমন ইচ্ছে খেলেছো। আমার ভেবে অবাক লাগে, জীবন এখন তোমার হাতের মুঠোয় নেই। ওরা তোমাকে ট্রাকে উঠিয়ে মিঠেখালি রেখে এলো, তুমি প্রতিবাদ করতে পারোনি।

আচ্ছা, তোমার লালবাগের সেই প্রেমিকাটির খবর কি, দীর্ঘ বছর প্রেম করেছিলে তোমার যে নেলী খালার সাথে? তার উদ্দেশ্যে তোমার দিস্তা দিস্তা প্রেমের কবিতা দেখে আমি কি ভীষণ কেঁদেছিলাম একদিন ! তুমি আর কারো সঙ্গে প্রেম করছো, এ আমার সইতো না। কি অবুঝ বালিকা ছিলাম ! তাই কি? যেন আমাকেই তোমার ভালোবাসতে হবে। যেন আমরা দু'জন জন্মেছি দু'জনের জন্য। যেদিন ট্রাকে করে তোমাকে নিয়ে গেলো বাড়ি থেকে, আমার খুব দম বন্ধ লাগছিলো। ঢাকা শহরটিকে এতো ফাঁকা আর কখনো লাগেনি। বুকের মধ্যে আমার এতো হাহাকারও আর কখনো জমেনি। আমি ঢাকা ছেড়ে সেদিন চলে গিয়েছিলাম ময়মনসিংহে। আমার ঘরে তোমার বাক্সভর্তি চিঠিগুলো হাতে নিয়ে জন্মের কান্না কেঁদেছিলাম। আমাদের বিচ্ছেদ ছিলো চার বছরের। এতো বছর পরও তুমি কী গভীর করে বুকের মধ্যে রয়ে গিয়েছিলে ! সেদিন আমি টের পেয়েছি।

আমার বড়ো হাসি পায় দেখে, এখন তোমার শ'য়ে শ'য়ে বন্ধু বেরোচ্ছে। তারা তখন কোথায় ছিলো? যখন পয়সার অভাবে তুমি একটি সিঙ্গারা খেয়ে দুপুর কাটিয়েছো। আমি না হয় তোমার বন্ধু নই, তোমাকে ছেড়ে চলে এসেছিলাম বলে। এই যে এখন তোমার নামে মেলা হয়, তোমার চেনা এক আমিই বোধ হয় অনুপস্থিত থাকি মেলায়। যারা এখন রুদ্র রুদ্র বলে মাতম করে বুঝিনা তারা তখন কোথায় ছিলো?

শেষদিকে তুমি শিমুল নামের এক মেয়েকে ভালোবাসতে। বিয়ের কথাও হচ্ছিলো। আমাকে শিমুলের সব গল্প একদিন করলে। শুনে ... তুমি বোঝোনি আমার খুব কষ্ট হচ্ছিলো। এই ভেবে যে, তুমি কি অনায়াসে প্রেম করছো ! তার গল্প শোনাচ্ছো ! ঠিক এইরকম অনুভব একসময় আমার জন্য ছিলো তোমার ! আজ আরেকজনের জন্য তোমার অস্থিরতা। নির্ঘুম রাত কাটাবার গল্প শুনে আমার কান্না পায় না বলো? তুমি শিমুলকে নিয়ে কি কি কবিতা লিখলে তা দিব্যি বলে গেলে ! আমাকে আবার জিজ্ঞেসও করলে, কেমন হয়েছে। আমি বললাম, খুব ভালো। শিমুল মেয়েটিকে আমি কোনোদিন দেখিনি, তুমি তাকে ভালোবাসো, যখন নিজেই বললে, তখন আমার কষ্টটাকে বুঝতে দেইনি। তোমাকে ছেড়ে চলে গেছি ঠিকই কিন্তু আর কাউকে ভালোবাসতে পারিনি। ভালোবাসা যে যাকে তাকে বিলোবার জিনিস নয়।

আকাশের সঙ্গে কতো কথা হয় রোজ ! কষ্টের কথা, সুখের কথা। একদিন আকাশভরা জোত্স্নায় গা ভেসে যাচ্ছিলো আমাদের। তুমি দু চারটি কষ্টের কথা বলে নিজের লেখা একটি গান শুনিয়েছিলে। "ভালো আছি ভালো থেকো, আকাশের ঠিকানায় চিঠি দিও"। মংলায় বসে গানটি লিখেছিলে। মনে মনে তুমি কার চিঠি চেয়েছিলে? আমার? নেলী খালার? শিমুলের? অনেক দিন ইচ্ছে তোমাকে একটা চিঠি লিখি। একটা সময় ছিলো তোমাকে প্রতিদিন চিঠি লিখতাম। তুমিও লিখতে প্রতিদিন। সেবার আরমানিটোলার বাড়িতে বসে দিলে আকাশের ঠিকানা। তুমি পাবে তো এই চিঠি? জীবন এবং জগতের তৃষ্ণা তো মানুষের কখনো মেটে না, তবু মানুষ আর বাঁচে ক'দিন বলো? দিন তো ফুরোয়। আমার কি দিন ফুরোচ্ছে না? তুমি ভালো থেকো। আমি ভালো নেই।

ইতি,
সকাল

পুনশ্চঃ আমাকে সকাল বলে ডাকতে তুমি। কতোকাল ঐ ডাক শুনি না। তুমি কি আকাশ থেকে সকাল, আমার সকাল বলে মাঝে মধ্যে ডাকো? নাকি আমি ভুল শুনি?

(তসলিমার লেখা চিঠি, রুদ্রকে)

মীর's picture


বিনম্র শ্রদ্ধা

১০

নীড় _হারা_পাখি's picture


চিঠি টা খুব ভাল লাগলো।। আজ অনেক টাই জানলাম রুদ্র দা'র। কিছু ই জানতাম না। শুধু নাম শুনেছি বা তার লিখা কবিতা পড়েছি। বা গান শুনেছি। কিন্তু এত জনপ্রিয় গান বা বিদ্রোহের কবিতা যে তার লিখা জানা ছিল না কারন গান শুনতে গেলে শিল্পির নাম জেনেছি, কবিতা শুনেছি কোন মঞ্চে বা সিডি তে কখনো লেখকের নাম পড়িনি। বিনম্র শ্রদ্ধা রইলো রুদ্র দা'র প্রতি।
আজো সেই আজিজ সুপার মার্কেট আছে, আছে সেখানে পাঠক সমাবেশ, আছে সেই চারু কলার বকুল তলা বা পিজি হাস্পাতালের পেছনের সেই বট তলা, সবি ঠিক আগের মতই আছে। এখনো অনেক আড্ডা হয় সেখানে। হয়তো এখনো আড্ডাতে রুদ্র'র নাম আসে। রুদ্র রা কখনো মরে না.।.।.।ওরা বেঁচে থাকে ওদের সৃষ্টিতে.।

দুটি কবিতা দেয়া হলো.।

http://www.youtube.com/watch?v=MQInOaSUZHM

http://www.youtube.com/watch?v=b45r6yUi32k&feature=related

১১

তানবীরা's picture


তাসলিমার লেখায় রুদ্রকে জেনেছি। একটা মানুষের অনেক চেহারা থাকে।

মন্তব্য করুন

(আপনার প্রদান কৃত তথ্য কখনোই প্রকাশ করা হবেনা অথবা অন্য কোন মাধ্যমে শেয়ার করা হবেনা।)
ইমোটিকন
:):D:bigsmile:;):p:O:|:(:~:((8):steve:J):glasses::party::love:
  • Web page addresses and e-mail addresses turn into links automatically.
  • Allowed HTML tags: <a> <em> <strong> <cite> <code> <ul> <ol> <li> <dl> <dt> <dd> <img> <b> <u> <i> <br /> <p> <blockquote>
  • Lines and paragraphs break automatically.
  • Textual smileys will be replaced with graphical ones.

পোস্ট সাজাতে বাড়তি সুবিধাদি - ফর্মেটিং অপশন।

CAPTCHA
This question is for testing whether you are a human visitor and to prevent automated spam submissions.

বন্ধুর কথা

ভাস্কর's picture

নিজের সম্পর্কে

মনে প্রাণে আমিও হয়েছি ইকারুস, সূর্য তপ্ত দিনে গলে যায় আমার হৃদয়...