ইউজার লগইন

হেথাক তুকে মানাইছে নারে, ইক্কেবারে মানাইছে নারে...(২)

এক.
ভ্রমণকারী হিসাবে নিজেরে মাঝে মাঝে খুব বিরক্তিকর লাগে। সৌন্দর্য্য উপভোগের বিষয়টা আমার ঠিক জুইত মতোন আসে না। আমি জনপদ দেখি। সভ্যতার পরিবর্তন বুঝনের চেষ্টা করি। প্রকৃতির চাইতে আমার কাছে কৃষ্টি একটু বেশি আগ্রহের জায়গা মনে হয়। আর তাই যেনো ঘুম ভাঙতে আমি কিছু কেনাকাটা আর খাওনের নিয়তে যখন বের হইলাম, শহরের ব্যস্ততা আমারে স্পর্শ করলো। মনে হইলো এই কিছু দিন আগেইতো খাগড়াছড়ি ঘুইরা গেছি, তখন শহরটারে ঘটনাবহুল মনে হইলেও এমন ব্যস্ত লাগে নাই। তয় গুইনা দেখলাম সময়ের পার্থক্য প্রায় ৮ বছরের...আজকালকার যূগে ৮ বছরের ব্যবধানে তো এর চাইতে বেশি পরিবর্তনও হইতে পারে। এইখানে না হয় রিকসার সংখ্যা বাড়ছে ১৫০গুণ, টমটম নামের নতুন বাহন যূক্ত হইছে শহুরেপনার তালিকায়, এইটুকে আর কী আসে যায়! আমার এই ধরনের অবজারভেশনরে অনেকেই বাতুলতা মনে করে। যদিও অধিকাংশবারেই আমি দেখছি এইসবে কোনো না কোনো মর্তবা তৈরী থাকে...

তয় রিকসা বাড়নের পিছনে অন্য কোনো মর্তবা থাকলেও আমার জন্য সেইটা আনন্দেরই হয়। বয়স বাড়নের সাথে সাথে আমি স্পৃহা হারাইছি হাটাহাটির। তাই হোটেলের রুম বয় মোস্তফার সাজেস্টেড রেস্তোরাঁ সিস্টেমের দিকে যাওনের সুবিধায় রিকসাওয়ালাগো জিজ্ঞাসা শুরু করলাম। পাঁচজনরে জিজ্ঞেস করনের পর একজন মাত্র পাইলাম সিস্টেমের পথ যার চেনা আছে। পাহাড়ি মালিকানাধীন মারমা মহল্লা পানখাইয়া পাড়ার এই রেস্তোরাঁর নামটাই আমার বেশ পছন্দ হইছে। আর তার এক্সটেরিয়র ইন্টেরিয়র দেইখা রীতিমতোন প্রেমে পড়লাম। তয় খাদ্য তালিকা ট্রাডিশনাল আশা করাতে একটু হতাশ হইলাম। এই রেস্তোরাঁর মূল খানেওয়ালারা বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর হওয়াতে এর মালিক খুব একটা ট্রাডিশনাল থাকেন নাই। ভর্তা-ভাজি-মুরগী-হাসের মাংস আর সামুদ্রিক মাছ ছাড়া শুক্কুরবারে আর কিছু পাইলাম না। তয় যেই জিনিসটা পাইলাম সেইটার দাম আপাতঃভাবে ১৭টাকা মনে হইলেও আমার কাছে লাখ টাকা মনে হইলো। মানে খাওয়া দাওয়ার আগে আমি সব ভর্তা আর হাসের মাংস আনতে কইছিলাম, তো সব কিছু আনার পর বুঝলাম এই অর্ডারে আসলে দুইজন মানুষ খাইতে পারে অনায়াসে। আমি স্বাদ নিতে সবগুলি খাবারের স্বাদ নিলাম। যখন বিল দিতে গেলাম তখন ওয়েটার ছেলেটা মালিকরে বিল দিতে বললো, মালিক ১১৭টাকা বিল শুইনা বললো ১০০ টাকা দিলেই হইবো। একজনের জন্য পুরা বিলটা হয়তো তার জন্য বেশি মনে হইছে। এই মানসিকতা নিয়াও কেমনে ব্যবসা চালাইতেছে সেইটা আমি ভাবতেই পারলাম না। একান্ত পাহাড়ী জীবন যাত্রা ছাড়া আর কোনো ব্যখ্যা তৈরী করতে পারলাম না আমি।

আমি বিল মিটাইয়া মালিক স্বপনদারে জিগাইলাম পাহাড়ি খাবার কোথায় পাওয়া যাইতে পারে...তিনি খানিক্ষণ ভাবলেন তারপর কইলেন একটা মারমা হোটেল আছে পানখাইয়া পাড়াতেই। আমি এইটুক শুইনা বের হইয়া আসলাম। রাস্তায় দাঁড়াইয়া রিকসার অপেক্ষা করতেছি। এমন সময় তিনি একটা কাগজ হাতে বের হইয়া আসলেন...সম্ভবতঃ তিনি আর কারো কাছ থেইকা ঠিকানা জোগাড় কইরা আমার জন্য একটা কাগজে লেইখা নিয়া আসছেন। এই আন্তরিকতা আমাগো ব্যক্তিতান্ত্রিক বাঙালি অন্তরেতো ভাবতেই পারন যায় না!

দুই.
হোটেলে ফিরনের পর যেই কাজে আসছি তার আয়োজনে ব্যস্ত হইতে দুই/তিনটা ফোন কইরা শাওয়ারের নীচে বইসা ঘুম দিলাম ২০ মিনিটের। তারপর আবার বের হইয়া যাওনের আয়োজন। শহরের জেলা হাসপাতালের ডাক্তার সঞ্জীব ত্রিপুরা'র সাথে দেখা করতে। সঞ্জীবদার বড় ভাই প্রশান্তদা আমার বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক। তাই আগের থেইকা বলা থাকাতে তিনি হয়তো অপেক্ষায় ছিলেন, কিন্তু তিনি যে আমারে দেইখাই আন্দাজ করতে পারবেন, আমার জন্য আলাদা একটা রুমে চেয়ার টেবিল অ্যারেঞ্জ কইরা রাখবেন এতোটা আশা করি নাই।

আমরা আড্ডা শুরু করনের পর এই কথা সেই কথার মধ্য দিয়া পৌছাইলাম কতোখানে! খাগড়াছড়ির পাহাড়ি জনগোষ্ঠী যে এক অঘোষিত সামরিক শাসনের মধ্য দিয়া দিনাতিপাত করে তার স্বরূপ বর্ণনা শুইনা আমি শিহরিত হইলাম। আর কীইবা আমার করা আছে! বাঙালি হিসাবে তো আমরা এর চাইতে হাজার গুণ স্বাধীনতা নিয়া দিন কাটাই। পুলিশের অনৈতিকতারে আমার তুচ্ছ মনে হইলো তার নিজের অভিজ্ঞতার সাথে মিলাইয়া দেখতে গিয়া।

হাসপাতাল থেইকা বের হইয়া যাবো খাগড়াপুর। সঞ্জীবদা টমটম কইরা দিলেন। ড্রাইভার একজন বাঙালি। এই তথ্যটাও খুব মামুলি। কিন্তু সে যখন ঠিক করা ভাড়ার চাইতে আরো ১০ টাকা বেশি চাইলো কিছুদূর গিয়াই তখন পকেটে না লাগলেও হৃদয়ে লাগলো।

কল্লোল দা'ও দেখি আমি টমটমের থেইকা নামা মাত্র'ই হাত উঠাইয়া ইঙ্গিত দিলো। তার সাথে সুধাকরদা বইসা ছিলেন। পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি'র খাগড়াছড়ি জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদকের সাথে কথা কওনের পর আমি রীতিমতোন মুগ্ধ। তিনি নিজ উদ্যোগে আমার লেইগা কেন্দ্রীয় সভাপতির এপয়েন্টমেন্ট। পার্বত্য রাজনীতিতে তাগো প্রতিপক্ষ ইউপিডিএফ'এর নেতাগো সাথে কথা কওনের সোর্স জোগাড় কইরা দিতে অস্থির হইয়া পরলেন। রাত নয়টা পর্যন্ত তাগো লগে আলাপের পর। টমটমে কইরা রওনা দিলাম জামতলার উদ্দেশ্যে। গন্তব্য পানখাইয়া পাড়া মারমা হোটেল।

তিন.
মারমা হোটেলে ঢুইকা বসতে না বসতেই একজন আমার কাছে আইসা জিগাইলো, "কী সমস্যা?"
আমি কইলাম কোনো সমস্যা নাই, খাইতে আসছি...কি আছে। তারপর আর কোনো কথা নাই। ভাত-ঝিনুক আর শুকরের মাংস দিয়া পেট ভইরা ভাত খাইয়া হোটেলে ফিরা ঘুমানের চেষ্টা...ভেড়া গুনতে গুনতে কাজ না হওয়ায় বেড়ায় লাগানো কাঠ, তারপর আরেকটু ক্লোজ আপে সবুজ ঘাস।

এরপর দেখি আমি সেই পুরানা সাদা পাহাড়ি গাছ বাড়িটার ব্যালকনিতে বইসা হ্রদে কতোগুলি শুশুক লাফায় তার সংখ্যা গুনি...

পোস্টটি ১২ জন ব্লগার পছন্দ করেছেন

হাসান রায়হান's picture


জটিলস!!!!!

জ্যোতি's picture


কি দারুণ করে লিখলেন!

আহমেদ রাকিব's picture


হ, বেশি জোস লেখা হইছে।

রাসেল আশরাফ's picture


এক কথায় জটিলসসসসসসসসসস

মীর's picture


জট্টিলসসস্ এরও বেশি। খুব ভালো পাইলাম

মেসবাহ য়াযাদ's picture


খাগড়াছড়িতে আমার এক ছোট দিদি আছে। বেশ বিখ্যাতই বলা চলে। পাহাড়ী নারী নেত্রী গোছের কেউ। পারলে খুঁইজা লৈয়েন। হের নাম সোনালী চাকমা। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এম এ পাশ করেছে। বাংলায়। দৈবাৎ দেখা হৈলে কৈয়েন, আপনে মেসবাহ য়াযাদ নামে কাউরে চিনেন...

লেখা জোসিলা হৈছে...

ভাস্কর's picture


দেখি কাইলকা খবর লমুনে...আইজকা বহুত টায়ার্ড লাগতেছে...

নুশেরা's picture


আপ্নে তো মামা হইছেন কিছুদিন আগে, যখন সেটেলার-পাহাড়ী গণ্ডগোল চলছিলো। তার পর থেকে সোনালী বোধহয় একটু কম অ্যাকটিভ

নজরুল ইসলাম's picture


জটিলস.।

১০

তানবীরা's picture


এতো নিঁখুত বর্ননা। যেদিনকারটা সেদিনই লিখেছিলেন নাকি? দারুনতো

১১

ভাস্কর's picture


দুই পর্ব মিলাইয়া আসলে একদিনের অভিজ্ঞতা লিখছি বইলা আজকেরটা একদিন পর লেখা...

১২

salman kamal's picture


mojak pailam

১৩

ভাস্কর's picture


dhannyabaad...

১৪

ভাস্কর's picture


হাসান রায়হান, জয়িতা, রাসেল আশরাফ, মীর, নজরুল ইসলাম@ আপনাদের ধন্যবাদ...

১৫

মাহবুব সুমন's picture


ঝিনুক দিয়ে কি তরকারী খাইছিলেন বস ?

১৬

ভাস্কর's picture


আমাগো পাহাড়িরা ঝিনুক গ্রেইভি কইরা রান্না করে...বেসিকালি এইগুলিরে ঝিনুক কওয়া যায় না, শুক্তি কইলেই মানায় বেশি...রাখাইনরা খোলসটাও ছাড়াইয়া নেয়, মারমা বা ব্যোমরা খোলস শুদ্ধাই রান্ধে...

১৭

মাহবুব সুমন's picture


ঝিনুক আমার দারুন লাগে। আমি কাঁচা থেকে শুরু করে বিবিককিউ পর্যন্ত ভালো পাই। তবে দেশী স্টাইলে ঝোল করে কখনো খাওয়া হয় নাই।

১৮

সাঈদ's picture


ফাটাফাটি । ছবি দিবেন কবে ?

১৯

ভাঙ্গা পেন্সিল's picture


খানা-দানার ছবি দিয়েন একটু Laughing out loud

২০

ভাস্কর's picture


ছবিতো এখনো তেমন কিছু তুলি নাই...আর আমার আবার খাওন দাওনের ছবি তুলনের কথা মনে থাকে না। একটা ডক্যুমেন্টারী করনের চেষ্টা করতেছি...সেইটা পাহাড়ি জীবন যাত্রা আর রাজনীতির উপর...

২১

মুকুল's picture


Love

২২

শওকত মাসুম's picture


বাহহ। দারুণ।

২৩

শাওন৩৫০৪'s picture


হ, এইরামভাবে দেখার জন্য ট্যুরে যাইতে মন্চায়, কিন্তু সঙ্গীর সাথে মিলেনা---
আপনে বস মানুষ-----

২৪

ভাস্কর's picture


চলেন একলগে পুরা আমরা বন্ধু মিল্লা এইরম একটা ট্যুর দেই...

@মাসুম ভাই, ধন্যবাদ। আপনেগো উৎসাহ না পাইলে তো ব্লগ লেখন ছাইড়া দিতাম।

২৫

নুশেরা's picture


কী দারুণ লেখা!
ডকু বানাচ্ছেন? এই বিষয়ে একটা দেখে আসছিলাম মেলবোর্নে, ইমন নামের একজনের বানানো

২৬

নীড় সন্ধানী's picture


বাহ্। চমৎকৃত হলাম। গোগ্রাসে গিললাম পুরোটা।

১১৭ টাকার বিল ১০০ টাকা নিল, আমিও ভাবছি এরকম করে ব্যাবসা করে কি করে ওরা?

পাহাড়ে যাইনা বহুদিন। আপনার লেখা পাহাড়ে টানছে আবার।

২৭

আসিফ's picture


দারুন।

২৮

মুক্ত বয়ান's picture


সেইরকম লেখা।
আবার ভ্রমণ কাহিনীর প্রেমে পরে যাচ্ছি।

২৯

লীনা দিলরুবা's picture


অসাধারণ!

৩০

তানবীরা's picture


শামুক আর ঝিনুকের ফ্রেঞ্চ / স্প্যানিশ প্রিপারেশন খুব ভালো হয়। ফ্রেঞ্চে শামুকগুলোকে ওয়াইন দিয়ে সিদ্ধ করে একটা ডিশ করে "এসকার্গো" খুব দারুন হয় খেতে। আর ঝিনুকের মাংসগুলো বের করে ক্রীম দিয়ে রান্না করে সুপার্ব। বিদেশ এসে শামুক - ঝিনুক খাওয়া শিখলাম Puzzled

৩১

হাসান রায়হান's picture


ওয়াইন দিয়া সিদ্ধ করা এসকার্গো নিয় আইসেন। Party

৩২

শাপলা's picture


যুকত অকখর লিখতে না পেরে, মন খুলে কিছু লিখতে পারছি না।
এটা আমার ল্যাপটপের সমস্যা।
অনেক কিছু মনে পড়ে গেল, কিছুই লিখতে পারলাম না।

মন্তব্য করুন

(আপনার প্রদান কৃত তথ্য কখনোই প্রকাশ করা হবেনা অথবা অন্য কোন মাধ্যমে শেয়ার করা হবেনা।)
ইমোটিকন
:):D:bigsmile:;):p:O:|:(:~:((8):steve:J):glasses::party::love:
  • Web page addresses and e-mail addresses turn into links automatically.
  • Allowed HTML tags: <a> <em> <strong> <cite> <code> <ul> <ol> <li> <dl> <dt> <dd> <img> <b> <u> <i> <br /> <p> <blockquote>
  • Lines and paragraphs break automatically.
  • Textual smileys will be replaced with graphical ones.

পোস্ট সাজাতে বাড়তি সুবিধাদি - ফর্মেটিং অপশন।

CAPTCHA
This question is for testing whether you are a human visitor and to prevent automated spam submissions.

বন্ধুর কথা

ভাস্কর's picture

নিজের সম্পর্কে

মনে প্রাণে আমিও হয়েছি ইকারুস, সূর্য তপ্ত দিনে গলে যায় আমার হৃদয়...