ইউজার লগইন

হেথাক তুকে মানাইছে নারে, ইক্কেবারে মানাইছে নারে...(৪)

এক.
সকালে দেখা করতে যাওনের কথা সদর উপজেলার বাঙালি চেয়ারম্যানের সাথে। আমি ঠিক ১০টায় পৌছাইয়া ফোন দিলাম। প্রথমে তিনি ফোন ধরলেন না। মিনিট পাঁচেক পর কল ব্যাক করলেন। তার উপজেলা কমপ্লেক্সে পৌছাইতে আরো আধঘন্টা লাগবো। আমি পরলাম বিপাকে। অন্য যেকোনো থানা সদরের মতোই এই অফিসও শহরের খানিকটা বাইরে। চারদিকে অফিস ছাড়া আর কিছু দেখার মতো নাই। আবার এই অফিসের সামনে দাঁড়াইয়া থাকনটাও অস্বস্তির প্রতি দুই মিনিটে একবার জবাবদিহি করতে হয় কার কাছে আসছি, কোত্থেইকা আসছি। বাংলা উচ্চারণ শুইনা আবার জেরা ঢাকার কোন এলাকায় থাকি...তাই নীচে নাইমা আইসা ঢুকলাম একটা ক্যান্টিন মতোন এলাকায়। যেইখানে কেক-বিস্কুট-চা ঝাড়া আর কিছু খাওনের নাই।

একটা টেবিল দখল কইরা বসলাম। খানিক্ষণ পরেই একজন বাঙালি আর একজন পাহাড়ি তরুণ বেশ বন্ধুত্বপূর্ণ কথোপকথনের উত্তেজনায় আমারে খেয়াল না কইরাই আমার দখলীসত্ত্বে হানা দিলো। তাদের বন্ধুত্ব দেইখা আমি রীতিমতোন কনফিউজ্ড। এমন সম্প্রীতির নমূনা দেখবার প্রত্যাশা আমার কখনোই ছিলো না। পাহাড়িজন উইঠা যাওনের সময়, আবার দেখা হবে টাইপ বচন দিয়া বুকে বুক মিলাইলো বন্ধুর সাথে। এই কারনে আমি আগ্রহ নিয়া বাঙালি ছেলেটার সাথে বাক্যালাপ শুরু করলাম। সেলিমের বাবা কার্পেন্টার। সে এইবার এইচএসসি পরীক্ষায় খারাপ করছে। মানে ফেল করছে। আর তার পাহাড়ি বন্ধু পাইছে ৪.৫। তাই দীর্ঘমেয়াদী বিচ্ছেদই আসলে ঘটতেছে তাদের। তবে আমার সাথে কথার পিঠে কথা চড়াইতে গিয়া যখন ঈর্ষার ছোঁয়াচ পাইলাম তখন আমার সকল সংশয় কাইটা গেলো নিমেষেই। সেলিমের জন্ম এই শহরে। এই মাঠে ফুটবল খেলতে খেলতেই তার বড় হওয়া। কিন্তু তার কথার পরতে পরতে পাহাড়ি বিদ্বেষ ফুইটা উঠলো। পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর সাথে আগে কথা কইছি। তারা তাগো সুনির্দিষ্ট বক্তব্য জানাইয়া দিছে। বাঙালিগো সাথে কোনো বিদ্বেষ তাগো নাই। যেই বাঙালিরা ভাগ্যান্বেষণে এই এলাকায় আইসা নিজেগো বসতি গইড়া তুলছে, যারা পেশাজীবী হিসাবে এই এলাকায় আসছে তাগো নিয়া তারা কখনো বিচলিত নয়। তাগো সম্পূর্ণ প্রতিবাদ প্রতিরোধ হইলো সেটল করানোর নামে পলিটিক্যাল মাইগ্র্যান্টগো নিয়া। যারা মাথাপিছু ৮৪ কেজি চাইল পায় রেশন কার্ডের বিপরীতে। যারা কোনো কাজ না কইরাই জায়গা দখল কইরা দোতলা বাড়ির ভিত গাঁথে। এই সেটেলারগো নিয়াই তাগো বিরোধ ছিলো সবসময়। যেই কারনে সুধাকরদা আমারে নিজের গরজেই তার বন্ধু শানে আলমের সাথে আলোচনা করাইয়া দিতে আগ্রহী হইয়া উঠেন। অন্যদিকে সেলিমের মতোন ছেলেরা বড় হইতেছে পাহাড়িগো শত্রু ভাবতে ভাবতেই। তারা সরল বুদ্ধির পাহাড়িগো পড়ালেখায় ভালো করতে দেইখা ঈর্ষান্বিত হয়, তারা পাহাড়িরা কোনো বড় পদে আসীন হইলে ঈর্ষান্বিত হয়। তাদের ধারণা পাহাড়িরা অনেক অস্ত্র ব্যবহার করে, আর বাঙালিরা দূর্বল। আবার যখন ২৩ ফেব্রুয়ারির বাঙালি বীরত্ব শুনায় তখন তার চেহারা বাঙালি গরীমায় উদ্ভাসিত হয়। অস্ত্রহীন বাঙালিরা যে পাহাড়ি ঘরবাড়ি পোড়ানোয় এইবার অনেক আগাইয়া ছিলো এইটা শোনানোর সময় সে গলা নীচু করে, কিন্তু আসলে গুরুত্বটা একজন বাঙালি হিসাবে আমার সাথে শেয়ার করে। নিতান্তই তার পরীক্ষা ছিলো বইলা ঐ ঘরে আগুন দেওনটা মিস করছে, নাইলে তার হাতেও লাগতো রক্তের দাঁগ। অন্তরেতো সেইটা নিয়াই ঘোরাফেরা তবু...

সেলিমরে আমি বুঝাইতে চেষ্টা করি পাহাড়িগো অধিকার...সে হাসে। সেলিমরে আমি বুঝাইতে চেষ্টা করি একজন রাজনৈতিক অভিবাসীর সাথে তার পার্থক্য...সে তাচ্ছিল্য কইরা হয়তো আমার কথায় কর্ণপাতই করে না। এমন সময় আমারে বাস্তবতায় ফিরাইয়া আনেন শানে আলম সাহেব। তিনি পৌনে এগারটায় আইসা পৌছাইছেন শেষ পর্যন্ত।

দুই.
শানে আলম সাহেবের চেহারা নিয়া আমার একটা অনুমান ছিলো, সেইটা একদম হুবহু মিলা যাওয়াতে মন ভালো হইয়া গেলো। টিপিক্যাল উপজেলা চেয়ারম্যান টাইপ চেহারা। তবে কথা কইতে গিয়া বুঝলাম একজন নির্দলীয় লোক এইরম একটা পদে নির্বাচিত হওয়ার পেছনে যার প্রয়োজন সবচাইতে বেশি...সেইটা তার ভালোই আছে। ভদ্রলোক মেধাবী তবে নিজের দায়িত্বরে বেশ আবেগ দিয়া দেখেন। শুরুতেই তাই আমারে সতর্ক কইরা দিলেন। যাতে আমি তারে কোথাও আংশিকভাবে উল্লেখ না করি। কয়দিন আগে প্রথম আলো পত্রিকায় তার একটা বক্তব্য আংশিক ভাবে উল্লেখ করাতে তারে ব্রিগেড থেইকা ফোন পাইতে হইছে। আমি তারে নির্ভয় দিলাম তার বক্তব্য কোন পত্রিকায় প্রকাশিত হইবো না। তবে ঐ ফোন যে তারে খানিকটা কৌশলী কইরা দিছে সেইটা বুঝতে পারলাম প্রত্যেকটা উচ্চারণে। সেটেলারদের বিরুদ্ধে তার তেমন কোনো ক্ষোভ নাই। তিনি তাদের যথাযথ পূণর্বাসন চান, এই কথাই আমারে বুঝাইলেন বহুক্ষণ ধইরা। পাহাড়িগো সেনসেটিভিটিটাও একটু বাড়াবাড়ি এইরম কইতেও চেষ্টা করলেন বেশ খানিক্ষণ। পাহাড়ে সেনাবাহিনীর অবস্থানরেও জায়েজ করলেন তিনি।

কিন্তু আমার কোনো কথায় হঠাৎ তিনি যেনো কি খুঁইজা পাইলেন...তার যেনো মুখ ছুটলো। সেটেলাররা যে এই অঞ্চলের তৃতীয় কোনো শক্তি দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয় সেই কথা বললেন। পাহাড়ের মানুষেরা কতোটা সরল আর আবেগী সেই সত্য জানাইলেন...আর সেনাবাহিনী সর্ম্পকে তিনি কোনো কথা কইতে চান না বইলা বুঝাইয়া দিলেন এই বিশেষ শ্রেণীরে তিনি খুব একটা পছন্দ করেন না। উইঠা আসার সময় আমারে বারবার কইলেন প্রসিত বিকাশ তার ক্লাসমেইট ছিলো...তারা একসাথেই বড় হইছেন। আমি বুঝি রাজনৈতিক অনুপ্রবেশের সময় কালে জন্ম নেয়া সেলিম আর তার পার্থক্য এইখানেই বড় হইয়া উঠে।

তিন.
আমার সত্যি মন খারাপ লাগতে শুরু করলো। এইবারের মতোন কাজ প্রায় শেষ। হয়তো আজকেই চইলা যাইতে পারতাম ঢাকায়। কিন্তু অনিচ্ছাটারে গুরুত্ব দিয়া সময়টা দিয়া দিলাম চুয়ানিরে। মারমা পাড়ায় গিয়া চাইল্বা ম্রাইমার সাথে বইসা গল্প করতে করতে বিকাল। তারপর হোটেল রুমে ফিরা জগৎ-জীবন-সংসার নিয়া টেনশন করতে করতে চুয়ানির প্রতি ভালোবাসা। পাহাড় আর চুয়ানি আমার একাকীত্বের বেলায় এসে একইরকম স্থবির হয়ে যায়। তাদের আড়ালে আমি সুখেই থাকি...রাত...রাত গড়িয়ে ভোর।

পোস্টটি ৭ জন ব্লগার পছন্দ করেছেন

রাসেল আশরাফ's picture


আগের গুলার মতো এটাও জোস!!!!!!!!!

ভাস্করদা ছবি কই?????

ভাস্কর's picture


ছবি এইবার আসলেও বেশি তুলি নাই। তয় ৩/৪টা যা তুলছি ঐগুলি ফ্লিকারে আপলোড করবো হয়তো শিগগিরি...

আশফাকুর র's picture


অদ্ভুত সুন্দর -

শাওন৩৫০৪'s picture


ওহ, এইটা অনেক বেশি ভালো....
সেলিমের কথাটা পৈড়া দ্বিধান্বিত বোধ হৈলো, একবার মনে হৈলো, পাহাড়ী সমস্যাটা মনে হয় চাইলেই সমাধান সম্ভব, কোনো কারনে কেউ জি্যাইয়া রাখতাছে, আজব!!!

ভাস্কর's picture


আমার নিজের মনে হইছে পুরা বিষয়টাই জিয়াইয়া রাখা হইছে যূগ যূগ ধইরা। এবং পুরা বিষয়টাই রাষ্ট্র আর তার ইন্টেলিজেন্স মিলা ডিজাইন করে। এইখানে আরো অনেক বিষয় আছে যেইগুলি ব্লগের মতোন জায়গায় বলা যায় না।

আন্তর্জাতিক রাজনীতির ঘুটি হইতে হয় সীমান্তবর্তী মানুষরে...

trrooo's picture


vashkar - fantastic series! pahar aar pahari manushgulor jonnyo ojosro valobasha

তানবীরা's picture


অপূর্ব ভাস্করদা অপূর্ব

হাসান রায়হান's picture


আমিও তানবীরার কথাটা রিপীট করি অপূর্ব ভাস্করদা অপূর্ব
আপনার এইসব ভ্রমন কাহিনীতে মানুষের মনের ভাবনার বিশ্লেষণ আপনের লেখায় এত চমৎকার ভাবে ফুটে উঠে যেইটারে বলা যার য়ু ক্যান্ট আসক বেটার দেন দিস।

আসিফ's picture


যথারীতি দারুন।
ছবিগুলো দেখার অপেক্ষায় রইলাম।

১০

মুক্ত বয়ান's picture


তরুণ প্রজন্ম আসলে বড় হয় তাদের পরিবারকেন্দ্রিক। সেখানে যেমন ভাব-ধারা সেটাই সে অনুকরণ করে। একটা পর্যায়ে এসে যখন তার বিকাশ ঘটে তখন তার চিন্তায় পরিবর্তন আসে। কিন্তু, সেলিমকে আপনি যেভাবে বুঝিয়েছেন, সেভাবে তার বাসায় আলোচনা হয়নাই, তাই তার চিন্তা পাহাড়ি বিদ্বেষী। এজন্যে আমি সেলিমকে দোষ দেই না, বরং তার পরিবার অনেক বেশি দোষী।
আর, লেখা যথারীতি চমৎকার। Smile

১১

আসিফ's picture


একটু দ্বিমত আপনার সঙ্গে।

একজন তরুণের মানস গঠনে পরিবারের পাশাপাশি পাড়া-বিদ্যালয়-বন্ধুমহল সবকিছুরই অবদান আছে।শুধু পরিবার হলে পীর বংশের ছেলেরা কমিউনিস্ট হতো না। কিংবা বলা যায় কেউই বোধ হয় মাদকাসক্ত হতো না। কোন পরিবারই আর যাই হোক মাদক গ্রহণকে উৎসাহিত করে না।

সেলিম আশপাশে সবাইকে দেখেছে পাহাড়ীদের শত্রু ভাবছে। আর পাহাড়ীর ছেলে ভেবেছে - নিজেদের ভাগ্য পরিবর্তনের জন্য প্রয়োজন শিক্ষা। ফলাফল সরলরৈখিক। সেলিম পেয়েছে ঈর্ষাসুলভ মন, পাহাড়ীর পেয়েছে পরীক্ষায় ভালো ফলাফল।

১২

আসিফ's picture


পাহাড়ীর = পাহাড়ীর ছেলে

দুঃখিত।

১৩

আশফাকুর র's picture


এক মত

১৪

মীর's picture


হাসান রায়হান ভাইয়ের সঙ্গে মিলিয়ে বলছি, আপনার লেখাগুলো এত ভালো হচ্ছে যে, য়্যু ক্যান্ট আস্ক বেটার দেন দিস।

১৫

ভাঙ্গা পেন্সিল's picture


পাহাড়ে গেছলাম আমিও। রাঙ্গামাটি। ঐখানের স্থানীয় এক ছাত্র ছিল গাইডের মতো। তার মুখেও পাহাড়িবিদ্বেষ ছিল। মারামারি-বন্দুকবাজিতে পাহাড়িদের নৈপুণ্যর কথা রসায়া বলার পর বলতো, আর্মি কেমন করে প্যাদানি দেয়, কেমন করে সাদা পোষাকে গিয়ে তুলে আনে।

১৬

একলব্যের পুনর্জন্ম's picture


অসাধারণ লেখা ভাস্করদা !!

১৭

জ্যোতি's picture


ভাস্করদার ভ্রমণকাহিনীগুলা পড়তে আসাধারণ লাগছে।

১৮

শাপলা's picture


আপনার লেখাটা আমি উলটো থেকে শুরু করেছি। লেখাটার পরিবতি জানি। তারপরও কেমন চোখে পানি চলে আসছে। মনটা দি্যে সত্যটা লিখেছেন আপনি, কি বলবো......!

মন্তব্য করুন

(আপনার প্রদান কৃত তথ্য কখনোই প্রকাশ করা হবেনা অথবা অন্য কোন মাধ্যমে শেয়ার করা হবেনা।)
ইমোটিকন
:):D:bigsmile:;):p:O:|:(:~:((8):steve:J):glasses::party::love:
  • Web page addresses and e-mail addresses turn into links automatically.
  • Allowed HTML tags: <a> <em> <strong> <cite> <code> <ul> <ol> <li> <dl> <dt> <dd> <img> <b> <u> <i> <br /> <p> <blockquote>
  • Lines and paragraphs break automatically.
  • Textual smileys will be replaced with graphical ones.

পোস্ট সাজাতে বাড়তি সুবিধাদি - ফর্মেটিং অপশন।

CAPTCHA
This question is for testing whether you are a human visitor and to prevent automated spam submissions.

বন্ধুর কথা

ভাস্কর's picture

নিজের সম্পর্কে

মনে প্রাণে আমিও হয়েছি ইকারুস, সূর্য তপ্ত দিনে গলে যায় আমার হৃদয়...