ইউজার লগইন

স্বীকারোক্তি...

বয়স অনেক হইলো। যতোই চল্লিশের দুয়ারে গিয়া পৌছাইতেছি, ততোই মনে হইতেছে কি জানি হারাইতেছি। সেই শৈশব থেইকাই এই হারানোর ভয় আমার পিছে লাইগা আছে। বাপের বাড়িতে একটা সুন্দর উঠান ছিলো। কিছুদিনের মধ্যেই সেই উঠানের উপর বাপে একটা বিশাল বাড়ি তুইলা ফেললো। যেই অসমাপ্ত বাড়ির তিনতলার কনস্ট্রাকশনের ফাঁকে ফাকে আমার সমব্রানিয়ার শত্রু-মিত্ররা স্থির দাঁড়াইয়া থাকতো। আমার সেই সমব্রানিয়া হঠাৎ একদিন লোপাট হইলো বাপের দেউলিয়া হওনের দায় মিটাইতে। বেতন দেওনের সামর্থ্য নাই হইয়া যাওয়াতে সরকারী বাংলা মিডিয়াম ইশকুলে ভর্তির তোড়জোর শুরু হইলো। আমি বুঝলাম আমার সব বন্ধুগো হারাইতে যাইতেছি...

এমন সবকিছু হারানের শৈশব অভিজ্ঞতায় আমি কৈশোরে অনেক আকড়াইয়া থাকনের মানসিকতা আত্মস্থ করতে শুরু করলাম। আমার যতোটুকু ততোটুকু একেবারে নিজের কইরা রাখনের অদম্য বাসনা নিয়া চলতাম। নিজের বই-খাতা-ডাইরী-খেলনা-অস্তিত্ব-জগৎ সবকিছু। জানি না আমার এখনকার যেই অহমের ভাবনা সেইসব কি ঐ সময়ের বাই প্রোডাক্ট কীনা! জীবনের শুরুতে আপাতঃ একরকমের লাক্সারী থেইকা পতনের বা হারানের এই ধারাবাহিক কার্ভের চক্করে পইড়া নিজের ভেতরের আমিটারে রক্ষার সচেতন-অচেতন চর্চায় ঢুকছি অনেক বেশি। আর এই আমি'রে রক্ষার প্রবণতা এক্সপান্ডেড হইছে অন্যের জিনিষে হাত না দেয়ার অভ্যাসে। ছোটবেলায় ছবি তোলার খায়েশ তৈরী হইছিলো। কিন্তু বাড়ির একমাত্র খেলনা ইয়াশিকাটা নষ্ট হওনের পর দীর্ঘদিন আমি আর ছবি তুলি নাই। অন্য কারো ক্যামেরা দেখলে হাত নিশপিশ করতো কিন্তু সাহস কইরা সেইটা ধরতে পারি নাই...যদি সেইটা নষ্ট হয় আমার হাতে!? তাইলে তো আমার যতোটুকু আছে এই সম্পত্তিও নাই হইয়া যাইবো।

তয় আর সবকিছুর বিনিময়ে আমি খালি একটা জিনিষ রাখতে চাইতাম আমার কৌশোরোত্তীর্ণ কাল পর্যন্ত। আমার মা। তিনি আমারে শৈশবের আধুনিকতায়ই শিখাইছিলেন, মানুষের হারাইয়া ফেলা সব জিনিষ আবার ফিরা পাওন যায়...কেবল স্বপ্ন বাদে। তিনি আমারে স্বপ্নের জগৎ ধইরা রাখনের শপথবাক্য শিখাইছিলেন। আমার মা কখনোই আমারে ইঞ্জিনিয়ার-ডাক্তার হওনের স্বপ্ন দেখতে শিখান নাই। তিনি চাইতেন আমি আমার নিজের স্বপ্নে থাকি। স্বাধীনতার স্বপ্নেই বেড়ে উঠুক আমার জীবন।

সময় যায়...আমি বড় হই। আর বড় হওয়ার মধ্য দিয়া আমি মায়ের যেই মাতৃত্বরে ভালোবাসছি, তার এলাকা আরো বড় হয়। বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে আমি সমাজ পরিবর্তনের মন্ত্র শিখি। সেই প্রথম আমি নিজের আমিত্বের যেই নেতিবাচকতা সেইটারে বুঝতে শিখি। মা হয়তো তার পূত্র সন্তানের অস্তিত্ব নিয়া কনসার্ন্ড ছিলেন, যেই কারনে তার ইন্ডিভিজ্যুয়ালিস্ট অ্যাপ্রোচটারে বাড়তে দিছেন। কিন্তু তাতে সমাজের প্রতিকূলতারে টপকাইয়া বহুদূর পথ যাওনের সম্ভাবনা তৈরী হইলেও মানসিক তৃপ্তির হাইয়েস্ট ফর্মতো আর তা না! যদিও আমার দৃঢ় কঠিন মা ছাত্র রাজনীতির কঠিন পারিপার্শ্বিকে প্রবেশের সিদ্ধান্তটারেও কখনো নাকচ করেন নাই। এর আগে এরশাদ বিরোধী আন্দোলনের সময় যখন আমি কার্ফ্যু ভাইঙ্গা মিছিলে সামিল হওয়ার জন্য বাসার থেইকা বের হইছি, তিনি আমার পথরোধ করেন নাই।

ছাত্র রাজনীতিতে সক্রিয় হওয়ার পর আন্দোলন সংগ্রামের মধ্য দিয়া আমার চিন্তা পদ্ধতির অনেকখানি নতুনভাবে, নতুন কাঠামোয় রূপান্তরিত হইছে। মানবজাতির ইতিহাস যে সংগ্রামের ইতিহাস সেই শিক্ষা পাইছি আমি ছাত্র রাজনীতি করতে গিয়া। যেকোনো ধরনের অন্যায়-অবিচারের প্রতিবাদ হওনটা জরুরী, এই মূল্যবোধের শিক্ষাও তৈরী হইছে রাজনৈতিক চর্চার মধ্য দিয়াই। তয় সেই যে নিজের সম্পদ আকড়াইয়া ধইরা রাখনের মানসিকতা সেইটারে ঝাটাইয়া বিদায় করতে পারি নাই বইলা রাজনৈতিক সংগ্রামের পথযাত্রায় আমি সক্রিয় থাকতে পারি নাই (তার দায় আজ আর অন্য কারো ঘাড়ে না চাপাই)। তবে তার শিক্ষা আমার মননের প্রায় পুরাটা জুইড়াই এখনো অবস্থান করে। আমি নীরবে অকর্মক হইয়াই স্বপ্ন দেখি একদিন পরিবর্তীত সমাজে পরবর্তী প্রজন্ম দৃপ্ত চলাফেরা করতেছে...

ইদানিং এই আমি আমি চরিত্রটারে একটু দূরে রাখনের চেষ্টা চালাই তাই এই লেখাটারে বেশিদূর নেওনের আগ্রহ পাইতেছিনা। শেষবেলায় স্বীকার করি, হারাইয়া ফেলার ভয়ে কাউরে ভালোবাসার কথা কইতেই সাহস পাই নাই আগে...তারপর যখন ভালোবাসার অর্জন ঘটছে, তখনো আমার হারাইয়া ফেলার ভয়টারে সামাল দিতে পারি নাই...এখনো সেই হারাইয়া ফেলার ভয় আমারে যন্ত্রণায় ফেলে প্রায়শঃই। চল্লিশের প্রায় প্রান্তে দাঁড়াইয়া আমি আবারো হারানোর ভয়ে থাকি, আমার স্বপ্ন-জীবন-জগৎ...

পোস্টটি ১৬ জন ব্লগার পছন্দ করেছেন

মীর's picture


স্বীকারোক্তি পড়ে মনে হলো এই ভয়টা তো আমারও আছে। হারিয়ে ফেলার ভয়ে আমিও তো কতকিছুই কাউকে জানাই না। শুধু চুপ-চাপ অপেক্ষা করতে থাকি। একসময় ওটা যে আমার তা এমনভাবে প্রতিষ্ঠা পাবে যে হারিয়ে গেলে সবাই সেটা আমার জন্যই খুজে আনার চেষ্টা করবে। যদি খুঁজে না-ও পায়, অন্তত আমার হারানোর ব্যথাকাতর সময়ে পাশে এসে দাঁড়াবে। সকালে প্রথম এই লেখাটাই পড়লাম। খুব ভালো লাগলো এটা কি আলাদা করে বলে দিতে হবে?

লীনা দিলরুবা's picture


তিনি আমারে স্বপ্নের জগৎ ধইরা রাখনের শপথবাক্য শিখাইছিলেন। আমার মা কখনোই আমারে ইঞ্জিনিয়ার-ডাক্তার হওনের স্বপ্ন দেখতে শিখান নাই। তিনি চাইতেন আমি আমার নিজের স্বপ্নে থাকি। স্বাধীনতার স্বপ্নেই বেড়ে উঠুক আমার জীবন।

-মুগ্ধ হলাম। আপনার মা'কে শ্রদ্ধা আর শুভেচ্ছা জানাই।

সাঈদ's picture


স্মৃতি হাতড়ে দেখলাম , এরকম স্বীকারোক্তি করার মত কোন সম্পদ আমার নাই।

জন্মদিনের শুভেচ্ছা।

রায়েহাত শুভ's picture


হুমমম...

নুরুজ্জামান মানিক's picture


জন্মদিনের শুভেচ্ছা।

মীর's picture


অ্যাঁ ভাস্করদা'র জন্মদিন না কি। খালিহাতে সুখবর??

যাই হোক প্রচ্চুর শুভেচ্ছা। কেক-কুক খাইতাম্চাই।

Party Party Party Party Party

অনেক শুভকামনা রইলো।

জ্যোতি's picture


জন্মদিনের শুভেচ্ছা ভাস্করদা।অনেক শুভকামনা রইলো।

সাহাদাত উদরাজী's picture


শুভ কামনা।

নীড় _হারা_পাখি's picture


জন্মদিনের শুভেচ্ছ...আর শুভ কামনা। ভাল থাকুন...

১০

শাওন৩৫০৪'s picture


হ্যাপ্পী বাড্ডে দাদা, জীবন যেমন উপোভোগ করতাছেন, করতে থাকেন, আরো অনেক আনন্দে থাকেন, সেই শুভ কামনা----

১১

ভাস্কর's picture


সবাইরে ধন্যবাদ...

১২

শওকত মাসুম's picture


লেখাটা পইড়া মুগ্ধ হইলাম।

১৩

আহমেদ রাকিব's picture


অসাধারন লাগলো লেখাটা। জন্মদিনের শুভেচ্ছা ভাস্কর দা।

১৪

নুশেরা's picture


সিম্পলি গ্রেট!

শুভ জন্মদিন ভাস্করদা।

১৫

মেসবাহ য়াযাদ's picture


প্রাণটা ভরে গেল। থ্যাংস বস ।

১৬

বকলম's picture


ভাস্করদা'রে জন্মদিনের শুভেচ্ছা। ছবিতে দেইখা মনে করতাম হয়তো নিজের সমবয়সীই হইব, বাট কিন্তু জন্মদিনে বয়স রহস্যটা প্রকাশ হইয়া গেল Tongue । যাই হোক ভাস্কর'দারে দেখতে কিন্তু অনেক ইয়ং লাগে। প্রেম করনের সুযোগ আসলে হেলায় হারানো উচিৎ হইবে না। Laughing out loud

১৭

বোহেমিয়ান's picture


জোশিলা! জোশ একটা লেখা

১৮

তানবীরা's picture


হারিয়ে ফেলার আগে পযর্ন্ত ভয় লাগে। জীবনের নিয়মেই অনেক কিছু স্বাভাবিকভাবে হারিয়ে যায়। কিংবা এক সময় হারানোটা স্বাভাবিক মনে হতে থাকে। একবার হারিয়ে গেলে ভয়মুক্ত হয়ে যাবেন যখন হারাবার আর কিছু থাকবে না Wink
সে সুখটাই কি কম ? Tongue

শুভ জন্মদিন আপনাকে Party

মন্তব্য করুন

(আপনার প্রদান কৃত তথ্য কখনোই প্রকাশ করা হবেনা অথবা অন্য কোন মাধ্যমে শেয়ার করা হবেনা।)
ইমোটিকন
:):D:bigsmile:;):p:O:|:(:~:((8):steve:J):glasses::party::love:
  • Web page addresses and e-mail addresses turn into links automatically.
  • Allowed HTML tags: <a> <em> <strong> <cite> <code> <ul> <ol> <li> <dl> <dt> <dd> <img> <b> <u> <i> <br /> <p> <blockquote>
  • Lines and paragraphs break automatically.
  • Textual smileys will be replaced with graphical ones.

পোস্ট সাজাতে বাড়তি সুবিধাদি - ফর্মেটিং অপশন।

CAPTCHA
This question is for testing whether you are a human visitor and to prevent automated spam submissions.

বন্ধুর কথা

ভাস্কর's picture

নিজের সম্পর্কে

মনে প্রাণে আমিও হয়েছি ইকারুস, সূর্য তপ্ত দিনে গলে যায় আমার হৃদয়...