আত্মহত্যা বিষয়ে যে সকল কথা আমার জানা ছিলো (দুই)
সাত্তার সাবে'র অপেক্ষায় সেইদিন পুরা মহল্লাবাসীরে অনেক উদ্বিগ্ন চেহারায় দেখি। এই উদ্বেগে সাত্তার সাবে'র তরুণী ভার্যার প্রতি আবেগের চাইতে আত্মহত্যা বিষয়ক রোমাঞ্চ - আর তৎসম্পর্কীত লুকোছাপার অর্থাৎ নিষিদ্ধ আচরনের প্রতি না জানা আগ্রহের বিচরণ বেশি ছিলো। মহল্লাবাসীগো আচরনে আমি সংশয়ী হইয়া পড়ি, মহাপাপ আসলে জাগতিক দুনিয়ার অভ্যস্ততায় এমন কনফ্লিকটিং কেনো হয়? সাত্তার সাবে'র অবহেলা, স্ত্রী'র প্রতি তার দায়িত্ব কর্তব্য, সামাজিকতার অভাব আত্মহত্যার চাইতে কম অপরাধ হিসাবে গণ্য করেন তারা। নবম শ্রেণী পড়ুয়া আমার কাছেও সাত্তার সাব সেইদিন একজন সমাজবিরোধী মানুষ হিসাবেই গণ্য ছিলেন বইলা মনে পড়ে।
বাপের ভয়ে লুকাইয়া আবুর বাড়িতে গিয়া ঘন্টা দুয়েক আট আনা বোর্ডে তিন তাস পিটাইয়া, পচিশ টাকা লাভ কইরা বাড়ি ফেরার পথে আবারো ঘটনাস্থলে উকি মারতে গিয়া দেখি সবকিছু ঠিকঠাক। সুনসান নীরবতা চারদিকে। কেউ দেখলে ভাবতেই পারবো না এইখানে কিছুক্ষণ আগে কিরম কোলাহল ছিলো, টেনশন ছিলো...আজকে চল্লিশের দ্বারপ্রান্তে দাঁড়াইয়া আশির দশকের মানুষের পরিবর্তনকামী চেতনাটা ভালোই ধরতে পারি। ঐ সময়টাতেই ঢাকা শহরের মধ্যবিত্ত মানুষেরা মহল্লা-পাড়া-এলাকা এমন বিষয়গুলিতে আগ্রহ হারাইতে শুরু করছিলো। হারাইয়া ফেলার চেষ্টায় রত ছিলো আসলে। আজকের দিনে যখন ঐ দিনের কথা ভাবতে চেষ্টা করি, তখন মনে হয় সাত্তার সাহেবরা আসলে এমন পরিবর্তনে উস্কানি পাইছেন, আর তার নাম না জানা স্ত্রী পাইছেন আত্মহত্যার রাস্তা। আর একই কারনে হয়তো আমি-আপনি বা আরো অনেকেই আত্মহননের পথ খুঁইজা বেড়াই।
সাত্তার সাহেব ফিরা আসছিলেন আমরা ঐ জায়গা থেইকা বের হইয়া যাওয়ার কিছুক্ষণ পরেই, যদ্দূর মনে করতে পারি তিনি আইসাই পুরা ক্রাইসিসটা সামলাইয়া ফেলেন। ঘরের বিভিন্ন আনাচ কানাচ থেইকা বউয়ের অবৈধ প্রেমের নমূনা তিনি বের করছিলেন বইলা আমরা শুনতে পাই। যেই পুরুষ আর নারী উভয়েই আমাগো কাছে অপরিচিত ছিলো, যাগো চেহারা মনে করতে পারে নাই মহল্লার আশিভাগ অধিবাসী, সেই মানুষগুলির গোপনীয়তার অন্তরালে কতোকিছু লুকানো ছিলো! আমার এই গোপনীয়তারে অনেক রহস্যময় লাগে। এমনকি আত্মহত্যার চিন্তা বা সিদ্ধান্তের চাইতেও। সাত্তার সাহেব রাত কইরা বাড়ি ফিরতেন ঢুলতে ঢুলতে চৌকিদার চাচা যতোই বলুক...মধ্যবিত্ত তার স্বশ্রেণীর বিবরনেই আস্থা রাখবো এইটাই যেনো স্বাভাবিক ছিলো। একমাসের মাথায় যেই লোক বাকীর খাতা খুলনের প্রতি আগ্রহী হয় তার পরিবারের অনিশ্চয়তা অনেক গৌণ হইয়া পড়ে, কারণ সাত্তার সাহেবের আত্মীয় স্বজনের তালিকায় পুলিশের বড় কর্তা আছেন বইলা জানতে পারে সকলেই। তিনি পুলিশের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তার সাথে মিনিট পনর কথা কওনের পরেই নাকি পুলিশ জায়গায় বইসা একটা অপমৃত্যুর মামলা লেইখা, আর ঘটনাস্থল ত্যাগ করে, যেইটা সেই আমলেও অবিশ্বাস্য ছিলো।
যদিও সাত্তার সাবরে বাড়ি ছাইড়া দেওনের অনুরোধ জানাইতেই তার রাজী হইয়া যাওয়াটা টুটুল ভাই ছাড়া কাউরে বিস্মিত করে না। তবু আরেকটা সন্দেহ চাউর হইতে শুরু করে সেই দিন বিকাল থেইকাই। যিনি আত্মহত্যা করছিলেন তিনি আসলে সাত্তার সাহেবের বউ না। তার আরেকটা সংসার আছে ঢাকার কোনো একটা জায়গায় অথবা গ্রামের বাড়িতে। বয়সে তার চাইতে বেশ ছোট এক তরুণীরে সে মিথ্যা প্রলোভনে ভাগাইয়া আইনা উপভোগ-সম্ভোগ করতেছিলেন আমাগো কলাবাগান লেকসার্কাস এলাকায়। আমরা যারা কিশোর ছিলাম, যারা মাত্র পর্নোম্যুভি দেখতে শুরু করছিলাম তাগো কাছে বিষয়টারে অ্যাডভেঞ্চারাস লাগে। আমরা আসলে ফ্যান্টাসাইজ করতে শুরু করি। সাত্তার সাহেব মহল্লার বিবেকবান বয়ষ্কগো কাছে যথেষ্ট অসামাজিক মানুষের ধারণা হইলেও আমাগো কাছে তিনি সমর্থ পুরুষের আইকন হইছিলেন বইলা মনে পড়ে, যে দুইজন বা তার চেয়ে বেশি নারী শরীর ভোগ করনের স্পর্ধা দেখাইছিলেন। আত্মহত্যার মতোন গর্হিত অপরাধ কিম্বা মহাপাপ করা সত্ত্বেও সে তার বউয়ের লাশ ময়নাতদন্তের হাত থেইকা বাঁচাইয়া একদিনের মধ্যে কোনো এক কবরস্থানে নিয়া যান। আর পরদিন কাউরে না জানাইয়া একমাসের ভাড়া বাকী রাইখা একরাইতের মধ্যে বাড়ি ছাইড়া চইলা যান অন্য কোনো খানে...হয়তো সেইখানেই তার ঠিকানা রাখা ছিলো। এমন কি চৌকিদার চাচাও সেইরাতে অন্য কোনো রাস্তায় টহল দিতেছিলেন বইলা আমরা শুনতে পারি।
টুটুল ভাইদের বাসায় আবারো বাড়ি ভাড়া দেওয়া হইবে নোটিশ লাগে। ভাড়া না পাইলেও তারা বড় একটা খাট পান। যেই খাটের উপর লাশ শোয়াইয়া রাখা হইছিলো বইলা টুটুল ভাইয়ের মা তারে ঘরে ঢুকানের অনুমতি দেন নাই, তবে একটা মিটসেফ হয়তো তাগো রান্নাঘরে ঢুইকা পড়ে অনায়াশে। আত্মহত্যার উত্তেজনাটা ধীরে ধীরে হয়তো হারাইয়া যায় আমাগো আলোচনার থেইকা, কিন্তু টুটুল ভাইগো সেই দুইরুমের ছোট টিনশেড ঘরে নতুন ভাড়াটিয়া পাইতে বেশ দেরী হয়। তিন/চার মাস পর যখন সেই ঘরগুলিতে মেস বানাইয়া দেয়া হয় ব্যাচেলরদের জন্য তখনো আমরা ঐ বাড়িরে আত্মহত্যার বাড়ি হিসাবে চিনাইতাম মানুষরে। আমাগো কাজের বুয়া জানাইতো ঐ বাড়ির ভাড়াটিয়া খুব বেশিদিন টিকে না। কারণ সেই অজ্ঞাতনামা তরুণীর আত্মহননের পর তার অতৃপ্ত আত্মা ঘোরাফেরা করে ঐ টিনের চাল-ঠিক পেছনের আমগাছ কিংবা সেই মিটসেফের দুয়ারে দুয়ারে।
আত্মহত্যার লাশ অভিশপ্ত থাকে এমন একটা বিশ্বাস দেখি বেশ গ্রহণযোগ্য হয় আমার চারপাশের মানুষের কাছেই। যদিও টুটুল ভাইয়ের বাসায় ক্লিন্ট ইস্টউডের ছবি দেখতে যাইতাম আমরা মাঝে মাঝে, কিন্তু বন্ধু আবু দেখতাম সন্ধ্যা হওনের পরেই উশখুশ করতো ঐ বাড়ি থেইকা বের হইয়া যাওনের জন্য। তার নাকি দম বন্ধ হইয়া আসতো অন্ধকার নামতেই। মহাপাপ বিষয়ক মীথের কারনেই হয়তো ঈশ্বরের এমন অবহেলার বিষয়টা স্বীকৃত ঠেকে সবার কাছে। পাপিষ্ঠ মানুষের আত্মা কেমনে ঈশ্বর একবারেই তার কাছে ফিরাইয়া নিবেন। ধর্মের ঈশ্বর তো এতো উদার ন'ন! তার জন্য বিশেষ শাস্তির বিধান রাখা থাকবো সেইটাই তো স্বাভাবিক...





ভাল্লাগতেছে ।
পাপিষ্ঠ মানুষের আত্মা কেমনে ঈশ্বর একবারেই তার কাছে ফিরাইয়া নিবেন। ধর্মের ঈশ্বর তো এতো উদার ন'ন! তার জন্য বিশেষ শাস্তির বিধান রাখা থাকবো সেইটাই তো স্বাভাবিক...
লেখাটার পরতে পরতে আপনার নিজস্ব দর্শনটা আমাকে বেশ বেশ ভাবনার খোরাক যোগাচ্ছে, তবুও লেখাটার কোথায় যেন একটু মন খারাপের ব্যাপার রয়ে যাচ্ছে। অন্তত আমার অনুভূতিটা সে রকমই হচ্ছে।
স্বেচ্ছামৃত্যু বিষয়ক দর্শন ছাড়াও মহল্লার জমজমাট পরিবেশের মধ্যেও গা ছমছমে ফিসফিসে নীরবতার পরিবেশটা দারুণ আসছে লেখাতে। পয়লা পর্বটা খেয়াল করি নাই, প্রথম পাতায় ছিলো না?
ধন্যবাদ আরাশি...
@শাপলা: লেখাটায় মন খারাপ অনুভূতি চইলা আসছে নিকি? তাইলে তো ঝামেলা...
@নুশেরা: ধন্যবাদ...আগেরবার একইদিনে দুইটা লেখা হইয়া যাওয়াতে এই লেখাটা প্রথম পাতায় দেই নাই...
ক্লাশ নাইন থিকাই জুয়া!!! খাইছে!
আমি খালি একবার ক্লাস নাইনে বেগম বাজার গেসিলাম। আমার এক সুশীল বন্ধু তাতে বিস্তর ছি ছি করছে।
ভালো লাগছে , শেষ প্যারাটায় মন খারাপ হলো।
ভাস্করদা'র সিরিজপ্রীতি আছে। এটা খুবই সুসংবাদ। আমার আবার সিরিজ-পাঠপ্রীতি আছে।
ভালো লাগছে এটাও।
@রায়হান ভাই: আমি ক্লাস সেভেনে গেছিলাম বেগম বাজারে...টুপি ধরাইয়া দিছিলো মাথায় দেওনের লেইগা।
@জয়িতা: ধন্যবাদ...
@মীর: নিয়মিত পাঠক হওনের জন্য ধন্যবাদ...
সেদিন আপনাদের বেগম বাজারে সিনেমা দেখতে গিয়া টুপি ধরায়া দেয়ার কাহিনী শুনে ব্যাপক মজা পাইলাম। এইটা কেমন অবিশ্বাস্য লাগে।
জোশ।
আত্মহত্যা !!! শুনলেই মন কেমন বিষাদে ভরে যায় ।
অসাধারণ একটা লেখা।
ধন্যবাদ মাসুম ভাই, সাঈদ আর রাসেল আশরাফকে...
প্রথম পর্বটা প্রথম পাতায় দেন নাই !
না...
অসাধারণ একটা লেখা।
মন্তব্য করুন