ইউজার লগইন

আত্মহত্যা বিষয়ে যে সকল কথা আমার জানা ছিলো (তিন)

সাত্তার সাহেব, যিনি একমাসের ভাড়া বাকী রাইখা পালাইয়া যাওয়ার অপরাধে আমাদের চোখে দোষী সাব্যস্ত হইছিলেন। যার সম্পর্কে আমরা আর কোনো তথ্য জাননের প্রয়োজন বোধ করি নাই, আমাদের কাছে তারে অপরাধী মনে হয় যেকোনো মূল্যায়ণে; তার অপরাধ সে একজন প্রাপ্ত বয়ষ্ক তরুণীরে বিয়া করছে, যেইখানে প্রলোভনের সম্ভাবনা দেখা যায়। এই তরুণী তার দ্বিতীয় স্ত্রী বইলা গুজব রটলে মহল্লাবাসী বেশ আহত হয়, যেনো দ্বিতীয় বিবাহ কিম্বা দ্বিতীয় সংসার প্রতিপালন দেশের আইনে স্বীকৃত না। যেনো আমাদের মধ্যবিত্ত পরিবারসমূহ কোনো টানাপোড়েন ছাড়াই হরবরাইয়া চলে। সারাদিনের ক্লান্তির শেষে যেনো প্রশান্তির এ্যালকোহোল পানে অভ্যস্ততা এক বিরাট অপরাধ!

পঁচিশ বছর পর আমি সাত্তার সাহেবরে দুষতে গিয়াও অন্তরে কিসের জানি টান পড়ে। সাত্তার নামীয় সেই লোকরে আমি ভদ্রলোক সম্বোধন করতে হয়তো পারি না কলমের টানে, কিন্তু আর্থ সামাজিকতার টানাপোড়েন আমার বিশ্লেষণের প্রক্রিয়া হিসাবে চইলা আসে। সেই নাম না জানা তরুণী'র আত্মহত্যায় কৈশোরে যতোটা বিচলিত হইছিলাম, আজ কেনো যেনো ততোটা হইতে পারি না। আমার মনে হয় আত্মহত্যার রচনায় কোথাও খানিক খাঁদ থেকে যায়। এই আত্মহত্যায় কি কেবল মুক্তির প্রেরণা ছিলো? এই আত্মহত্যা কি কেবল সিউডো মধ্যবিত্তসূলভ প্রতারণার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ? নাকি এর অন্য কোনো নিগুঢ় উদ্দেশ্য তৈরী হয়? প্রতিশোধ! প্রতিহিংসা!? যদি আমরা সাত্তার সাহেবকে চিনতাম, যদি জানতাম সে সৎ মায়ের অত্যাচারেই প্রথম ঘরের বাহির হয়!? যদি জানতে পারি সে তার অফিসের নিকটবর্তী কোনো মসজিদে জুম্মার নামাজের আগে খুতবায় মুসলমান পুরুষের বহুবিবাহ জায়েজের বিধান শুইনা মূলতঃ সেই তরুণীর সাথে ঘনিষ্ঠতা তৈরী করে!? যদি তার প্রথম স্ত্রী তাকে সন্তানসহ বাপের বাড়িতে চইলা যাওয়া বা সন্তানের সাথে আর দেখা করতে না পারার হুমকী দেওনে সে ভীত ছিলো!? অথবা তার দ্বিতীয় স্ত্রী প্রতি রাতে তারে তাগাদা দেয় প্রথম জনরে ত্যাগ করনের পরিকল্পণায়!?

যদি শুনতে পাই একমাসের বাড়ি ভাড়া না গুনতে হওয়াতে তার বড়ো সন্তানের পরীক্ষার ফিস দেওয়া গেছিলো সেইবার? আমরা তবে কি সাত্তার সাহেবের অপরাধরে অন্যভাবে দেখতাম? আমি ভাবতে পারি না...কিংবা ভাবতে চাই না আসলে। এই ভাবতে না চাওয়ার পেছনে প্রভাবক হিসাবে কাজ করে আত্মহত্যা সম্পর্কীত সামাজিক মূল্যবোধ; , পুরুষতান্ত্রিকতা অথবা পুঁজির চলন অনুসরণে তৈরী হওয়া এই মূল্যবোধের ভিত্তিতেই বিবাহ, নারী-পুরুষ সম্পর্ক কিম্বা যৌনতার যেইসব নিয়ম সমাজের শৃঙ্খলা রক্ষার তরে নিবেদিত হয়...তারে শিরোর্ধায বইলাই জানি।

আসলে এইসব নিয়ম কার স্বার্থ রক্ষা করে! নবম শ্রেণী পড়ুয়া কিশোরের মনে এই সব প্রশ্ন তৈরী হওয়ার কোনোই সুযোগ ছিলো না সেই সময়। আমরা বরং অনেক বেশি মনোনিবেশ করছি তখন স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনে। একজন প্রায় চল্লিশ পুরুষের ২০/২২ বছর বয়সী তরুণী স্ত্রী'র আত্মহত্যা আমাদের ঝঞ্ঝা বিক্ষুব্ধ প্রাণে বড়জোর খানিকটা রিলিফ দেয়। সেই বছর, অর্থাৎ ১৯৮৭'এর অক্টোবর মাসে ঢাকা অবরোধের ডাক দিছিলো ২২ দলীয় ঐক্যজোট। রাজনৈতিক আত্মহনন শেষে বাঁইচা যাওয়া ৮ দলীয় জোট লজ্জাক্রান্ত হইয়াও সর্বদলীয় এই আন্দোলনে ছিলো কেবল ছাত্র সংগঠনগুলির জেদে। যার দাপটে স্বৈরাচারের আরশ কাঁইপা ওঠে, যার প্রতাপেই স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে সঙগঠিত হইতে শুরু করে বাংলাদেশ।

১০ নভেম্বর মারা যায় নূর হোসেন। পত্রিকায় সেই ছবি দেইখা আমি যেনো স্পষ্ট বুঝতে পারি আত্মাহুতি দিতেই সেইদিন এই যুবক আন্দোলনের তেজী মিছিলের সামনে খালি গায়ে গণতন্ত্র মুক্তির শ্লোগানে নিজেরে জীবন্ত পোস্টার বানাইছিলো। পুলিশের গুলির সামনে বুক পাইতা দিতেই সেই দিন সচিবালয় এলাকায় ঋজু দাঁড়াইছিলো বীর নূর হোসেন।

আমরা আজো সেই আত্মাহুতির স্মরণে শ্রদ্ধাবনত হই।

পোস্টটি ১০ জন ব্লগার পছন্দ করেছেন

মীর's picture


প্রিয় পোস্ট। ভাস্করদা'র চিন্তা-চেতনা একটু বেশি চাঁছাছোলা। কাট কাট। এটা ভাল্লাগে।

ভাস্কর's picture


ধন্যবাদ মীর...

শওকত মাসুম's picture


আপনার ভাষার স্টাইলটা দারুণ লাগছে। শুরুতে একটু সৈয়দ হক ভাব মনে হচ্ছিল, পরে মনে হচ্ছে এইটা আসলে আপনারই।

নুশেরা's picture


যে কোন পরিপ্রেক্ষিতে আত্মবিশ্লেষণটা আপনি অসাধারণ করেন। কোন ফাঁকফোঁকর থাকেনা।

এই পর্বে শেষটা দুর্দান্ত মোচড় নিলো। তখনকারই তো ঘটনা!

সময় করে গল্পটা রেডি করে ফেলেন। তাড়াতাড়ি!

ভাস্কর's picture


ধন্যবাদ মাসুম ভাই আর নুশেরা।

আমি সৈয়দ হকের একটা বই পড়ছি রিসেন্টলি, ঐটার প্রভাব থাকনের সম্ভাবনারে বাদ দিতে পারতেছি না, এতো শক্তিশালী একজন লেখক...বইটার নাম এক যুবকের ছায়াপথ।

আর নুশেরারে কই মূল গল্প শুরু হইতে আর একটা পর্ব লাগবো আর কি...

আতিয়া বিলকিস মিতু's picture


৭ ই নভেম্বর ৮৭'আমার ভাই "নাদের" ১৭ বছর বয়েসে মারা যায় প্রেসক্লাব এ।পরদিন সকালে খবরের কাগজের প্রথম পৃষ্ঠায় ছবি ছাপা হয় আমার ভাই এর।প্রেসক্লাবের একটা কোনায় ছড়িয়ে থাকে আমার ভাই এর রক্ত।পাড়ার ছেলেরা বাসা থেকে ডেকে নিয়ে গিয়েছিল স্বৈরাচার বিরধী আন্দলোনে যোগ দিতে।

নুশেরা's picture


মিতু, আপনি এবং আপনার পরিবার একের পর এক দুর্যোগের মধ্য দিয়ে গেছেন। এখনও যাচ্ছেন। আপনাদের সহ্যশক্তি নিয়ে কী বলা যায় জানি না। সর্বময় মঙ্গল কামনা করি।

অতিথি's picture


ভালো লাগলো

তানবীরা's picture


মন্তব্য লিখার ভাষা নেই

মন্তব্য করুন

(আপনার প্রদান কৃত তথ্য কখনোই প্রকাশ করা হবেনা অথবা অন্য কোন মাধ্যমে শেয়ার করা হবেনা।)
ইমোটিকন
:):D:bigsmile:;):p:O:|:(:~:((8):steve:J):glasses::party::love:
  • Web page addresses and e-mail addresses turn into links automatically.
  • Allowed HTML tags: <a> <em> <strong> <cite> <code> <ul> <ol> <li> <dl> <dt> <dd> <img> <b> <u> <i> <br /> <p> <blockquote>
  • Lines and paragraphs break automatically.
  • Textual smileys will be replaced with graphical ones.

পোস্ট সাজাতে বাড়তি সুবিধাদি - ফর্মেটিং অপশন।

CAPTCHA
This question is for testing whether you are a human visitor and to prevent automated spam submissions.

বন্ধুর কথা

ভাস্কর's picture

নিজের সম্পর্কে

মনে প্রাণে আমিও হয়েছি ইকারুস, সূর্য তপ্ত দিনে গলে যায় আমার হৃদয়...