সংশয় অথবা প্রশ্ন বিষয়ক দুই পয়সার আলোচনা...
আধুনিক দর্শনের প্রারম্ভিক পর্বের দার্শনিক হিসাবে রেনে দেকার্তরেই ধরা হয়। এই আধুনিকতার মূল শর্ত হইলো সংশয়। আগের আমলের প্রায় সকল দার্শনিক চর্চাতে বিশ্বাস বিষয়টার বড় ভূমিকা থাকতো। রেনে দেকার্ত দেখাইলেন জগতের যেই পরিবর্তনশীলতা তাতে আসলে কোনো ঘটনারেই বিশ্বাসের গন্ডীতে আবদ্ধ করন যায় না আর। হেরাক্লিটাস নামের একজন আইয়োনিয়ান দার্শনিক যিনি এই পরিবর্তনশীলতার কথা দেকার্তের জন্মের আড়াই হাজার বছর আগে কইছিলেন তারে স্মরণ কইরা দেকার্ত তার সংশয় পদবাচ্যের শুরু করেন।
দেকার্তের আগেও মানুষ সংশয়ী ছিলো, দেকার্তের আগেও মানুষ অবিশ্বাসী ছিলো। কিন্তু তিনি প্রথম সংশয়ের পদ্ধতিগত অ্যাপ্রোচের প্রতি মনোযোগ দিছেন। সংশয় প্রক্রিয়া নিয়া চারটা ধাপের কথা কইছিলেন তার প্রথম বই ফার্স্ট মেডিটেশানে। এইরম পদ্ধতিগত সংশয়রে পরবর্তীতে আধুনিক বিজ্ঞান তার বেসিক অনুসন্ধিৎসায় যূক্ত করছে। ল্যাবরেটরীতে কার্তেজিয়ান মেথড সম্ভবতঃ এখনো ব্যবহৃত একটা অ্যাপ্রোচ।
আমি নিজেও সংশয়ী মানুষ। প্রশ্ন করনের একটা দুর্নাম আছে আমার। অতীতে প্রশ্ন উত্থাপনের প্রবণতার লেইগা আমার লগে অনেক প্রাক্তন কাছের মানুষগো লগে তর্ক শেষ পর্যন্ত কাইজ্জায় গড়াইছে। আমার সংশয়ী হইয়া উঠনের পেছনেও রেনে দেকার্ত পাঠ বড় ভূমিকা রাখছিলো একসময়। তয় রেনে দেকার্তের প্রতি আমার শ্রদ্ধাবোধ তৈরী হইছিলো একজন হিস্টোরিয়ানের একটা মন্তব্যের মধ্য দিয়া অ্যাভ্রাম স্ট্রোল নামের ইউরোপীয় এই বিশ্লেষক রেনে দেকার্তের সংশয়রে দেখছিলেন নিশ্চিত হওয়ার পাগলামির সাথে। দেকার্তের বিখ্যাত উক্তি কোজিটো অ্যার্গো সাম এখনো আমরা উত্তরাধুনিক কালের মানুষরাও প্রতিনিয়তঃ স্মরণ করি। চিন্তার দুয়ার খুলতে সংশয় বড় ভূমিকা রাখছে চির কাল। সমাজ পরিবর্তন-পরিবর্ধনেও সংশয়ের ভূমিকা কেউ অস্বীকার কইরা ফেলতে পারে না তুড়ি মাইরা।
রেনে দেকার্তের নিশ্চিত হইয়া উঠনের পাগলামী আসলেই প্রয়োজন। আমরা যারা মধ্যবিত্তসূলভ আচরনে অভ্যস্ত হইয়া উঠছি, যারা তর্করে জীবন যাপন প্রক্রিয়ায় বাহুল্য মনে করি, যারা নিজেগো সমালোচনা শুনতে অভ্যস্ত নই তাগো লেইগা রেনে দেকার্ত আসলে এজন বিরক্তিকর এলিমেন্ট। তয় দেকার্তের সংশয়ের উত্তর সপ্তদশ শতকের বিজ্ঞানীরা দিতে না পারনের কারনে অনেক সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রেই তারে মেটাফিজিক্সের দোরগোড়ায় যাইতে হইছে।
রেনে দেকার্তের দর্শন কপচাইতে কিম্বা ইতিহাসে তার ভূমিকা স্মরণ করতে আমি লিখতে শুরু করি নাই। হঠাৎ আইজকা আমার মনে হইলো এই দুনিয়ায় প্রশ্ন করনের প্রবণতা ওয়ালা মানুষগো ভাত নাই। তয় প্রশ্ন করনের প্রবণতা জীবনে অশান্তি আনে নিশ্চিত। ক্ষমতা কখনো প্রশ্নের মুখামুখি হইতে ভালোবাসেনা। ক্ষমতার মানুষেরা প্রশ্নের প্রবণতারে ডরায়। ক্ষমতা বেশিরভাগ সময়েই প্রশ্নকারীগো দৌড়ের উপর রাখে অথবা প্রশ্নরে ধামা চাপা দেওনের কূটকৌশল খেলে। রাষ্ট্রযন্ত্রের এই রোগ ছড়াইছে সরকারী-বেসরকারী নির্বাহী বিভাগে। এই রোগ বিস্তৃতি পাইছে বিচ্ছিন্নভাবে গইড়া উঠা বিদ্যমান সমাজের প্রতি আস্থাশীল মানুষের ইউনিয়নেও।
প্রশ্ন করতে জানে এমন মানুষরে আমার যেমন দেখতে ভালো লাগে নৈকট্যবোধ করি। আবার যেই মানুষ অস্তিত্ব জাহির করতে গিয়া প্রশ্নের কন্ঠরোধ করে তার থেইকা দূরে থাকনের আশাপোষণ করি। প্রশ্ন মানেই আক্রমণ, প্রশ্ন মানেই প্রতিরোধ বিষয়টারে এমন কইরা দেখা হইছে মধ্যযূগীয় সমাজকাঠামোয়। দিনে দিনে মানুষের সভ্যতা সংস্কৃতি পাল্টাইছে। তারা প্রশ্ন করতে করতে বিদ্যমানতারে আলোচনার বিষয় বানাইছে। অধিকাংশ মানুষ প্রশ্ন শুনলেই ভাবে এই বুঝি ইজ্জত গেলো। এই রম ভাবনের পেছনে কোনো যৌক্তিক অবস্থান যে নাই তা'ও না কিন্তু...কারণ প্রশ্নহীনতা ব্যক্তির ক্ষমতা অটুট রাখে। প্রশ্ন রিজিড মানুষের তখ্ত তাউশ উল্টাইয়া দেওনের নজীরও রাখছে ইতিহাসে। আমি নিজের জীবন দিয়া জানি প্রশ্নের ক্ষমতা আর প্রশ্ন ভীতির নমূনা। কেবল ব্যক্তি জীবনেই না। ভার্চূয়ালিও আমি প্রশ্ন করতে গিয়া বিপদে পড়বার মতোন পরিস্থিতিতে পড়ছি অতীতে।
প্রশ্নের প্রয়োজনীয়তা এই যূগে অস্বীকার করনের কোনোই জো নাই। সংশয় ছাড়া বিজ্ঞান আগায় নাই কোনো কালে। বিশ্বাসের গরাদ কখনো ভাঙে নাই প্রশ্নহীনতায়। দৈব কিংবা বৈদ উভয়ে পরাজিত হয় কেবল প্রশ্নের সামনে আইলেই। প্রশ্ন করতে পারাটা...প্রশ্নের সম্মুখিন হওনের আচরণ অবশ্যই একটা চর্চার বিষয়। এই চর্চাই পারে মানব সভ্যতারে আগাইয়া নিতে।
ভালো লাগে মানুষ যখন ধইরা নেওয়া বিশ্বাসরে প্রশ্ন করে। তয় আরেকটা চর্চাও জরুরী হইয়া পড়ে প্রশ্নমূখী পৃথিবীর প্রত্যাশায়। প্রশ্নের সম্মুখিন হইতে পারনের যোগ্যতা। সেই যোগ্যতার অভাব দেখি চাইরপাশে। যারা আজকাল প্রশ্ন করে তারা নিজেরাও প্রশ্ন নিতে পারছে এমন নজীর রাখে নাই অতীতে। তাই সংশয় বলবৎ থাকে। সংশয়ের দুনিয়ায় আরো একটা নতুন সংশয় খুবেকটা উপাদেয় লাগে না।
আশা রাখি আমরা একদিন প্রশ্নের এই চর্চারে একান্ত কইরা নিতে পারুম। তয় একটা কথা মনে রাখন জরুরী। প্রশ্ন করনের যোগ্যতা জ্ঞানচর্চার মধ্য দিয়া অর্জন করা সম্ভব। কিন্তু প্রশ্নের মুখামুখি হওনের লেইগা দরকার মানসিক বিস্তৃতির চর্চা। বিশ্বাস বিসর্জন দিয়া সংশয়ের বৈজ্ঞানিক ভিত্তিতে আস্থাশীল হওনের মানসিক চর্চার উপস্থিতি দরকার। আশা রাখি আমরা সেই পর্যায়ে উত্তীর্ণ হইতে পারুম। পরিবর্তন অবশ্যম্ভাবী। একমাত্র পরিবর্তনেই কোনো সংশয় রাখি নাই কোনোকালে।





ভাস্করদা' আমার মাথায়ও একটা প্রশ্ন ছিলো বুঝলেন। কিন্তু পোস্ট পড়তে পড়তে ভুলে গেসি।
নিজেরে প্রশ্ন করতে থাকেন...একসময় মনে পড়বো।
তাইলে আপাতত লেখাটারেই লাইক্করি..
প্রশ্ন কি সবসময় শুধুই প্রশ্ন? মাঝেমধ্যে কি এটা প্রশ্নকর্তার মতামত প্রতিষ্ঠা করার প্রয়াস না?
প্রশ্ন কি পক্ষ নেয়? (যদি নেয়)যেই প্রশ্ন পক্ষ নেয় সেই প্রশ্নের উত্তর দেয়ার ফায়দা কি?
প্রশ্ন নিয়া তর্ক হবে...কিন্তু প্রিডিটারমাইন্ড হইলে তো প্রশ্নের উত্তর দেয়াই বেকার। জ্ঞানীরা বলছে মূর্খের সাথে তর্ক না করতে...কিন্তু প্রিডিটারমাইন্ডের সাথে তর্ক করতে মানা করে নাই
।
প্রশ্ন নিয়া আমার মনেই প্রশ্ন জাগে।
হ্যা, প্রশ্নকর্তার মতামত কিম্বা বিরোধ প্রতিষ্ঠার প্রয়াস থাকতে পারে। দুইটা কনফ্লিক্টিং প্রয়াস যদি যথাযথ তর্কের চর্চায় থাকে তাইলে কিন্তু কোনো একটা জায়গায় পৌছানোর সম্ভাবনা তৈরী হয়। প্রশ্ন কইতে আমি ফ্যালাসীরে বুঝাইতেছি না। যথার্থ দার্শনিক ভিত্তি আছে তেমন প্রশ্ন বা সংশয়ের কথা কইতে চাই।
প্রশ্ন পক্ষ নিতেই পারে। ক্ষমতা যখন ফ্যাসিস্ট আচরণ করে, তখন তার বিরুদ্ধে প্রশ্ন তোলাটা তো অবশ্যই নির্যাতিতের পক্ষে যাইবো। এখন প্রশ্নকর্তা কোনো পক্ষের হইবো কি না সেইটা বিবেচ্য হইতে পারে। সেইটা বিশ্লেষণ কইরা প্রশ্নের মর্তবাও যাচাই করা যাইতে পারে। কার্তেজিয়ান মেথড মূলতঃ এইরম উপজীব্যের উপর দাঁড়ানো বাস্তবতা।
মূর্খের সাথে তর্ক জায়েজ না এইটা হয়তো ঠিকও হইতে পারে। কিন্তু কাওরে মূর্খ বইলা জাজমেন্টে যাওয়ার অভ্যাসটা খুব ভালো আচরণ মনে হয় না আমার কাছে। কারণ মূর্খতারে আমার স্ট্যাটিক কোনো বিষয় মনে হয় না। অনেক জ্ঞানী লোক কোনো নির্দিষ্ট বিষয়ে মূর্খ হইতে পারে। একজন কম্পিউটার সায়েন্সে পিএইচডি প্রাপ্ত ইঞ্জিনিয়ার কইয়া বসতে পারে যে হিমালয় প্রতিদিন তার অবস্থান পরিবর্তন করে। কথাটা সত্য। কিন্তু এইটা যখন কারো কোনো দাবীরে প্রশ্নবিদ্ধ করনের জন্য তোলা হয় তখন তার উদ্দেশ্য নিয়াও পাল্টা প্রশ্ন তোলা যায়। কারণ হিমালয়ের ঐ পরিবর্তনের মাত্রা আসলে এতোই নেগলেজিবল যে সেইটা খালি চোখে টের পাওনটা অসম্ভব। এখন আমার মতোন মূর্খ এই তর্ক থেইকা দুইটা জিনিষ শিখতে পারে। এক. পৃথিবীর উপরিভাগে ভূমিরূপের পরিবর্তন বিষয়ক জ্ঞান। দুই. বিদেশি ডিগ্রী থাকলেই তার সিদ্ধান্ত বা অবধারণ বিশ্বাস করনের কোনো দরকার নাই।
খারাপ কি কনতো তাইলে প্রশ্নের দুনিয়া?
প্রশ্ন নিয়া করা প্রশ্নের স্পেসিফিক রূপটা এইখানে কইতে পারেন...ঠিক কোন বিষয়ে আপনের প্রশ্ন জাগে? প্রশ্ন বলতে আপনি আসলে কি ধরনের প্রকাশরে বুঝেন?
মন্তব্যের জন্য ধন্যবাদ ভাঙ্গা পেন্সিল।
অল্প বিদ্যা ভয়ংকরী লোকজনের সাথে আমি কোন আলোচনায় যেতে চাই না। এরা জ্ঞান দেখাতে খুবই ব্যস্ত থাকে, আলোচনা কম হয়। এদের থেকে বাঁচার জন্য আমি আমার মুখ বন্ধ রাখতে চাই।
আমি নিজেরেও খুব বেশি বিদ্যার লোক মনে করি না। আমার মনে হয় বিদ্যার বাটখারাটা মাঝে সাঝে ভুল রিডিং দিতে পারে। জাজমেন্ট প্রসেসটারে বরং আমার অনেক ভয়ঙ্কর লাগে অনেক সময়।
যারা আজকাল প্রশ্ন করে তারা নিজেরাও প্রশ্ন নিতে পারছে এমন নজীর রাখে নাই অতীতে।
এইটা ঠিকই বলছেন। আমরা অন্যের কাছ থেইকা যা আশা করি, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই নিজের ক্ষেত্রে তারে অপ্রয়োজনীয় মনে করি।
মন্তব্য করুন