এইবার সংশয় অথবা প্রশ্ন বিষয়ক আরো তিন পয়সার আলোচনা...
যে কোনো ধইরা নেয়া সত্যরে প্রশ্নের মুখামুখি করনের প্রবণতাটা শুরু হইছিলো রেনে দেকার্তের পথ ধইরা। কিন্তু তার এই পথ আসলে মানুষরে সমস্যায়ও ফেললো। পরম সত্য খুঁইজা নেওনের যেই উদগ্র বাসনা দেকার্ত সাহেবের ছিলো, সেইটা মানুষরে অনিশ্চয়তার হাঁসফাঁস অবস্থার মধ্যে ফেইলা দ্যায়। দেকার্ত সাহেব অনেক কিছুরেই প্রশ্ন করতে শিখাইলেন, মধ্যযূগীয় মানুষের স্টিগমাটিক প্রবণতারে প্রশ্নবিদ্ধ কইরা অনুসন্ধিৎসু আধুনিক মানুষ হইয়া উঠনের প্রেরণা জোগাইলেন; কিন্তু শেষ পর্যন্ত নিজে গিয়া পড়লেন ধর্মানুভূতির খপ্পরে। এই ধর্মানুভূতি পরম সত্যের আশ্রয়স্থল আর একমাত্র বিশ্বাস্য পথ হইলো তার প্রক্রিয়াতে।
উনবিংশ শতক থেইকাই সংগ্রামী মানুষেরা জানলো কোনোকিছুই প্রশ্নহীন হইতে পারে না। রাজাগো ক্ষমতারেও প্রশ্নের মুখে ফেইলা দেওয়া যায়...তারা ঈশ্বরের প্রতিনিধি না। হেগেল সাহেব অনেক চেষ্টা চরিত্র কইরাও তারে বদলাইতে পারলেন না। মানুষ ক্রমশঃ বস্তুতান্ত্রিক হইয়া উঠলো। এই বস্তুতান্ত্রিকতারে অবশ্য কেবল মার্ক্সবাদের লগে গুলাইয়া ফেলনের কোনোই অবকাশ নাই। এই বস্তুতান্ত্রিকগো অনেকেই পরবর্তীতে বরং পুঁজিতান্ত্রিকতার দিশারী হিসাবে পরিগণিত হইছে।
যাউগ্গা অনেক জ্ঞানের কথা কওয়া হইয়া যাইতেছে। মূল আলোচনা ছিলো সংশয়ের দার্শনিকতার অনুসন্ধান, সেই জায়গাতেই থাকাটা শ্রেয় লাগে আমার কাছে। উনবিংশ শতকে আধুনিক মানুষ নিউটনিয়ান ঘরানার বিজ্ঞানের বদৌলতে বেশ সিদ্ধান্তমূলকও উঠতেছিলো। যদিও এই সিদ্ধান্তের ধরণ বেশ খানিকটাই ইহজাগতিকতারে মাথায় রাইখাই ঘটতেছিলো। বস্তুতান্ত্রিক কওনের চাইতে এই শব্দটাই অধিক জুৎসই হয় এই সময়টারে বুঝনের লেইগা। ইহজাগতিকতার চাপে ও তাপে উনবিংশ শতক থেইকা বিংশ শতক পর্যন্ত রাজত্ব করলো প্রায়োগিকতার দার্শনিক চিন্তা। মানুষ জীবন আর শিল্পরে আলাদা কইরা ভাবতে শিখলো। জীবনের শিল্প-কলখারখানার বিস্তার এই ক্ষেত্রে বিশাল ভূমিকা রাখছে। মেশিন হইলো উৎপাদনের হাতিয়ার। মানুষ তার আর্ট-কালচারের শিল্পরে এই মেশিনিস্ট অ্যাপ্রোচ থেইকা দূরে রাখনের লেইগা শিল্পকলারে জীবন বহির্ভূত ভাবতেই বেশি ভালোবাসতেছিলো। যদিও এই ধারণাগুলি পুরানারে প্রশ্ন কইরাই দানা বাঁধতেছিলো, তবুও বইলা দেয়া যায় নতুনত্বের এইসব আহ্বান আসলে নিজেরেও প্রশ্নহীন করনের সংগ্রামে লিপ্ত ছিলো বেশ ভালো মতোনই।
ছিলাম সংশয়ে, কিন্তু আলোচনা যেনো বারবার সংশয়হীনতার পেছনেই দৌড়াইতে চায়।
বিংশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর পর চিন্তার নতুন কাঠামো'র উদ্ভব ঘটতে শুরু করলো। এই চিন্তা কাঠামোর পেছনে হয়তো সোভিয়েত ইউনিয়নের দোর্দন্ড প্রভাব কাজ করছিলো। প্রথম বিশ্বযুদ্ধ কালে ফ্রাঙ্কফূর্ট স্কুলের বেশ কয়জন চিন্তক-দার্শনিক-রাষ্ট্রবিজ্ঞানী মূলতঃ সোভিয়েত ইউনিয়নের গইড়া উঠনের কালে তার কাঠামোবাদী-কার্যকারণবাদরে প্রশ্ন করতে শুরু করছিলেন। এই প্রশ্নকরনের চর্চা মার্ক্সিজমরে আক্রমণের উদ্দেশ্যে শুরু করা হয় নাই এইটা মাথায় রাইখা আগের লাইনটা পড়তে হবে। এই চর্চা ছিলো লেনিনিস্ট পৃথিবীরে প্রশ্নবিদ্ধ করা, যেইখানে সমাজবাদী দৃষ্টিভঙ্গীতেও রাষ্ট্র ক্ষমতার একরম হাতিয়ার হওনের ইঙ্গিত দিতে শুরু করছিলো। ব্যক্তির প্রশ্ন করনের অধিকার ছিলো এই স্কুল অফ থটসের মূল টপিক। একটা সমাজবাদী বা সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রে ব্যক্তির সাথে রাষ্ট্রের দ্বান্দ্বিক অবস্থান নির্ধারণের তাগীদেই তারা এই তর্কে লিপ্ত হইছিলো।
এই দার্শনিক ভিত্তির সাথে সেইসময়কার আরেকটা চিন্তার মিল পাওয়া যায়। সেইটা হইলো অস্তিত্ববাদ। আমার আলোচনায় তারা গুরুত্পূর্ণ না বইলা ঐ পথে খুব একটা হাটনের শখ হইতেছে না। আমি সংশয়ী প্রবণতাতেই আপাততঃ থাকতে আগ্রহী আছি। তয় গতো শতকের পঞ্চাশের দশকের মেষভাগে দেখা গেলো এইদিক ঐদিক থেইকা প্রশ্ন উত্থাপনের অধিকার নিয়া আলোচনা শুরু হইলো। পুরানারে প্রশ্নবিদ্ধ করাটাই এইসব চিন্তা কাঠামোর মূল উদ্দেশ্য ছিলো। এই মানুষেরা নিউটনিয়ান সায়েন্সরেও প্রশ্নের মুখে ফেললেন অনিশ্চয়তার বিজ্ঞান ক্কোয়ান্টাম মেকানিক্স এদের আলোচনার মেথডওলজি জোগাইলো। তয় খেয়াল রাখতে হইবো এই প্রশ্নকারীরা কিন্তু পুরানারে পাল্টানের সংগ্রামে অ্যাক্টিভিস্ট হিসাবে এই সুর্নিদিষ্ট আচরণে যায় নাই। তারা জগৎ-জীবন-দর্শনের তাগীদে নতুন পঠন পদ্ধতির কথা কইতেই চেষ্টা করছে অধিকাংশ সময়। পুরানারে প্রশ্ন কইরা নতুন সিদ্ধান্তের তরে তাদের অধিকাংশেই নিবেদিত প্রাণ ছিলো না, বা থাকলেও তারা নিজেগো বলয়রেও প্রশ্নের মুখে ফেলছে অচীরেই।
৬০ দশকের শেষভাগে, সত্তরের শুরুতে একজন দার্শনিক-সাহিত্য পরিব্রাজক ফ্রেঞ্চ লিওতার্দ সাহেব পেছনের এই সময়টারে একভাবে বিশ্লেষণ করলেন। তিনি দেখাইতে চেষ্টা করলেন এই চিন্তকেরা একটা নতুন চিন্তা কাঠামোয় পরিব্রাজনা করতেছে। ধইরা নেওয়া বিশ্বাস নির্ভর কিম্বা অবিশ্বাস নির্ভর সত্যরে প্রশ্নের মুখামুখি কইরা এক মেটা ন্যারেটিভের জগতে যাওয়ার চেষ্টাই এই সময়ের দার্শনিকরা পূর্ণ হৃদয়ে কইরা গেছে। তিনি দেখাইলেন আধুনিক কালের দার্শনিকেরাও হয়তো নাকচ করছে পুরানা সত্যরে। কিন্তু নতুন এই চিন্তা কাঠামোয় কেবল নাকচ করন না বরং সত্যরে সংশয়ের মধ্যে ফেলতে পারাটাই মূখ্য উদ্দেশ্য ছিলো। এই সংশয় আধুনিক সমাজের স্টিগমাটিক বা সংস্কারধর্মী যেই সব ক্ষেত্র গইড়া তোলা হইছিলো তারে প্রশ্ন করনের মধ্য দিয়া এক ধরনের আলোচনার ক্ষেত্র প্রস্তুতের চেষ্টা হিসাবেই দেখা হইতেছিলো ঐ সময়টাতে।
ক্ষমতার নতুন বলয়ে ভাষা-বিজ্ঞান-নৈতিকতা-কার্যকারণ তত্ত্ব কিম্বা বিচার বিশ্লেষণের এক রম বাস্তবতা তৈরী হইয়া গেছিলো আধুনিক জমানাতেও। যদিও এই আধুনিকতাবাদীরা ক্ষমতার বলয়ের বাইরে থাকা মানুষরে বহুতরকমের প্রতিশ্রুতি কিম্বা আশ্বাস বাক্য শুনাইছিলো তার আগের জমানারে পাল্টানের সময়টাতে। তো এই নতুন সময়ের দার্শনিকেরা ধইরা ধইরা বিদ্যমান বাস্তবতাসমূহরে প্রশ্নের মুখে ফেলতে শুরু করলো। লিওতার্দ এই সময়টারে কইলেন উত্তর আধুনিক প্রবণতা বা ধারণা।
ধইরা নেওয়া সত্যরে সংশয়ে ফেইলা তার মেটান্যারেটিভ নির্মাণই যার মূল উদ্দেশ্য ছিলো। যার মাধ্যমে হয়তো কখনো পরিবর্তনের বিভিন্ন সূচকও সামনে চইলা আসবো। ব্লগীয় আচরণে অতীতে দেখছি এইরম আলোচনারে নিরুৎসাহিত করা হইতো বেশ উৎসাহের সাথে। উত্তর আধুনিক বইলা বিভিন্ন ভিন্ন চিন্তা কাঠামোর মানুষরে গালি দেওয়া হইছে অতীতে। তয় মনে হয় সাম্প্রতিক সময়টাতে কোনো একটা পরিবর্তনের আভাষ দেখতে পাই। ব্লগজগতে কিছু মানুষ যারা নিজেরাই হয়তো উত্তর আধুনিক কইয়া গালি দিছে অন্য মানুষরে কিছুদিন আগেও, তারা প্রশ্ন করনে সুখ খুঁইজা পায়। তারা প্রচলিত হওয়া সত্যরে প্রশ্ন কইরা, সংশয়ে ফেইলা দিয়া নতুন মেটান্যারেটিভ নির্মাণে উৎসাহী হয়। খোলাখুলিই কই মুসা ইব্রাহীমের পর্বতারোহনরে যেই ভাবে উত্তর আধুনিক দর্শনগত ভিত্তির উপর দাঁড়াইয়া প্রশ্নবিদ্ধ করা হইলো বা করনের চেষ্টা অব্যাহত আছে, তার নির্যাষে আরামই পাই।
তয় গতো পোস্টের মতোন আবারো প্রশ্ন কইরা যাই, প্রশ্ন বিদ্ধ মানুষের প্রশ্ন উদ্দেশ্যমূলক হওনের সম্ভাবনা রাখে। উদ্দেশ্যমূখীনতা কখনোই সংশয়ের দর্শনরে আপহোল্ড করতে পারে না। যদি সেইটা হয় তাইলে আমাগো চিন্তাজগত ধ্বংস হওনের সম্ভাবনা তৈরী হইবো। যথার্থ প্রশ্ন করতে হইলে নিজেরেও প্রশ্নবিদ্ধ হওনের লেইগা প্রস্তুত রাখতে হয়...সেইটাই প্রশ্নের পথরে সচল রাখে। নাইলে হোচট খাইয়া ৮৭৫০ মিটার নীচে পইড়া যাওনের সম্ভাবনাটাই কেবল বাড়ে...যেইখানে নিশ্চিত হয় চিন্তার মৃত্যু।





লেখা তো দেখি কাকচক্ষু দিঘী হয়েছে। ভাস্করদা'কে অভিনন্দন।
আমার যেটা মনে হয় সত্যরে সংশয়ে ফেলে যাই নির্মাণ করা হোক তা আখেরে টেকসই হয় না। কেননা উত্তরাধুনিকতাও নিশ্চই একদিন প্রাচীনতা অর্জন করবে। তাই ধ্রুব'গুলোকে এর আলোকে বিচারের প্রয়াস না নেয়াই ভালো।
এই কথায় মুসার অর্জনকে প্রশ্নবিদ্ধ করার অপচেষ্টায় কোনো ধ্রুবসত্যকে চ্যালেঞ্জ করা হয়ে গেছে -এমন দাবি করছি না। তবে প্রশ্ন আর প্রশ্নের মধ্য দিয়ে উঠে আসা বিতর্ক আর বিতর্কের মধ্য দিয়ে উঠে আসা তথ্য-প্রমাণ অনেককিছুই পরিস্কার করে দেয়। ইচ্ছেপূর্বক উদ্দেশ্যহীনতায় দুষ্ট না হলে যা অনায়াসে বোধগম্য।
এখন শুধু সংশয়বাদীদের শেষ পতনটুকু দেখার ইচ্ছা।
উত্তর আধুনিকতার সংশয় আখেরে কি হইবো সেই আলোচনার চাই বেশি প্রয়োজন সংশয়ের উদ্দেশ্য বিধেয় যাচাই করা। একজন উত্তরাধুনিকতায় বিশ্বাসী মানুষ ক্যান অপ্রয়োজনীয় সংশয়ের দোরগোড়ায় ঘরতে থাকবো!? মুসা হিমালয় শীর্ষে উঠছে কি উঠে নাই প্রমাণ কইরা তার লাভ কি? এই সবও প্রশ্নের মুখামুখি হয়...
কিন্তু আধাখেচড়া অনুসরণকারীরে প্রশ্ন করতে গেলে দেখা যায় খেউক্কাইয়া উঠে তার চারপাশ। আমি মনে করি এইরম মধ্যযূগীয় আচরণ কখনো উত্তর আধুনিকতার ধারে কাছে থাকতে পারে না...তার মানে পুরা বিশ্লেষণটাই ভেইগ-উদ্দেশ্যপূর্ণ।
শেষ পর্যন্ত তিনি মেনেছেন। ভাঁড়ামির একশেষ করে ছাড়লেন।
মানা না মানা তো আসলে বিষয় না। মাইনা নেওনের বাক্যটা আমি আমার টুকরা-টাকরা ৩'এর মাসুম ভাইয়ের পোস্টে উল্লেখ করছিলাম। পইড়া দেইখেন। পুরা ব্যাপারটা এতোটাই প্রেডিক্টেবল ছিলো। প্রোসেস অনুযায়ি প্রশ্ন করতে করতে দেখবেন সত্যের খুব কাছাকাছি চইলা যাওয়া সম্ভব হয়। কাছাকাছি বলতেছি কারণ সত্য বইলাতো আসলে কিছু নাই...সত্যের মেটা ন্যারেটিভটাই সবকিছু।
মাসুম ভাইয়ের কমেন্টের জবাবে*
সিনেমার নাম 'দুই পয়সার আলতা' শুনছিলাম দ্রব্যমূল্য যে উর্ধমুখী সেইটা বুঝাইতে চাইছেন বলেই 'তিন পয়সার আলোচনা' ধরে শান্তি পাইতে চাই
প্রশ্ন করলে হুদাই আমার সাদা দিলে কাদা দেখতারেন 
সত্য বইলাতো আসলে কিছু নাই...সত্যের মেটা ন্যারেটিভটাই সবকিছু।
লেখা আর সাথে আলোচনা সবটাই ভালো লাগলো।
মন্তব্য করুন