তিউনিশিয়া, মন আমুর!
নয় মাস মুক্তিযুদ্ধের পর বাংলাদেশ স্বাধীনতা লাভ করছিলো। নয় বছর সংগ্রাম শেষে খুনি স্বৈরাচার এরশাদররে ক্ষমতা ছাড়তে বাধ্য করছিলো এই দেশেরই ছাত্র-জনতা। তথ্য দুইটা আজকাল মাঝে সাঝে আমার বিশ্বাস করতে ইচ্ছা হয় না। নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের মূল্যবৃদ্ধির প্রতিবাদে যদি সরকারের সাথে অসহযোগ আন্দোলনের ঘোষণা দেয়া হয় আজকে আমার মনে হয় সেই সিদ্ধান্ত নিয়া পক্ষ-বিপক্ষের তর্ক শুরু হইবো বিভিন্ন মোড়ে মোড়ে। হরতালে বা অসহযোগ সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনে কতোটা ক্ষতিকর প্রভাব ফেলে, দেশের শিল্প-কলকারখানা কতোটা হুমকীর সম্মুখিন হইবো সেই বিষয়ে তথ্য উপাত্ত এখন মানুষের মাথায় মাথায় খেলা করে। প্রতিবাদের ভাষা কতোটা সভ্য-ভব্য হওয়ার প্রয়োজন আছে সেই বিষয় নিয়াও বিতর্ক শুরু হওনের সম্ভাবনা তৈরী হয় এমন সব সময়ে।
আর এই ফাঁকে দেশের অবস্থা অন্য যে কোনো সময়ের চাইতে খারাপ হইতে থাকে। ধারাবাহিক ভাবে বাড়তে থাকা দুর্নীতির আওতা আরো বাড়ে। আইন শৃঙ্খলা পরিস্থিতির এমন অবনতি হয় যখন দেশের দলীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী যে কয়দিন আগে যে কোনো তদন্ত শুরু হওনের আগেই বিরোধী দলরে দায়ী কইরা বক্তব্য দিতো পত্র-পত্রিকায়, সেও বলতে বাধ্য হয় দেশের অবস্থা খুবেকটা ভালো নাই। কিন্তু মানুষের কোনো ভাবাবেগ দেখি না এতো কিছুর পরেও। আমি নিজেও বা ব্লগে লেখা ছাড়া আর কি করি!
এমনই একটা সময়ে তিউনিশিয়াতে শুরু হয় বিক্ষোভ। মাত্র এক মাস আগে একজন গ্র্যাজুয়েট পাস দেওয়া মাত্র ২৬ বছর বয়স্ক তিউনিশিয়ান ছাত্র কোনো যথাযথ চাকরী না পাইয়া রাস্তায় শব্জী বেচতে শুরু করে। কিন্তু প্রশাসনতো নিয়মতান্ত্রিক থাকতে হয়। পারমিট ছাড়া ব্যবসা করার জন্য তারে উৎখাত করা হইলে, সেই ছাত্র নিজের গায়ে আগুণ দিয়া আত্মাহুতি দিলে সারাদেশে প্রতিবাদের আগুণ ছড়াইতে শুরু করে। বিশেষ কইরা রাজধানীতে এই বিদ্রোহের মাত্রা প্রশাসনরে কঠোর অবস্থা নিতে বাধ্য করে। হাজার হাজার ছাত্রের মিছিলে পুলিশ গুলিবর্ষণ করে। কিন্তু মিছিলের বেগ তাতে থামে নাই। বরং এই আন্দোলনের ছোঁয়া লাগে সর্বক্ষেত্রে।
এই আন্দোলনের সময় ২৩ বছর ধইরা জাইকা বসা বেন আলী সরকার ধইরা নেয় তাদের বিরুদ্ধে এই ক্ষোভের কারণ উইকিলিক্স। কারণ অ্যাসাঞ্জবাহিনী কয়দিন আগেই বেন আলী'র অপকর্মে আমেরিকার মদদের কথা প্রকাশ করছে। ধইরাই নেয়া হয় জনগণ মূলতঃ তথ্য মাধ্যমে প্রকাশিত এইসবের কারনেই সচেতন হইয়া উঠছে, নাইলে বেন আলীর সরকার তো দেশের উন্নয়ণে ভালোই ভূমিকা রাখছে। যেনো উন্নয়ণের কিছু পদক্ষেপ নিলে সরকারের আর তাদের আত্মীয় স্বজনের দুর্নীতি জায়েজ হইয়া যায়। সরকার উইকিলিক্স ব্যান কইরা দেয় দেশে। এই সিদ্ধান্তে বিদ্রোহ চাপা না পইড়া বরং আরো বাড়তে থাকে। পূরা জনগোষ্ঠীর ১০ ভাগ ইন্টারনেট ভোক্তা কমিউনিটি এই বিদ্রোহরে আরো ছড়াইয়া দেয়, সরকারের ধরা ছোঁয়ার বাইরে নিয়ে ফেলে।একজন বিশ্লেষকের মতে ফেইসবুকের নাকি বড় একটা ভূমিকা ছিলো এই আন্দোলনের দাবানল ছড়ানোতে।
কিন্তু আসলে বেন আলী'র বিরুদ্ধে জনতার এই ক্ষোভ বেশ কিছুদিন আগের থেইকাই ফুসতেছিলো জনগণের মধ্যে। আমেরিকার রাষ্ট্রদূত রবার্ট গোডেচ'এর বরাত দিয়া এক পত্রিকায় দুই হাজার নয় সালের একটা অভিমত ছাপাইছে। গোডেচ সেইখানে বেন আলীর ক্ষমতার অপব্যবহার নিয়া সতর্কীকরণ বার্তা দিছিলো বলা হইতেছে। যদিও সেইখানে বেন আলীর উন্নয়ণমূখী দৃষ্টিভঙ্গীটাও আলোচ্য হইছে। কিন্তু আমেরিকার বেন আলী প্রীতি তাতেও থাইমা থাকে নাই। আমেরিকার পররাষ্ট্র বিষয় স্টেইট সেক্রেটারী হিলারী ক্লিনটন ঠিক'ই বেন আলীর সাথে তার সখ্যতার বিষয়টা প্রকাশ্য রাখছে শুরু থেইকাই। বিদ্রোহের কালে পর্যন্ত আমেরিকা বিশ্ববাসীরে এই আন্দোলনের মাধ্যমে মৌলবাদীরা শক্তিশালি হইবো বইলা ব্যখ্যা দেয়ার চেষ্টা করছে।
আন্দোলনের খবরা-খবর নিতে গিয়া আমি রীতিমতো চমকাইছি। আমাগো আওয়ামি সরকার গতো ২ বছর ধইরা দেশবাসীরে প্রবৃদ্ধির মাত্রা ৫% ছাড়াইতেছে বলতেছে। মৌলবাদের উত্থান ঠেকানের কথা বলতেছে। সার্ভিস ওরিয়েন্টেড সেক্টর গুলিরে আগের চাইতে সহজ করার কথা কইতেছে। বেন আলীর সরকারো ঠিক একই প্রপাগান্ডা করতেছিলো গতো কয়েক বছর ধইরা। কিন্তু এই ফাঁকে বাড়ছে দ্রব্যমূল্য আর বেকারত্বের হার। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও কি বিষয়টারে একইরকম লাগে না!?
তিউনিশিয়ায় জনতার প্রতিরোধে পরশু রাতেই বেন আলী তার পরিবার সহ দেশ ছাড়ছে। ক্ষমতা হস্তান্তর করছে স্পীকারের হাতে, ছয়মাসের মধ্যে নতুন নির্বাচনের ব্যবস্থা করা হইতেছে। বেন আলী কেবল রাজনৈতিকভাবেই বিতারিত হয় নাই, তিউনিশিয়ানরা তারে দেশ থেইকাই বিতারিত করছে। মার্কিন মদদেও সে টিকতে পারে নাই। অনেকে হয়তো বলার চেষ্টা করতেছে একসময়ের ঔপনিবেশিক রাষ্ট্র ফ্রান্সের ভূমিকা আছে এই আন্দোলনরে ত্বরান্বিত করতে। কিন্তু সব বিশ্লেষকই মাত্রা ছাড়ানো ক্ষমতার অপব্যবহার, দুর্নীতি আর জবাবদিহিতার অনুপস্থিতিরেই এই জনরোষ তৈরীর প্রধান কারণ হিসাবে চিহ্নিত করছে। আরেকটা বিষয় সিগনিফিকেন্ট মনে হয় আমার, বেন আলী'র তিউনিশিয়া থেইকা পালাইয়া যাওয়ার দিনের একটা সময় হিলারী ক্লিনটন ফোন কইরা আমাগো প্রধানমন্ত্রীরে কি ক'ন?
তিউনিশিয়ার এই বিদ্রোহ আমার চেতনায়ও নাড়া দেয়...হতাশার ঘুমঘোর থেইকা উইঠা আবার আশার গল্পগাথুনীতে আগ্রহী করে। অনেককাল আগের প্রায় ভুলতে বসা একটা শ্লোগান হঠাৎ মাথায় আস্তানা গাড়ে
বিদ্রোহ-বিপ্লব-মুক্তি!





বিদ্রোহ-বিপ্লব-মুক্তি! সুন্দর সুচিন্তিত পোস্টের জন্য আমার অভিনন্দন ভাস্কর ! বিদ্রোহ-বিপ্লব-মুক্তি! পুরাতন কথা, তবু আছে যুক্তি ।
বিদ্রোহ-বিপ্লব-মুক্তি
ভালো লিখেছিস।
ভালো লিখেছিস।
হুমম।
...জানতে মন চায়
~
আ র মুক্তি!
প্রায় প্রত্যেক বছরেই পেপারে দেখি আফ্রিকার কোন না কোন দেশের প্রেসিডেন্ট ভাগলবা হয়। সব আমগো লক্ষ্মণ সেনের ভাবশিষ্য
এগুলি নাকি গিয়া উঠে সৌদি বাদশার মেহমানখানায়, কী আমোদের জীবন
গন্তব্য এক হইলেও প্রত্যেকবারের সাথে এইবারের পার্থক্য আছে, অন্যান্যবার এরা ভাগে আরেক সেনাশাসক স্বৈরাচারের ঠেলায়, আর তিউনিশিয়ায় এইবারে শিক্ষিত মধ্যবিত্ত পেশাজীবীরা এককাট্টা হইয়া একজন স্বৈরশাসকরে তাড়াইছে।
রাইট। দেখতেছিলাম 'জেনারেল অমুক নতুন প্রেসিডেন্ট হিসেবে রাষ্ট্রক্ষমতা সংহত করেছেন' টাইপের সেকেন্ড লাইনটা মিসিং
হায়রে বেন আলীরা!
ঘটনাটা পুরা আমাদের এরশাদ চাচার মত। তবে আমাদের এরশাদ চাচা সত্যি ভাগ্যবান ছিলেন। বিদেশ যেতে হয় নাই!
সামনে এমন ভাগ্য আরো অনেকের হতে পারে!
সুন্দর বিষয় নিয়ে আলোচনাত জন্য আপনাকে ধন্যবাদ জানাই।
হু ম ম। আমাদের সরকার শিক্ষা নিলে তো ভালো।
চালের মূল্য নিয়ে শঙ্কার অনেক কারণ তৈরি হচ্ছে।
আর এই দেশের চাইলের রাজনীতি কিন্তু সবসময়ই গুরুত্বপূর্ণ। সামহোয়্যারে আমার একটা পোস্ট ছিলো এই বিষয়ে...
ভাস্করদা', ব্লগ লেখা ছাড়া আপ্নে আর কিছু করেন না। অথচ দেখেন তিউনিশিয়ায় আন্দোলন ছড়ানোর পেছনে ফেসবুকের একটা শক্তিশালি ভূমিকা ছিলো।
এর মানে কি? পরিস্থিতির দাবি বিবেচনায় এখন একটা কথা চিন্তা করাই যায়, এই মুক্তবুদ্ধির সৃজনশীল চর্চায় বিদ্রোহ-বিপ্লব-মুক্তির পথ প্রশস্ত হওয়ার সুযোগ ভালোমতোই আছে। ব্লগিং চালায়া যান বস্। আপ্নের মতো আরো বহু মানুষরে পাশে পাবেন।
একটা ব্যাপার খেয়াল করেন। কয়েক বছর আগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক ছাত্রের সাথে সেনাবাহিনীর এক সদস্যের ঝামেলার কারণে সারা দেশ কিন্তু তখন বিক্ষোভে উত্তাল হইছিল। সেসময় কিন্তু অবরোধ- হরতাল নিয়ে কাউকে কোন উচ্চবাচ্য করতে তেমন একটা শুনা যায় নাই। কিন্তু এখন তেমন কোন কিছু ঘটে না কেন?
কেন রাজনৈতিক সরকারের আমলে কখনো কোন বিদ্রোহ হয় না? কেন কেবল অরাজনৈতিক সরকারের আমলেই বিদ্রোহ হয়?
কোন উত্তর?
আমাদের রাজনীতির অবস্থা খানিকটা হইলেও প্রিমিয়ার ফুটবল বা ক্রিকেট লীগের মতোন...এইখানে কেউ আওয়ামি লীগ সাপোর্ট করে, কেউ বা বিএনপি। ধরেন আজকে যদি মোহামেডানের তামিম দল বদল কইরা আবাহনীতে যোগ দেয় তাইলে সে আবাহনী সমর্থকগো চোখের মনি হইবো। আর এখন, তামিমরে সকাল-বিকাল গালি দেয়। তেমনি রাজনীতিতেও আওয়ামি লীগ সমর্থকরা দলের যেকোনো সিদ্ধান্ত জায়েজ করতে উইঠা পইড়া লাগে। তয় বিষয়টা যে ধীরে ধীরে পরিবর্তীত হইতেছে সেইটা শেষ সংসদ নির্বাচন আর এইবারের পৌরসভা নির্বাচনের ফলাফল বিশ্লেষণ করলেই বুঝতে পারা যায়। অতীতে বিএনপি কিম্বা আওয়ামি সমর্থকরা তাগো পার্টির বিরুদ্ধে কোনো বিরোধীতামূলক অবস্থান নেয় নাই। যেইটা দল ছাড়া স্বৈরাচারগো বিরুদ্ধে নিয়া ফেলছে।
হুমম। এবার দেখতেছি। স্বতন্ত্র- প্রার্থীদের দল থেকে বের করে দেওয়া হচ্ছে। তাতে লাভ কি হবে?
যদি এমন হতো,
#১. এই নিজ দল ত্যাগীদের বিরোধী দলে কখনোই আমন্ত্রণ জানানো হবে না, কিংবা
#২. এনারা কেন দল ছেড়ে চলে গেলেন আর কেনই বা দল যাদের নমিনেশন দিয়েছিলো তারা বিজয়ী হল না, সেটা তুলনা করে একটা পজেটিভ পদক্ষেপ নেওয়া হত।
তাহলে দুই দলের জন্যেই অনেক ভালো হত।
আপনে কি মনে করতেছেন বিদ্রোহী প্রার্থীরা সব প্রতিপক্ষ দলে যোগ দিবো!?
বিদ্রোহী প্রার্থীরা অতীতের মতোই এখন অকশনে নামবো। সরকারী দলের ক্ষমতা আর টাকার দাপটে কয়েকজন হয়তো প্রতিপক্ষ শিবিরে যোগ দিবো। আর আওয়ামি বিদ্রোহীরা খুব স্বাভাবিক ভাবেই আওয়ামিগীরি দেখাইয়া পরবর্তী নির্বাচন পর্যন্ত পার করবো...
দেখা যাক।
মন্তব্য করুন