কারখানা...(চার)
বাড়ি ফেরার পথে একটা জটলা দেখে গাড়ি থামায় সাদ। গাড়িটা একটু সামনে নিয়ে পার্ক করে, টিপসি ফিলিঙের শরীর নিয়ে ভাসতে ভাসতে এগিয়ে গিয়ে দেখে অনেক লোকের ভীড়ের মাঝে একজন লোক প্রায় হাত-পা ছড়িয়ে কাঁদছে। তার মাথা তাৎক্ষণিক ভাবে কাজ করে না। একজনের কাঁধে হাত রেখে জিজ্ঞেস করে,
: কি হইছে ভাই?
: আর কইয়েন না এই লোকের মাইয়ার বিয়া সামনের রবিবার। মাইয়ার বয়স হইছে বিশের মতোন। পোলায় করে ব্যবসা। পোলার বাপে যৌতুক চাইছে ৩ লাখ টাকা নগদ আর একটা সোনার চেইন। তো সে এই টাকা যোগাড় করতে রক্তপানি কইরা গতো কয়দিন ধইরা এই দিক ঐদিকে দৌড়াইছে। এখনো পুরা টাকাটা কালেক্ট করবার পারে নাই। তো আইজকা রাইতে কোত্থেইকা হাজার দশেক টাকা আনছিলো।
এদ্দূর বলে সে খেয়াল করে সাদের মনোযোগ কতোটা রয়েছে কাহিনী শোনায়। তারপর আবার শুরু করে...
: এরমধ্যে তার পকেটে নাই রিকসা ভাড়া। হাইটাই বাড়ি ফিরতাছিলো। আর দেখতেই পাইতাছেন এইখানে রাস্তায় কোন বাত্তিবুত্তি নাই। হালার পোলাপাইনে করছে কি খাম্বার লগে দড়ি বাইন্ধা থুইয়া খাড়াইয়া আছিলো আন্ধারে। এই ব্যাটা দড়িতে উষ্টা খাইয়া পড়ছে পরথম, টাকার প্যাকেটটাও ছিটকাইয়া পড়ছে। পোলাপাইনে হেই প্যাকেট লইয়া দিছে দৌড়।
মানুষের এই অভ্যাসটা সাদের দারুণ লাগে। তার প্রশ্নের জবাবটা এই লোক দিতে পারতো এক বাক্যে। কিন্তু কতো আন্তরিকতার সাথে পুরো সিচ্যুয়েশানটাকে ডেসক্রাইব করলো। টিপসি মেজাজের সাদের কাছে মনে হয় এই মানুষগুলোই তাদের মতো ননক্রিয়েটিভদের বাঁচিয়ে রেখেছ। এরা গল্প করতে ভালোবাসে, গল্প শুনতে ভালোবাসে। আর ভালোবাসে বিপদে পড়তে, প্রতারিত হতে। আর তাই নাকের কান্না আর চোখের জলেই বিক্রী হয়ে যায় ম্যাজিক টুথ পাউডার, ফেয়ার এ্যান্ড লাভলি। মেয়েটা কি ফেয়ার অ্যান্ড লাভলী মেখে ফর্শা হওয়ার চেষ্টা করেছে কখনো!? সাদের মনে হতে থাকে অসহায় এই পিতার মুক্তির একমাত্র উপায় এখন ফেয়ার অ্যান্ড লাভলী। আজিব! রুনা থাকলে এখন মেইল শভিনিস্ট গালি শুনতে হতো।
সাদ কী আসলেই মেইল শভিনিস্ট!
নিজেকে কখনোই তার শভিনিস্ট লাগেনা। অনেক পুরুষের চাইতে সে রিজনেবল। নইলে তো পদে পদে ম্যানিপ্যুলেট করতে পারতো নিরুপমাকে। অথবা রুনাই বা কতটা ফেমিনিজম বোঝে? তার কাছে মনে হতো রুনা বরং একজন পুরুষের মতোই হতে চায়। এই সোসাইটি ঠিক যেরকম ছাঁচে একজন পুরুষের আইকন তৈরী করে, রুনা ঠিক তেমন একজন নারী হতে চেয়েছে। আসলে সে পুরুষের সুবিধাগুলি ভোগ করতে চেয়েছে। আধিপত্যের জায়গা থেকে পুরুষ যেভাবে স্বাধীনতা ভোগ করে, রুনা ঠিক সেসবই চেয়েছে বলে মনে হয় সাদের। এটা কি পিছিয়ে থাকা জনগোষ্ঠীর বেইসিক অ্যাটিচিউড? সে সব সময় তার চাই প্রিভিলেজ্ড গোষ্ঠীর মতো হতে চায়? কে জানে! হয়তো সাদ একজন পুরুষ বলেই এভাবে ভাবছে। নারীরা হয়তো মানুষের স্বাধীনতা বলতে অন্য কোন আচরণকেই বোঝে। শরীরের রাজনীতির কারনে পুরুষ আর নারীতে কি অনেক তফাৎ!? চিন্তাটা গুছিয়ে আনতে পারে না সাদ। আর তাই চিন্তা বাদ দিয়ে গাড়ির দিকে রওনা দিয়েও আবার ফিরে আসে। পকেট থেকে মানিব্যাগ বের করে দেখে হাজার দুয়েক টাকা আছে। ভীড় ঠেলে এগিয়ে গিয়ে লোকটার হাত টেনে মুঠোর মধ্যে টাকাটা গুজে দিয়েই বেরিয়ে আসে কারো দিকে না তাকিয়ে।
গাড়িটাকে গ্যারাজে ঢুকিয়ে বেইজমেন্ট থেকেই লিফটে উঠে যায় সে। ঢাকার মানুষ এখন আসলেই অনেক ইনসিকিওর্ড। যে কোনো সময় যে কারো উপর হামলা হতে পারে। ঠেকাবার মতোন সাধ বা সাধ্য কোনোটাই নেই এই স্টেইটের। নিরুপমাকে কি এমন কোনো গ্রুপের হাতে সপে দেয়া যায়? চিন্তাটা খুব খেলো লাগে সাদের। ভাড়াটিয়া খুনীদের বের করতে তো পুলিশের দুই-তিনদিনও লাগে না দেখা যায়। খুনটা একেবারেই নিজের হাতে সারতে হবে।
কফিতে পটাশিয়াম ক্লোরাইড ঢেলে দিলে কেমন হয়? রক্তের সাথে মিশে যাওয়ার পর হৃদস্পন্দন বন্ধ হতে নাকি সেকেন্ড বিশেক লাগে। জুডিশিয়াল এক্সিকিউশনে এটার ব্যবহার পশ্চিমে বেশ জনপ্রিয়। কিন্তু ওরা তো শুনেছে শরীরে ইঞ্জেক্ট করে, খেলে পরে কি হবে কে জানে...জাহিদকে ফোন করে বিষয়টা জানতে হবে। সাদের মনে হয় সাহিত্য না পড়ে ফার্মাসি পড়লে এখন কাজে দিতো...





আগের পর্বগুলো পড়ে আসি।
বউ খুন করা প্রমোট করছেন নাকি?
নিরুপমা কি আসলেই খুন হবে?
আগের তিন পর্ব পরে আসলাম। পরের পর্ব এখনই পড়তে ইচ্ছে করছে। চরম কৌতুহল নিয়ে অপেক্ষয় থাকলাম।
দারুন। গল্পের সাথে মিশে গেছি। কী হয়...
একসাথে কয়েক পর্ব করে পড়বো বলে রেখে দিয়েছি আপনার সিরিজটা। এখানে একটা দর্শনের আভাস পাচ্ছি।
সবগুলো পর্ব একসাথে পড়লাম, ঘটণার ধারাবাহিকতা একটু পিছলে গেছে কিন্তু এই সিরিজটা আমার কাছে ব্যতিক্রমি লাগছে, আমাদের এখানে এমন মনস্তত্বের গল্প দেখা যায় না। ভাস্করদা, গল্প রচণায় আপনার সাফল্য কামনা করছি। অলরেডি সাফল্য আসলে (জানা নাই) অভিনন্দন।
দারুন আগাইছে...
সিরিজটা শেষ কইরেন ভাষ্কর'দা
মন্তব্য করুন