কারখানা...(সাত)
ঘরে ঢুকতেই সাদ দেখে রুনা কিচেনে ঢুকছে। সে টিপটো করে কিচেনের দিকে গেলে দেখে রুনা তার প্রিয় চিঙড়ি ভুনা করছে নারিকেল দিয়ে। সাদ রুনার ঠিক পেছনে গিয়ে দাঁড়ায়, পেছন ফিরে তাকায় আলভী। ওকে রুনার টিশার্ট আর ট্রাউজারে কেমন উদ্ভট দেখাচ্ছে। আলভী রান্নাঘরে সাদের পছন্দের ডিশ রান্না করছে বিষয়টা কেমন অস্বস্তিকর লাগে সাদের কাছে। আলভীও কেমন অপ্রকৃতিস্থের মতোন হেসে হাত বাড়িয়ে দেয় তার দিকে। সাদ হাত ধরতে গিয়ে দেখে হাত কই! এতো পাখির পালক। আলভী কিম্বা রুনা, রুনা কিম্বা আলভী পালক ছাড়িয়ে নিয়ে ছুটে বেরিয়ে যায় কিচেন থেকে। সাদও তার পেছনে ছুটে যায়...ব্যালকনিতে গিয়ে ঘুরে দাঁড়ায় নিরুপমা, সাদের দিকে তাকিয়ে বিভৎস স্বরে আঙুল তুলে বাচ্চাদের মতোন লাফিয়ে লাফিয়ে বলতে থাকে,
: তুমি খুনী, তুমি খুনী...হা হা হা!
পাখা মেলে দেয় আলভী অথবা রুনা কিম্বা নিরুপমা। ব্যালকনির গ্রীল ধরে দাঁড়ালে সাদ দেখে একটা সাদা চিল উড়ে যাচ্ছে, তার পায়ের সাথে একটা সুন্দর অ্যালিগেটরের চামড়ার স্যুটকেস নিয়ে। সাদের বুক গুমড়ে কান্না আসে, কিন্তু সে কাঁদতে পারে না একেবারেই...
ধরফরিয়ে ঘুম থেকে উঠে যায় সাদ। বুকে চাপ চাপ ব্যথা অনুভব করে। স্বপ্নটা মনে পড়তে শূন্য শূন্য লাগে তার। পাখিটা তাকে একা রেখে কেমন উড়ে যায়। ছ-সাত ’মাস ধরে সে একা থাকছে কিন্তু এমন অদ্ভুত স্বপ্নের সাথে তার বসবাস ছিলো না কখনো। সাদের একটু শিউড়ে যাওয়া অনুভূতি হয়। মনে হয় সে অনেক একা হয়ে যাচ্ছে। সে মনে করতে পারে না শেষ কবে এমন ভোররাতে ঘুম ভেঙে গিয়েছিলো তার। একটা সিগারেট ধরিয়ে সে বারান্দায় এসে দাঁড়ায়। স্ট্রিট ল্যাম্প ছাড়াও বেশকিছু বাড়ির জানালায় আলো দেখতে পায় সাদ। আরো অনেকেই ঘুম ভেঙে যাওয়ার পর জেগে গিয়েছে তার মতোন...এমন করে ভাবতে তার ভালো লাগে। সিগারেটটা শেষ করে আবারো বিছানায় এসে চোখ বুজে ঘুমাতে চেষ্টা করে সাদ। কিন্তু সে বুঝতে পারে আজকে রাতে হয়তো আর ঘুমটা আসবে না। কাল সকাল ১০টায় একটা প্রেজেন্টেশান আছে। না ঘুমিয়ে বিধ্বস্ত চেহারা নিয়ে ক্যাম্পেইন ডিজাইন প্রেজেন্ট করতে হবে ভাবতেই তার ভয় লাগে। কি অদ্ভুত! এমন না ঘুমিয়ে তো তার কতোরাত গেছে! আর এই ক’দিনের নিয়মতান্ত্রিক অভ্যাস তাকে কেমন গোবেচারা মিডলক্লাসে পরিণত করেছে ভাবতেই সাদের গা গুলায়।
তার মনে পড়ে স্বৈরাচার বিরোধী ঝঞ্ঝা বিক্ষুব্ধ সময়ের কথা। সে আর আলভী মিলে সেনাবাহিনী-পুলিশ-বিডিআরের চোখে ধুলো দিয়ে হাতে লেখা পোস্টার সাটতে বেরোত মধ্যরাতে। কামরুল ভাইয়ের ধমকেও তারা ভড়কে যায়নি। টানা চলতে থাকা কার্ফিউ ভেঙে রাতের সুনসান রাস্তায় তারা হাটতে বেড়োত নিয়ম ভাঙতে। পোস্টার সাটা’র অযূহাতটা ছিলো দলের নেতাদের ধমক থেকে পিঠ বাঁচানোর কৌশল। মাঝেমাঝে প্রেসক্লাব পার হয়ে হাইকোর্টের মাজারে ঢুকে গাঁজায় দম দিয়ে ডিসেম্বরের শীতকে জয় করার সাধনায় সপে দিতো দু’জনার শরীর।
ঐ বয়সে শরীর একদম নিজের বশ ছিলো, আর আজ শরীর তবে কার বশ!? শরীর আজ কার ইচ্ছায় পাখা মেলে দেয় তার নিজস্ব জগতে? সেই খানে সাদের প্রবেশাধিকার নেই। শরীর তার নিজের প্রয়োজনেই সাদে দিয়ে রুটিন বানায়। নিয়ম করে এক্সারসাইজ আর প্রোটিন ভক্ষণ। হঠাৎ তার মনে পড়ে স্বপ্নটা সে ভোর রাতে দেখেছে। ভোর রাতের স্বপ্ন কি সিগনিফাই করে? আদৌ কি কোনো কিছু সিগনিফাই করে স্বপ্ন? গতোকিছুদিন সে যেসব ঘটনার ভেতর দিয়ে যাচ্ছে, যেসব প্রত্যাশা কিম্বা নিরাশা অথবা হতাশার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে তারইতো রিফ্লেকটেড রিয়ালিটি আজকের স্বপ্ন। এর মাঝে বেশি কিছু খুঁজতে যাওয়াটা বরং অন্যায়। হঠাৎ একটা শব্দে সাদ চমকে ওঠে। কিছু একটা উড়ে এসে আছড়ে পড়ে স্লাইডিং উইন্ডোতে...মধ্যরাতে পথ হারানো বাদুর? নাকি সেই সাদা চিলটা?
আসলেই কিছু আছড়ে পড়লো? নাকি শব্দটা তার হেল্যুজিনেশন ভাবতে ভাবতেই সাদের ঘুম চলে আসে। বেলায়েতের প্রলয়ংকরী দরোজা ধাক্কানোর শব্দে যখন তার ঘুম ভাঙে তখন ৯টা বেজে ২০ নিয়মতান্ত্রিক সাদের হাতে শেইভ করার সময়টা কেবল আছে। তাড়াহুড়ো করে সব সেরে গাড়ি বের করতে করতে সাদের মনে হয় সে বুড়ো হয়ে যাচ্ছে...





এটা দেখে লগ ইন না করে পারলাম না। অসাধারণ। আর আপনাকে অশেষ ধন্যবাদ রেগুলার পাচ্ছি বলে।
স্বপ্ন দৃশ্যটা বোঝা যাচ্ছিল পড়তে পড়তে যে এটা স্বপ্ন দৃশ্য আঁকছেন।
চালায়ে যান।
তানবীরা'প্পু ঠিক বলেছেন।
মন্তব্য করুন