অন্ধকারের উৎস থেকে তিনি আলোকবার্তা নিয়ে এলেন...
একদিন যা কিছু স্পষ্ট মনে হয়েছিল
সে-সব এখন আর স্থির
নির্ধারিত সত্য নয়;
আলো বেড়ে গেছে; আবছায়া আরো
বেড়ে গেছে;
--- আমাদের বুদ্ধি আজ; জীবননানন্দ দাশ
ভূমিকায় অহমিকা
"কোনো বিষয়ে বিশ্বাস স্থাপনের পর কি আর আলোচনার কোনো স্কোপ থাকে?" দর্শনবিদ্যায় প্রাতিষ্ঠানিক ডিগ্রী নেওয়ার প্রথম কেলাসে শিক্ষক জিগাইলেন। হা কইরা বইসা থাকা ছাত্রী-ছাত্রদের মুখের সামনে দিয়া মাছি ওড়ে কিন্তু চিন্তার কোনো দেখা নাই। বরং কিছু বুদ্ধিমানের হৃৎপিন্ডে ছ্যাৎ কইরা উঠে। তন্মধ্যে আমি ও আরেকজন কবি-গল্পকার রায়হান রাইন কিঞ্চিত আগ্রহ বোধ করি, কারণ আমরা এই প্রশ্নের উত্তর জানতাম। শিক্ষক দর্শন কী ও তার স্বরূপ বিষয়ে আলোচনা করতে গিয়া ধর্মের সাথে দর্শনের সম্পর্কজাত প্রপঞ্চ বিষয়ে সম্ভবতঃ ছাত্রী-ছাত্রদের মনোভাব বুইঝা নিতে চাইতেছিলেন। তার আলোচনায় না ধর্ম-না দর্শনের বিষয়গুলি প্রাধান্য পাইতেছিলো; কেবল কিছু প্রশ্নমালা দিয়া আগামীদিনে যাদের সাথে তার দীর্ঘ সময় কাটবো তাদের মনস্তত্ত্বের ধরণ আচ করতে চাইতেছিলেন। আর তাই রায়হানের না-বাচক জবাবে তিনি খানিক হাসিমাখা মুখে আলোচনা শুরু করেন আবার। এই ঘটনাটা প্রায় দশ বছর পর আমার মনে পইড়া যায় আকবর আলি খানের প্রবন্ধ সংকলন অন্ধকারের উৎস হতে পড়তে শুরু করার খানিক পরেই। তিনি আমাদের সামাজিক তথ্যায়ণে হাত দিছেন একেবারে। গাছের শেকড়ে নয়, আমের মুকুলে নয় আকবর আলি খান কবি জীবনানন্দ দাশ সম্পর্কে আমাদের ধারণার বিচিতে হাত দিছেন। চিন্তার অংকুরোদগমের জন্য যথেষ্ঠ প্রয়োজনীয় পটভূমি। সম্ভবতঃ বাংলা সাহিত্যের সবচে' জনপ্রিয় ১০ কবিতার একটা বনলতা সেন বিষয়ে মানুষের বেইসিক বিশ্বাসের মূলে তিনি কুঠারাঘাত করতে চাইছেন। বিশ্বাসের আছর সরাইয়া তিনি আলোচনার ক্ষেত্র তৈরী করতে চাইছেন।
ইস্কুল বয়সে মায়ের মাস্টারীর চাকরীর ফেয়ারওয়েলে পাওয়া খান ব্রাদার্স প্রকাশিত রনেশ দাশগুপ্ত সম্পাদিত জীবনানন্দ দাশের কবিতা সংগ্রহের যেই কবিতা কিশোর মনে দাগ কাটছিলো তার নাম বনলতা সেন। আমি সেই কবিতার পায়ে পায়ে হাজার হাজার বছর পৃথিবীর পথে হাটতাম। কোমল কোমল প্রেমানুভূতি নিয়া বনলতা সেনের সামনে গিয়া বসতাম। তার পান পাতা মুখ থেইকা যখন উচ্চারিত হইতো "এতোদিন কোথায় ছিলেন?" আমার কৈশোরক অস্থিরতার আশ্রয়স্থল হইতো তার পাখির নীড়ের মতোন চোখ যূগলে। কিশোর বয়সের রোমাঞ্চ হয়তো, কিন্তু এই প্রেমময়তারে কখনোই উপেক্ষিত হইতে দেখি নাই। কবিতাপ্রেমী বেশিরভাগ মানুষের কাছে জীবনানন্দের রোমান্টিকতা বিষয়ক বিবৃতি শোনার ফাকেই একদিন রাত্রী নামের একটা কবিতা জীবনানন্দ সম্পর্কে আমার ধারণা বেশ খানিকটা পাল্টাইয়া দিলো। যদিও বনলতা সেন তখনো স্বপ্নময়তায় মোড়ানো। অনেক বাধা পেড়িয়ে যাওয়ার পর পাওয়া স্নিগ্ধ রাপুনযেল।
জীবনানন্দের রাত্রী কবিতার চিত্রকল্পে আমি একজন নাগরিক মানুষের অন্তরের ছোঁয়া খু্ইজা পাওয়ার পর কবির আরো অনেক কবিতায়ই নৈসর্গের ফাকে ঝোঁকে নাগরিকতার প্রকাশ খুঁইজা পাইতে শুরু করলাম। তার ক্যাম্পে , নগ্ন নির্জন হাত, ঘাস, কমলালেবু নানা কবিতায় গ্রামীণ পটভূমিকা আর নিসর্গের উল্লেখ সত্ত্বেও দেখার চোখটারে নাগরিকত্বের প্রতিভূই লাগলো আমার। রূপসী বাংলার কবি "এইখানে সরোজিনি শুয়ে আছে..." শীর্ষক প্যারাডক্সে প্রবেশ করছেন প্রথম জমানাতেই। বিশ্ববিদ্যালয়ে যাওয়ার পর পরিচয় ঘটলো বাংলার শিক্ষক খালেদ হুসাইনের সাথে, তখন তিনি বাংলা একাডেমীতে ফেলোশীপ করতেছেন। তার মূল প্রতিপাদ্য নাগরিক জীবনানন্দের অনুসন্ধান। আকবর আলি খান সাহেবের প্রবন্ধের সংকলন নিয়া আলোচনা করতে গিয়া যেনো নিজের কথাই বলতেছি। নিজের উপলব্ধিগুলি বলার কারণ, প্রতিনিয়তঃ এমন পরিবর্তীত পটভূমিকায় জীবনানন্দ দাশরে দেখতে অভ্যস্ত হইতে শুরু করার আকাঙ্খা, যার উল্লেখ আমার সবসময়ই প্রয়োজনীয় মনে হয়। এই কারনেই কল্লোল যূগের পাঁচ কবির মধ্যে জীবনানন্দ দাশ আলাদা হইয়া যান তার রহস্যময়তা দিয়া। তার বিরুদ্ধে অশ্লীলতার অভিযোগ আসে, তার বিরুদ্ধে আনস্মার্টনেসের অভিযোগও ছিলো। আবার সকল অভিযোগই ক্রমশ বিলীন হইছে কালের প্রবাহে। তিনি দুঃখবাদী লাইন লিখতে লিখতে অনেকের সামনে দুঃখবাদি হিসেবে দাঁড়ান, আবার বেপরোয়া লাইনেও তার খ্যাতি আছে।
জ্যোছনার আঁচল সরিয়ে তিনি আঁধার দেখেন
আকবর আলি খান শেষ সামরিক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ছিলেন। সরকারী আমলা হিসাবে তার খ্যাতি আছে। তিনি সম্ভবতঃ রাষ্ট্রদূত ছিলেন বাংলাদেশ সরকারের। অর্থনীতি বিষয়ে তিনি দেশের প্রাজ্ঞব্যক্তিদের মধ্যে একজন। টেলিভিশনের পর্দায় এই লোকের আধবোঁজা চোখে কথা বলবার ধরনে বেশ আনন্দ পাইলেও তারে ৬০দশকের ভালো ছাত্র, ইপিসিএস পাস দেওয়া সরকারী আমলা ছাড়া অন্য কিছূ ভাবতে পারি নাই। পত্রিকার পাতায় কখনো সখনো তার লেখা কলাম পড়া হইছে কিন্তু লেখক হিসাবে তেমন নামডাক না থাকাতে দৈনিক কাগজের অন্যান্য লেখার মতোই তার গুরুত্ব ক্যালেন্ডার উল্টাইলেই সমাপ্তি টানছে। এই জীবনে হয়তো সমকালীন অর্থনীতি বিষয়ক নন-ফিকশন হাতে নিয়া উল্টাইয়া পাল্টাইয়া দেখছি, যদিও আদতে তেমন মনোযোগ দিতে পারি নাই। অতএব আকবর আলি খান আমার পছন্দের পাঠ্য হিসেবে বিবেচিত হন নাই কখনো। অর্থনীতি বিষয়ক লেখক হিসাবে একমাত্র পরিচিত বন্ধু শওকত হোসেন মাসুম প্রায়শঃই তার করা অনুধাবনের কথা উল্লেখ করেন আড্ডায়-ব্লগ পোস্টে। তেমনি এক উল্লেখে তার অন্ধকারের উৎস হতে বইখানার নামটা আসে জীবনানন্দের বনলতা সেন বিষয়ক নতুন চিন্তা নিয়া বলতে গিয়া। এই বিপরীত ধর্মী চিন্তার পরিচয়েই প্রথম আগ্রহের সূত্রপাত।
মেলায় ২০% কমিশনের পরেও বইটার দাম ছিলো ৫৫৬ টাকা। এতো দাম দিয়া কোনো অর্থনীতি আলোচকের বই কেনার আগ্রহ হয় নাই সেই সময়টায়। আজকাল তেমন বই কেনা না হইলেও আশেপাশের অনেক বন্ধুর বই কেনার অভ্যাসে আমারো পড়া হইয়া যায়। তেমনি একজনের পর্সোনাল কালেকশন থেইকা আকবর আলি খানরে নামাইলাম মুহুর্তের ইচ্ছায়। সাড়ে তিন পাতার ভূমিকাতেও লেখক অনুজ্জ্বল। তবে তার মূল প্রবন্ধের প্রস্তাবনা'র প্রথম লাইন যেনো চৌম্বক,
কাজিয়াতে আমার অরুচী নাই। সমাজবিজ্ঞানের যে সব শাখার সাথে আমার পরিচয় তাতে বিশেষ জ্ঞান কতোটুকু আছে জানিনে, তবে গলাবাজি রয়েছে এন্তার।
আমি মুগ্ধতা নিয়া একেবারে আঠার মতোন আটকাইলাম। প্রথমতঃ তর্করে উনি একেবারে দেশি ভাষায় কাজিয়া বলতেছেন! ইদানিং তর্ক বিষয়ে দেখি তরুণদের মধ্যেও আগ্রহ কম। এককথা-দুইকথার পর তিনকথা আসলেই আশেপাশে ভীড় কইমা যাইতে শুরু করে। সম্ভাব্য মল্লযুদ্ধের প্রত্যাশায় হয়তো কেউ কেউ গ্যালারীতে বসে। কিন্তু তর্ক বা কাজিয়া হারাইয়া যায়। আর দ্বিতীয়তঃ দীর্ঘ দ্বিতীয় বাক্যের দ্বিতীয় অংশ। অক্ষরবৃত্ত ছন্দে গ্রন্থিতে লাইনটারে বেশ কাব্যিক ঠেকে। "তবে গলাবাজি রয়েছে এন্তার" এমন শব্দ পছন্দও আমার তারুণ্যের মনে হয়। তিনি ধীরে ধীরে তার প্রস্তাবনারে গুছিয়ে লেখেন। তার লেখার বাক্যে শব্দ বাছাই বেশ সুনির্দিষ্ট লাগে। তবে তার বাক্য কাঠামোর সরলতায় আমি ডুবি। এভাবেই শুরু হয় বাংলা সাহিত্যের সম্ভাব্য একটা তর্ক পরিস্থিতি বিনির্মাণের সাথে পরিচয় পর্ব।
সরকারী প্রশাসনে চাকরীর শুরুতে লেখক পনর দিনের জন্য শিক্ষানবিস হিসাবে নাটোরে ছিলেন। এই সময়টায় তেমন কাজ না থাকায় তিনি নাটোরের বনলতা সেন'এর বিষয়ক তথ্য সংগ্রহ আর রীতি অনুযায়ী মহকুমা প্রশাসকদের রিপোর্ট পড়ার সিদ্ধান্ত নেন। মহকুমা প্রশাসকদের লেখায় বনলতা সেন'এর কোনো উল্লেখ না পাওয়ায় সে নাটোরবাসী বিভিন্ন শ্রেণী-পেশার মানুষদের মধ্যে ইনভেস্টিগেট করার সিদ্ধান্ত নিলে তাতেও কিছু পাইলেন না। এরপর তিনি হাত দেন পুরানো দলিল-দস্তাবেজে। যদিও পুরনো নথিতে জীবনানন্দের বা তার বনলতা সেনের উল্লেখ পাওয়ার কোনো সম্ভাবনা ছিলো না, তবু পাঠাভ্যাসের আগ্রহ থেকে নাড়াচাড়া করতে করতে তার মনোযোগ কাড়ে একটা তথ্য। বিংশ শতকের গোড়া থেকেই প্রায় সব প্রশাসকেরাই নাটোরের রূপজীবীতা পেশা নিয়ে উল্লেখ কইরা গেছেন দেখতে পান তিনি। উত্তর বঙ্গের প্রায় সকল জমিদারদের মনোরঞ্জনেই নাটোরের রুপজীবী নারীদের ডাক পড়তো। নাটোর শহরের এমন তথ্য উদ্ধারের পরও তিনি প্রায় ত্রিশ বছর কারো সাথে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করেন নাই। তার ভাষায়
প্রায় ত্রিশ বছর অপেক্ষা করে দেখলাম যে এ বিষয়ে কেউ ভাবছেন না। অনেক দ্বিধা দ্বন্দ্বের পর ২০০০ সালে পরার্থপরতার অর্থনীতি বইয়ে সাহস করে দুটি অনুচ্ছেদে বনলতার প্রসঙ্গটি উল্লেখ করি।
তাঁর এই হাইপোথিসিস হয়তো যৌক্তিক বচন হিসেবে অনেক শক্তিশালী লাগে না। কিন্তু আলোচনার ক্ষেত্র তৈরী করার জন্য যথেষ্ঠ। একজন পাঠক হিসেবে আমি আবারো লেখকের "সাহস" বিষয়ক উপলব্ধিতে মোহিত হয়ে পড়ি। আমলাতান্ত্রিক এই দেশের একজন আমলা তার সাহিত্য বিষয়ক উপলব্ধি প্রকাশে বিনয় ঝরাইলেন, এই বিনয় কেবল তার সাহসের প্রকাশরে মজবুত করে এমন না বরং তা পাঠকের গতিশীলতাও তৈরী করে। পরবর্তী আলোচনার পথে হাটবার মসৃনতা আনে। তার এই বিনয়ের আহবানে সাড়া দিয়া আগাইয়া আসেন একজন প্রাজ্ঞ সাহিত্যের শিক্ষক। আবু তাহের মজুমদার নামের এই শিক্ষক সত্তর দশকের একজন ব্যর্থ কবি। তিনি মূলতঃ জীবনানন্দ দাশের পারিবারিক আর সামাজিক অভিজ্ঞতালব্ধ নৈতিকতারে যুক্তি হিসাবে দাঁড় করান তার যুক্তি বচন হিসাবে। দেশের একাডেমিক আবহে রেফারেন্সের অভ্যাস তেমন না থাকায় তাঁর ১২ দফা যুক্তিবচনে তার প্রয়োগ দেখা যায় না। তিনি কবি জীবনানন্দের দারিদ্ররেও যুক্তি হিসাবে উপস্থিত করেন। বরিশাল থেকে নাটোর যাওয়ার খরচ কবি বহন করতে সমর্থ্য ছিলেন কীনা বা থাকলেও স্ত্রীকে তিনি কি দোহাই দিছিলেন এই ধরনের অ্যান্টি থিসিসে তিনি আকবর আলি খানের থিসিসরে ভুল প্রমাণিত করতে উদ্যোগী হন। কবি জীবনানন্দ একজন নৈতিক-সামাজিক মানুষ ছিলেন, একজন অন্ধকারের নারীর সঙ্গ তারে অপবিত্র কালিমা লেপন করবো এমন একটা অবস্থান নিয়া আ. তা. মজুমদার আলোচনা প্রচেষ্টায় নামেন। বিনয়ী আকবর আলি খান তার বক্তব্য হুবহু উৎকলিত করছেন তার প্রবন্ধে যাতে তার বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ দায়ের করা না হয়।
আইকন ভেঙে আইডিয়ালে
আকবর আলি খান বিনয়ী মানুষ। কোনো বক্তব্যেই ঔদ্ধত্যের প্রকাশ ঘটান না। আমলা হিসেবেও তিনি আমলাতন্ত্রের সামাজিক আইকন ভাঙেন বাইছা নেন আমলাতন্ত্রের আইডিয়ালরে। তিনি আ. তা. মজুমদারের অভিযোগ ধইরাই রচনার আঙ্গিক সাজাইছেন। পরিকল্পণার মেথোডলজি হিসাবে জনপ্রিয় কার্তেসীয় পদ্ধতিরে গ্রহণ না কইরা বরং থিসিস-অ্যান্টি থিসিস = সিন্থেসিস পদ্ধতিকে অধিক কার্যকরী হিসেবে দেখছেন। যেই কারনে বিরুদ্ধ বাক্যরে অসার প্রমাণের চাইতে নিজের বক্তব্যের সাথে বিভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গীর সমন্বয়ের মাধ্যমেই উপস্থাপন করেন তাঁর চিন্তারে। অধিবিদ্যার মতোন মেটান্যারেটিভরে প্রশ্ন না কইরা প্রতিপক্ষ হিসাবে নিজের ডিসকোর্সরে দাঁড় করান তিনি। কোনো উপর্যূক্ত সিদ্ধান্ত না দিয়া তিনি পাঠকের বিবেচনার উপর আস্থাশীল থাকেন। আর এই মেথোডের অংশ হিসাবে তিনি চারটা আলোচনার ক্ষেত্র চিহ্নিত করেন,
১. কবিতার অন্তর্দ্বন্দ্ব হিসাবে তার শব্দের বিশ্লেষণ।
২. জীবনানন্দকৃত ইংরেজী অনুবাদের বিশ্লেষণ।
৩. জীবনানন্দ লিখিত অন্যান্য কবিতায় বনলতা চরিত্রের বিশ্লেষণ।
৪. বনলতা সেন কবিতায় বিদেশি প্রভাব।
জীবনানন্দের বনলতা সেন কবিতার পঠনে আকবর আলি খান কেবল একটা কনস্ট্যান্ট ব্যবহার করছেন। এই কবিতার গাঁথুনি যে বৌদ্ধ ধর্মীয় প্রেক্ষাপট-কৃষ্টি-সভ্যতা-সংস্কৃতি'র উপর নির্ভর কইরা গইড়া উঠছে সেই বিষয়ে তিনি নিশ্চিত। চিত্রকল্প নির্মাণে জীবনানন্দ দাশ বৌদ্ধ ধর্ম আর গৌতম বুদ্ধের ঐতিহাসিকতায় সমর্পিত ছিলেন পুরাপুরি; কারণ কবি এই ধর্মাশ্রয়ী প্রেক্ষাপটের বিপরীতে মানসী প্রেমকেই বড় কইরা দেখাইতে চাইছেন বইলা তার ধারণা।
জীবনানন্দের স্বকৃত ইংরেজী অনুবাদের সাথে মূল কবিতার তুলনামূলক আলোচনায় লেখক বেশ কিছু অসামঞ্জস্যতা দেখাইলেন। এই অনুবাদ আগে দেখলেও এর দুর্বল আঙ্গিকের কারনে তেমন মনোযোগ দেয়ার প্রয়োজন অনুভব করি নাই। অথচ আকবর আলি খান দেখান মূল কবিতায় ব্যবহৃত "পাখির নীড়ের মতো চোখ" উপমাটা রীতিমতো গায়েব কবির নিজের ইংরেজী ভার্সনে। এর বাইরে অনুবাদে একজায়গায় wisdom শব্দের ব্যবহার আছে, লেখক এই wisdom-রে গ্রহণ করছেন প্রজ্ঞা অর্থে। এবং অতি অবশ্যই তারে বৌদ্ধধর্মীয় প্রজ্ঞা সম্পর্কীত জ্ঞানের সাথে মিলাইছেন। তবে বনলতা সেন কবিতার বিরুদ্ধে বিদেশী প্রভাবের যেই অভিযোগ উত্থাপিত হয় তারে তিনি যথাসম্ভব বাতিল করতে চেষ্টা করছেন।
উপসংহার
খানিকটা একাডেমিক ঘরানার কাঠামোতে উপস্থাপণ করলেও আকবর আলি খানের সুক্ষ স্যাটায়ারগুলি টের পাওয়া যায়। তিনি অনেক্ষেত্রেই প্রচল ধারণার বিপরীতে দাঁড়াইছেন বিনয়ের সাথে, কিন্তু শব্দ আর ক্রিয়াপদে অহমের উপস্থিতি আসছে মাঝেসাঝে, এই অহমরে যদিও নিজের উপর আস্থা হিসাবেও দেখার স্কোপ থাকে। বনলতা সেন-এর বৌদ্ধধর্ম সংশ্লিষ্টতা বিষয়ে তার বক্তব্য কিছুটা সিদ্ধান্তমূলক মনে হয়, রেফারেন্স আর ইতিহাসের সুনির্দিষ্ট ঘরানার ইন্টারপ্রিটেশন ব্যবহারের কারণে এইটা হইতে পারে। ভিন্ন কৌণিক দৃষ্টিভঙ্গী তিনি এড়াইয়া গেছেন কিছূ জায়গায়। যেমন অশোক রাজার ক্ষেত্রে তিনি কেবল তার নৃশংসতারেই আলোচনার প্রতিপাদ্য হিসাবে ব্যবহার করছেন। অন্যদিকে বিম্বিসার বিষয়ে তার পক্ষপাত থাকে।
বনলতা সেন নাটোরে বাস করা একজন রূপজীবী ছিলেন। এই সিদ্ধান্ত প্রমাণে তিনি ঠিক বিতার্কিকদের মতোন একটা রিজিড অবস্থান নিছেন। আর তা প্রমাণের জন্য প্রয়োজনীয় ম্যাটেরিয়ালের ব্যবহার করছেন প্রবন্ধে। কিছুক্ষেত্রে অ্যান্টিথিসিস হিসাবে উপস্থাপিত উপাত্তগুলি যেনো ইচ্ছাপূর্বকই খানিকটা দূর্বল রাখা হইছে বইলা মনে হয়। এর কারণ লেখকের বিনয়ী স্বরও হইতে পারে। যারে খানিকটা ইনকনফিডেন্টও লাগে ক্ষেত্রবিশেষে। তবে সামগ্রীক উপস্থাপনে বনলতা সেন বিষয়ে তার ধারণা বেশ শক্তপোক্তই লাগে। এই প্রবন্ধের বিপরীতে বরং আব্দুল মান্নান সৈয়দ কিম্বা আ. তা. মজুমদারের বক্তব্য খানিকটা শিশুতোষ বিশ্বাস ও সামাজিক নৈতিকতা নির্ভর মনে হয়। তবে আকবর আলি খান এমনিতেই আমার কাছে উল্লেখযোগ্য হইয়া উঠছেন ইতোমধ্যে প্রচল বিশ্বাসরে প্রশ্ন করতে পারার সামর্থ্যের কারনে।





নিমগ্ন পাঠকের মতো পড়লাম। একটানে। অনেক ধন্যবাদ। বইটি পড়তেই হবে।
আপনি সফল... আমার ভিতরে উনার লেখা পড়বার আগ্রহ জোরে-শোরে জেগে উঠেছে...
তাহলে কি বলতে চাইছেন, জীবু বাবু মনে মনে মনকলা খেয়েছিলেন?!! হু হু।
সত্যি সত্যি কারো চোখ পাখির নীড়ের মতো হলে মার ডালা কেস হবে অবশ্য
আমি তাঁর বেশ পুরোনো ভক্ত। বিভিন্ন সময়ে মুখোমুখি কথা হয়েছিল তাঁর সাথে। আমলা শব্দটা ঠিক তাঁর জন্য খাটে না। আর পরার্থপরতার অর্থনীতি বইটা অবশ্যই সবারই পড়া উচিৎ। অবশ্য পাঠ্য একটা বই।
মন্তব্য করুন