ব্লগরব্লগর
দারিদ্র অবস্থাটারে আমার বেশ রহস্যময় লাগে। এক্কেবারে শীতের কুয়াশার মতোন। ঘন কুয়াশার দেয়াল ভেদ কইরা মাঝে সাঝেই কিছু দেখা যায় না, এরম সময় মনে হয় কুয়াশার ঐপারে যাওনটা অসম্ভব! কিন্তু বাস্তবতাটাও কিন্তু স্মরণে থাকে...কুয়াশার দেয়াল আসলে দেয়ালই না; এইটারে আস্তরণ বলা যাইতে পারে। যার মধ্যে মায়াবী একরম ব্যাপার আছে। একটা নির্দিষ্ট নিয়ম মাইনা সে আসলে ঘিরা রাখে মানুষরে. সাথে মানসরেও। একটা ভয় থাকে, যেইটা ভীষণরকম বাস্তবমূখী। সামনাসামনি সংঘর্ষের। যতোখানি দূরত্বে থাকলে সতর্ক হইয়া যাওয়া যায় তারচাইতে কাছে আসনের পর আসলে সামনের গতিশীল বস্তু বা মানুষ দৃশ্যমান হয়। এই কারনে একান্ত প্রয়োজন না থাকলে কুয়াশায় সাধারণতঃ খুব বেশি আগাইয়া যাওয়া হয় না। কুয়াশার রহস্য ভাঙতে না পাইরা মানুষ স্থবিরতারেই সহজ সমাধান মনে করে। অপেক্ষা করে কখন কুয়াশা কাটবো। কখন রোদ্দুরের ক্ষমতায় কুয়াশা দূর কোথাও ছিটকাইয়া পড়বো। দারিদ্ররেও আমার এমন লাগে। দারিদ্র মানুষের চরিত্রে এমন রহস্যময়তা আরোপ করে, কখন যে সে প্রলেতারিয়েত কখন যে সে লুম্পেন আবার কখন যে সে বিপ্লবী হইয়া উঠবো তা কেউ নিশ্চিত কইরা বলতে পারে না। আর মধ্যবিত্ত যখন দারিদ্র বরণ করে শ্রেণীর সহজ সূত্রে তার মধ্যবিত্তসুলভ লুকোছাপার আচরণ পাল্টানের কথা থাকলেও সে আসলে আরো চাদরে মুড়ি দিয়া চলে। সে না পারে তার চাইতে উচ্চবিত্তধারী মানুষের সাথে মিশতে, না পারে সে স্বগোত্রীয় বা স্ব-শ্রেণীর মানুষের সাথে স্বাভাবিক হইতে। মধ্যবিত্তের বিত্ত গেলেও অহমটা থাকে ষোলআনা। এর ব্যত্যয় অবশ্য ঘটে, কিন্তু সেইটা সামাজিক বিবেচনা মানা কোনো উদাহরণ না, বরং তারে অসামাজিক বলা চলে। আমি জীবনে অধিকাংশ মাদকাসক্ত মধ্যবিত্তরেই তার শ্রেণী বিচ্যূতিরে মাইনা নিয়া চলতে ফিরতে দেখছি। মধ্যবিত্তের অহম-সুপার হিরো হইয়া উঠার তাগীদ এই ধরনের মানুষে খুবেকটা থাকে না। এমনকি মাদকাসক্ত কবিরে দেখছি খ্যাতির চাইতে আবেগ বেশি তাড়না দেয়। এই কারনেই মনে হয় দাদা'বাদী কিম্বা বীটনিকগো মধ্যে নেশা অথবা আরো সামাজিক মূল্যবোধের বিরুদ্ধাচারণ করবার স্বতঃ প্রণোদিত চেষ্টা ছিলো।
দারিদ্র'এর কারনে আমি কবির মতোন মহান হইতে পারি নাই কোনো কালে। আমি একেবারেই টিপিক্যাল মধ্যবিত্তসুলভ থাকছি। যেই কারনে কৈশোরে আমার তেমন একটা বন্ধুত্ব গইড়া উঠে নাই। নব্বইয়ের আন্দোলন না থাকলে হয়তো আমার জীবনের এই ভাগেই আমি নিভৃতচারী রহস্যময়তা নিয়া নিতে পারতাম। কিন্তু নব্বইয়ের তুমুল সময়গুলি আমার ভেতরকার অনেক দেয়াল আর মূল্যবোধ ভাইঙ্গা দিছিলো। পরিচয় ঘটছিলো অসাধারণ, বড় মাপের বিভিন্ন শ্রেণী-পেশার মানুষের সাথে। যাদের সামাজিক পরিচয়ে আমার উপরি-উপরি মধ্যবিত্তসুলভ আগ্রহ ছিলো, কিন্তু তাদের ভেতরকার মানুষটারে চেনার কোনো আগ্রহ হয় নাই তেমন। যেই সাগর ভাই আমারে ক্লাস এইটে থাকতে তার ট্রাকে চড়াইয়া দিনাজপুর নিয়া গেছিলো তার চাইতে আমার অধিক আপন হইয়া উঠছিলো শিক্ষিত জীবন ভাই। নব্বইয়ের আন্দোলন পরবর্তীকালে আমি ফিরতে পারছিলাম সাগর ভাইয়ের কাছে। মাঝেমধ্যে তার গল্প শুনতে শুনতে কখন যে রাত গভীর হইতো টেরও পাইতাম না।
তবে দারিদ্রের কারনে আমি জীবনের একটা বড় সময় সংকুচিত ছিলাম। বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের শুরুর ভাগে আমি রীতিমতোন মাদকাসক্ত মানুষ। ঐ সময়ে আমি নিজেও সেই চেনা কবির মতোন ছিলাম। তারমতোন প্রেসের পাশের বস্তিতে জীবনযাপন করতে হয় নাই অবশ্য, কারণ আবাসিক বিশ্ববিদ্যালয়ে থাকনের একটা জায়গা ছিলো। তবে সেই সময়ে বন্ধু ছিলো অনেক। কেবল মাদকাসক্তরাই না, অনেক সামাজিক মূল্যবোধের অমাদকাসক্ত বন্ধুও ছিলো। নেশা ছাইড়া বিপ্লবী হওয়ার মন্ত্রে যখন দীক্ষা নিলাম, ঐ সময়টাতে আমার কিছু কলিগ কমরেড আমার ব্যাপারে বেশ রিজার্ভ ছিলো। সিনিয়র কমরেডরা কিছু একটা বুইঝা আমারে সংগঠনের বিশ্ববিদ্যালয় ইউনিটের সাধারণ সম্পাদক হিসাবে আমার নাম প্রস্তাব করার পর সেই সব সমবয়সী কমরেডরা আমার নেতিবাচকতায় সমর্থন দিছিলো। মানে আমি যখন দায়িত্ব নিতে অস্বীকৃতি জানাইছিলাম, নিজের অযোগ্যতা জাহির করলাম, স্বাভাবিক নিয়মের বাইরে গিয়া তখন আমার এইসব বন্ধু সিনিয়রদের ভুল মনোনয়নরে বেশ প্রশ্নবিদ্ধ কইরা দিছিলো। অন্যান্য বামপন্থী সিনিয়রদের মতোই যদিও আমাদের বিশ্ববিদ্যালয় নেতৃত্বও একগুয়েমি দেখাইছিলো সেইদিন। তবে তারাও টেনশনে ছিলো। যখন সম্মেলন অনুষ্ঠানে নেতৃত্ব ঘোষণার পর্ব আসলো, তখন তারা বারবার আমারে যেকোনোধরনের পরিস্থিতির জন্য তৈরী হইতে বলতেছিলো। এর আগে জীবনে এমন কইরা মঞ্চে দাঁড়ানোর অভিজ্ঞতা ছিলো না আমার। আমি সেইদিন কেমন নির্বোধ হইয়া গেছিলাম। কোনো অনুভূতি কাজ করতেছিলো না। দারিদ্র আর মাদকাসক্ত সেইসব বন্ধুগো কথা ভাবতেছিলাম। যাদের নিষ্পৃহতায় অনেককিছু শিখবার আছে, তাদের কথা।
আমার জীবনের প্রথম মঞ্চে দাঁড়ানের অভিজ্ঞতা একেবারে খারাপ ছিলো না। এইটাতে গর্ববোধ করবার কিছু নাই যদিও, কিন্তু আমি আজকাল টের পাই মাদকে আসক্ত থাকবার সময় আমি অনেক জলের মতোন সরল ছিলাম। অনেক উন্মোচিত ছিলাম। সেই উন্মূক্ত মানুষ হয়তো কখনো সুপার হিরো হয় না। কিন্তু মানুষের কাছে তার সরলতা অ্যাকাউন্টেবল থাকে। তার মাদকাসক্তির সাথে হয়তো অনেকের বিরোধ থাকে। কিন্তু যদি সেই মাদকাসক্তিতে অ্যারোগ্যান্সি যুক্ত না হয় তাইলে একরমের ভালোবাসাও থাকে। এতো কথা মনে পড়লো গতো ২৫ ডিসেম্বর আমার বিশ্ববিদ্যালয় ব্যাচের বন্ধুদের রিউইনিয়ন অনুষ্ঠানে যোগ দেয়ার উত্তেজনায়। প্রায় ১৩/১৪ বছরের ব্যবধানে দেখা হওয়ার পর মধ্যবয়ষ্ক অনেকরে আমি চিনতেও পারি নাই। কিন্তু তাদের আবেগ আমারে স্পর্শ করছে। অধিকাংশ বন্ধু আমার বেপরোয়া জীবন, আমার এলোমেলো জীবনের কথা মনে রাখছে। তাদের কোনো বিরক্তি দেখি নাই সেইসব দিন নিয়া।
নিজেরে দরিদ্র মনে করায় কোনো মহত্ত্ব থাকতে পারে বইলা আমি বিশ্বাস করি না। দারিদ্র আর দরিদ্র এই দুই বিষয়রে এক কইরা দেখতে গেলে আসলে বিপদ নামে...





আমিও ছিলাম এক সময় , এখনও মনে হয় সেই স্বভাবটা রয়ে গেছে। দারিদ্র কত প্রকার ও কি কি - জীবন আমাকে দেখিয়েছে ভালো ভাবে।
লেখা ভালো লাগলো অনেক।
অমর্ত্য সেন বলছে, বাংলাদেশিদের আয় বেড়ে গেছে সাত/আট গুন তাই দেশে আর দরিদ্র নাই
চ্যানেল আই বার বার তাই দেখাচ্ছে টিভিতে, হাসিনা না জানি কত খুশি হচ্ছে এই দেখে
দারিদ্রের কারণে আমি এখনও সংকুচিত থাকি
দারিদ্র মোটেও মহান কিছু না... কাজী নজরুল ঠিক কী অর্থে এটাকে মহান বলেছিলেন জানি না..
কাজী নজরুল মনে হয় দারিদ্রের প্রলেতারিয়েত বৈশিষ্ঠ্যের কথা ভাইবা লিখছিলেন। বিদ্রোহ-বিপ্লব এইসব তো পূর্ব বাংলায় দারিদ্র পীড়িত মানুষের সম্বল ছিলো। তেভাগা কিম্বা নীল বিদ্রোহে গরীব কৃষকরা ছাড়া তো আর কোনো শ্রেণীর সেই অর্থে পারটিসিপেশন ছিলো না।
কে যেন লিখছিল, দরিদ্র থাকার বড় সুবিধা হল এ জন্য কোনো কষ্ট করতে হয় না।
মাসুম ভাই,
এই ধরনের কওয়াগুলি অনেক চটকদার হয়...তাৎক্ষণিকভাবে বিশ্বাস করতে ইচ্ছা হয়। কিন্তু "দরিদ্র থাকার জন্য কষ্ট করতে হয় না" না বইলা যদি বলা হয় "দরিদ্র থাকার জন্য শ্রম দিতে হয় না" তাইলে কি ঐ লোক যা বলতে চাইছে তা বলা হয়? একজন মধ্যবিত্তের মূল্যায়নে দারিদ্রের কষ্ট আর যে ঐ কষ্টের ভেতরে দিন অতিবাহিত করে তার কষ্টের অনুভূতি এক হওয়ার কথা না।
বিদ্যমান সমাজে অনেক শ্রম কিম্বা কষ্ট স্বীকার কইরাই মানুষ দরিদ্র থাকে। এইটা যে কেবল আমাদের বাংলাদেশের মতোন রাষ্ট্রের ক্ষেত্রেই ঘটে ব্যাপারটা একেবারেই তা না। আশির দশকের পর থেইকা কালোবাজারী-চোরাচালানী, অস্ত্র আর মাদক ব্যবসা সারা পৃথিবীর প্রায় সমস্ত বড় ধনীগো লেইগা মূল মন্ত্র হইয়া উঠছে। এইসব ধনীরা হয়তো ফোর্বসের প্রচ্ছদে স্থান পায় না। কিন্তু তারাই মিতাল বা অন্য কাওরে ঢালের মতোন সামনে রাখে। বৈষম্য বাড়তেছে এইটাও বাস্তবতা। উন্নত দেশগুলিতে হয়তো অধিকাংশের জন্য চাহিদা পূরণের ব্যবস্থা থাকে কিন্তু উন্নয়ণশীল দেশে সেইটাও হয় সংখ্যালঘু অনুপাতে। কৃষি বা শিল্প নির্ভর দেশগুলিতে শ্রমশোষণ কিম্বা উদ্বৃত্ত মূল্যের হার দিন দিন বাড়তেছেই। ইনফরম্যাটিক্স নির্ভর অর্থনীতি যাগো প্রধান অবলম্বন তারা তো বিশ্বাস করে "সারভাইভ্যাল অফ দ্য ফিটেস্ট"; কে মরলো বা কে হারাইলো এই ধরনের পরাজয়ের নমূণা ঐসব দেশে তথ্য হিসাবেই স্বীকৃতি পায় না। তথ্য হইলো কে বাঁচলো। কারণটাও খুব সহজ। বাঁচে গুটি কতক। আর নিঃস্ব হয় হরে দরে।
লেখাটা 'ব্লগর ব্লগর' শিরোনাম বয়ে বেড়াতে পারছেনা। ব্লগর ব্লগর শিরোনামের লেখাগুলো হয় মজারু।
এই লেখা আমি মোবাইল দিয়ে নেটে ঢুকে পড়েছি তাই কমেন্ট করতে পারিনি, কয়েকবার এটিতে চোখ বুলিয়েছি। লেখককে আমি ব্যক্তিগতভাবে চিনি কিন্তু এই লেখা পড়ে মনে হলো এই লেখক আমার পুরোই অচেনা। একজন মেধাবী-সম্ভবনাময় তরুণের বেদনাহত লেখাটি আমাকে কষ্টতাড়িত করেছে।
মন্তব্য করুন