ইউজার লগইন

ভুলে যাওয়া রুম নাম্বার কবিতারে আমি যেইভাবে বুঝতে পারি...

ঘাসফড়িঙের দল পাখায় বয়ে নিয়ে আসে ভেজা মাটির দুঃখবোধ, ধুলো ওড়া দুপুর
অপেক্ষারা ফিরে ফিরে আসে সিগারেটের ধোঁয়া, এসফল্ট পথ আর ধুলিময় জুতোজুড়ে
সন্ধ্যা নামে। শালিকের হলুদ কাজল আঁকা চোখে আঁধারের সরোদ
হাসি আর কথাগুলো ছড়িয়ে যায় সাতমসজিদ রোডে, আলো ও আঁধারে
ভুলে যাওয়া মুঠোফোন সংকেত ও সংবাদ
নিরব পথের খুনসুটি টেনে নিয়ে যায় সিঁড়িঘরে, বিদায়ের ক্ষণ।

কবিতার সাথে বৈরীতা আছে অনেকের। এই বৈরীতার দায় আসলে কার সেইটা সোশ্যাল সায়েন্সের বিষয় হইতে পারে। আমার মতোন নন-একাডেমিক মানুষের কান্ধে সেই গবেষণার ভার চাপাইতে চাওয়াটা ভেড়ায় চইড়া মরুভূমি পাড়ি দেওনের স্বপ্ন দেখার মতোন রিয়ালিটি হইবো। তয় কবিতার বোঝাবুঝি'র ধরণ বা মানসিকতার কিছু পদ্ধতিগত জটিলতা আমি একেবারেই সহজাত আগ্রহবশতঃ টের পাই। আমার প্রথমেই ছোটোবেলায় ইশকুলে থাকতে শেখা ব্যাকরণ বইয়ের ভাবসম্প্রসারনের কথা মনে পড়ে। ঐটার একটা ফরম্যাট ছিলো, শুরুতেই কইতে হইবো

"আলোচ্য অংশটুকু কবি রায়েহাত শুভ বিরচিত ভুলে যাওয়া রুম নাম্বার কবিতা থেকে নেওয়া হয়েছে। কবি এখানে প্রিয় মানুষ বা বন্ধুর বিদায় মুহুর্তে একজন ভাগ্যাহত দুখি মানুষের অনুভূতির কথা তুলে ধরেছেন...।" তারপর ব্লা ব্লা ব্লা...

কবিতা না বোঝার দায় পাঠকের নাকি লেখকের অতি রূপক বা মুখোশ প্রবণতা সেই বিচার আসলে অর্থহীন। ব্যাকরণ বইয়ের সংজ্ঞা অনুযায়ি কবিতার সংজ্ঞা হইলো, "যে সাহিত্য কাঠামোয় নান্দনিক উপায়ে অনুভূতি প্রকাশিত হয় কাল্পনিক অভিজ্ঞতা বিবৃত করার মধ্য দিয়ে; যার অর্থ-দ্যোতনা কিংবা ছন্দবদ্ধ বাক্যগঠনরীতি বর্ণনাধর্মীর বদলে আবেগের উপর নির্ভর করে, সর্বোপরি যে সাহিত্য উপস্থাপণরীতি অনেক ব্যক্তিগত অনুভূতির কথা বিবৃত করে তাকে কবিতা বলা হয়।" এখন অনেকে হয়তো কইতে পারেন "ভাই, এই সংজ্ঞা বুঝনের চাইতে কবিতা বুঝতে চাইতে পারার সাহসটা বরং সহজে আত্মস্থ করন যায়।" তার ভুল ধরনের কোনো অধিকার আমার নাই। তবে আমরা বিশ্বখ্যাত কবিগো কিছু সংজ্ঞায়ন প্রচেষ্টা ফলো করতে পারি,

ওয়ার্ডসওয়ার্থ কইছেন, " শক্তিময় অনুভূতির স্বতঃস্ফুর্ত-উপচে পড়া ধারার নাম কবিতা।"
এমিলি ডিকিনসন কইলেন,"কোনো লেখা পড়ার পর যখন আমার মনে হয় শরীর ঠাণ্ডা হইয়া আসছে, পৃথিবীর কোনো আগুনের পক্ষে তার উষ্ণতা ফিরাইয়া দেওয়া সম্ভব না, তখন বুঝতে পারি এই লেখা একটা কবিতা।"
ডিলান টমাসের মতে, " কবিতা হইলো সাহিত্যের সেই ধরণ যা আমারে হাসায়, কান্দায় কিম্বা বিবশ করে, যার সাড়ায় আমার পায়ের আঙুলের ডগা চমকাইয়া উঠে, যার শক্তিমত্তায় আমি এইটা-ঐটা করতে চাই অথবা কিছুই করতে আগ্রহ পাই না।"

এইসব সংজ্ঞা পইড়া কতোটা জ্ঞান লাভ অথবা কবিতা বোঝাবুঝির ট্রেনিং পাওয়া সম্ভব তা জানি না; তবে অনুমান করতে পারি কবিতা বিষয়টা যে বোঝাবুঝির বিষয় হিসাবে খুব জনপ্রিয় না সেইটা প্রাচীনকাল থেইকাই মাইনা নেয়া হইছে। কবিতা পারে কেবল আবেগ সম্প্রসারণ করতে। আমার মাঝে সাঝে প্রিয় চরিত্র শার্লক হোমস কবিতার ডিডাকশন কিভাবে করবো সেই বর্ণনা পড়ার সাধ হয়। এই সাধ অবশ্য আধুনিক জমানার শেষভাগে মানে ৬০'এর দশকে পরিচিত হইতে থাকা কাঠামোবাদ আর উত্তর-কাঠামোবাদী ব্যখ্যার কিছু বয়ানে খুঁইজা পাওয়ার সম্ভাবনা দেখি। এই সময়ের চিন্তাশীল দার্শনিকগো আলোচনায় বিশ্লেষণধর্মীতার কিছু পদ্ধতিগত তাত্ত্বিক প্ল্যাটফর্ম তৈরী হইছে। প্রাচীন আমলের "অর্থের পূননির্মাণ" বা "রিকনস্ট্রাকশন" সম্পর্কীত ধারণা বা ডিসকোর্স ভাইঙ্গা দিয়া যেইখানে "অর্থের অবিনির্মাণ" বা "ডিকনস্ট্রাকশন" বেদীমূল তৈরী করা হইছে। যেইখানে কবিতার শব্দের, কখনো বা শব্দবন্ধের সিগনিফিকেন্স ধরার চেষ্টা হয়। যেই পদ্ধতিগত আলোচনায় লব্ধস্বর খুঁইজা বের করা বা উপলব্ধের চেষ্টা থাকে। শব্দ যেইখানে আসলে আবেগের রাজনৈতিক চিহ্নায়ন ছাড়া কিছু না।

কবিতার বোঝাবুঝির বোঁঝা আমি সবসময় নিতে চাই না। মূলতঃ রোমকূপে অথবা ঠিক চোখের নীচের ত্বকে কাপুনিতেই কবিতা পড়ার মজাটা টের পাইতে ভালো লাগে। তবে কৈশোরকালে কবিতা পড়ার ভঙ্গী বিষয়ে একটা লেখা পইড়া অনুবাদ করছিলাম। সেই লেখার অনুপ্রেরণায় পঠনরীতির বিষয়টারে আমার অনেক সময় পাজল বা খেলার মতোন লাগে। শ্রদ্ধেয় বড় ভাই রায়হান ভাইয়ের কবিতা সম্পর্কীত অনাগ্রহ নিয়া আমার আগ্রহ ষোলআনা। তারে অনেক কাব্যধর্মী গদ্য বা আজকালকার মুক্তগদ্য নামের কাঠামোতে লেখালেখিতেও বেশ মন্তব্য করতে দেখি...অনেক দুর্বোধ্য লেখার সারমর্ম অনুসন্ধান নিয়া প্রায়ই তার সাথে আলোচনা হয়। সেইসব অভিজ্ঞতা থেইকা আমার মাঝেমাঝে মনে হয় কবিতা না বোঝার ভঙ্গীটা তার ভাবজাত আচরণ। আবার মাঝে মাঝে মনে হয় এই বিষয়ে উনার মনে হয় কোনো ট্রমা আছে। যেই ট্রমা'র কারনে উনি কবিতার বাক্যবন্ধে মনোযোগ দিতে ডড়ান। শুরুতে শুভ'র যেই কবিতার উল্লেখ করছি সেই কবিতার প্রথম লাইন, " ঘাসফড়িঙের দল পাখায় বয়ে নিয়ে আসে ভেজা মাটির দুঃখবোধ" নিয়াই উনার অবোধগম্যতার অভিযোগ জানাইছেন। এখন দেখা যাব শুভ'র কবিতাটারে যদি আমরা পাঠ করি তাইল কি অর্থ নির্মিত হয়।

ঘাসফড়িঙের পাখা, শুনতেই বেশ কোমল অনুভূতি তৈরী হয়। কিন্তু এই ঘাসফড়িঙের ছবি দেখলে কি মনে হইতে পারে; ছবি দেখা যাক,

ঘাসফড়িং

ঘাসফড়িং দেখতে যেমনই হোক ঘাস বলতেই আমি দেখতে পাই সবুজ বিস্তীর্ণ মাঠ। বুনো সৌন্দর্য দেখার অনুভূতির সাথে মিল খুঁইজা পাই। আর ফড়িঙের অস্থিরতাময় ওড়াউড়ির অভ্যাসের সাথে আরবান মানুষের চারিত্রিক অস্থিরতার। একেবারেই ভিন্নমেরুর দুই চিহ্নে যখন একটা পতঙ্গের নামকরণ হয় তখন স্পষ্টতঃই বুঝি এই জাক্সটাপোজ তৈরী হইছে রহস্যময়তার প্রতি আকর্ষণবোধ থেইকা। তবে সাধারণ ফড়িংয়ের পাখার সাথে ঘাস ফড়িংয়ের পাখার পার্থক্যটা অনেক। সাধারণ ফড়িং বেশ সময় ধরে দ্রুত উড়ে বেড়াতে পারে, কিন্তু ঘাসফড়িংয়ের পাখা থাকলেও তাতে ভর করে বড়জোর তারা লাফাইয়া চলতে পারে। ঈশপের উপকথা "পিপীলিকা ও ঘাসফড়িংয়ের গল্পে" যেই ঘাসফড়িংয়ের চরিত্র আঁকা হইছে তার সাথে বাস্তবের ঘাসফড়িংয়ের যথেষ্ট'ই মিল পাওয়া যায়। এই ঘাসফড়িং নির্ভরযোগ্য না, তার দায়িত্বশীলতার বোধে ঘাটতি থাকে...অস্থির খেলাপ্রবণ পতঙ্গের কোনো নির্দিষ্ট আবাস স্থল থাকে না। মধ্যযূগ থেইকা আধুনিক কালের সাহিত্যে এই ঘাসফড়িং আর পিপীলিকার গল্পের অ্যাডপ্টেশন করছেন বিখ্যাত চিত্রশিল্পী-চলচ্চিত্র নির্মাতা-গল্পকাররা। ঘাসফড়িংকে প্রায় সকলেই সমাজের femme fatale হিসাবে দেখতে চাইছেন। এই নারী চরিত্র ফ্যাশনেবল, তার উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য উভয়ই মূলতঃ যৌনতাকে কেন্দ্র করে প্রদক্ষিণরত, এই চরিত্রে কোনো স্থিতি নাই, কিন্তু এই অস্থিরতা ইতিবাচক অর্থে অস্তিত্বের সন্ধানে ঘটে না, ঘটে কেবলই নেতিবাচক প্লেজার প্লে'তে। এই অনুধাবন বেশ পুরুষতান্ত্রিক। তাই কবি যখন ঘাসফড়িংয়ের দল লিখেন আমি তাতে বুনো অস্থিরতার ঘ্রাণ পাই। যেই ঘাসফড়িং মাটি কাছাকাছি ঘোরেফেরা করে। ঘাসের আড়ালে থাকে অন্যান্য পতঙ্গ তার আচরনে মোহাবিষ্ট হয়ে তার খাদ্য হিসাবে ধরা দেয়। ঘাসফড়িংয়ের সম্মুখ আর পিছনে পাখারূপ যেই অঙ্গ তাতে ভেজা মাটির দুঃখবোধ নিয়ে আসতেই পারে বলে মনে হয়। এই দুঃখবোধে সহমর্মিতা আছে কীনা জানি না। কিন্তু করুণার ছটা আছে সেইটা টের পাই। ভেজা মাটির দুঃখবোধ এই আবেগের অনুবাদে রোদ্দুরের অভাববোধ থাকতে পারে, কর্ষণের সম্ভাবনার কথা মনে হয়। তবে শব্দের কোমল উপস্থাপনে কবির লব্ধস্বরের কারনে মনে হয় যে মাটি'র রয়েছে রোদ্দুরের অভাব অর্থাৎ অপ্রাপ্তির দুঃখবোধ রয়েছে...এই দুঃখবোধের সমার্থক না হলেও ঘাসফড়িংয়ের অস্থিরতার সাথে তার অনুভূতির প্রাবল্য পরিমাপে মিল রয়েছে।

পরের বাক্য, "ধুলো ওড়া দুপুর অপেক্ষারা ফিরে ফিরে আসে সিগারেটের ধোঁয়া, এসফল্ট পথ আর ধুলিময় জুতোজুড়ে সন্ধ্যা নামে।" সম্ভবতঃ কবিতার সবচাইতে কম্যুনিকেটিভ বাক্য বিন্যাস। "ধুলো ওড়া দুপুর" আর "অপেক্ষা'রে" আমার একেবারেই একরকম লাগে। চৈত্রের খরখরে ধুলো ওড়ানো দুপুরবেলায় নিঃসঙ্গতা-এলিয়েনেশন-প্রাপ্তিহীনতার এই বোধগুলো চাড়া দেয়। বৈচিত্রহীন আকাশ, রোদ্দুরের চড়া অথচ মডিউলেশনহীনতা কিম্বা ঘাম ঝরানো ক্লান্তির স্বরূপ কবির মতোই আমারেও ক্লান্ত করে। কখনো আবার বৃষ্টি ঝরবে অবিরল, ঝড় হবে, সব পুরানো মলিন ঘাস-পাতা উড়ে গিয়ে নতুন অংকুরোদগম ঘটবো সবুজের এমন অপেক্ষার কাল ঘনঘন আসে। সিগারেটের ধোঁয়ার মতোন অর্থহীন নীরবতা আর এসফল্ট রুক্ষতার মতো এই চৈত্রের দিনগুলিতে মানুষের দীর্ঘ দিনের শেষে বাড়ি ফেরার তাড়া থাকে। জুতো আর পায়ে পায়ে চলতেই অন্ধকার নেমে আসে জনপদে। যারে আমরা সন্ধ্যা নামে ডাকি। শুভ যখন লিখেন শালিকের হলুদ কাজল আঁকা চোখে আঁধারের সরোদ হাসি'র মেটাফোর তৈরী করেন আমার রোমকূপে শিহরণ তুলে একে একে আরবান সড়কে নিয়ন বাতিগুলি জ্বলে উঠে। শালিকের চোখে হলুদ কাজল - কবি কতো নির্দ্বিধায় বলেন; অথচ কাজল শুনতে আমরা বরং আঁধারের দ্যোতনা পাই। সোডিয়াম বাতির জন্য এতো সুনির্দিষ্ট আর সহজ চিত্রকল্প আমি খুঁজে পাই না। এর সাথে আঁধারের তীক্ষ্ণ হাসির ঝলক চলে। নিয়ন আলো আর অন্ধকারের দ্বান্দ্বিক একটা সম্পর্ক নির্মিত হয় আরবানাইজেশনে। নাগরিক আঁধার আর আলোকের সহাবস্থান। প্রিয়জনের সঙ্গ মেনে চলতে থাকা সাত মসজিদ রোড; সঙ্গহীনতায় মুঠোফোন সংযোগ...বাড়ি পৌছে দেয়া। আপাতঃ বিচ্ছেদের আড়ষ্টতায় আলো-আঁধারীতে বড়জোর সিঁড়িঘর পর্যন্ত যাইতে পারেন কবি। তারপর পুনরাবৃত্তির চক্রে পড়ে যাওয়া বিদায়ের ক্ষণ চলে আসে। এই চক্রের ইতিহাস অতীত স্মৃতি হতে পারে, হতে পারে বর্তমানের অনিশ্চিত চলতে থাকা। কিন্তু কবিতা পড়ার কালে টের পাই কবির সঙ্গপ্রিয়তার অনুভব, আপাতঃ বিচ্ছেদের বেদনা কিন্তু সব কিছু ছাপিয়ে না বলা কথা যেইটা কানে বেশি বাঁজে তা হইলো থিতু হইতে চাওয়ার বাসনা।

পোস্টটি ১১ জন ব্লগার পছন্দ করেছেন

রায়েহাত শুভ's picture


আপনি আসলেই বস...

পুরা কবিতাটারে এত সুন্দর কইরা ব্যাখ্যা করা আমার নিজের পক্ষেও সম্ভব হইতো না...

ভাস্কর's picture


সম্ভবতঃ আপনার নিজের কবিতা বইলা আপনি কম্যুনিকেট করতে পারছেন লেখার সাথে। আর কেউতো বুঝতে পারতেছে না আলোচনাটা...

লীনা দিলরুবা's picture


একবার পড়ে কোনো মন্তব্য করতে পারলাম না, আবার পড়ি।

ভাস্কর's picture


দ্বিতীয়বারেও পারলেন না? তাইলে তো লেখা মহা ইনকম্যুনিকেটিভ হইছে...

লীনা দিলরুবা's picture


কবিতা পারে কেবল আবেগ সম্প্রসারণ করতে।

আপনার এই সিদ্ধান্তের সাথে আমি একমত। তবে, আবেগের এমন সম্প্রসারণে সহায়তা করার জন্য শুভর এরচেয়ে আরো গভীর কবিতা এই এবি ব্লগেই আছে।

কবিতা নিয়ে সৈয়দ হকের অনেক বক্তব্যের মাঝে দু'টো হলো-

এক. একটি কবিতা পড়ে তার অর্থ খোঁজা কর্তব্য নয় বরং এই ও এতটুকুই যে, কবিতাটি কীভাবে আমাকে স্পর্শ করছে; কবিতাটি কতখানি আমাকেই স্থানচ্যুত করছে গভীরতার অর্থে।

দুই. কবিতা যেন একটি অভিনয়-অনুষ্ঠান। শব্দসকল এর চরিত্র, ছন্দ এর আলোকসম্পাত, ধ্বনিসঙ্গীত এর দৃশ্যসজ্জা, স্তবক এর বেশভূষা।

আলোচ্য কবিতাটি পড়ে 'ভালো লেগেছে'র বাইরে স্তব্ধ হবার মতো কোনো অনুভব আমার ঘটেনি।

ভাস্কর's picture


একটা বিষয়ে আলোচনা করা যায় আপনার জবাবের প্রেক্ষিতে...

পরিস্থিতি এক: আমার মা হাসপাতালে। তারে লাইফ সাপোর্ট দেয়া হইছে। আমি হাসপাতালের করিডোরে এইপাশ ঐপাশ করতেছি। হাসপাতালের ডেটল ডেটল গন্ধে আমার বমি করতে ইচ্ছা করতেছে। আমি ওয়েটিং যোনের চেয়ার সারিতে একটা কর্নার বেছে বসলাম। স্ট্রেস কমাতে চিন্তার কোর্সটা পাল্টাতে পারলে ভালো হতো। আমি বন্ধুর দিয়ে যাওয়া কবিতার বইয়ের সৌজন্য কপিটা ব্যাগ থেকে বের করলাম...

পরিস্থিতি দুই: সারাদিন পর বাসায় ফিরলাম রাত ৯টায়। শাওয়ার নেয়া হইলো। জলের সাথে সমস্ত ক্লান্তি ঝরে পড়লো। চিলতে বারান্দায় রাখা রকিং চেয়ারে গিয়ে আধশোয়া হয়ে বসলাম। চোখ বন্ধ করেই সিগারেট পুরলাম মুখে তারপর চোখ খুল মুখাগ্নি করার সময় চোখে পড়লো পূর্ণ চাঁদ! আমি এক বন্ধুর নতুন প্রকাশিত কবিতার বই হাতে নিলাম।

পরিস্থিতি তিন: সারাদিন পর বাসায় ফিরলাম রাত ৯টায়। শাওয়ার নেয়া হইলো। জলের সাথে সমস্ত ক্লান্তি ঝরে পড়লো। চিলতে বারান্দায় রাখা রকিং চেয়ারে গিয়ে আধশোয়া হয়ে বসলাম। চোখ বন্ধ করেই সিগারেট পুরলাম মুখে তারপর চোখ খুল মুখাগ্নি করার সময় চোখে পড়লো পূর্ণ চাঁদ! ফোন বেজে উঠলো। "জ্বী, স্যার!...সবগুলো স্লাইড শেষ হয়নি স্যার, সকালে আপনি আসার আগেই আমি ফাইনাল করে ফেলবো...বাসায় ল্যাপটপ নিয়াসছি, রাতেই শেষ করে রাখবো টেক্সট ম্যাটেরিয়াল...ওকে স্যার, এবার আপনাকে টেনশন নিতে হবে না, হয়ে যাবে সময়মতো।" ফোনটা রেখে মনে হলো মাথায় আবার কয়েক গ্যালন পানি ঢেলে আসি। বন্ধুর নতুন কবিতার বইটা পাশের লো বেইজ টেবল থেকে তুলে নিয়ে পৃষ্ঠা উল্টাতে শুরু করলাম।

ধরা যাক এই তিন পরিস্থিতি একই ব্যক্তির বেলায় ঘটার সম্ভাবনা আছে। কবিতার বইটা মেলে ধরলে ঠিক একই পৃষ্ঠা খুলে। সে বাম পৃষ্ঠার কবিতাটা পড়বে সবগুলো পরিস্থিতিতেই...আপনার কী মনে হয় যে তার ক্ষেত্রে ঐ কবিতার প্রভাব প্রত্যেবার একইরকম হবে?

জ্যোতি's picture


এইবার বুঝলাম যে শুভর কবিতা আমি কিছু বুঝি নাই, যা বুঝছিলাম তা ভুল বুঝছি। Sad

ভাস্কর's picture


আপনে কি বুঝছেন? শুভ হয়তো আমার সাথে তর্কে নামতে হইতে পারে এই ডরে এইটারেই ঠিক কইতেছে...আপনেরটা লিখলে হয়তো ঐটারেই মাইনা নিবো।

জেবীন's picture


শিরোনাম পড়েই কমেন্ট করতে এসেছিলাম যে, "প্লিজ বইলেন যে টিউটোরিয়াল ফর রায়হানভাই", পরে কিছুটা পড়ে আসলেই ভালো লাগছিলো, ছবি দেখেতো মজাই পেয়েছিলাম, সচিত্র টিউটোরিয়াল বলে কথা। কিন্তু তারপর, ............ এর পর যে কই খেই হারায়ে ফেললাম, আর থলকূল খুজেঁই পেলাম না!

১০

ভাস্কর's picture


দৃর্বোধ্য?

১১

ভাস্কর's picture


দুর্বোধ্য?*

১২

লাবণী's picture


জটিল ব্যাপার স্যাপার!
আমার মাথা আউলাইয়া যাচ্ছে!

১৩

রায়েহাত শুভ's picture


ভাস্করদা, পাঠকের পঠন প্রক্রিয়ার প্রতি আমার সম্পুর্ণ শ্রদ্ধা আছে। আপনার পঠন আর ব্যখ্যা আমার পছন্দ হইছে, সেইটা আগের কমেন্টেই বলছি।

এইখানে আমার নিজস্ব পঠনরীতিটাও একটু উপস্থাপন করতে চাইতেছি।

প্রথম পংক্তিতে আমি লিখছি
ঘাসফড়িঙের দল পাখায় বয়ে নিয়ে আসে ভেজা মাটির দুঃখবোধ, ধুলো ওড়া দুপুর
ঘাসফড়িঙের পাখারে আমি অস্থিরতা আর দুঃখবোধের বাহক হিসাবে চিত্রিত করতে চাইছি। আপনার দেয়া femme fatale সংক্রান্ত বিষয়টা আমার জানা আছিলো না। সেইজন্যে ডেলিবারেট ভাবে আমার লেখায় ঘাসফড়িঙ কোনো নারী চরিত্র উল্লেখ করে না। আমার লেখাটায় একটা নারী চরিত্রের উপস্থিতি অবশ্যই রইছে, কিন্তু সেইটারে আমি ঘাসফড়িঙের মেটাফোরে দেখতে রাজী না।
আপ্নে প্রথম লাইনের কমার (ধুলো ওড়া দুপুর) পরের অংশরে পাঠ করছেন দ্বিতীয় পংক্তির শুরু হিসেবে। লেখার সময় আমি প্রথম পংক্তিটারে পুরাটাই একটা বাক্য হিসাবে দেখতে বেশী স্বাচ্ছন্দ্য পাই।
ভেজা মাটি, এই অংশটারে দেখলে আমরা দুইটা জিনিস দেখনের অবকাশ পাই।
# একটা হইতেছে সকালের স্নিগ্ধতা। যেই সময় রাতের ঠান্ডা মাইখা মাটি কিছুটা ভেজা ভাব ধারন করে।
# সেকেন্ড হইতেছে ভেজা মাটিতেই জীবনের উত্থান ঘটনের চান্স বেশী থাকা।
আর এই ভেজা মাটি কৃষাণের কাম্য।
বিপরীতে তাকাইলে আমরা দেখতে পাই
* দুপুরের রুক্ষতা। যখন সুর্যের তাপ প্রখর, মাটির ভেজা ভাব চইলা যাওনের সম্ভাবনা।
* ধুলা হইয়া মাটির ছড়াইয়া যাওয়া। আর চারা গাছের জীবনাবসানের সম্ভাবনা।

পুরা পংক্তি একসাথে পাঠ করলে ভেজা মাটির দুঃখবোধ হিসাবে আমরা ধুলো ওড়া দুপুরেরে চিহ্নিত করতে পারি সহজেই। এই ভাবটার বাহন হিসাবে আমি এইখানে ঘাসফড়িঙের দলের ডানারে ইন্ট্রোডিউস করি...

১৪

ভাস্কর's picture


শিরোনামে যদিও বুঝতে পারা-পারি'র বিষয়টা আসছে, কিন্তু আমি যে কবিতাটারে হালকা-পাতলা ডিকনস্ট্রাক্ট করলাম তার সাথে বাস্তবিক বোঝাবুঝির কোনো সম্পর্ক নাই। সাইনগুলি আমার অভিজ্ঞতার সাথে দ্বান্দ্বিক সম্পর্কের ফলে যা সিগনিফাই কইরা যেই সিগনিফিকেন্স তৈরী করে আমার উপলব্ধিতে সেইসব লিখছি। আপনে লিখা ফেলছেন মানে আপনে মইরা গেছেন।

ঘাসফড়িং বিষয়ে শুরুতে আমার যা মনে হইছে তা যে আসলে আপনের ভাবনা ছিলো না সেইটারে উল্লেখ কইরা একটা বাক্য লিখতে হইবো। তাড়াহুড়ায় ঐটা মিস করছি। আগের ফেমে ফ্যাটাল'এর ধারণাটা যে পুরুষতান্ত্রিক সেইটা লেইখা আমি কবির ভাবনার কথাটা আন্দাজ করছি সরাসরি, এখন এডিট কইরা ঢুকাইয়া দিতে হইবো যে কবি'র অন্যান্য লেখালেখির প্রকাশে পুরুষতন্ত্র ঘনিষ্ঠতার চে' বিরোধীতাই থাকে বেশি। ঐটা একবার ভাইবাও লেখা হয় নাই।

ডিকনস্ট্রাক্ট কইরা পাঠের বেলায় শব্দের ধ্বনি নিয়া পর্যন্ত প্রাসঙ্গিকতা তৈরী করতে দেখছি অনেকরে। যাইহোক ভালো লাগতেছে ঘাসফড়িংয়ের বুনো অস্থিরতার ব্যখ্যাটা হুবহু মিলা যাওয়াতে।

১৫

রায়েহাত শুভ's picture


লেখা প্রকাশের পরেই যে লেখকের মৃত্যু হয়, এই বক্তব্যে পুরোপুরি একমত।

পাঠকের হাতে আসার পর সেই লেখা পুরাই পাঠকের নিজস্ব। একজন পাঠক লেখা পইড়া যা ইন্টারপ্রেট করবে সেইটাই তার জন্য সঠিক ইন্টারপ্রেটেশন। এই ব্যাপারে লেখকের কোনো বক্তব্যই থাকা উচিত না। কিন্তু কবিতাটা, আর আপনের দৃষ্টিতে সেইটার ইন্টারপ্রেটেশন লইয়া কয়েকজনের ভিতরে কনফিউশন তৈরী হবার ফলেই আমি আসলে ব্যখ্যা দিতে আসছিলাম...

১৬

ভাস্কর's picture


কোক

১৭

রাসেল's picture


কবিতা জিনিষটা পাঠকের পাঠে পুন:নির্মিত হয়, সেসব পাঠের কোনোটাই হয়তো কবির অনুভবটুকু ধারণ করে না পুরোপুরি। শব্দ এবং তার ব্যবহার কবিতার চিত্রকল্পকে পাঠকের কাছে উপস্থাপন করে মাত্র কিন্তু পাঠক তার ব্যক্তিগত অনুভব উপলব্ধির জায়গা থেকে কবিতা মাপে, সে কারণেই সম্ভবত কবিতার একক অনুভব সম্ভব হয় না। সবাই একই রকম অনুভব করবে এমন কবিতাও হয়তো লেখা সম্ভব, তবে সেসব সম্ভবপরতা এবং অসম্ভবের আলোচনার বদলে শুভর কবিতার ভিন্নপাঠটুকু নিয়ে আলোচনা করা যায়।

আমার কাছে বরং "আঁধারের সরোদ হাসি" অংশটুকুকে কিঞ্চিৎ বৈচিত্রময়, সম্ভবনাময় মনে হয়। যদিও আমার ধারণা "আঁধারের সরোদ হাসি" উপমাটা বাদ্যযন্ত্র সরোদকে কেন্দ্র করে, যেখানে বিষন্নতা বাজে, কিন্তু অন্য একটি উপস্থাপনও সম্ভবপর এখানে।
সরোদ শব্দটাকে রোদসমেত রৌদ্রোজ্জ্বল হিসেবেও কল্পনা করা যায়। সেক্ষেত্রে আরও সম্ভবনার দুয়ার খুলে যায় কবিতাটির, তখন শব্দগুচ্ছ বিষন্নতাকে উপড়ে ফেলে বেশ ঝলমলে আনন্দমুখর হয়ে উঠতে পারে।

১৮

ভাস্কর's picture


আঁধারের সরোদ হাসি বিষয়টা আমারো বেশ ভালো মেটাফর মনে হইছে। তয় "শালিকের হলুদ কাজল আঁকা চোখ" চিত্রকল্পটারে শুভ'র একান্ত নিজের মনে হইছে। শুরুতে ধরতে পারি নাই, পরে শহরের রাস্তার এনভায়রনমেন্টে বিষয়টারে সোডিয়াম বাতির মতোন লাগলো। তারসাথে আঁধারের সরোদ হাসিটারে লাগলো ছুড়ির মতোন তীক্ষ্ণতার অনুভূতি, আলোর সাথে যার সংঘাতময় উপস্থিতি...চিড়ে যায় একেবারে।

১৯

রায়েহাত শুভ's picture


রাসেল ভাই আপনি আরেকটা ভাবনার পথ খুঁজে দিলেন। ইশ! মাঝে মাঝেই যদি কবিতা সংক্রান্ত এরকম আলোচনা হইতো...

২০

তানবীরা's picture


অনেক কিছুই পড়লাম, যার বুঝলাম না অনেক, শিখলাম না অনেক Puzzled

মন্তব্য করুন

(আপনার প্রদান কৃত তথ্য কখনোই প্রকাশ করা হবেনা অথবা অন্য কোন মাধ্যমে শেয়ার করা হবেনা।)
ইমোটিকন
:):D:bigsmile:;):p:O:|:(:~:((8):steve:J):glasses::party::love:
  • Web page addresses and e-mail addresses turn into links automatically.
  • Allowed HTML tags: <a> <em> <strong> <cite> <code> <ul> <ol> <li> <dl> <dt> <dd> <img> <b> <u> <i> <br /> <p> <blockquote>
  • Lines and paragraphs break automatically.
  • Textual smileys will be replaced with graphical ones.

পোস্ট সাজাতে বাড়তি সুবিধাদি - ফর্মেটিং অপশন।

CAPTCHA
This question is for testing whether you are a human visitor and to prevent automated spam submissions.

বন্ধুর কথা

ভাস্কর's picture

নিজের সম্পর্কে

মনে প্রাণে আমিও হয়েছি ইকারুস, সূর্য তপ্ত দিনে গলে যায় আমার হৃদয়...