ইউজার লগইন

একুশে ফেব্রুয়ারী নিয়া কিছু স্মৃতিকাতরতা আর নায়কোচিত তিরিশ মিনিটের কাহন...

তখন স্ট্যান্ডার্ড টুতে পড়ি...ভোরে ঘুম থেইকা উঠতে হইবো এই চিন্তায় সারা রাইত নির্ঘুম...আমার প্রথম প্রভাত ফেরী...বাপ আর মায়ের কেনী আঙুল ধইরা আমরা তিন ভাই-বোন ধানমন্ডি থেইকা খালি পায়ে গেছিলাম শহীদ মিনারে...লাখে লাখে মানুষের আগমন...সেইদিন আমরা নাস্তা করছিলাম চীনাবাদাম দিয়া, এইটুক মনে আছে...তয় কেন যে আর কয় বছরের মধ্যেই শহীদ মিনারে যাওনের আগ্রহটা বাপ আর মা হারাইয়া ফেলছিলো, তা বুঝি নাই বহুকাল...ধীরে ধীরে বুঝি, পুঁজিবাদের তত্ত্বমতে কোন এক বড় পুঁজি যখন আমার বাপের ছোট পুঁজিরে গিলা খাইয়া ফেললো তখন থেইকাই তারা কেরম নিস্পৃহ হইলেন...জাতীয়তাবাদের কঠিন পুঁজারী বাপ-মা তখন আইলসামীরে বেশি গুরুত্ব দিতে শুরু করলেন...আমি এই পরিবারের অস্থিরতা আর অনিশ্চয়তার দোলাচলে বাইড়া উঠলাম...

অনেকদিন লাগছিলো অভিভাবকগো আমারে স্বাধীনতা দেওনের সিদ্ধান্ত নিতে...ক্লাস সেভেনে উঠনের পর আমি প্রথম একা একা শহীদ মিনারে যাওনের অনুমতি পাইলাম...আর এই সিদ্ধান্ত নিতে তাগো আমার তেলেসমাতি দেখাইয়া একরাইত হাজত বাস করতে হইছিলো...সে অন্য গল্প! কিন্তু ক্লাস সেভেন থেইকা আমি প্রতি বিশে ফেব্রুয়ারী মাঝ রাইতে অ্যালার্ম দিয়া ঘুমাইতে যাই, ৫টায় ঘুম থেইকা উইঠা সোয়া ৬টার মধ্যে শহীদ মিনার। তয় এই স্বাধীনতা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওনের পর আরো দূর বিস্তৃত হইলো...সেই সময়টায় ২০ তারিখ রাত ১২টার পর থেইকাই আমি শহীদ মিনার নিবাসী হই।

একসময় যেইটা ছিলো ভোরের শহরে স্বাধীনভাবে হাটতে পারনের আনন্দ...সেইটা পরিবর্তীত হইলো জাতীয়তাবাদী প্রকাশে...একসময় সেইটাও রূপ পালটানির খেলায় একটা প্রতিবাদী আন্দোলনের রক্তভেজা ঘ্রাণ নেওনের শপথ...এইভাবে একুশে ফেব্রুয়ারী আমার পরানের গহীন ভেতরে আসে। মানজারে হাসীন মুরাদের সাথে একটা প্রামাণ্যচিত্রে সহকারী হিসাবে থাকনের অভিজ্ঞতায় আমি প্রায় জনা দশেক ভাষা সৈনিকের সাথে বিভিন্ন সময়ে মোলাকাত করতে পারছিলাম। ২০০১ সালের একুশে ফেব্রুয়ারী ভোরে আশি অতিক্রান্ত ৫ ভাষা সৈনিকের এক আড্ডার আলোচনা আমারে নতুন কইরা ভাবতে শিখাইছিলো। সেইদিন থেইকা একুশে ফেব্রুয়ারীরে আমি অনেক অন্যরকম একটা আন্দোলনের অংশ হিসাবে দেখতে পাই।

এই বৈষম্যমূলক রাষ্ট্রে ভাষা কেমনে শোষণের হাতিয়ার হইয়া উঠছে! সেইটা নিয়া আলোচনা করতে শুনছিলাম বিপ্লবী ঐ মানুষগুলিরে। প্রতিষ্ঠানের ভাষা সেহেতু অনেক সিভিল-সুশীল...এই ভাষা সাধারণ্যেরে আক্রমণাত্মক হইতে নিষেধাজ্ঞা জারী করে। আক্রমণ করনের অধিকার কেবল উপরের শ্রেণীর। আমার ভাষা যদি সুশীল না হয়, তাইলে আমার প্রবেশাধিকার নাই সমাজের সকল সমাবেশে...মানুষ একরম বাংলায় কথা কয় তাদের পারিপার্শ্বিক যোগাযোগে, প্রতিষ্ঠানের কাছে গেলেই ঐ ভাষা হয় আনস্মার্ট! কারা জানি ঠিক কইরা দেয় বাঙালীর বাংলা ভাষার অভিধান...যেই খানে যারা পড়তে লিখতে পারে তারা এক ভাষা কওনের ক্ষমতা রাখে, আর অন্যরা হয় অন্য কিছুই কয়, নাইলে অপভ্রংশের শৃঙ্খলে বান্ধা!

আমি জানি না ভাষার বৈষম্য নিয়া প্রতিষ্ঠানের আচরণ আসলেই পাল্টানো সম্ভব কি না বা পাল্টানোর সম্ভবপরতা থাকলেও তার কোন পথ আমি চিনি নাই এখনো। কিন্তু একুশে ফেব্রুয়ারীর উদাহরণ সামনে নিয়া সবসময় বিপ্লবী বাসনাই জাগে! মনে পড়ে বায়ান্নে এককাতারে ছিলো সকল শ্রেণী-পেশার মানুষ। বিভিন্ন জেলা থেইকা, বিভিন্ন সাংস্কৃতিক পরিমন্ডল থেইকা উইঠা আসা মানুষেরা ভাষার অধিকারের দাবীতে এককাট্টা হইছিলেন, ভাষার রাজনৈতিক অধিকার আদায়ের বাসনায়।

যদিও দেশের বিদ্যমানতা এখন ভিন্ন খাতে প্রবাহিত। আন্দোলনের মানুষগুলিরে বিজ্ঞাপনী সুবিধা হিসাবে ব্যবহার করনের পরিকল্পনায় সফল দেশের সর্ববৃহৎ মাল্টিন্যাশনাল কর্পোরেট পুঁজি। তারা এই অধিকারের আন্দোলনের বীরত্ব গাঁথা পুঁজি কইরা ক্রেতা সাধারণের সহমর্মিতা প্রত্যাশী হয়। একটা জাতির পূণর্গঠনের ধারাবাহিক আন্দোলনরে তিরিশ মিনিটের সুপার হিরোইক মুহুর্ত হিসাবে ফ্রেমবদ্ধ করনেই তাগো আগ্রহ বেশী। এমন অবস্থায় বুঝি এই ব্যর্থ রাষ্ট্রের কতোটা দায়...যার লেইগা প্রতিবাদী সেই ভাষা সৈনিকেরাও আজ তাদের হৃদয় বিক্রী করতে বাধ্য হ'ন কর্পোরেট পুঁজির কাছে। হতাশ হৃদয়ের কোন মূল্য তারা খুঁইজা পান না জীবনের প্রবাহে। তাদের হতাশায় কি আমরাও আক্রান্ত হই তবে!?

পোস্টটি ৮ জন ব্লগার পছন্দ করেছেন

শওকত মাসুম's picture


পড়লাম। আর কিছু না কই

ভাস্কর's picture


কিছু কইয়া তো কোন লাভ নাই...অতএব আপনে ফার্স্ট...

গরমপত্র's picture


ব্যাকতেরে "গ্রামীন ফোন ইন্টারন্যাশনাল মাদার ল্যাঙ্গুয়েজ ডে"র শুভেচ্ছা Wink

ভাস্কর's picture


হ...

মুক্ত বয়ান's picture


হা হা হা!!!
৩ জন ভাষা সৈনিক যখন হাসি হাসি মুখে ক্যামেরার সামনে দাঁড়িয়ে তাদের লড়াইয়ের কথা বলেন, তখন ক্যামেরার পেছনে তাদের সত্যিকার অবস্থান জানতে ইচ্ছে করে।

অ:ট: হাজত বাসের কাহিনী ঝাতি জান্তে চায়!!! Wink Wink

ভাস্কর's picture


তাগো বর্তমান সামাজিক আর পারিবারিক অবস্থা, রাষ্ট্র তাগো কতোটা দায়ভার নিছে...বায়ান্নে তাগো যেই চাওয়া-পাওয়া ছিলো তা কতোটা পূরণ হইছে...এইরম অসংখ্য প্রশ্নের জবাব বিশ্লেষণ করলেই তাগো অবস্থা বিবেচনা করতে পারবেন...

ঐ বিষয়ে পরে কথা হইতে পারে...

অদিতি's picture


বিরাট বিজ্ঞাপনের শেষ ৩/৪ মিনিট ভাষা সৈনিকদের মুখ তো তবু দ্যাখন যায়, এইটারে সাধুবাদ জানান...আপ্নেরা যে কি না!

মুক্ত বয়ান's picture


এইটা কি কন??
আমি তো জানি পুরা বিজ্ঞাপনের দৈর্ঘ্যই ১.৫৬ মিনিটSmile

অদিতি's picture


তাইলে তো আরো কম সময় ধইরা তাগো দ্যাখন যায়। তবুতো যায়...

১০

মুক্ত বয়ান's picture


হ। আজকে তো ওনারা সবাই থাকবে, যাইয়েন, মশকো দেখবেন।

ভাব  নিয়া কথা কইবে, মুখের কথায় আকাশ-পাতাল উজায়ে ফেলবে, কাল থেকেই "বেইল" নাই। Sad

১১

ভাস্কর's picture


হয়তো বেইল থাকতেও পারে। প্রতিমাসে কিছু পরিমাণ টাকা ঐ সৈনিকেরা পাইতেও পারেন শেষ বয়সে...কিন্তু তার বিনিময়ে কতো টাকার বিজ্ঞাপনি ঝান্ডা উড়ে সেইটা দেখার বিষয়...আমি এই বিজ্ঞাপনে ক্যাম্পেইনের বাজেট যদ্দূর জানি, তা দিয়া একটা জাতীয় ভাষা শিক্ষা ইন্সটিটিউট প্রতিষ্ঠা করা যায় অনায়াশে...

১২

তানবীরা's picture


Cry

১৩

ভাস্কর's picture


সাধুবাদ জানাইতে জানাইতেই আমরা নির্বিকার সাধু হইয়া যাইতে পারুম আশা রাখি...

১৪

অদিতি's picture


হ বেশি প্রোটেস্ট করতে গেলে আবার প্রোটেস্টান্ট হইয়া যাইতে পারেন।

১৫

ভাস্কর's picture


হ...এর চাইতে ভালো আমরা সব শুনতে শুনতে সুন্নি মুসলমানই থাকি...

১৬

নজরুল ইসলাম's picture


তামাশা দেখি আর কী... জিপিয় তামাশা...

১৭

ভাস্কর's picture


কয়দিন পর এইটাই হয়তো জাতীয় তামাশা হইবো...

আমাগো প্রিয় মতিউর রহমান সাহেব এখন সুখেই আছেন...

১৮

অদিতি's picture


হু, সুখেই আছেন। এখন আর অন্য দেশে বৃষ্টি হইলে আর ঢাকাতে ছাতা খোলা লাগেনা। খিক খিক...

১৯

ভাস্কর's picture


হ...এখন অন্য দেশে বোমা পড়লে এইখানে বুলেট প্রুফ ছাতা খোলেন...

২০

মেসবাহ য়াযাদ's picture


কয়দিন পর এইটাই হয়তো জাতীয় তামাশা হইবো...

আমাগো প্রিয় মতিউর রহমান সাহেব এখন সুখেই আছেন...

এরপর কিছু না বলি...

২১

ভাস্কর's picture


--------------

২২

টুটুল's picture


ভাষার মাসে লোকজন কথা কইতে ডরায় ক্যান?

২৩

শাওন৩৫০৪'s picture


...আপনি তো অনেক লাকী...এতজন ভাষা সৈনিকের সাথে আলাপ করতে পারছেন..

 

প্রাতিষ্ঠানিক  সুশীল ভাষার অংশটা আরো বড় পরিসরে কোথাও লেখলে জানার ইচ্ছা আছে..মানে হৈলো গিয়া, প্রতিষ্ঠানের ভাব-ভঙ্গী তো দেখই, সুষ্ঠ ভাবে চালানীর জন্যই বৈষম্যটা অত্যাবশ্যকীয় একটা ভাব রাখে..,..কিন্তু না থেকলে আসলেই কি ক্যাওয়াস হবোনা কোন?.......ইন্টারেস্টিং জিনিষ..

 

হ, এখন তো কর্পোরেট ব্যাবসায়ীরাই নিদারুন সব চোখে পানি আনা এ্যড দিয়া, আমাদের দেশপ্রেম শিখানের ডিলারশিপ নিছে টাইপ ভাব নেয়...চোখের কোনায় চিক চিক করে, এ্যাড গুলা দেইখা..

 

২৪

নরাধম's picture


কিছু বলার নেই।

মন্তব্য করুন

(আপনার প্রদান কৃত তথ্য কখনোই প্রকাশ করা হবেনা অথবা অন্য কোন মাধ্যমে শেয়ার করা হবেনা।)
ইমোটিকন
:):D:bigsmile:;):p:O:|:(:~:((8):steve:J):glasses::party::love:
  • Web page addresses and e-mail addresses turn into links automatically.
  • Allowed HTML tags: <a> <em> <strong> <cite> <code> <ul> <ol> <li> <dl> <dt> <dd> <img> <b> <u> <i> <br /> <p> <blockquote>
  • Lines and paragraphs break automatically.
  • Textual smileys will be replaced with graphical ones.

পোস্ট সাজাতে বাড়তি সুবিধাদি - ফর্মেটিং অপশন।

CAPTCHA
This question is for testing whether you are a human visitor and to prevent automated spam submissions.

বন্ধুর কথা

ভাস্কর's picture

নিজের সম্পর্কে

মনে প্রাণে আমিও হয়েছি ইকারুস, সূর্য তপ্ত দিনে গলে যায় আমার হৃদয়...