ইউজার লগইন

আমাদের কি কিচ্ছু করার নেই! কিচ্ছু বলার নেই!

মুক্তিযুদ্ধের ঠিক পরের বছর আমার জন্ম। শহুরে মধ্যবিত্ত পরিবারে বড় হয়ে ওঠার কারণে দেশের সামাজিক অস্থিরতা কিংবা রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের কোনো বিষয় তেমন একটা প্রভাব ফেলেনি ছোটবেলায়। তবে একটা সময় গেছে যখন নির্বাচনের আবহ মানুষের প্রাণে সাড়া ফেলতো। ইলেকশন ডে মানে বাড়িতে রীতিমতো উৎসবের মহড়া। সেদিন ভালো খাবার দাবার হতো, বাংলাদেশ টেলিভিশনে শুরু থেকেই প্রচারিত হতো ক্লাসিক ইংলিশ ম্যুভি, হলিউডি ব্যাশ আর একটা প্রোগ্রাম সলিড গোল্ড যেখানে কন্টেম্পরারি পপ্যুলার ইংলিশ নাম্বারের অফিসিয়াল মিউজিক ভিডিওগুলো দেখানো হতো। আমার নিজের মিউজিক টেইস্ট তৈরী হয়েছিলো সেইসব ইলেকশন ডে'র সময় দেখা মিউজিক ভিডিও দেখতে দেখতেই। আরেকটা মজার ঘটনা ছিলো সেই সময়টায় আমরা ভোট-ভোট খেলতাম। প্রতীক পাল্টে পাল্টে আমরা ইলেকটোরাল ক্যাম্পেইনের মক করতাম। তখনো আমাদের মধ্যে রাজনৈতিক বিভাজনের বোধ অতোটা প্রবল আর জরুরী হয়ে উঠেনি। তবে ৫২'এর ভাষা আন্দোলন, ৬২'এর শিক্ষার অধিকার রক্ষায় প্রতিরোধ, ৬৯'এর গণ অভ্যূত্থানের পথ ধরে ১৯৭১'এর মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে স্বাধীনতা অর্জনকারী দেশের মানুষ সামরিক জান্তার বিরুদ্ধে রক্ত ঝরা ছাত্র-গণ অভ্যূত্থানের মধ্য দিয়ে একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের স্বপ্ন দেখেছিলো ১৯৯০ সালে। কোনো বিষয়ে দেশের সব শ্রেণী-পেশা -রুচি-সংস্কৃতির মানুস এককাট্টা হলে প্রতিপক্ষ যতোই শক্তিশালি হোক না কেনো তার পরাজয় বরণ করতেই হবে; বাংলাদেশের ইতিহাসে ঘটে যাওয়া বিভিন্ন ঘটনায় আমরা তার বিপরীত কিছু ঘটতে দেখি না।

১৯৯০ সালে শুধু আমাদের দেশে নয় সারা পৃথিবীর মানে আন্তর্জাতিক রাজনীতিতেও অনেক কিছু পাল্টে গিয়েছিলো। দীর্ঘ সময়ের আমেরিকা আর সোভিয়েত ইউনিয়ন এই দুই ব্লকে বিভক্ত হয়ে যাওয়া দেশগুলো খেই হারিয়ে ফেললো শুরুতে কারণ সেই বছর সোভিয়েত ইউনিয়ন বিলুপ্তির সম্ভাবনা দেখা দিলো। পরের বছরই অর্থাৎ ১৯৯১'এ প্রত্যাশিত সোভিয়েত বিপর্যয় ঘটলো, ভাঙলো বার্লিন প্রাচীর তিয়েনআনমেন স্কোয়ারে ছাত্র আন্দোলনের জোয়ারে সেসময়কার চীনা সরকার কামান চালিয়ে দিয়েছিলো। এসব শুনতে যতোটা ভয়াবহ আর জটিল সমীকরণ বলে মনে হচ্ছে বাস্তবতা আরো অনেক বেশি ভয়াবহ ছিলো। যে মানুষেরা কয়েকদিন আগেই ভেবেছে আন্দোলনে-লড়াইয়ে পাল্টে দেয়া যায় অন্যায়-বঞ্চনার ইতিহাসকে সেই মানুষেরাই দিশেহারা হয়ে পড়লো। চারিদিকে তখন মানুষের ব্যক্তিগত অর্জনকেই বড় করে দেখার একটা চল শুরু হয়েছে। দিনে দিনে কিভাবে জানি মানুষ এককাট্টা হওয়ার স্বপ্ন দেখতেও ভুলে গেলো।

আমাদের দেশেও নব্বই পরবর্তী সময়ে অন্য যেকোনো সময়ের চেয়ে অস্থিরতার প্রকাশ ঘটলো। বিশ্ব রাজনীতিতে এরমধ্যে তৈরী হওয়া নতুন অংকের মতোন আমাদের দেশেও ব্যক্তি বিরোধের পাশাপাশি ধর্ম নিয়ে হানাহানি শুরু হলো। মানুষের সহনশীলতা কমতে নাকি বাড়ছিলো সেটা নিয়ে অবশ্য বিতর্ক শুরু করে দেয়া যায়। কিন্তু অন্যায়ের পরিমাণ যেভাবে বাড়ছিলো তার পাল্টা অন্যায়ের বিচার হওয়ার পরিমাণ এতোটাই কমে যেতে শুরু করলো যে মানুষের মাঝে হতাশা ছাড়া আর কোনো আবেগ আর স্থান পেলো না। আমরা যারা দেশের সাধারণ মানুষ যারা বড় হয়ে উঠেছি রাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্য দিয়ে তারা প্রতি পাঁচ বছর পর পর ক্ষমতার পট পরিবর্তন ঘটিয়েই তার সুফল চেয়েছি শুধু। কিন্তু সামাজিক ভাবে এই পাল্টে যাওয়া নিয়ে তেমন কোনো ফলপ্রসু আলোচনা করার চেষ্টা করেছি কি?

আমরা যারা সাধারণ মানুষ তাদের তো আসলে খুব বেশি কিছু করার থাকে না। কেবল বছরের একটা দিন ভোট দেয়াতেই আমাদের ক্ষমতার দাপট। ঐ দিন আমরা প্রতিবাদ করি পেছনের পাঁচ বছরে ঘটে যাওয়া সব অন্যায়ের। হেড না টেইল-টেইল না হেড এমন করেই আমরা বেছে নেই দেশের অস্থিরতা, সামাজিক সব অন্যায়-নির্যাতন-অবিচারের বিরুদ্ধে কারা আগামী পাঁচ বছর দায়িত্ব পালন করবে। কিন্তু এভাবে তো কোনো কিছু থেকে বেঁচে যাওয়া যায় না বড়জোর লুকিয়ে থাকা যায় কিছুদিন। আর একারনেই দিনে দিনে আস্কারা পেয়ে কিছু মানসিকতা এমন মনস্টার অথবা দৈত্য-দানোর মতো চেহারা পেয়ে গেছে সেটা হয়তো টের পাচ্ছি আমরা এই বছরের শুরু থেকেই।

সাংবাদিক দম্পতি সাগর-রুনিকে হত্যা করলো নাম না জানা পরিচয়হীন খুনিরা, কেটে গেলো মাস চারেক এখনো খুনিদের গ্রেপ্তার করা গেলো না, এখনো তারা নামহীন-পরিচয়হীনই থেকে গেলো। কেবল সাগর-রুনির একমাত্র ছেলেটার চোখে তাদের হিংস্র চোখের ছায়া লেগে আছে। এই ছেলেটা বড় হয়ে কি করবে আমরা ভাবতে পারি? সে কি গোপনে তার বাবা-মা'র খুনিদের খুঁজে বেড়াবে সব সম্ভাবনাকে ধূলিস্মাত করে দিয়ে! একে একে বিভিন্ন পরিচয়ের মানুষ গুম হয়ে যেতে শুরু করলো বিভিন্ন প্রান্ত থেকে, তাদের কারো কারো লাশ হয়তো ভেসে উঠেছে বিষাক্ত হয়ে পড়া নদীর বুকে; কিন্তু ধরাছোয়ার বাইরে চলে যাচ্ছে এসবে পেছনে মূল পরিকল্পণা যাদের মাথা থেকে বেরিয়েছে অথবা যারা নৃশংসভাবে টুকরো টুকরো করেছে মৃত মানুষের শরীর। অপরাধের আওতা কতোদূর গিয়েছে তার আন্দাজ করা যায় যখন দেশের দণ্ডমুণ্ডের কর্তাদের এলাকা সংসদ ভবনের মূল চত্ত্বরে কঠোর নিরাপত্তার ভেতর থেকে পঁচা গলা মৃত তরুণীর লাশ উদ্ধার হলো্। আর এভাবেই আমাদেরই অনেক ছোটভাই বন্ধু কোনোকিছু পাওয়ার জন্য বা রাগ-ক্ষোভের প্রকাশ হিসাবে অভিমান করে না আজকাল, তারা বাবা-শিক্ষক-বন্ধুর গায়ে ছুড়ি মেরে দেয়। যারা আইন শৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণ করার কথা সেই পুলিশ বাহিনী তার মূল কাজে ব্যর্থ হলেও কিছুদিন হলো রাজনৈতিক নেতা-প্রতিবাদে মূখর নারী-অচেনা সরল সোজা গ্রামীণ যুবক সবার গায়েই হাত তুলছে নিয়মিত। আম জনতার চেয়ে সাংবাদিক পেশায় নিয়োজিত মানুষদের একটু প্রিভিলেজ ছিলো। কিছুদিন আগেও দেখা গেছে শীর্ষ সন্ত্রাসী থেকে শুরু করে দুর্নীতিবাজ আমলারাও ভয় পেতো সাংবাদিকের কলম বা ক্যামেরাকে। কিন্তু মে মাসের শেষ সপ্তাহে এসে যেনো সেই ধরে নেয়া বাস্তবতাকেও ভুল প্রমাণ করতে উঠে পড়ে লেগেছে কিছু মানুষ। গতো ২৬ মে জাতীয় দৈনিকের তিনজন ফটোসাংবাদিককে বলে কয়ে পেটানো হলো, গর্বিত এই পুলিশ অফিসারের বিরুদ্ধে নারী নির্যাতনের অভিযোগ ছিলো ছাত্র থাকাকালীন সময়েও। তিনি নিজের চরিত্র না পাল্টেই ঢুকে পড়েছেন কোনো এক প্রকারে যেখানে তার হয়তো থাকার কথা নয়। ২৮ তারিখ দেশের জনপ্রিয়তম অনলাইন দৈনিক বিডিনিউজ২৪'এর অফিসে ঢুকে কুপিয়ে হাসপাতালে পাঠালো এলাকার সন্ত্রাসীরা। কোনোখানে নিরাপত্তা নেই, রাস্তায় গণ্ডগোল হচ্ছে ভেবে দরজা আটকে ঘরে শান্তিতে বসে থাকা যাবে এমন নিশ্চয়তা স্বয়ং দেশের প্রধানমন্ত্রীও জোরগলায় দিতে পারেন না। এ অবস্থায় আমরা যারা ক্যামেরা নিয়ে দেশের সৌন্দর্য্য তুলে ধরতে উন্মুখ আছি গতো বেশ কয়েকবছর ধরেই তারা কি করতে পারি। এভাবেই ধ্বংস হয়ে যাবে দেশ আমাদের ক্যামেরার লেন্সের সামনে দিয়েই!? আগামীবছর কোনো ফটোগ্রাফি এক্সিবিশনে জমা দেয়ার জন্য একটা সুন্দর ছবি তুলতে পারবো তার নিশ্চয়তা কি কেউ দিতে পারবেন? পরিস্থিতি কিন্তু আদতেই এতোটা ভয়াবহ...

আসুন কিছু একটা করি। অন্ততঃ আমাদের মনটাকে পরিচ্ছন্ন রাখতে একদিন ফেইসবুকের প্রোফাইল পিকটাকে কালো করে দিয়ে চলতে থাকা অন্যায়-অবিচারকে দেখাই এভাবে খুব বেশিদূর আর যাওয়া হবে না তার, বাংলাদেশের মানুষের সমৃদ্ধ অতীত ইতিহাস রয়েছে রুখে দাঁড়ানোর। প্রয়োজন নিজেদের অস্থির অস্তিত্বগুলোকে একটি ছবিতে চিনে নেয়া। আগামী জুন মাসের ১ ও ২ তারিখ ফেইসবুক প্রোফাইলটাকে কালো করতেও কি আমাদের কষ্ট হবে খুব!?

পোস্টটি ১১ জন ব্লগার পছন্দ করেছেন

রাসেল আশরাফ's picture


আজ সকালে একটা কোরিয়ান সাইটে একজনের ব্লগ পড়ছিলাম ঢাকা নিয়ে। যদিও আমি কোরিয়ান ভাষা বুঝি না গুগুল ট্রান্সলেটরে অনুবাদ করে যা বুঝলাম খুব একটা ভাল কিছু লিখেনি। পড়ে মেজাজটা খারাপ হলো কিন্তু কিছুক্ষন পর চিন্তা করলাম যা লিখেছে মিথ্যাতো লিখে নি।

আসলেই এর একটা বিহিত দরকার।
আপনার প্রস্তাবে সহমত।

সাঈদ's picture


ইদানিং খুব টেনশন হয়।
শুধু সরকার, পুলিশ এরা না , মানুষগুলোও ইদানিং খুব হিংস্র হয়ে গেছে। খুব ভয় হয় ।

মেসবাহ য়াযাদ's picture


দেশে আসলে হচ্ছেটা কী ? আমি খুব আতঙ্কিত বোধ করছি- আমাদের পরবর্তী প্রজন্মের কথা ভেবে

রন's picture


প্রস্তাবের সাথে সমর্থন রইলো! একটা ব্যাজ তৈরি করে দিয়েন ভাস্কর দা এবং একটা নতুন পোস্ট যেখানে আমাদের প্রতিবাদের সারসংক্ষেপ থাকল। পোস্টটা আমরা ফেইসবুকের মাধ্যমে বন্ধুদের মাঝে ছড়িয়ে দিলাম!

বিষণ্ণ বাউন্ডুলে's picture


সহমত।

স্বপ্নের ফেরীওয়ালা's picture


প্রস্তাবের সাথে সমর্থন রইলো!

সাথে রইন্যা আরেকটা ব্যাজ তৈরি করো "MADS IN BANGLADESH" Smile

~

আরাফাত শান্ত's picture


কত কিছু করার ছিলো কিন্তু মাঝখানে শুধু সময়গুলোই চলে গেলো!

রন's picture


আমার প্রোফাইলটা কালো করে দিলাম!

তানবীরা's picture


আসলেই এর একটা বিহিত দরকার।
শুধু সরকার, পুলিশ এরা না , মানুষগুলোও ইদানিং খুব হিংস্র হয়ে গেছে। খুব ভয় হয় ।

মন্তব্য করুন

(আপনার প্রদান কৃত তথ্য কখনোই প্রকাশ করা হবেনা অথবা অন্য কোন মাধ্যমে শেয়ার করা হবেনা।)
ইমোটিকন
:):D:bigsmile:;):p:O:|:(:~:((8):steve:J):glasses::party::love:
  • Web page addresses and e-mail addresses turn into links automatically.
  • Allowed HTML tags: <a> <em> <strong> <cite> <code> <ul> <ol> <li> <dl> <dt> <dd> <img> <b> <u> <i> <br /> <p> <blockquote>
  • Lines and paragraphs break automatically.
  • Textual smileys will be replaced with graphical ones.

পোস্ট সাজাতে বাড়তি সুবিধাদি - ফর্মেটিং অপশন।

CAPTCHA
This question is for testing whether you are a human visitor and to prevent automated spam submissions.

বন্ধুর কথা

ভাস্কর's picture

নিজের সম্পর্কে

মনে প্রাণে আমিও হয়েছি ইকারুস, সূর্য তপ্ত দিনে গলে যায় আমার হৃদয়...