পুলিশ পাঁচালী...
বিলাত থেকে ব্যারিস্টারি পাস করে বাড়ি ফিরেছেন কেবল। আত্মীয়স্বজনেরা দেখতে আসছে, আশীর্বাদ করছে, "আরো বড় হও বাবা, জীবনে বহুদূর যাও।" সবার এমন আগ্রহী চোখ এড়িয়ে তিনি ছুটে গেলেন ঠাকুমার কাছে। যার কাছে কিচ্ছা শুনতে শুনতেই তার রাজকুমার হওয়ার স্বপ্ন ভিড় করেছে সেই কৈশোরে! যার পথ ধরেই তার সাত সমুদ্দুর তেরো নদী পাড়ি দিয়ে বিলাতে ব্যারিস্টারি পড়তে যাওয়া। ঠাকুমার পা ছুঁয়ে প্রণাম করতেই উঠে গেলেন তিনি। তারপর কনুইয়ের উপর ভর করে কোনোরকমে বৃদ্ধা ঠাকুমা আধশোয়া ভঙ্গীতে উঠে বসার চেষ্টা করতে তিনি এগিয়ে গেলেন আরো খানিকটা কাছে। একেবারে সত্যজিতের পথের পাঁচালীর ইন্দির ঠাকরুনের মতোন চেহারার ঠাকুমা খনখনে কণ্ঠস্বরে ফোকলা দাঁতে তাকে আশীর্বাদ করলেন। প্রথমবার তিনি ঠিক বুঝে উঠতে পারলেন না ঠাকুমার আধো আধো কথাগুলো। কয়েক মুহুর্ত পর তিনি পুরো কথাটার মানে বের করতে পেরে ঢোক গিললেন যেনো। শৈশবের স্বপ্ন দেখানো ঠাকুমার কথাগুলো যেনো তার বুকে শেল হয়ে বিঁধলো। তার কানে স্পষ্ট স্বরে শৈশবের সেই দৃপ্ত কণ্ঠস্বরে এখনকার কথাগুলো বাজতে থাকলো ভাঙা রেকর্ডের মতোন, "সবার মুখ উজ্জ্বল করে দিস দীনু, কিনু দারোগার মতো ক্ষমতা তোর হাতের মুঠোয়!"
বানানো গল্প হলেও এমন ঘটনার উল্লেখ বৃটিশ সাম্রাজ্যের পটভূমিকায় রচিত বেশিরভাগ সাহিত্যেই পাওয়া যাবে। বৃটিশ ঔপনিবেশিক শাসকেরা এই দেশে তাদের ক্ষমতার বিস্তারে পুলিশিং প্রথা চালু করেছিলো্। সেই আমলেই প্রত্যন্ত বাংলায় এলাকায় দোর্দণ্ড প্রতাপে চলতেন দারোগা বাবুরা; তাদের বেতনের চেয়ে উপরি আয় ছিলো অনেক বেশি। বিয়ের পাত্র হিসেবেও এই দারোগাদের কদর ছিলো বেশ। অপরাধী ধরার চে' বিদ্রোহ দমনেই তাদের আগ্রহ থাকতো বেশি। সেই বৃটিশ পুলিশিং আদর্শে ভাবধারাতেই বেড়ে উঠেছে এই অঞ্চলের পুলিশ সাম্রাজ্য। জমিদারী প্রথা বিলোপের মাধ্যমে বৃটিশরা ক্ষমতা কুক্ষিগত করেছিলো ঠিকই, কিন্তু এই একটা ব্যাপারে তারা জমিদারদের সাজিয়ে তোলা নিয়মের অনুসারী হয়েছিলো সেই সময়টাতে। জমিদারদের নিরাপত্তা দেখভালের নামে লুটতরাজ আর নির্যাতনের হাতিয়ার হয়েছিলো তাদের লাঠিয়াল গোষ্ঠী, তেমনি ভাবেই বৃটিশদের ক্ষমতার খুটির নিরাপত্তা দেখতো এই দেশীয় পুলিশ বাহিনী।
বৃটিশদের সাম্রাজ্য ছেড়ে দিতে হয়েছিলো বিদ্রোহের তোড়ে। ঔপনিবেশিকতার শক্তিকে পরাজয় মেনে নিতে হয়েছিলো স্বরাজের দাবীতে গড়ে ওঠা বিদ্রোহী শক্তির কাছে। ক্ষমতা অধিগ্রহণ করলো দেশীয় শাসকেরা। অনেক স্বপ্ন-অনেক কল্পণার ফানুষ উড়িয়ে বসেছিলো এদেশের সাধারণ মানুষেরা। কিন্তু যে কে সেই বৃটিশদের তৈরী করে দেয়া কাঠামোর ভেতরে ঢুকে দেশীয় বিপ্লবীরা যেনো তামাটে বা খয়েরী ত্বকের বৃটিশই বনে গেলো দিনে দিনে। তারাও ব্যক্তিস্বার্থ চরিতার্থ করতে শুরু করে দিলো। তাদের এই ধান্দাবাজীতে জনগণের মনে আবারো বিদ্রোহ দানা বাঁধতে শুরু করলে হুমকীর সামনে পড়ে গেলো তাদের নিরাপত্তা। আবারো নির্ভরতা তৈরী হতে শুরু করলো পুলিশের উপর।
এমন ধারাবাহিকতা নিয়েই ভারত-পাকিস্তান আর বাংলাদেশ। ইতিহাসের এমন সময়ের উদাহরণটাই বেশি যখন পুলিশি ক্ষমতা শাসকের স্বার্থ ছাড়া অন্য কিছুর দিকে ঝুকেছে। হয়তো ঝুকেছেও...কিন্তু সেটা পরবর্তীতে ক্ষমতায় আসতে পারার সম্ভাবনায় দাঁড়িয়ে থাকা গোষ্ঠীর দিকেই। পুলিশ কখনো সাধারণ মানুষের বন্ধু ছিলো্ না। মুক্তিযুদ্ধে কথিত নেতৃত্বদানকারী দল আওয়ামী লীগ যখন নির্বাচনে নিরংকুশ বিজয়ের মধ্য দিয়ে শাসন ক্ষমতা পেলো, অবিসংবাদিত নেতা বঙ্গবন্ধুও তার বিরুদ্ধে পুঞ্জিভূত বিদ্রোহ দমনের সম্ভাবনাকে তিরোহিত করতে লাঠিয়াল পুলিশ বাহিনীকে দাবড়ে দিয়েছিলেন। যারা সন্ত্রাসী আওরঙ্গকে ধারালো অস্ত্র হাতে হাতের কাছে পেলেও গ্রেফতার করেনি কিন্তু বিদ্রোহী ছাত্রসমাজের মেধাবী তরুণদের দিকে ছিলো তাদের শাসালো নজর। পরবর্তীতে অবশ্য পুলিশের ট্রেনিংজনিত দূর্বলতায় আওয়ামী সরকারকে গড়ে তুলতে হয়েছে প্রশ্নহীন-জবাবদিহিতাহীন রক্ষীবাহিনী। সে আরেক ইতিহাস...আজ থাক।
সপরিবারে বঙ্গবন্ধু পরিবারকে হত্যা করা হলো। সেনাবাহিনীর একটা সশস্ত্র গ্রুপ ক্ষমতা অধিগ্রহণ করলো্। নানা চড়াই উৎড়াই পেরিয়ে জেনারেল জিয়াই জিতলেন চালাকিতে। তিনি সেনাশাসন জারী করে বুঝলেন সেনাবাহিনীর সাথে জনগণের কোথায় যেনো সুর কেটে যায়। আর তাই তিনিও নির্ভর করলেন পুলিশি হামলা-মামলাতেই। এরপর আবারো সেনাবিদ্রোহ, আবারো নতুন সামরিক স্বৈরশাসক। স্বৈরাচারী এরশাদের দীর্ঘ নয় বছরের শাসনকালেও পুলিশি ভূমিকা একবারের জন্যও পাল্টায়নি বরং ৭৩'এ যেমন কমিউনিস্ট পার্টির মিছিলের উপর কোনোরকম উস্কানি ছাড়াই পুলিশ গুলি চালিয়েছিলো তেমনি করেই ৮৩তে শিক্ষার দাবীতে সংগঠিত মিছিলের উপর পুলিশের ট্রাক তুলে দিয়ে মেরে ফেলা হলো চারজন ছাত্রী-ছাত্রকে।
এসময় জুড়েই ছিলো পুলিশি দাপট। নব্বইয়ের ছাত্র-গণঅভ্যূত্থানের মধ্য দিয়ে পাওয়া গণতান্ত্রিক স্বপ্নে যখন এই বাঙালি জাতি বিভোর বা আচ্ছন্ন তখন অন্যদিকে চলছে শাসকদের পুলিশি পরিকল্পণা। হামলা মামলা আর দাবড়ানোর সেই পুরাকালীন ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি শুরু হলো গণতান্ত্রিক কাঠামোয় ক্ষমতা পাওয়া বিএনপি সরকারের হাত ধরে। যেই রক্ষীবাহিনীর নির্যাতন এদেশে তৈরী করেছিলো্ একটি আওয়ামী বিরোধী রাজনৈতিক বিরোধ তারা এবার তৈরী করলো পুলিশ আর সেনাবাহিনীর সমন্বয়ে আরেকটি রক্ষীবাহিনী। কেবল নামে আর পোশাকের ফারাক।
বিরোধী দলে থাকলে রাজনীতিবিদেরা বহু কথা কয়। কিন্তু ক্ষমতায় গেলে সেই একই রকম পুলিশি সরকার। গণতন্ত্রের মুখোশ পেয়ে যাওয়ায় বরং তাদের অনেক পদক্ষেপ জায়েজ হতে শুরু করলো। পরবর্তী নির্বাচনে আওয়ামী লীগের হাতে ক্ষমতা ছেড়ে দেয়ার পর জানা গেলো বিএনপি সরকার বিসিএস পরীক্ষার মাধ্যমে কিভাবে জোচ্চুরি করে পুলিশে তাদের প্রাক্তণ ছাত্রনেতাদের ঢুকিয়ে দিয়েছিলো। ঠিক একইভাবে আবার যখন আওয়ামীরা ক্ষমতা ছাড়লো তখন আবার একই কাহিনী শুনতে পেলাম আমরা যারা আম জনতা। রাজা যায় রাজা আসে, পুলিশেও ঘটে একই ঘটনা...আওয়ামীপন্থীরা যায় বিএনপি পন্থীরা আসে...বিএনপি পন্থীরা যায় আওয়ামী পন্থীরা আসে। তাও এই নির্বাচনের বাঁধা পেরোতে পারে কেবল তারাই যাদের মাস্তানিতে রয়েছে প্রভূত খ্যাতি আর উপরি দেয়ার ক্ষমতা। গতো বছর বিশেক ধরেই এ নিয়ম চলতে চলতে পুলিশ এখন আওয়ামী-বিএনপি মাস্তানদের রিহ্যাব সেন্টার বনে গেছে পুরোপুরি।
একজন মাস্তানের নির্ভরতা থাকে গডফাদারে অর্থাৎ দলবাজ নেতার আর তার রক্ষিত অস্ত্রের উপর। গডফাদার বিগড়ালে পুলিশ দাবড়াতে শুরু করে সেই মাস্তান সন্ত্রাসীকে আর গডফাদারের মন রাখতে পারলে পুলিশ তাকে সালাম জানিয়ে দিন শুরু করে। আর মাস্তানরাই যখন পুলিশে নাম লেখাতে শুরু করলো তখন তার ভয় কীসে। যতোদিন ক্ষমতায় দল আছে ততোদিন আর ভয় কি! গডফাদারের উপর নির্ভরতা যে টাকার জোরে কিনে নেয়া যায় সেটা একজন মাস্তান সন্ত্রাসীর চেয়ে পুলিশ ভালো জানে। একজন নির্ভরতাহীন মাস্তানকে যেকোনো সময় ফাসিয়ে দেয়া যায়, কিন্তু পুলিশ মাস্তানের আছে একটা বৈধ অস্ত্রের ভাণ্ডার আর চার্জশীট উল্টে দেয়ার ক্ষমতা। যার ব্যবহার শুরুতে লুকিয়েচুরিয়ে হলেও ধীরে ধীরে দাপটে চলাটাই ফ্যাশন হয়ে দাঁড়ালো। পুলিশ এখন নিরপরাধী তরুণকে থানায় ধরে এনে মুক্তিপণের বিনিময়ে ছেড়ে দেয়। মুক্তিপণ না দিতে পেরে খুন হয়ে যাওয়া তরুণের সংখ্যাটাও কিন্তু এখন কম নয়!
আগে পুলিশ ক্ষমতাসীন নেতা ছাড়াও আরেকটা গোষ্ঠীকে ভয় পেতো। সেই ভয়ঙ্কর গোষ্ঠী সাংবাদিকরা প্রচার যন্ত্রে পুলিশি দুর্নীতি ছড়িয়ে দেয়ার কথা বলে পাড় পেয়ে গেছে সবসময়। আর বিষয়টাকে বিনিময় মূল্য হিসেবে রাখতেই খবরের কাগজ কিম্বা অন্যান্য প্রচার মাধ্যমেও পুলিশের নামে খুবেকটা কিছু ছাপা হয়নি...ব্যক্তিকে নিয়ে ঘাটাঘাটি হয়েছে যদিও, কিন্তু একটা সম্প্রদায় হিসাবে তার সন্ত্রাস-তার মাস্তানিকে সামনে না নিয়ে আসাটাই ছিলো সাংবাদিকদের বেঁচে থাকার অস্ত্র। সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে ক্ষমতার দাপট শুরু হলে অন্যায় অবিচার নিয়ে সংবাদপত্রিকার পাঠক বাড়তে শুরু করলে অনেকক্ষেত্রেই বিক্রি বাট্টার ইউনিক সেল্স পয়েন্ট হিসাবে পুলিশের দায়িত্বহীনতা কিম্বা পুলিশের অপরাধসমূহ খবর হিসেবে পত্রিকার পাতায় আসতে শুরু করলো গতো কয়েক বছর ধরে। পত্রিকায় ছবি আর সংবাদ ছাপা হতে শুরু করায় পুলিশের পিঠ দেয়ালে ঠেকতেও শুরু করলো। দেয়ালে পিঠ ঠেকলে শাসক হিসাবে থাকা তার রক্ষকও যে পিঠ দেখায়! বাঁচানোর মালিক তখন তো আর কেউ থাকে না...
এ অবস্থায়ই দেয়ালে পিঠ ঠেকে যাওয়া পুলিশ যেনো মারদাঙ্গা হয়ে উঠেছে সাংবাদিক সমাজের উপরেও। আর সাংবাদিক পিটিয়েও নিস্কৃতি পেয়ে যাওয়া পুলিশ তো দিশেহারা বাঘের মতোন যার চারিদিকে কেবল খাবার আর খাবার অর্থাৎ মানুষ আর মানুষ...কোনটা ছেড়ে কোনটা খাবে এমন চিন্তায় বিভোর পুলিশ আর অপরাধ দমন নিয়ে ভাবেনা। দেশে এখন মাঝে সাঝে শীর্ষ সন্ত্রাসীরা "ক্রসফায়ার" বা "এনকাউন্টারের" শিকার হয়, এছাড়া অন্য কোনো অপরাধের দায়ে তারা গ্রেফতার হয় না। পুলিশের অবশ্য একটা দায় এড়ানো বক্তব্য আছে এ ব্যাপারে, রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ তাদের অধিকার দেয় না কোনো মামলার সঠিক তদন্ত করে রহস্য উদঘাটনে। তারা মাঝে মাঝে জজমিয়াদের ধরে স্বীকারোক্তিমূলক প্যাদানি দেয় শুধু।
দেশের যখন এমন পরিস্থিতি, তখন চোখে পড়লো প্রিয় ছড়াকার লুৎফর রহমান রিটনের লেখা সাম্প্রতিক ছড়াটা, সেটাই আগে লিখে দিলে অবশ্য এতো বড় পোস্টের কোনো দরকার ছিলো না। তাই মাত্র দুটি লাইন উদ্ধৃত করে শেষ করি,
বলবো কি আর ভাই --
সবার উপরে পুলিশ সত্য তাহার উপরে নাই...





আপনার লেখাটা পড়তে পড়তে এই কথাটাই ভাবছিলাম
দেখি পরের লাইনে আপনি এটা লিখে দিয়েছেন।
আমি আর একটু যোগ করে যাই, একদিন সবকিছু ক্ষয়ে যাবে ----- শুধু পুলিশি তান্ডবটুকু রয়ে যাবে
একমত
পুলিশকে বেশ যত্ন করে ফ্রাঙ্কেনস্টেইন বানানো হয়েছে... এখন যা কিছু করার সেই করবে।
~
সবকিছুই নিয়ন্ত্রণহীন। নির্বাচনের আগের বছরগুলো কখনোই ভাল যায় না। দেখি এবার কি কি ঘটে
তবুও এই কড়া রোদে যখন কোনো ট্রাফিক কনস্ট্যাবল ঘামে ব্যাপক ভিজে পরিশ্রম করতেছে তখন মায়াই লাগে!
কী বলবো বলুন !
১. পুলিশের সামনে আমিন বাজারে ৬ ছাত্রকে ডাকাত বলে পিটিয়ে মেরেছে...
২. নোখালীতে মিলন নামের এক ছেলেকে পুলিশের সামনেই পিটিয়ে মারা হয়...
৩. ঢাবি'র কাদেরকে পুলিমশ পিটিয়ে স্বীকার করানোর চেষ্টা করেছে- সে ছিনতাইকারী...
৪. একজন বেসরকারী প্রাথমিক শিক্ষককে রাজপথে পিটিয়ে মেরে ফেলেছে পুলিশ...
৫. প্রথম আলোর ৩ ফটো সাংবাদিককে কী অমানুষিকভাবে পেটালো পুলিশ...
৬. আদালতে মামলা দিতে আসা এক তরুনীকে শ্লীলতাহানীর চেষ্টা এবং এ নিয়ে পরবর্তীতে ২ সাংবাদিক এবং ২ জন আইনজীবির উপর শারীরিক নির্যাতন...
৭. বরিশালের হিজলায় ৩/৪ দিন আগে এক গৃহ বধুকে পাসপোর্ট ইনকোয়ারিতে এসে এক পুলিশ একা পেয়ে ধর্ষণের চেষ্টা...
তারপরও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, পুলিশ আগের চেয়ে অনেক ভালো...
মন্তব্য করুন