ইউজার লগইন

রাঙ্গামাটির রঙে চোখ জুড়ানো? (তিন)

কেবল কৈশোরত্তীর্ন তরুন হিসাবে ৯০ দশকের শুরুতে যখন সুবলঙ আসতাম, তার রূপে মোহিত হইয়া একটা পুরা দিন চইলা যাইতো...পাহাড়ী ঝর্ণার অবারিত জলে শরীরের প্রতিটি কনায় শিউরে ওঠা অনুভূতি...চুয়ানির আচ্ছন্নতায় ঠান্ডা জলের বৈপরীত্যে আমরা সন্ধ্যাতক একদম নিজের জগতে থাকতাম। সেই সুবলঙে যাওনের লেইগা ইঞ্জিন চালিত ছাউনি দেওয়া ট্রলার ভাড়া কইরা পারিবারিক(?) আবহে যাত্রা...এক্কেরেই নতুন অভিজ্ঞতা আমার জন্য। কিন্তু ঈষিতা কটেজে চইলা আসছে সকাল সাতটায়! তারপর থেইকা প্রতিমুহুর্তে তাড়া...চলেন! চলেন!

তার তাড়াতেই ৯টার মধ্যে আমরা নৌকায় উইঠা প্রস্তুত। ঈষিতা আবার সাথে কইরা তার খালাতো ভাই হিমেলরে নিয়া আসছে গাইড হিসাবে। ঈষিতার ভাষায় এই ছেলে রাঙ্গামাটির আদ্যোপান্ত চেনে...৫ বছর কাটাইছে মারিশ্যার অরণ্যে...বরকলের প্রত্যেক পাহাড়ে তার পদচিহ্ন আছে...যদিও আমরা একদম পর্যটক প্যাকেজের ফরম্যুলা মাইনাই যাত্রা শুরু করলাম, গাইডের উপস্থিতি এইখানে বাহুল্যমাত্র। একদিনে ৫টা স্পটে প্রয়োজনীয় পদচারণা...

কাপ্তাই হ্রদে এইবার জল তার ইতিহাসের সব অভিজ্ঞতারে নাকচ কইরা ফুইসা উঠছে। নিয়মিত পাহাড়ি বৃষ্টির বাইরেও দিনভর মেঘাচ্ছন্ন আকাশ...তয় লেইকে শীতের পাখি আর সাদা বকের সংখ্যা আগের চাইতে খানিক বেশিই য্যান এইবার। প্রকৃতির সৌন্দর্য্যে রাকেশ তপতী আর মৌসুম স্তব্ধ-বাকরুদ্ধ হইলো খানিক্ষণের জন্য...কেবল ক্যামেরায় ক্লিক! আমি গতোবার আইসা পুরান রাজবাড়ির জাইগা ওঠা ছাদে নামছিলাম, সেই জায়গায় এইবার জাল পাতছে পরিবর্তীত পেশার পাহাড়িরা...কিছু বাঙালীও...এই পেশাগত সহাবস্থানরে একদম সম্প্রীতির নজরে আমি আগেও কখনো দেখি নাই...

জল বাড়নের কারনে নৌকার গতিপথ আগের চেয়ে অনেক সুখকর হইছে বইলা দাবী করলো মাঝি...আমরাও সায় দিলাম তার কথায়। হিমেল জানাইলো এই এলাকায় এখন ছোট পাহাড় বিক্রি হইতেছে ২০/৩০ হাজার টাকায়। সেই ছোটবেলা থেইকাই আমার পাহাড় কেনার শখ। মৌসুম আর আমি আমাগো পরিচয়ের শুরুর দিক থেইকাই দিনরাত পাহাড়ের উপর সাদা লজের স্বপ্ন দেখতাম। পাশে গাছের উপর একটা ঘর...দড়িতে গাথা সিঁড়ি...পাশে পাহাড়ি হ্রদ...হ্রদে বেগুনী নৌকা...

কিন্তু এতো রোমান্টিকতা আসলে সয় না জীবনে...সেই কথায় পরে আসি...দেড় ঘন্টার মাথায় আমরা সুবলঙে পৌছানোর পর দেখলাম গতোবছরের চাইতে খানিকটা স্বাস্থবান হইছে ঝর্না...তয় পুরানা স্মৃতির চক্করে আমার ইথিওপিয়ান বাঘের কথাই মনে পড়লো। রাঙ্গামাটি জেলার ডিসি সাহেবের করুনায়(?) রঙ্গম গাছ আর গাঁদা ফুলে ছাইয়া গেছে সুবলঙের বিস্তৃত প্রান্তর। না বাঙালী-না পাহাড়ি একটা অবয়ব দিয়া তিনি সাজাইতে চেষ্টা করছেন সরকারী টাকায় আর ব্যক্তিগত উদ্যোগে। বিদেশেও এই ধরণের ট্যুরিস্ট স্পট গুলি সংরক্ষিত হয় বইলা জানি, এনভায়রনমেন্টাল আর্কিটেকচারে আমাগো এক বড় ভাই পড়ালেখাও করছিলেন...পেবলো ভাইয়ের তৈরী করা একটা কাঠামোয় সেন্ট মার্টিনে আমরা গিয়া এক সপ্তাহ কাটাইছিলাম...তিনি দেখাইছিলেন কিভাবে প্রকৃতিরে তার নিজস্ব কাঠামোতেই উত্তরাধুনিক সৌকর্য্যে নিয়া আসা সম্ভব।

তয় এই ট্রিপে আমরা প্রথম ধাক্কা খাইলাম প্রবল শব্দে ধাইয়া আসা একটা মিলিটারী স্পিডবোটের আগমনে। ঠকাস ঠকাস কইরা তিনজন জলপাই গানম্যান নামলেন...তাগো পেছনে একজন সিনিয়র অফিসার, ক্যামোফ্লেজ লাইফ জ্যাকেট পরিহিত দুই শিশু কন্যা। তারা সুবলঙ ঝর্ণারে পেছনে রাইখা কয়েকটা স্থিরচিত্র তুলনের ফাকে আমরা নাইমা আসলাম ঘাটের চা-বিড়ির দোকানের সামনে। একজন মিলিটারী গানম্যান আগাইয়া আইসা আমাগো জেরা শুরু করলো,"কোত্থেইকা আসছেন...ক্যানো আসছেন" এই টাইপ প্রশ্নে। আমাগো জবাব শুননের পর রীতিমতো চমকাইয়া দেওয়া প্রশ্ন তার,"আপনারা যে এইখানে আসছেন...সিকিউরিটি দিচ্ছে কে?" আমি আগাইয়া গিয়া তারে কইলাম,"ভাই আমাগো সিকিউরিটির প্রয়োজন নাই...আমরা মাঝেমাঝেই এইখানে আসি বেড়াইতে।" গানম্যানের পরবর্তী বাক্য শুইনা রীতিমতো হাসি পাইলো...তিনি জানান দিলেন, "স্যারের মেয়েদের এই ভ্রমণের জন্য আমরা তিন জায়গায় সিকিউরিটি চৌকী বসাইয়া আসছি।" তার দম্ভ ভালো না লাগলেও কিছু করনের নাই...তারা আবার ঠকাস ঠকাস শব্দে স্পিডবোটে উইঠা রওনা দিলো।

তাগো যাওয়ার সময় লিংকিন পার্কের গান বাঁজাইয়া আরেকটা বোট আইসা ভিড়লো ঘাটে। একদল পাহাড়ি কিশোর নাইমা আসলো...তাগো মুখে চুয়ানির গন্ধ আমারে মনে পড়াইলো সেই সময়ের কথা! ঘাটের টিকেটের টাকা দিয়া ছেলেগুলি তর তরাইয়া উইঠা গেলো ঝর্ণার কাছাকাছি...আমরা উদ্যোগী হইলাম ফিরা যাইতে।

বাকী স্পটগুলিতে যাওয়ার পথে দেখি জলপাই মামুগো তিনটা স্পিডবোট সুবলঙ পানে ধায়...পাহাড়ি কিশোরেরাও তাগো জন্য হুমকী স্বরূপ...মনে হইলো ফিরা যাই...কিন্তু মধ্যবিত্ত প্রাণে পলায়নপরতা আছে...

পোস্টটি ১০ জন ব্লগার পছন্দ করেছেন

হাসান রায়হান's picture


ভাঙ্গা পেন্সিল's picture


রাঙ্গামাটিতে প্রথমবার গেছিলাম পরিচিত আত্মীয়ের ফেভারে। উনার কারণে বাস থেকে নামামাত্র হাজিরা দিলাম ডি.সি.র কাছে। ডি.সি. সবাইরে কে কোথায় পড় জিগাইলো। আমি বললাম বুয়েট। শুইনাই জিগায়, সাঁতার পার? আমি কইলাম না। কয়, ভুলেও তুমি পানিতে নামবা না। ট্রলারেও উঠবা না। Angry Angry ঐখান থেকা বাইর হইয়া ফার্স্ট প্লানঃ ট্রলারে উঠমু।

নীড় সন্ধানী's picture


পড়তে পড়তে যাচ্ছি। চেনা জায়গার কাহিনী পড়তে আরাম লাগে। শান্তিবাহিনীর যুগেই আমার সব ভ্রমন। নিষিদ্ধ এলাকায় ক্যামেরা হাতে দুয়েকবার হুমকি খাইছি। শুভলং গেছি তবে মারিষ্যা যাওয়া হয়নি।

টুটুল's picture


ফিরছেন?
ডাইরি কৈ?

ভাস্কর's picture


ফিরছি মাঝরাতে। তারপর ঘুমাইছি ভোরের দিকে। সারাদিন বিছানায় গড়াগড়ি চলতাছে...এরমধ্যে ইলেক্ট্রিসিটি গেছে দুইবার...

ডাইরী আবার আইজকার থেইকা শুরু হইবো...মেলায় যাওনের ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও শরীরের কুলাইলো না...

নরাধম's picture


 

 

নুশেরা's picture


শাওন৩৫০৪'s picture


....এইটা পৈড়া সেই ট্যুরের একটা কথা মনে পড়লো....আমরা গেছিলাম ২১/২২ জন। (খাগড়াছড়ি/রাঙ্গামাটি, বান্দরবান)...তাই যেই বাসেই উঠতাম, প্রায় পুরাটাই আমরা আমরাই....অল্প কয়েকজন পাহাড়ী থাকতো...লোকাল/ইন্টারসিটি বাসও ভাড়া করা বাসের মত ব্যাবহার করছি....তাই প্রতি চেকাপের সময় যখন জলপাই আঙ্কেলরা উঠতো, এত স্টুডেন্ট দেইখা চেকাইতো না....তখন খুব আত্মপ্রসাদ পাইতাম...ভিআইপি লাগতেছিলো নিজেদের...ভাবখানা এমন, ওদের এলাকায় ওরা নজরদারিতে আছের, অথচ আমরা সকল পাপের উর্ধে...এখন বুঝি, কি পরিমান অপমান ছিলো সেইটা তাদের জন্য....আর কি পরিমান অন্যয় ছিলো আমাদের অপরাধ বোদে না ভুগা টা...

তানবীরা's picture


পড়ছি

মন্তব্য করুন

(আপনার প্রদান কৃত তথ্য কখনোই প্রকাশ করা হবেনা অথবা অন্য কোন মাধ্যমে শেয়ার করা হবেনা।)
ইমোটিকন
:):D:bigsmile:;):p:O:|:(:~:((8):steve:J):glasses::party::love:
  • Web page addresses and e-mail addresses turn into links automatically.
  • Allowed HTML tags: <a> <em> <strong> <cite> <code> <ul> <ol> <li> <dl> <dt> <dd> <img> <b> <u> <i> <br /> <p> <blockquote>
  • Lines and paragraphs break automatically.
  • Textual smileys will be replaced with graphical ones.

পোস্ট সাজাতে বাড়তি সুবিধাদি - ফর্মেটিং অপশন।

CAPTCHA
This question is for testing whether you are a human visitor and to prevent automated spam submissions.

বন্ধুর কথা

ভাস্কর's picture

নিজের সম্পর্কে

মনে প্রাণে আমিও হয়েছি ইকারুস, সূর্য তপ্ত দিনে গলে যায় আমার হৃদয়...