ইউজার লগইন

মৃত্যুঞ্জয়

হঠাৎ করেই মাথাটা হালকা মনে হচ্ছে। ঘাড়ের উপর মাথাটা স্থির থাকতে চাইছে না। মাথাটা যেন হয়ে গেছে বাতাস ভর্তি বেলুন। সোজা হয়ে থাকতে পারছে না । নিজের ভারে একদিকে হেলে পড়ছে। জোর করে সোজা রাখতে চাইলাম, না রাখা যাচ্ছে না। শরীরটা নিস্তেজ হয়ে আসছে। মাথাটা হাত দিয়ে সোজা করে রাখবার জন্য দুই হাত দিয়ে ধরতে চাইলাম। হাত আমার নিয়ন্ত্রনে নেই, হাত উপরে উঠলো না। আমি হাঁটু ভেঙ্গে বসে পড়লাম। বসার সময় মনে মনে বলছি সাবধানে বসতে হবে, খুব সাবধানে।

চোখ মেলে দেখি সামনেই সাদা রঙের চাপা দেয়াল। হাত বাড়ালেই ছোঁয়া যাবে। দেয়ালে ধোঁয়াটে সাদা আলো। মোম এর আলো কি? এত উপরে মোমের আলো কেন? আমি কোথায়? আবার সব আধাঁর । ধীরে ধীরে আঁধার কেটে গেল।

আমি ছাদে হাঁটছিলাম। ডাক্তার একটু আধটু হাঁটতে বলেছে। সূর্য হেলে পড়েছিল পশ্চিমে। তারপর --আমি চমকে উঠলাম। চোখ মেললাম। ক্ষিন আলোতে আলোকিত একটি ঘর। পেটে হাত রাখলাম, একটু পরেই ভিতর থেকে ধাক্কা দিয়ে তার অস্থিত্ব আমাকে জানিয়ে দিল। আমাকে ফিসফিস করে বললো -মা আমি ভাল আছি।

আমি চারপাশে তাকালাম। এখানে কেন আমি? যাক গিয়ে যেখানে খুশি থাকি, আমার ঘুম পাচ্ছে, আমার সোনামনি ভাল আছে, আমার সাথে আছে, আমি আর কিচ্ছু ভাববো না।

পর পর তিনটি বাচ্চা অকালে চলে গেছে। প্রথম ভ্রুণটি চার মাসেই চলে গেছে তীব্র ইলেক্ট্রিক শক্‌ এর কারনে। তারপর যে এসেছে সে ঐ সময়ের আশে পাশের সময়েই চলে গেছে। যেন অগ্রজকে অনুসরণ করাই তাদের কাজ ছিল। এরপর দীর্ঘ বিরতি। অবশ্যই ডাক্তারের পরামর্শে। ডাক্তাররা বলেছেন-- বারবার ভ্রুণ চলে গেলে এক সময় আর থাকবেইনা। সাধারনত তিনটি গেলে আর থাকেনা । বছর ২/৩ অপেক্ষা করুন। অপেক্ষা করেছি। তারপর এই বেবী। ধারন করবার পর মাস তিন ভাল ছিলাম। এরপর এক সকালে ঘুম থেকে উঠে দেখি রক্তাক্ত আমি। হতভম্বের মত ওর দিকে চাইলাম। সে শক্ত করে আমার হাত ধরে বললো-- কিচ্ছু হবে না । ভয় নেই, একটু ও অস্থির হবে না, আমি আছি।

ডাক্তারের পরামর্শে বিছানা নিলাম। একদম হাঁটা নিষেধ। ২৮ সপ্তাহ পার হয়ে গেছে। আশায় বুক বেঁধেছি। সারা শরীরে পানি চলে এসেছে । ব্লাড প্রেশার ও খুব বেশী। ডাক্তারের পরামর্শেই একটু হাঁটাহাটি। তাই ছাদে গিয়েছিলাম হাঁটতে।

কত সময় গেছে আমি জানি না ।

হাসপাতাল এ থাকতে হলো আরও তিন সপ্তাহ। ভ্রুণের বয়স যেদিন ৩২ সপ্তাহ ৫দিন সেই রাতে ১১টায় ডাক্তার এসে জানালো আগামীকাল ভোরে আমার অপারেশন। সকালে চলে গেলাম অপারেশন থিয়েটারে।
----কে যেন বললো বেবী মাকে দেখাও। বেবী এল । একটি কমলা রঙের কাপড়ে মোড়া ছোট্ট পুটলি। মুখটুকু শুধু বের করা। চোখ পিটপিট করছে। একদম গোলাপী একটি পুতুল। কমলা কাপড়ে অপূর্ব রূপ ধারন করেছে। মনে মনে বললাম ‘এত সুন্দর হয় মানব শিশু।‘

বেবী হবার আজ সাত দিন পার হলো ,আমি হাসপাতালে আছি । আমার কোন ছুটি নেই। কেন নেই ? কেউ সঠিক জবাব দেয় না। সবাই বলে --দেখি কাল হয়ত দেবে। আমার সাথের রুগীরা বাচ্চা নিয়ে চলে যাচ্ছে হাসি মুখে আর আমি পরে আছি।

বিকাল সাড়ে তিনটা। মাথাটা ঝিম ঝিম করছে। একটু পরেই মাথার ব্যাথাটা খুব বেড়ে গেল। ওয়ার্ড থেকে বের হয়ে সামনে যে ডাক্তার পেলাম তাকে বললাম --আমার খুব মাথা ধরেছে। তিনি চট করে প্রেশার মাপার যন্ত্র নিয়ে আমার বেডে এলেন। প্রেশার চেক করে আমাকে শুয়ে থাকতে বলে দৌড় দিলেন।

আমি উঠে বসলাম। আমার সারা শরীর কুঁকড়ে আসছে । একটা বহির্শক্তি আমাকে বিছায় শুইয়ে দেবার চেষ্টা করছে, আমি প্রাণপন চেষ্টা করছি না শোবার। মনে হচ্ছে শুলেই মরে যাব। আমার হাত,পা সহ সমস্ত শরীর ছোট হয়ে আসছে, যেন সব একসাথে মিলিত হয়ে একটা গোল বস্তুতে পরিনত হবে। বুকের উপর চেপে বসা অশারিরীক শক্তি যা ভিতরের হৃদপিন্ডটাকে হাতের মুষ্ঠীতে চেপে ধরেছে। বৃন্ত থেকে ছিঁড়ে আনবে যেন। কয়েক মিনিট মাত্র। আমি বসা অবাস্থাতেই চোখ মেলে দেখি আমার চারপাশে শুধু ডাক্তার। সবাই বলছে শুয়ে পড়ুন। আমি সবাইকে সরে যেতে বলতে চাচ্ছি। তাদের বলছি আমি এত ভিড়ে শ্বাস নিতে পাড়ছি না। কেউ সড়ছে না। আমার কন্ঠ দিয়ে কোন শব্দ বের হচ্ছে না। কে যেন চিৎকার করে বলছে --আদালত কই আদালত আনুন।

যখন চোখ মেললাম তখন দেখি আমি আবার একটি ছোট্ট ঘরে, অন্ধকার। হাত বাড়িয়ে বিছানা ছুঁয়ে ছুঁয়ে দেখলাম । আমি একা, বাবুতো নেই। মা কে ডাকলাম। নার্স এসে পরম মমতায় হাতটা কপালে রেখে বললেন -বাবু আমাদের কাছে আছে। আপনি ঘুমান।

আমি জেগে উঠলাম। ফিরে এলাম নিজের পরিচিত জগতে। মৃত্যুর খুব কাছ থেকে ফিরে এলাম। সম্পূর্ন সজাগ মস্তিস্কে সমস্ত শরীর যখন মস্তিস্কের আদেশ অমান্য করে সেই অনুভূতি বর্ণনার অতীত। অপরিচিত জগতে যেখানে আমি যেতে চাই না সেখানে টেনে নিয়ে যাবার অভিজ্ঞতা ভয়াবহতর।

পোস্টটি ৭ জন ব্লগার পছন্দ করেছেন

উচ্ছল's picture


ভালো থাকবেন। সামনের দিনগুলো হোক আনন্দময়।

সামছা আকিদা জাহান's picture


ধন্যবাদ।

টুটুল's picture


এইটা কি গল্প নাকি আপনার ???? Sad

সামছা আকিদা জাহান's picture


http://www.somewhereinblog.net/blog/akidaruna/29129479 সামুতে লিখেছিলাম এইটা। পরে না বুঝে আমরা বন্ধুতে পোস্ট করেছিলাম। তারই ধারাবাহিকতায় এটা লিখলাম। এ আমার নিজের কথা। ধন্যবাদ।

শওকত মাসুম's picture


ভাল থাকুক সবাই

সামছা আকিদা জাহান's picture


ধন্যবাদ মাসুম ভাই। ভাল থাকুন সব সময়।

মীর's picture


লেখাটা ভালো লাগলো বলে সামু'র লিংকটাতেও ক্লিকাইলাম। পড়ে মুগ্ধ হয়ে গেলাম। সাথে সাথে কষ্টও হলো খুব। আপনি আসলে দারুণ করে লিখতে পারেন।

সামছা আকিদা জাহান's picture


ধন্যবাদ মীর। আসলে মাঝে মাঝে স্মৃতি চারন করতে খুব ভাল লাগে।

লীনা দিলরুবা's picture


প্রথম ঘটণাটি জানা ছিল। আজকেরটি পড়ে আবার মন খারাপ হলো।

১০

সামছা আকিদা জাহান's picture


মন খারাপ করার কিছু নেই লীনা আমার শুভার্থীর বয়স এখন সাড়ে ছয় বছর। শত কষ্টের পর পাওয়া আমার অমূল্য সম্পদ আমার সব দুঃখ ভুলিয়ে দিয়েছে।

১১

নাজ's picture


----কে যেন বললো বেবী মাকে দেখাও। বেবী এল । একটি কমলা রঙের কাপড়ে মোড়া ছোট্ট পুটলি। মুখটুকু শুধু বের করা। চোখ পিটপিট করছে। একদম গোলাপী একটি পুতুল। কমলা কাপড়ে অপূর্ব রূপ ধারন করেছে। মনে মনে বললাম ‘এত সুন্দর হয় মানব শিশু।‘

আসলেই! সকল মায়ের তার সন্তান'কে প্রথম দেখার এই অনুভুতি বুঝি একই Smile

ভালো থাকুন, এটাই দোয়া করি।

১২

সামছা আকিদা জাহান's picture


আসলেই মা ই শুধু পায় সন্তান ধারনের আনন্দ। আপনারাও ভাল থাকুন।

১৩

লিজা's picture


কোন কিছু বলার ভাষা হারিয়ে ফেলার মত লেখা, শরীর অবশ করে দেবার মত ঘটনা । Sad । সব কিছুর পরেও যে আপনারা সুস্থ আছেন, ভালো আছেন, জেনে খুব ভালো লাগলো । ভালো থাকুন, সুস্থ থাকুন সবসময় ।

১৪

সামছা আকিদা জাহান's picture


আপনারাও ভাল থাকুন। ধন্যবাদ।

১৫

তানবীরা's picture


আপনার এই অভিজ্ঞতাটা আমার খুব চেনা। মা আর ছা ভালো থাকুক এই শুভ কামনা। আপনি সাহসী দুঃসময়গুলো লিখে ফেলেছেন, আমার ভাবলেও হেলুসিনেশন হয়

১৬

সামছা আকিদা জাহান's picture


ধন্যবাদ তানবীরা। বেঁচে আছি এটাই বড় কথা।

মন্তব্য করুন

(আপনার প্রদান কৃত তথ্য কখনোই প্রকাশ করা হবেনা অথবা অন্য কোন মাধ্যমে শেয়ার করা হবেনা।)
ইমোটিকন
:):D:bigsmile:;):p:O:|:(:~:((8):steve:J):glasses::party::love:
  • Web page addresses and e-mail addresses turn into links automatically.
  • Allowed HTML tags: <a> <em> <strong> <cite> <code> <ul> <ol> <li> <dl> <dt> <dd> <img> <b> <u> <i> <br /> <p> <blockquote>
  • Lines and paragraphs break automatically.
  • Textual smileys will be replaced with graphical ones.

পোস্ট সাজাতে বাড়তি সুবিধাদি - ফর্মেটিং অপশন।

CAPTCHA
This question is for testing whether you are a human visitor and to prevent automated spam submissions.

বন্ধুর কথা

সামছা আকিদা জাহান's picture

নিজের সম্পর্কে

যতবার আলো জ্বালাতে চাই নিভে যায় বারেবারে,
আমার জীবনে তোমার আসন গভীর আন্ধকারে।
যে লতাটি আছে শুকায়েছে মূল
কূড়ি ধরে শুধু নাহি ফোটে ফুল
আমার জীবনে তব সেবা তাই বেদনার উপহারে।
পূজা গৌরব পূর্ন বিভব কিছু নাহি নাহি লেশ
কে তুমি পূজারী পরিয়া এসেছ লজ্জার দীনবেশ।
উৎসবে তার আসে নাই কেহ
বাজে নাই বাঁশি সাজে নাই গেহ
কাঁদিয়া তোমারে এনেছে ডাকিয়া ভাঙ্গা মন্দির দ্বারে।
যতবার আলো জ্বালাতে চাই নিভে যায় বারে বারে।