ইউজার লগইন

একজন গোলকিপারের আত্মজীবনী

আমার সারাটা জীবন মোটেমাটে ঘুরতে ঘুরতে কেটেছে।পিতৃদেবের সরকারি চাকুরির সুবিধায় আমাকে ক্লাস টেন পর্যন্ত সাতখানা স্কুল চেন্জ করতে হয়েছে।স্কুল জীবনে খেলা বলতে খেলেছি ফুটবল,কাবাডি আর যৎসামান্য ক্রিকেট।কাবাডি ক্যারিয়ার রীতিমত ঝলমলে ।পরপর দুইবার সিলেট সরকারি পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়ে কাবাডি চ্যাম্প.(একটুও বাড়িয়ে বলিনি।)।ক্রিকেটে ক্যারিয়ার ঝরঝরে।সারাজীবনের সর্বোচ্চ রান - তাও সিলেটে পাড়ার এক সম্মান রক্ষার ম্যাচে ৩৫ বলে ২২ রান।কিন্তু ফুটবল এখানে ভালোই আছে কৃতিত্ব!!!ভাবতে ভালো ই লাগে বুফন,চিলাভার্ট,পিটার চেক দের মত আমিও একজন--------------- গোলকিপার।

c

বাংলার হাজারো নাদুস নুদুস বাচ্চাদের মত আমিও একজন,যাদের ফুটবলীয় সামর্থে দিধান্বিত হয়ে দলনেতা সাথে সাথে বানিয়ে দেন "গোলবারের অতন্দ্র প্রহরী"।

শুরুটা যেভাবে:

আমার জন্ম ঢাকায়।ওখানে থাকি ২ বছর(যা আমি মনেই করতে পারিনা।মার কাছে শোনা।)তারপর ছিলাম কুষ্টিয়াতে আড়াইটি বছর।বয়স যখন পাঁচ তখন এলাম চট্টগ্রামে।চট্টলাতেই আমার পড়ালেখার পাট শুরু হল-কিউ.বি কিন্ডারগারটেনে।ফুটবলে হাতে খড়িও হল এখানেই।এক টিফিন পিরিওডে ক্লাস ওয়ানে থাকতে আমরা ফুটবল খেললাম যাতে আক্ষরিক অর্থে কোন ফুটবল ছিলোনা।হাল্কা সবুজ সে গোল বস্তুটির নাম- "ছোট কাচা জাম্বুরা"। এখানে বা এই ম্যাচে আমি প্রথম ও শেষ বারের মত খেলেছিলাম উন্মুক্ত ভাবে।এভাবে চট্টলায় ক্লাস থ্রি এর অরধেক পর্যন্ত পড়ে বাবা বদলি হলেন সিলেটে।বছরের মাঝে তো আর ভাল কোথাও ভর্তি হয়া যায়না।আমি পাড়ার এক স্কুলে ভর্তি হলাম।একদিন পাড়ার মাঠে আপন মনে বসে আছি।এক বিশাল লম্বা মানুষ আমাকে বললেন "বসে রইস কিতার লাই।"অতপর আমাকে তার দলের গোলরক্ষকের পদে নিযুক্ত করলেন।আমি প্রতিবাদ করার সাথে সাথে বলা হলঃ'মুটা পুয়া কেমেনে সামনে খেলবি যা বলছি কর।'জানা গেলো তাহার নাম জুনায়েদ ভাই।আমাকে গোলী পেয়ে বিপক্ষের খেলয়ার দের সে কি আক্রমন।ব্রাজিলের জাগো বনিটা যেন নেমে এসেছিল সিলেটের এক টুকরা মাঠে।নিষ্ঠার সাথে বেশ কটা গোল আটকালেও খেলাম চার খানা।শরীরের এখানে সেখানে বল লাগছিল -কিন্তু কিছুই হয়নি টাইপের মুড ধরে রেখেছিলাম।এক সময় বল সজোড়ে লাগলো এমন এক জায়গায় যে বেনিআসহকলা একসাথে দেখে আকাশের তারা ও গুনে ফেললাম খান দশেক।প্রথম বড় ম্যাচে আমার বিদায় হল দু পায়ের মাঝে হাত দিয়ে গোঙাতে গোঙাতে।

এর পর আমি থাকা মানেই

যা গোলবারে যা।

এলাকার এক নম্বর কিপার হয়েই ক্যারিয়ার শুরু করলাম আমি।কেউ বুঝলোনা বাংলাদেশের বাতিস্তুতাকে বানানো হচ্ছে গোল্কিপার!?!??! Sad(

এর পর ক্লাস ফোরে আমি সিলেট সরকারি পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়ে ভরতি হলাম।এখানে ফুটবল খেলা কোথায় না হয়??????বিশাল মাঠে।পাইলট স্কুলের সারি সারি ক্লাসের মাঝেও ছিলো ছোট ছোট জায়গা।সেখানেও চলত খেলা।আবার বায়োলজি প্র্যাকটিকাল রুমের পিছনে কদম তলায় ও চলত ফুটবল খেলা।বিশাল কথিত অডিটরিয়ামেও আছে ফুটবল। বল কোথায় পেত!?পাইলট স্কুলে ফুটবল খেলতে বল লাগেনা।ক্রিকেট বল,ফুটবল,সিঙারা খাওয়ার কাগজের ঠোঙা সবঈ এখানে বল। আর আমিও এখানে যথারিতি "গোলী"।স্বাস্থগত কারণে বন্ধুরা আমায় ডাকত কেউ মোটু,কেউ ভুট্টু নামে।তাদের কাছে গোল্কিপার পদে আমার তুলনাই নাকি নাই।আমার শরিরের কারণেই নাকি পুরা বার ঢাকা পড়ে যায়...।রোনাল্ডও নাকি আমাকে গোল দিতে পারবেনা।আর তাই আমি মাঠে দাঁড়িয়ে খালি আটকাই না হলে গোল খাই। পাথরে লোহা ঘষলে লোহাও সুঁই হয়ে যায় এক সময়।আমি ও তাই ভালো কিপার ই হয়ে গেলাম।এভাবে সিলেটে ক্লাস ফোর থেকে এইট আমি একটানা গোলকিপার ছিলাম।প্রথমে অবহেলার শিকার হয়ে গোল কিপার হলেও পরে আমি গোল্কিপার হতাম সমীহের কারণে। মনে পড়ে একবার পাড়ার ফাইনাল খেলায় আমাদের মেইন স্ট্রাইকার রাশেদ ভাই না থাকায় আমার উপর কড়া নিরদেশ ছিল গোল খাওয়া যাবেনা...।।আমি গোল খাইনি।উপরন্তু পেনাল্টিশ্যুট আউটে আমি যতদুর মনে পড়ে তিনটা শট আটকে এলাকায় হিরো হয়ে গিয়েছিলাম এই মোটাসোটা শরীর নিয়েও।মানুষের চোখে বিজয়ির কোন দোষ থাকেনা।তাই আমার ভারী শরীরটাকে সবাই কাধে তুলে নিয়েছিল পরম ভালোবাসায়।ঘটনা ক্লাস এইটের।

তারপর আব্বা আবার বদলি হলেন।এবার আবার চট্টগ্রামে।কিন্তু রোনালদিনহো যেমন তার সেরা সময় ফেলে এসেছিলো বারসায়।তেমনি আমিও সিলেটে...।।এখানে তাই কিছুই করা হলোনা।আজ তাই বিশ্বকাপ দেখতে গিয়ে প্রিয় দল গোল দিলেও মনের অজান্তেই মন খারাপ হয়ে যায় "গোলকিপারের" জন্য...।।

পোস্টটি ৯ জন ব্লগার পছন্দ করেছেন

নজরুল ইসলাম's picture


ভালো লিখছেন। পড়ে মজা পাইলাম।
আমি খেলা পারতাম না, কিন্তু খেলায় উৎসাহ ব্যাপক ছিলো। গোলকিপারও না স্ট্রাইকারও না, আমারে বন্ধুরা ভালোবেসে ডিফেন্সে বসায়া রাখতো। আর আমি ছিলাম সাইজে আপনের উল্টা। কাঠির মতো শুকনা।

আশফাকুর র's picture


প্রথমে আমিও পারতাম না।পরে হয়ে যায়।এবার বিশ্বকাপে নাইজেরিয়ার গোলকিপার রে দেইখা পুরান কথা মনে হইল।

নাহীদ Hossain's picture


Laughing মজা লাগছে। আপ্নের গোল্কিপার ক্যারিয়ার স্বার্থক।

আশফাকুর র's picture


থাংকু থাংকু।
ক্যারিয়ারটা ছোট হৈলেও খারাপ না কি বলেন..।হহাহহা Devil Devil Devil Devil

ভাঙ্গা পেন্সিল's picture


আমি ডিফেন্ডার ছিলাম। আসলে ছিলাম ম্যান-মার্কার। মেইন ম্যাচে আমারে খেলাইতো না, মেইন ম্যাচের আগের প্রাকটিস ম্যাচে খেলাইতো...দুই-তিনখান অপোজিশন স্টার যেন পরের ম্যাচে খেলতে না পারে সেই ব্যবস্থা করতে Wink

আশফাকুর র's picture


আমি আবার ফেয়ার প্লের সাপোর্টার। Crazy Crazy Crazy Crazy

ভাঙ্গা পেন্সিল's picture


আমিও তো Wink রেফারির চোখ এড়ায়া ট্যাকল করি Big smile য়ামার জীবনের একমাত্র হলুদ কার্ড খাইছি হ্যান্ডবল কইরা Innocent

আশফাকুর র's picture


আমি জীবনে হলুদ কার্ড একটাও খাইনাই।তবে দুইটা লাল খাইছি

মামুন হক's picture


দারুণ লাগলো আপনার স্মৃতিচারণ ভাই। মজার ব্যাপার হলো আমিও খেলা শুরু করেছিলাম গোলকিপার হিসাবে। সেই ৮৬ থেকে ৮৮ তিন সিজন ছিলাম আমাদের স্থানীয় দলের এক নম্বর কিপার। কিন্তু ৮৮ সালে কিশোর লীগের আগে প্রস্তুতি ম্যাচে বিপক্ষ দলের লম্বা লম্বা স্ট্রাইকারেরা আমার মাথার উপর দিয়ে একের পর এক বল জালে ফেলতে লাগলো। আমি ছিলাম মাত্র ৪ ফুট ১০ ইঞ্চি সাইজের। সেই ম্যাচে চার গোর হজম করে আমার এতদিনের দুর্ধর্ষ গোলকিপারের সুনাম ধুলায় মিশে গেল। মনে আছে ভীষণ লজ্জা পেয়েছিলাম। তখন বাসাবো মাঠে প্রস্তুতি ম্যাচেও হাজার হাজার দর্শক হতো। সেই ম্যাচের পরের দিনই গোলকিপার হিসাবে ইস্তফা দিলাম।

যাহ্‌ মন্তব্য অনেক বড় হয়ে যাচ্ছে। আসলে আপনার লেখাটা স্মৃতির পুকুরে বড় একটা ঢিল মেরে ফেলেছে। দেখি হয়তো আলাদা একটা পোস্টই দিয়ে ফেলবো।

১০

আশফাকুর র's picture


মামুন ভাই,
আমাকে আপনি বোলার দরকার নাই,আপনি আমাকে তুমি বললেই কহুশি হব।আপনি ও তা হোলে গোলকিপার ছিলেন।যাক আমার আরেকজন সমগোত্রীয় পেলাম।ভাইরে আমাদের কাজটা খুব টাফ।আমার এলাকার ম্যাচে আমি এক বার ২ গোল খাইছিলাম.।আমারে মানুষ যা কইল বলার না...।আপনার কাছে রিকুয়েস্ট জলদি আপনার লেখাটা বাইর করেন।আর স্মৃতির পুকুরে প্রস্তর নিক্ষেপকারী হিসেবে আমার নামখানাও কইয়েন Wink Wink Wink Wink
ভালো থাইকেন।ভাতিজিরা কেমন আছে?

১১

মামুন হক's picture


আচ্ছা লিখবোনে, লেখা খারাপ হইলে সব দোষ তোমার Smile
আসলে ফুটবলের স্মৃতি নামে একটা সিরিজ লেখার ইচ্ছা আছি। আমি কিন্তু এখনও বিদেশে শৌখিন লীগে খেলি, তবে এই সিজনই শেষ। তারপরে বুট মাচায় উঠায়া রাখুম।

১২

আশফাকুর র's picture


আপনি যে এখনও খেলেন সেটা ফুটবলানন্দ পড়ে জানলাম।লেখা খারাপ হলে আমারই দোষ মাথা পেতে নেব..কিন্তু তাড়াতাড়ি লেখেন..।লেখাটা পড়ার অপেক্ষায় রইলাম

১৩

মীর's picture


গোল্কিপারের আত্মজীবনী মজা লাগলো। আমি ছিলাম স্ট্রাইকার, তাই গোল্কিপার ভালো পাই।
ওদের কাছে-পিঠে বল নিয়ে ঘুরতে আর শট করতে সুখ পাই।

১৪

আশফাকুর র's picture


স্ট্রাইকার!!!!!হা হা কত স্ট্রাইকার কে কাঁদালাম Crazy Crazy Crazy Crazy

১৫

ফয়সল রাব্বী's picture


ভালো লাগছেরে লেখাটা, জোশিলা। আমার ভাগ্য বা সাফল্য তোর মত ভালো নারে, গোলকিপার দাড়াইলে হালি হালি খাইতাম Sad( Sad( Sad(

১৬

তানবীরা's picture


যাদের বাবার বদলীর চাকরী তাদের মতো আনন্দের জীবন আর কারো নাই। আমাদের এক বাড়ির মধ্যেই জীবন কাটলো।

মুটা পুয়ারে শুভেচ্ছা, কিলাইন আছুন, বালাইনি?

১৭

আশফাকুর র's picture


নদীর এ পাড় কহে ছাড়িয়া নি:শ্বাস
ও পাড়েতে সর্গসুখ আমার বিশ্বাস
আপনি আবার আমাকে ঐ কথাটা মনে করিয়ে দিলেন..।বদলীর চাকুরি যে কত খারাপ--আমার চেয়ে ভালো কেউ জানেনা..এক জায়গায় একটু স্থির হওয়ার আগেই আরেক জায়গায় বদলি..আমার ক্যারিয়ারটাই তো শেষ করে দিলো।না হলে আজ কে বিশ্বকাপে বাংলাদেশের পতাকা উড়ত Wink Big smile ।ধন্যবাদ

মন্তব্য করুন

(আপনার প্রদান কৃত তথ্য কখনোই প্রকাশ করা হবেনা অথবা অন্য কোন মাধ্যমে শেয়ার করা হবেনা।)
ইমোটিকন
:):D:bigsmile:;):p:O:|:(:~:((8):steve:J):glasses::party::love:
  • Web page addresses and e-mail addresses turn into links automatically.
  • Allowed HTML tags: <a> <em> <strong> <cite> <code> <ul> <ol> <li> <dl> <dt> <dd> <img> <b> <u> <i> <br /> <p> <blockquote>
  • Lines and paragraphs break automatically.
  • Textual smileys will be replaced with graphical ones.

পোস্ট সাজাতে বাড়তি সুবিধাদি - ফর্মেটিং অপশন।

CAPTCHA
This question is for testing whether you are a human visitor and to prevent automated spam submissions.

বন্ধুর কথা

আশফাকুর র's picture

নিজের সম্পর্কে

স্বপ্ন দেখতে ভাল লাগে। নানা স্বপ্ন দেখতে দেখতে জীবন কাটছে। ছেলেবেলা থেকে স্বপ্ন ছিল বাংলাদেশের প্রথম ট্যাংক বানাবো। আমার জলপাঈ রঙা সে ট্যাংকে চড়বে বাংলার সেনারা...।সে স্বপ্নের খাতিরে প্রকৌশলী হলাম। কিন্তু স্বপ্ন পূরণ হয়নি...।বানাতে পেরেছি একটা ছোট বহির্দহ ইঞ্জিন। জীবনে তাই আর বড় কিছু স্বপ্ন দেখিনা। একমাত্র অনেক টাকা কামাতে চাই...।সারা জীবন আমার মা টা অনেক ভুগেছে...।। আমি মার জন্য কিছু করতে চাই...।।স্বপম বলতে এটুকুই