ছেলেবেলার কুরবানির ঈদ
“অতঃপর হযরত ঈব্রাহিম (আঃ) তার পুত্র ঈসমাইল কে কুরবানী করার প্রস্তুতি নিলেন। ছুরি শান দিয়ে পুত্রের চোখ বেঁধে দিলেন যাতে তার মায়াময় চোখ পিতৃস্নেহকে আবার জাগিয়ে না তুলে। ছুরি ঈসমাইলের গলায় দিতেই আল্লাহ বললেন হে ঈব্রাহিম থাম। তুমি পরীক্ষায় পাস করেছ। তাই ঈসমাইলের বদলে দুম্বা কুরবাণি হল। বুঝলি বাবারা। চুপ করে আছে!! আল হামদুলিল্লাহ বল বান্দরের দল”।
হ্যা এভাবেই আমাদের ক্লাস ফোরে পড়াতেন ফারুক হুজুর। আর আমরা আমাদের গলার সমস্ত শক্তি এক করে বলতাম আল হামদুলিল্লাহ। সত্যি আল হামদুলিল্লাহ। কুরবানীর ঈদের সময় আমার হৃদয় সবচেয়ে পুলকিত থাকে। আকৃতিগত কারণেই আমার খাওয়া দাওয়ার প্রতি মারাত্মক আগ্রহ। আমি তো এখন তাও লাইনে আসছি। এই ক্লাস নাইনেও রাতে স্বপ্নে দেখতাম চকোলেটের উপরে ভাসতেসি। সে এক মারাত্মক স্বপ্ন। আজ অনেক দিন পর আবার মৌসুম এসেছে কুরবানীর। মন তাই আমার যথারীতি পুলকিত এবং আশংকিত। পুলকিত আমার মা জানের হাতের রুটি মাংস ভুনা খাওয়ার আনন্দে আর আশংকিত এবার আমার ছোটবোন ফ্রী বলে। কারণ সে ফ্রী থাকলেই নানা কিছু রান্না করে এবং আমি হলাম তার নিয়মিত গিনিপিগ। আর খাবার যা সে রান্না করবে প্রতিবার খাওয়ার পর বলতে হবে-অসাধারন হইসে। এক্ষেত্রে আব্বুর স্টাইলটা ইউনিক। খেয়ে “অনেক ভাল। তবে তোমার মুল কাজ পড়াশোনা। এসব আর করার দরকার নাই। তবে রান্না ভাল হইসে”।
আমার ছোটবেলা কেটেছে কুমিল্লা, চিটাগাং, কুষ্টিয়া, বরগুনা, সিলেট, চিটাগাং হয়ে আবার চিটাগাং এ। তবে সবসময় আমাদের ঈদ করতে হত বাড়ীতে মানে ব্রাম্মনবাড়িয়া বা বাওনবাইরাতে। রোজার ঈদে আমার খুব বেশি ভাল লাগতোনা। কারণ এক জামা ছাড়া তখন আর কিছু পাওয়ার ছিল না মনে হত। তারপরো মজা যে হতোন তা না । তারপরো এত ভাল লাগতোনা। কিন্তু কুরবানীর ঈদ অসাধারন। আমরা প্রতি কুরবানীর ঈদের তিন কি চারদিন আগে বাড়ির দিকে রওনা হতাম। সে কি আনন্দ। আমি, আব্বু, আম্মু আর পরে ছোট্ট তাসনুভা। ট্রেনে তখন আমরা যেতাম সুলভ বা শোভন শ্রেণীতে। জানালা ধরে দাঁড়িয়ে থাকতাম আমি। আর আমার এক হাত ধরে বসে থাকত আব্বু। একটার পর একটা স্টেশন পাড় হত। আর আমার সে কি আনন্দ। কয়েস কাকার সাথে গরু কিনতে যাব। ফয়েজ কাকার ফার্মেসিতে বসে ওশুধ বেঁচা দেখব। আর শিপন কাকার পাশে বসে থেকে মাছ মারব। দাদা ভাইয়ের সাথে সকালে বাজারে আসব। আর রসগোল্লা আর পরোটা খাব। দাদুমনির হাতের সন্দেস পিঠা খাব। এসব চিন্তা আর পরিকল্পনায় ট্রেন জার্নি কেটে যেত। কিন্তু গোল বাধল তাসনুভার জন্মের পর। একটু বড় হতেই সে আমার সব প্রিয় জিনিসের দিকে হাত বাড়াতে লাগল। খাক না খাক সারাক্ষণ হাতের মাঝে দুধ ভরা ফিডার নিয়ে বসে থাকত। তারপর ভাইয়ু ভাইয়ু বলে আমার দিকে ফিডার এগিয়ে দিত। আমার আব্বু “বোন আদর করে দিচ্ছে – একটু খাও।” বলে আমাকে সান্তনা দিতেন। আমাকে একটু মুখে দিতেই হত তারপর তার সে কি খুশি। খুশির চোটে আস্তে আস্তে দুইপা সোজা হতেই আমার জানালার পাশের সিট বেদখল। সেখানে একটা ছোট মেয়ে বসে আছে। আর তার পাশে পৃথিবীর সব রাগ এক মুখে এনে বাংলার পাঁচের মত মুখ করে বসে আছি আমি। সে যাই হোক ট্রেন নোয়াপাড়া আসলেই আব্বু ব্যাগ নিয়ে আর আম্মু আমাকে আর নুভাকে নিয়ে নামত। প্রায় ঈ আমাদের নিতে আসত আমাদের বাড়ির হেলাল কাকা। হেলাল কাকার রিক্সায় চড়ে আমরা আসতাম মাধবপুর। সেখানে আব্বুর সব বন্ধুরা যারা অনেকে সেখানে ব্যাবসা করত-আব্বু কে দেখেই হাঁক ছারত “আরশাদ নিরে? আইসস কুন বেলা। ভাবি আসইন্নি ভালা? বাসাত আইস আশাদ।” আমার বাবার আবার এক বন্ধু ছিল নাম মেম্বর। (ইহা তার আসল নাম কিনা জানিনা)। আমার আব্বু হরিণবের বাজার আসলেই লাফাতে শুরু করতেন কখন মেম্বরের সারের দোকান আসবে। চোখের সীমায় আসা মাত্র আব্বুর সে কি চিতকার-“মেম্বর মেম্বর। দুহান থেইয়া বাইর হ বাপজোট্টা”। দুইজন মিলে তারা হারিয়ে যেতেন হয়ত তাদের শৈশবে। আর আমরা আম্মুর সাথে বসে চলে যেতাম শুংকরাদহ আমাদের গ্রামে। সেখানে দাদাভাই পুকুরের পাশে দাঁড়িয়ে থাকতেন। আমরা আসতেই আমাদের নিয়ে বাড়িতে ঢূকতেন। আম্মুকে শুধাতেন “আরশাদ কই”। আম্মু বলতেন বাজারে। তখন তিনি বলতেন “ আরশাদের মা তোমার পুতের আক্কেল দেখ? বাড়িত না আইয়া বাজারে বয়া রইসে”। তারপর কয়েস কাকার ঘরে আসতাম আমি। আমার দেখাদেখি নুভার ও কি আগ্রহ কয়েস কাকার ঘরে আসার জন্য কেউ যদি দেখত। কাকার খুব প্রিয় ছিল জ্যামিতি। আমি যখনই দেখতাম কাকা সম্পাদ্য করত। আমাকে দেখলেই বলত, “ভাইপুত আইসস নিরে? ভাই কই?” তারপর আমরা চাচা ভাতিজা মিলে গতবার কোন রঙের গরু কিনসিলাম আর এবার কি কিনব তা নিয়ে আলোচনা করে সময় কাটাতাম। তারপর আব্বু আসলেই দাদুমনির কাজ শুরু হত। আরশাদের লেইগা ডাব নামানো, চিতই পিঠা বানানো ইত্যাদি যার অন্যতম কাজ। আর আমি আব্বু আসলেই দৌড়ে দাদাভাইয়ের কাছে যেতাম। কারণ দাদাভাইয়ের প্রথম সম্ভাষণ-“আইসে লাট। থাপরায়া তোর দাঁতদি ফালায় দিমু। বৌ- বাচচা একলা আসে আর তুই গঞ্জে যাস। চুপ। যা কলতলায় যা।” এই অংশটা যে আমার কি প্রিয় তা বলার মতনা। একজন উঁচু পদের সরকারী অফিসার বকা খাচ্ছে সেটা আমাদের ব্যাপার না কিন্তু নিত্য বকাদান কারি আব্বু বকা খাচ্ছে এইটা আমার সবচেয়ে ভাল লাগত। তারপর দুপুরে ভাত খেয়ে আমি, দাদাভাই, কয়েস কাকা, এপোলো কাকা যেতাম মাধবপুর গরুর হাটে। এসময় আমার দাদা সবাইকে পরিচয় করিয়ে দিতেন তাঁর বড় নাতির সাথে। আমিও পরিচিত হতাম “আবজু মিয়ার বড় নাতি তানিন মিয়া হিসেবে।”
বাজারে গরু দেখে আমার সে কি আনন্দ!! কয়েস কাকা আর আমি গরুর লেজ ধরে টান দিতাম। গরু লাফালাফি করে আমাদের দিকে ঘুরার চেষ্টা করত। সারা দুপুর খোঁজাখুঁজি করে আমরা রাতে আমাদের মান্যবর গরুকে নিয়ে আসতাম। রাতে হেঁটে হেঁটে গরু নিয়ে আসা আর সবাইকে দাম বলা সে এক মধুর আনন্দ। তারপর গরু এনে উঠানে বেঁধে রাখা হত। আমি সারারাত হাতে খড় নিয়ে বসে থাকতাম গরু একটু খড় হাত থেকে নিলেই খুশিতে নাচতাম। সকালে উঠেই গরুর কাছে যেতাম। কখনো রজব আলী ভাই আসত গরুর গোসল করাতে। আমিও পুকুরে নামতাম গরুর গা ঘঁষতে। নাওয়া খাওয়া সব বাদ দিয়ে সারাক্ষন গরুই তখন আমার বন্ধু। কুরবানীর আগের দিন থেকে গরুকে শুধু পানি খাওয়ানো হত। ঈদের নামায শেষে গরু কুরবানী দেয়া হত। আমাদের গরু জবাই করত দাদাভাই নিজে। তারপর আব্বুরা সাত ভাই মিলে গরু কাটতে থাকতেন আমি কখনো চা, কখনো চালের গুড়া দিয়ে তাদের সাহায্য করে যেতাম। তারপর রান্না করে আমাদের ডাকা হতেই আমরা সবাই বসে যেতাম ।তারপর সাদাকাল টিভিতে ঈদের ছায়াছবি দেখতে দেখতে চলত টানা মাংস ও ছিটা রুটি ভক্ষন। বিকালে আমি আর কয়েস কাকা বের হতাম অন্য বাড়ির মাংসের স্বাদ নিতে। রাত করে যখন ফিরতাম আমাদের চাচা ভাতিজার তখন ঊঠানে শুয়ে শুয়ে এর পরের ঈদ থেকে আরো কম করে খাওয়ার পরিকল্পনা করা ছাড়া আর কিছু করার থাকতনা। এভাবে ঈদের পর আরো তিন দিন- বৈচিত্রহীন ভাবে চলত আমাদের বৈচিত্রময় মাংস খাওয়া। তারপর চার নম্বর দিন আমরা আবার রিক্সায় উঠতাম বাড়ি থেকে বাসায় যাওয়ার জন্য। রিক্সা থেকে পেছনে তাকালে দেখা যেত দাদা ভাই দাদুমনি আর কয়েস কাকা দাঁড়িয়ে আছে-যতক্ষণ দেখা যায় দাড়িয়েই আছে। এদিন বাজারে এলে আব্বুর গলায় আর সেই জোড় থাকতোনা। মেম্বর কাকার দোকানে মেম্বর কাকা নিজেই দাঁড়িয়ে থেকে আমাদের বিদায় দিতেন। আমার আর নোভার হাতে তুলে দিনে সন্দেস বা চিপসের প্যাকেট। আমি, আম্মু, নুভা মিলে অবাক হয়ে দুই বন্ধুর সজল নয়নে বিদায় দৃশ্য। মেম্বর কাকা আব্বুকে বলতেন, “চিঠি দিও আরশদ।” তখন তো আর মোবাইল ছিলনা।
এখন আর সময় আগের মত নাই। দাদাভাই নেই। কয়েস কাকা জীবন যুদ্ধে ব্যাস্ত। মেম্বর কাকা এখন উপজেলার রাজনীতি নিয়ে ব্যাস্ত। একজন তানিন মিয়া এখন গম্ভীর এক মানুষে পরিণত যার মাথায় সামনের মাস থেকে নতুন জীবনের হাতছানি, ছোট্ট তাসনুভা এই মাসের শেষ দিকে হয়ত ভর্তি হবে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে ফরেস্টিতে। জীবন অনেক বদলে গেছে। সময় থেমে থাকেনা। তাই এখন নিজেরা কুরবানী শহরে দেয়াও থেমে নেই। ডিপ ফ্রীজ টাতে মাংস জমা হওয়া ছাড়া এই শহুরে ঈদের খুব বেশি দেয়ার নেই। তারপরো জীবন যখন যেখানে যেমন তাতেই মানিয়ে নিতে হয়। সবার বরকার ঈদ ভাল কাটুক। শুভেচ্ছা রইল অগ্রীম।





নস্টালজিক করে দিলেন ভাই! ভাল থাকুন।
আপনিও ভাল থাকবেন ধন্যবাদ।
হৃদয়টা মোচর দিলো... আহা ফেলে আসা দিনগুলো
MEMORIES টুটুল ভাই MEMORIES
ভালো লাগছে না। পুরো ব্যাপারটাই ভালো লাগছে না।
স্যরি, দুঃখিত। কমেন্টটা লিখেছিলাম অন্য পত্রিকার জন্য, অন্যমনস্কতার কারণে এখানে দিয়ে ফেলেছি।
ইশ, আমার যে কী হবে!
এখন ঈদ করি শ্বশুরবাড়ি আর ঈদের আগের রাত থেকে মনে পড়তে থাকে, নিজের বাড়িতে করা ঈদের স্মৃতি, দুপুরে সবাই মিলে একসাথে চালের গুড়োর রুটি, গরুর ঝোল, সালাদ খেতাম। এটা বেশি মিস করি।
অগ্রীম ঈদ মোবারক আপু।
পুরানো সেই দিনের কথা মনে করায়া দিলেন:(
"এখন আর সময় আগের মত নাই। দাদাভাই নেই। কয়েস কাকা জীবন যুদ্ধে ব্যাস্ত। মেম্বর কাকা এখন উপজেলার রাজনীতি নিয়ে ব্যাস্ত। একজন তানিন মিয়া এখন গম্ভীর এক মানুষে পরিণত যার মাথায় সামনের মাস থেকে নতুন জীবনের হাতছানি, ছোট্ট তাসনুভা এই মাসের শেষ দিকে হয়ত ভর্তি হবে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে ফরেস্টিতে। জীবন অনেক বদলে গেছে। সময় থেমে থাকেনা। তাই এখন নিজেরা কুরবানী শহরে দেয়াও থেমে নেই। ডিপ ফ্রীজ টাতে মাংস জমা হওয়া ছাড়া এই শহুরে ঈদের খুব বেশি দেয়ার নেই। তারপরো জীবন যখন যেখানে যেমন তাতেই মানিয়ে নিতে হয়। সবার এবারকার ঈদ ভাল কাটুক। শুভেচ্ছা রইল অগ্রীম।" ভাল লাগলো ।
অগ্রিম অভিনন্দন । ঈদের শুভেচ্ছা ।
ধন্যবাদ।
আহা....সেই দিনগুলো।
অগ্রীম ঈদ শুভেচ্ছা মাসুম ভাই।
স্মৃতি জাগানিয়া লেখা। অনেক কথাই মনে পড়লো। আমরা বিশষ করে আমি কোরবানির ঈদে সকালের দিক সেমাই খেয়ে গরুর সঙ্গে যুদ্ধ নামতাম। তারপর কাটাকুটি হয়ে গেলে দুপুরে খেয় শুরু হতো বন্ধুদের বাড় বাড়ি দলবেঁধে গোস্ত খাওয়া। সঙ্গে কাঁচা পেঁয়াজ। রাতে পেট ঢোল হয়ে থাকতো। আর কিছু খাওয়ার সামর্থ থাকতো না।
প্রবাসে ঈদ নেই।
আপনাদের ঈদ কাটুক আনন্দে।
ছোট বেলায় ক্লাশ নাইন অব্ধি প্রতি কোরবানীর ঈদে বছরে একবার আমরা গ্রামের বাড়ি যেতে পারতাম ক'দিনের জন্য। যৌথ পরিবারের সবাই মিলে একসাথে ঈদ। জীবন থেকে যা হারিয়ে যায় তা শুধু হারিয়েই যায়। সব কিছুর বিনিময়ে যা আবার ফিরে চাই জীবনে তাহলো সেই দিন গুলোকে।
নদীতে নৌকা ভ্রমন, চালের রুটি বানানোর হিড়িক, লাকড়ির চুলায় মায়েদের অনভ্যস্ত হাতের রান্না, পুকুরে ঝাপাঝাপি, চান্নিপর খেলা। আমাদেরকে দেখতে আসে পাশের বাড়ির লোকেরা আসতো, ব্যংগ করে বলতো, শহুইরা কাউয়া দেখতে আসছি।
অন্য সবকিছুর সাথে ঈদও আজকাল বদলে গেছে। এখন শুধু খাও, জামা পর আর টিভি দেখো।
"অন্য সবকিছুর সাথে ঈদও আজকাল বদলে গেছে। এখন শুধু খাও, জামা পর আর টিভি দেখো।" বদলে গেছে অনেক কিছুই ।
মন্তব্য করুন